Monday, 29 March 2021

PEACE---- THE MOST WANTED ARTICLE IN THE WORLD

 




In daily life,  most of us, face two things.  These are  .. (1) Challenge  / Problems created by the environment  and other one ...(2) is our ability/ skill  based on our socio-economic condition  to encounter the challenges. The peace of mind or enjoyment of life,  mostly depends upon the power of these two factors.  Equilibrium of these two bring happiness to us . Peace  / happiness  or unhappiness is the  final result of  a match  between Challenges  and  Skill.  If Challenges/problems  are much higher than our  Skill  or Ability to  meet the same,  then unbalanced  situation generates. Unhappiness  , Tension  etc prevails in our life. In this situation it may be suggested,  if possible   the whole Challenge / Problem can be divided into smaller  parts . Then one can try with his limited ability  / skill  to solve those smaller parts so that in the long run total problems will be solved and desired balanced will come. Again in case of vice-versa, I.e. where ability  or skill is higher than the  problems  / Challenges faced, over confidence  or Superity Complex comes. This over confidence  or Superior Complex gives temporary happiness or peace but in future,  it acts in opposite direction.  But  when  these two factors are equal,  real peace  or happiness comes and we call it as balanced / happy life. It is just like a tenis match that if you  can return the services of opponent properly   , the game will be enjoyable and in the long run you will win the game. 


Now the question is how to mitigate the problems which arrive now and then in our day to day life. The first theory is to follow the principle--------- " SOLVE the problem or LEAVE the problem. Don't LIVE with the problem. " Living with the problems is very  painful as well as dangerous  and it leads to destruction of life.  Again the question comes _______ How to solve? There are three steps which can be followed to solve any problem.  These are  (1) Face the problem throughly  (2) Fight with the problem with your  whole ability and skill  (3) Finish the problem upto the  root level.  Don't leave behind any small fraction of problem alive as it will automatically grow and will take  another big shape in future again. 


To fight with these problems,  we have to come out of the negative thoughts.  Negative thoughts block ²one's ability of thinking.  The crowd of negative thoughts mutilated, cripples and destroy slowly the human spirit.  It darken our vision and make us indifferent.  Example of negative thoughts can be illustrated in this way.  Suppose you have invited 100 persons in a function of your home.  There sixty percent was present and forty percent was absent. It is advisable not to analyze the cause why they are absent. Negative thinking will try to direct you to discuss the different causes of absent.  This thinking will first proceed through the main root and it will devide and again it will sub-devide and  so on.  The result of which is that the total enjoyment of function will be ruined and you will get no solution  or  appropriate answer of your thoughts.  In stead of this  ... if you mix with joy with your invitees those who have appeared , your mind will be relaxed and the of the I.e. enjoyment  will be achieved.  This is the simplest example of bad effect  of negative thinking. 



But, it is also true,  for the common people this negative thinking appears automatically and takes a greater part of our thoughts. Negative attitude serves no good.... either to us or to others. It is very much impossible to overcome the negative  attitudes. Negative attitude should be overcome with positive ones. Believe/ Trust is an urgent and foremost weapon to overcome negative thinking.  The sooner we come out , quicker the benefits and blessings showered on us. Principles to step out of negative thinking can be done by :::: (a) Friendship with  brave and confident people  (b) Replacement of negative thoughts with positive ones (c) Step out of idleness. 


Again another weapon to win the  problem or Challenges   is the faith in yourself.  Faith is the fundamental factor in all winning people. As per Vivekananda's saying ----- " Whatever you think,  that will be.  If you think yourself weak, weak will be.  Vice versa,  if you think yourselves strong, strong will be.  Similarly,  if you think yourself pure, pure will be & vice versa. If a man thinks day and night he is measurable,  low and nothing --- nothing he becomes ". SO BELIEVE IN YOURSELVES.  If you want to get rid of these problems/Challenges,  you work it out in intellectual  or spiritual plan. In course of time,  you will see that you are free and eternal bliss will come to you.  Here we may cite the example of ARJUNA'S activity in KURUKHETRA. Defective thinking leads him to loss of faith in himself. He dropped his weapons and refused to proceed for fight. LORD KRISHNA removed his confusion and pulled him out from the  loss of faith in himself   And we all know the  consequences of this generation  of faith  in himself. 

Another factor  i.e. fault finding attitude never wins. It leads to disturb mind.  It N E V E R brings peace in life . It is better not to talk about the  faults of others. Because if you talk about the faults of someone,  it will not help him. Rather it will make injury to him.  We, the  human beings,  blame others for our failure.  We always try to  find out the faults in others for  our failure. BLAMING OF OTHERS NEVER ENDS . Blaming each other serves no purpose. It never gives us the desired result i.e. win of problem.  So it is better not to blame others but to find out the faults / mistakes which we have done ourselves. 

Selfishness is another factor  which is the barrier / obstacle to get peace.  Self interest or selfishness leads to  scared mind. Selfish mind is always  tensed mind. It always search the loss or gain. Man becomes very much commercial.  But unselfish mind is always relaxed mind   If you think good for the people , good for the community,  good for the family,  good for organization or good for general others,  you will feel a relaxed mind in yourself . 

Again,  it is the moral strength enables us to cultivate higher virtues of our personalities and bestow upon us peace,  harmony and prosperity.  Neither the physical strength nor the intellectual strength can bestow us that which can be blessed by moral strength. But the question is........ How the moral strength of individuals can be achieved or improved? Generally moral strength comes from ~~~~~~ (a) Purity of thoughts  (b) Purity of speech  (c) Purity of action. Company of good people and reading of good books are highly conductive for Purity of thoughts.  Secondly,  the way of speech reveals our inner personalities.  The words we speak must be smooth and inspire the mind and touch the inner core of the heart of the listeners. Thirdly,  words may sometimes be used to hide our inner fillings but actions will convey the REAL INNER FEELINGS.  The purity of action calls for dedication of work,  dignity of work and to treat work as the worship of G O D.

In upanisad it revels that  " উত্তিষ্ঠত, জাগ্রত,  প্রাপ্য বরান্ নিবোধত্ত "।

Sunday, 28 February 2021

মায়ের দামাল ছেলে




*ওঠো কাজে লাগো*
*#স্বপ্নের_যুবকগণ*
(০৩-০১-১৪২৭)
‌বিশ্ব মহামারী সর্বত্র। আমরা ঠাকুরের ছেলেমেয়েরা দিব্যত্রয়ীর মুখ চেয়ে আছি। বেশ কিছুদিন ধরে লকডাউন চলছে। সকলেই এক অস্বাভাবিক জীবনযাপন এর মধ্যে রয়েছি। মন বড়ই অশান্তির মধ্যে রয়েছে অধিকাংশ রামকৃষ্ণ ভক্তমন্ডলীর কাছে। ঠাকুর মন্দিরে একা একা রয়েছেন। আমাদের ঠাকুর আবার বড়ই ভক্তবৎসল। ভক্ত ছাড়া তিনি এক মুহূর্ত থাকতে পারেন না। তিনি ভক্তের ভগবান। আবার এর মধ্যেই বিভিন্ন রকমের মানুষ মঠ নিয়ে কুমন্তব্য করেছেন, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি এই দুর্যোগে তারাও সুস্থ এবং শান্তিতে থাকুক। আবার এদিকে মিশনের পরম্পরা অনুযায়ী সাধুরা কোন দিকে কান না দিয়ে সেবাধর্মের মাধ্যমে নিজেদের জীবন পাত করছেন, হ্যাঁ! এটাই রামকৃষ্ণ মিশনের একমাত্র ধর্ম।

‌ জানেন! আমাদের সঙ্ঘে যারা গুরু আছেন, তারা আমাদের যেভাবে সাধন পদ্ধতি শিখিয়েছেন, মনে হয় না এইরকম মহৎ থেকে মহত্তর সাধন প্রণালী জগতে আর কিছু থাকতে পারে। আমরা নিয়মিত সাধন-ভজনের সময়, সর্বাগ্রে এই প্রার্থনা করি- *"জগতের কল্যাণ হোক, মঙ্গল হোক, জগতের সকলেই যেন সুখ শান্তিতে থাকে"* ইত্যাদি। সুতরাং, জগতের জন্য মঙ্গল প্রার্থনা আমরা নিয়মিতই করে থাকি।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, জগতের কল্যাণ প্রার্থনা নিয়মিত আমরা যেরকম ভাবে করি, এখনো কি সেই রকম ভাবেই করব !
দেখুন সারা বছর আমরা ঠাকুর-মা-স্বামীজি কে নিত্য আরাধনা করি, কিন্তু তাদের জন্ম তিথির সময় মোটামুটি সকলেই আমরা তাদের একটু বিশেষভাবেই আরাধনা করি,
অতএব এখন জগতের কল্যাণ চিন্তা প্রার্থনা করার বিশেষ সময়।
মঠ ও মিশনের অধিকাংশ ভক্তই,বিশেষত যুবসমাজ সর্বদাই মঠ ও মিশনের ধারাকে ধরে রাখার চেষ্টা চালায়। তাই স্বামীজীর সেই স্বপ্নের যুবক ভাইয়েরা! এখন আশপাশটা চেয়ে দেখার সময় হয়ে এসেছে, বড্ড দুঃখ যন্ত্রণার মধ্যে মানুষ রয়েছে, শুধু মানুষ কেন পশুপাখি  সকলেই । এখনই তো সময়, বিবেকানন্দকে নিজের জীবনে প্রবেশ করানোর! তোমরা মানুষের জন্য কি কিছু করতে পার? এই দুর্দিনে! আচ্ছা তা না পারলেও অন্তত আশপাশের পশুপাখি গুলোর জন্য কিছু করো দেখি। 
মনে পড়ছে? শুনতে পাচ্ছ ? স্বামীজির কথা!
খুব ভালো করে শোনো, 
মন দিয়ে শোন, স্বামীজি বলছেন- *"আমি চাই তোরা খেটে খেটে মরে যা"*,
তিনি আমাদের খেটে খেটে মরতে বলছেন মানুষের জন্য!
নাহ্! ঠাকুর-মা-স্বামীজীকে আমরা যখন ধরেছি একবার, তখন আবার মরবো কেন! আমরা অমৃতের সন্তান, আমাদের মৃত্যু নেই -এ আমাদের নিশ্চিত ধারণা। তবে পরহিতে জীবনপাত করে মানব জনম সার্থক করতে হবে,এটাই উপযুক্ত সময়, তবেই শ্রীরামকৃষ্ণের পূজা পূর্ণতা পাবে।
পরিশেষে সকলে ভালো থাকুক, সুস্থ থাকুক, সুখে থাকুক এবং শান্তিতে থাকুক শ্রীরামকৃষ্ণ চরনে এই প্রার্থনা।।
                     ইতি--.    
        মায়ের দামাল ছেলে,,






স্বামী ভুতেশানন্দজী মহারাজের জীবনকথা।
––––––––––––––
মহারাজের জীবনের শেষদিকের একটি ঘটনা।
 সন্ধ্যায় বাগানের ভেতরের রাস্তায় হাঁটছেন। আমি একটু পরে গেলাম। আমাকে দেখেই বাগান দেখিয়ে বললেন বুঝেছ স -  সব সূর্যমুখী ফুলগাছগুলো কেটে বাগান সাফ করে ফেলেছে।
 কেন? 
না গাছগুলো আর ফুল দেবেনা। বুড়ো হয়ে  গেছে।  ঢ্যাঙাগাছ গুলো রেখে আর কি হবে? 
আমরা সব চুপ করে আছি। সঙ্গে হাঁটছি। 
মহারাজ বলে চললেন সেবার আমেরিকায় গিয়েছি। একদিন দেখি কি আমাদের গাড়ীর সামনে রাস্তায় পালপাল গরু মোষ চলেছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম ওগুলো কোথায় চলেছে?
 ওরা বললো ওগুলো বুড়ো হয়ে গেছে, ওগুলো আর দুধ দেবেনা, তাই ওগুলোকে কসাইখানায় নিয়ে যাচ্ছে।

 আমরা সকলে চুপ করে আছি। একটুপরে মহারাজ নীরবতা ভঙ্গ করে বললেন তাইতো গরুগুলো বুড়ো হয়ে গেছে আর দুধ দেবে না।
 গাছগুলো বুড়ো হয়ে গেছে আর ফুল দেবে না। 
বুড়ো বুড়িরা আমার কাছে এসে ঠিকই বলে - ওদের বাড়িতে জায়গা হয় না। বৃদ্ধাশ্রমে চলে যাচ্ছে।
 আমিও তো বুড়ো হয়ে গেছি। আমি কি করছি?
 আমরা একেবারে চুপ নির্বাক। 
এরপর আরও কিছু সময় হেঁটেছি। 
মনে আছে বেশ কিছুক্ষন মহারাজ কথা বলেননি। একেবারে মৌন।
 বুঝলাম গাছগুলোকে উপলক্ষ করে মহারাজের মন কত  গভীর চিন্তায় আবিষ্ঠ।

 প্রত্যেকের যা দেবার তা ফুরুলে সে জগতে ব্রাত্য।
বেঁচে থাকার বা জগতের এককোণে  পড়ে থাকার অধিকারটুকুও তার নেই।

সমগ্র জীবনে তার অবদান বা অতীতকে মনে করে তারও জগতে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। 
তার যা দেবার সেটা ফুরালেই তাঁকে জগত থেকে শেষ করে দিতে হবে –
অবদানহীন অবস্থায় প্রাণমাত্র ধারণের যোগ্যতাও কারও থাকবে না। 
এ কেমন জগত? একথাগুলোই যেন মহারাজ মৌন নিস্তব্ধতার মধ্যে বলতে চেয়েছেন।
 আবার মহারাজ গম্ভীর কণ্ঠে বলে চলেছেন দেখলে মানুষ কেমন স্বার্থপর। গাছগুলো কেমন বড় হয়েছে কিন্তুু যেহেতু ফল দেয় না কেটে ফেলল। 
অর্থাৎ যেহেতু ওটা আর আমার প্রয়োজনে আসছে না অতএব ওটার আর দরকার কি? 
মানুষ সর্বদা নিজের প্রয়োজনের কথা ভাবে। একবারও ভাবেনা যে আমার প্রয়োজন ছাড়াও সেটার একটা নিজস্ব জীবন আছে। একটা Purpose আছে।

 মাঝেমাঝে মানুষ বলে ভগবান পোকামাকড় কীটপতঙ্গ কেন সৃষ্টি করেছেন?
 অর্থাৎ এগুলো তাঁর কোন উপকারে লাগছে না, অতএব এগুলোর কোন দরকার নেই।
 নিজেকে ছাড়া নিজের প্রয়োজনকে সম্পর্কিত না করে মানুষ যেন ভাবতে পারে না। 
এই হচ্ছে ego centric মনোভাব। একবারও ভাবে না যে আমার প্রয়োজনে না লাগলেও এদের একটা নিজস্ব জীবন আছে।
 কি purpose আমরা বুঝি না। কিন্তু ওগুলোর দরকার নেই এরকম বলা ego র প্রকাশ।

স্বামী ভুতেশানন্দজী মহারাজের রসবোধ -
–" স্বামী ঋতানন্দ "।


M.-—says in the 2nd Volume of the Kathamritha (7th edition, page 268)
that Sri Ramakrishna did not give formal sanyas to any
one and that the devotees called themselves by their old names Dutt, Ghose, Ganguli, etc., and continued their studies living in their homes as before, for sometime after the passing away of the Master. “ Sri Ramakrishna did
not give formal Sanyas to any of his disciples. Formalism
and calculation were not in his nature. He moved
wholly by the impulsion of the Divine Mother’s Will.
He gave the first initiation to his boys, thus laying
the foundation of their spiritual life, but he left the second to be given by ‘ Noren ’ who became the leader
of the group after the Master was gone (Sri Ramakrishna
and His Disciples by Sister Devamata, page 98). When
the Sanyas was actually given and in what order to the various monks is not definitely known- In Swami Sishya
Samvada (Part I, p. 99) of Saratchandra Chakravarty,
a disciple of Swami Vivekananda, it is stated “We have
heard that after the Mahasamadhi of Sri Ramakrishna,
Swamiji (Vivekananda) collected all the passages in the Upanishads dealing with the rules for taking Sanyas and
took Sanyas with his gurubhais according to Vedic rites before a picture of Sri Ramakrishna.” The Bengali
Book ‘ Kali-Tapaswi ’ (Life of Swami Abhedananda,
published by the Ramakrishna Vedanta Society, Calcutta)
gives the following version (pages 38—40): “Gradually
Norendra brought to the Mutt (Baranagore) Sarat,
Rakhal, Baburam, Niranjan, Gangadhar, Subodh, Hari,
Tulasi, Sarad and others . One day Noren wanted to take Sanyas with his gurubhais according to Vedic rites. Kali made arrangements for performing
the Viraja Homa according to the Shastras, and placing the sandals of the Guru (Sri Ramakrishna) in front,
officiated as the director, and Noren, Kali, Sasi, Sarat, Rakhal,Baburam, Niranjan, etc., performed the ceremony. Noren called himself Vividishananda and gave names to the others according to their characteristics.  Tarak did not join in the above homa. When Jogin and Latu returned from Brindavan, Kali made them perform the Homa and take Sanyas. A few days
after, Hari and Tulasi took Sanyas in the above manner.” Vaikuntanath Sanyal, a direct disciple of the Master has stated that Norendra took Sanyas himself and gave Sanyas to Brahmananda, Ramakrishnananda, Abhedananda, Adbhutananda, Nirmalananda, Turiyananda and others by performing jag-yajna (sacrificial fire) before the picture and relics of Sri Ramakrishna paramahamsa All these took sanyas on the same day.”

In a conversation at Benares 
Swami Nirmalanandaji
stated -
One day Swamiji (Vivekananda) selected the Mantras necessary for taking Sanyas from Mahanirvana Tantra and gave Sanyas to all of us. Sarat, Sasi, Kali, Latu, Gopal senior, Maharaj and Baburam—all of us
received Sanyas from Swami Vivekananda. Later on Mahapurushji, Vijnananandaji, Niranjananandaji and
Trigunateetajl took Sanyas themselves in the shrine of Sri Ramakrishna. Swamiji gave us the Sanyas names.”

So, Noren who became Vividishananda himself gave Sanyas to his gurubhais and gave them appropriate names To Tulasicharan Dutt, he gave the name Nirmalananda ‘ on account of the rare purity of his character, so wrote Swami Ramakrishnanandaji.

Source -Swami Nirmalananda His life and teachings pages 21,22.





🍀 দেহ ত্যাগের দুদিন আগে স্বামীজী নিমন্ত্রণ করেছিলেন নিবেদিতাকে । আয়োজন খুব  বেশী ছিল না । অতি সামান্য উপকরণ । বরফ দিয়ে ঠান্ডা করা দুধ, আলু সেদ্ধ, কাঁঠাল বিচি সেদ্ধ আর ভাত । উপকরণের অভাব বিবেকানন্দ আদরযত্নে পূরণ করে দিলেন । স্বামীজী নিজেই পরিবেশন করছেন । মজার মজার কথাবার্তা স্বামীজী বলছেন -- নিবেদিতা বসে বসে শুনছেন সে সব কথা আর খাচ্ছেন । খাওয়া শেষ হল ।




                                        স্বামীজী নিজের হাতে জল ঢেলে দিলেন, পরে নিজেই তোয়ালে দিয়ে হাত মুছিয়ে দিলেন । লজ্জা পেলেন নিবেদিতা । বললেন, স্বামীজী, এসব তো শিষ্য-শিষ্যারাই করে । আপনি এসব করছেন কেন ? স্বামীজী একটু হাসলেন । তারপর পরম স্নেহে ধীরে ধীরে উত্তর দিলেন, তুমিতো জান যিশুও তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়েছিলেন । উত্তর শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়লেন নিবেদিতা । ফ্যাকাসে হয়ে গেল তার মুখ । এ কি কথা শুনছেন তিনি গুরুর মুখে ? যিশু তাঁর শিষ্যদের পা ধুইয়ে দিয়ছিলেন কিন্তু সে তো তার মৃত্যুর আগের দিন । নিবেদিতা বিদায় নিলেন । গুরু আশীর্বাদ করলেন তাঁকে ।
           স্বামীজী ইঙ্গিতে আপনার মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন নিবেদিতাকে, কিন্তু নিবেদিতা বুঝতে পারেননি । আসল কথা কয়েকদিন স্বামীজীকে তো বেশ সুস্থই দেখাচ্ছিল ।
             শুক্রবার ৪ জুলাই । সেদিন বেশ ভাল আছেন স্বামীজী । সকালে ধ্যান করলেন দীর্ঘকাল ধরেই । দুপুরে শিষ্যদের সংস্কৃত পাঠ দিলেন । বিকেলে কয়েক মাইল পায়ে হেঁটে ঘুরে এলেন । ফেরার পরে যখন সন্ধ্যারতির ঘন্টা বাজছে, তখন নিজের ঘরে এসে ধ্যানে বসলেন । মুখ তাঁর দক্ষিণেশ্বরের দিকে । হাতে তাঁর জপের মালা । একঘন্টা অতিক্রমণের পর তিনি মেঝেয় শুয়ে পড়লেন । আরও একঘন্টা পরে দুটি গভীর শ্বাস বের হয়ে এল । সামান্য একটু কান্না -- শিশুর মতো । তারপর -- তারপর সব শেষ । ধ্যানের মাধ্যমে আত্মা বের হয়ে গেছে দেহ ছেড়ে । দেহটা শুধু পড়ে রইল পরিত্যক্ত বস্ত্রের মতো 🍀

              🌺 প্রণাম স্বামীজী 🌺
          💜 প্রণাম ভগিনী নিবেদিতা 💜




ফ্র্যাঙ্ক রোডহ্যামেলের কথায় :~


স্বামীজীর সব বক্তৃতাতেই তিনি বোমাবর্ষণ করতেন ৷ অাকস্মিক ঝাঁকি দিয়ে চিরাচরিত একঘেয়ে পথের বাইরে শ্রোতাদের টেনে বার করতেন ৷ খ্রীস্টানদের ঈশ্বরতত্ত্ব-বিষয়ক চিরাচরিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে যায় এমন সব বিস্ময়কর বৈদান্তিক ধারণাগুলি তিনি অম্লানবদনে সর্বসমক্ষে পেশ করে এক মুহুর্ত থেমে যেতেন, এবং দাঁত দিয়ে নীচের ঠোঁট চেপে শ্রোতাদের প্রতিক্রিয়া উদগ্রীব হয়ে লক্ষ্য করতেন ৷ কতবার, কতবার যে তিনি এমন করেছেন তা বলার নয় ! এবং বলা বাহুল্য সর্বদাই তার শুভ প্রভাব শ্রোতাদের অাবিষ্ট করতো ৷

একদিন স্বামীজী বললেন : "অনুতাপ করো না ! কখনও অনুতাপ করো না !.... এগিয়ে চল ! হাহুতাশ করে নিজেকে অবসন্ন করো না !  পাপ বলে যদি কিছু থেকেও থাকে, সে পাপের বোঝা গা থেকে ঝেড়ে ফেলে নিজেদের সত্য পরিচয়টি জানো ৷ স্বরূপত তোমরা শুদ্ধ, অপাপবিদ্ধ, নিত্যমুক্ত ৷ যিনি তোমাদের পাপী বলেন, একমাত্র তিনিই ঈশ্বর-নিন্দুক....৷"

খ্রীস্টীয় জগতের পরম্পরাগত যে-শিক্ষা তার বিরুদ্ধে এর চাইতে তীব্রতর আঘাত আর কি হতে পারে !

স্বামীজী বলতেন : "এ জগৎটাই একটা ঘোর কুসংস্কার ৷ আমরা সম্মোহিত হয়ে আছি, তাই এটাকে সত্যি বলে মনে করি ৷ এই মোহজাল ছিন্ন করে ফেলতে পারলেই আমরা মুক্ত.... ৷ এই বিশ্বসংসার প্রভুর খেলা বই কিছু নয় ৷ এ-সব কিছুই তাঁর মজার জন্য ৷ কারণের বশীভূত হয়ে তিনি কোনও কিছু করেন না ৷ ঈশ্বরের লীলা বুঝতে হলে তাঁকে আগে জানো ৷ তাঁর খেলার সঙ্গী হও, তাহলে তিনিই সব বলে দেবেন.... ৷ আর আপনারা যাঁরা দার্শনিক, তাঁদের উদ্দেশ্যে অামি বলি — এই বিশ্বের অস্তিত্বের কোনও হেতু খুঁজতে যাওয়া অযৌক্তিক, কারণ তাতে ঈশ্বরকে সীমিত করে ফেলা হয়, যা আপনারা মোটেই চান না ৷"
এই বলে তিনি অদ্বৈত বেদান্তের মুখ্য বৈশিষ্ট্যগুলির অপূর্ব ব্যাখ্যা দিতে লাগলেন ৷



এই যোগের নাম অষ্টাঙ্গযোগ, কারণ এর প্রধান অঙ্গ আটটি। যথা-

🌼 প্রথমঃ যম। যোগের এই অঙ্গটি সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এটি সারা জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করবে। এটি আবার পাঁচ ভাগে বিভক্তঃ

(১) কায়মনোবাক্যে হিংসা না করা।

(২) কায়মনোবাক্যে লোভ না করা।

(৩) কায়মনোবাক্যে পবিত্রতা রক্ষা করা।

(৪) কায়মনোবাক্যে সত্যনিষ্ঠ হওয়া।

(৫) কায়মনোবাক্যে বৃথা দান গ্রহন না করা(অপ্ররিগ্রহ)।

🌼 দ্বিতীয়ঃ নিয়ম। শরীরের যত্ন, স্নান, পরিমিত আহার ইত্যাদি।

🌼 তৃতীয়ঃ আসন। মেরুদন্ডের উপর জোর না দিয়ে কটিদেশ, স্কন্ধ ও মাথা ঋজুভাবে রাখতে হবে।

🌼 চতুর্থঃ প্রণায়াম। প্রাণবায়ুকে আয়ত্ব করবার জন্য শ্বাসপ্রশ্বাসের সংযম।

🌼 পঞ্চমঃ প্রত্যাহার। মনকে বহির্মুখ হ’তে না দিয়ে অন্তর্মুখ ক’রে কোন জিনিস বোঝবার জন্য বারংবার আলোচনা।

🌼 ষষ্ঠঃ ধারণা। কোন এক বিষয়ে মনকে একাগ্র করা। সপ্তম-ধ্যান। কোন এক বিষয়ে মনের অবিচ্ছিন্ন চিন্তা।

🌼 অষ্টমঃ সমাধি। জ্ঞানের আলোক লাভ করাই আমাদের সকল সাধনার লক্ষ্য।

যম ও নিয়ম সারা জীবন ধ’রে আমাদের অভ্যাস করতে হবে। জোঁক যেমন একটা ঘাস দৃঢ়ভাবে না ধরা পর্যন্ত আর একটা ছেড়ে দেয় না, তেমনি একটি সাধন ছাড়বার আগে অপরটি বেশ ক’রে বোঝা এবং অভ্যাস করা চাই।ll
      
                🌼°°স্বামী বিবেকানন্দ°°🌼


কেউ পাপী নয়-----

        স্বামীজী বলতেন, সবসময় কাউকে তার ভুল-ত্রুটির কথা মনে করিয়ে দিলে তার ক্ষতি করা হয়.  যেসব বাবা-মা ছেলেমেয়েদের বলে  'এটার কিছু হবে না----বোকা, গাধা'----সেই ছেলেমেয়েরা অনেক সময় সেরকমই হয়ে যায়.  আর যদি ছেলেমেয়েদের উৎসাহ দেওয়া হয়, ভাল বলা হয়----তাহলে সত্যি সত্যিই তারা ভাল হয়.  কারণ 'Negative thought  মানুষকে  weak করে দেয়. Positive  ideas  দিতে পারলে সাধারণে মানুষ হয়ে উঠবে ও নিজের পায়ে দাঁড়াতে শিখবে.'  ঠাকুরের উদাহরণ দিয়ে বলছেন,  'যাদের আমরা হেয় মনে করতুম, তাদেরও তিনি উৎসাহ দিয়ে জীবনের মতি-গতি ফিরিয়ে দিতেন.'  কাজেই, নেতিবাচক জিনিসটার দিকে অত জোর দিতে নেই----ইতিবাচক কিছু আছে কিনা দেখতে হয়.
       
        ঠাকুর তাই বলছেন,   তোমাদের কেবল পাপ, পাপ, পাপ !  পাপের কথা এত বল কেন তোমরা ? ঈশ্বরের কথা বল.  বলছেন,  হাততালি দিলে যেমন পাখিরা গাছ থেকে উড়ে যায়, তেমনি হরিনাম করলে দেহবৃক্ষ থেকে পাপ-পাখিরা সব উড়ে যায়. 

         যীশুখৃষ্টের জীবনে একটা ঘটনা আছে.  এক মহিলাকে অনেক লোক তাড়া করেছে.  মহিলাটি দুশ্চরিত্রা, তাই সবাই তাকে শাস্তি দেবে, ঢিল ছুঁড়ে মারবে তাকে.  যীশু দেখলেন এই দৃশ্য.  দেখে বললেন,   থাম.  তোমাদের মধ্যে যে জীবনে কোনদিন কোন অন্যায় করনি,  সে প্রথম ঢিলটি ছুঁড়বে.  সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করছে.  এমন কেউ নেই সেখানে যে কোনদিন কোনো অন্যায় করে নি.  যীশু তখন তাদের চলে যেতে বললেন আর সেই মহিলাকে দু-একটা সদুপদেশ দিয়ে বিদায় দিলেন.  ধর্ম বা ধর্মগুরু----তাঁরা এই করেন. মানুষকে ক্ষমা করেন.  ক্ষমা করেন অন্যায়কে প্রশ্রয় দিতে নয়,  মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যেতে.

                     -------স্বামী লোকেশ্বরানন্দ



আমি কচুরি সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী, বলতেন বিবেকানন্দ






বাঙালি মাত্রই খাদ্যরসিক, সেই তালিকা থেকে বাদ ছিলেন না স্বামী বিবেকানন্দও। শোনা যায়, কচুরি-তরকারির প্রতি তাঁর এমন আসক্তি ছিল, বিদেশে নিজের হাতে বানিয়ে খেতেন সেই পদ! আজ প্রথম পর্বঅলোক নাথ শেঠ
কচুরি খেতে ভালোবাসে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। কিন্তু জানেন কি, স্বামী বিবেকানন্দও কচুরি খেতে খুব পছন্দ করতেন। তিনি বলতেন, কচুরি ছাড়া নাকি তাঁর দিন চলে না। মাঝে মাঝেই কলকাতার নামকরা দোকানে ঘুরে ঘুরে তিনি কচুরি খেতেন। আবার মাঝে মাঝে দোকান থেকে আনিয়েও খেতেন। কিন্তু বিদেশে থাকার সময় তাঁকে কে বানিয়ে দেবে কচুরি আর তরকারি? বিদেশে বাড়ির বেসমেন্টে বসেই তিনি বানিয়ে ফেলতেন গরমাগরম কচুরি আর তরকারি। তার পর তৃপ্তি করে তা উদরস্থ করতেন।

ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছেন স্বামীজি। পথে এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আচ্ছা, আপনি কোন সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী? গিরি না তোতাপুরি?’ বিবেকানন্দ বরাবরই কথার প্যাঁচে পটু ছিলেন। তাঁর জবাব ছিল, ‘গিরি তোতাপুরি কোনওটাই না, আমি কচুরি সম্প্রদায়ভুক্ত।’ এমনই ছিল তাঁর কচুরি প্রেম। সিমলার বিখ্যাত কচুরি বিক্রেতা ‘পরমহংসের কচুরি’র দোকান থেকে তিনি প্রায়ই কচুরি আনাতেন নিজের আর বন্ধু রাখালের জন্য। পরবর্তীকালে রাখালই হন স্বামী ব্রহ্মানন্দ।

শুধু কচুরি নয়, স্বামীজি ছিলেন আসলে খাদ্য রসিক। নানা রকম খাবার তাঁর পছন্দের তালিকায় ছিল। শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন, ‘খালিপেটে কখনও ধর্ম হয় না’। গুরুদেবের এই কথাটি বিবেকানন্দ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন। আর তা হবে না কেন! ছোটবেলা থেকে দত্ত পরিবারের বাসমতী চালের পোলাও খেয়ে বড় হওয়া। তাঁর পিতাও ছিলেন ভোজনরসিক। মাংস আর পোলাও ছাড়া অন্য কোনও খাবারে দত্ত বাড়ির রুচিই আসত না। শ্রীরামকৃষ্ণও স্বামীজিকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। তিনি বলতেন, ‘নরেনকে খাওয়ালে লক্ষ ব্রাহ্মণ ভোজন করানোর পুণ্য হয়…।’ কিন্তু তাঁর খাদ্য তালিকায় সব কিছুর উপরে থাকত কচুরি আর তরকারি। এটা না খেলে তাঁর দিন যেত না। সমস্ত মায়া ত্যাগ করা মানুষটি কচুরি দেখলে লোভ সংবরণ করতে পারতেন না।


স্বামীজির মাংসপ্রীতির কথা হয়তো অনেকেই জানেন না। মাংসের নানা পদ তাঁর প্রিয় ছিল। মুরগির মাংস খেতে তিনি বিশেষ ভাবে পছন্দ করতেন। সে সময় মুরগির মাংস গৃহস্থ ঘরে ঢোকা ঘোর অনাচার বলে মানা হত। কিন্তু স্বামীজি এ সব নিয়ম মানতেন না। স্বামীজির মুরগির মাংসের প্রতি এ হেন প্রেম সম্বন্ধে স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণও অবগত ছিলেন। স্বামীজি নানা হোটেল গিয়ে যথেচ্ছ পরিমাণে মাংস ভক্ষণ করতেন। একদা এক শিষ্য শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে স্বামীজির নামে অভিযোগ জানায়। ঠাকুর হেসে বলেছিলেন, ‘খেয়েছে তো কী হয়েছে। তুই যদি রোজ হবিষ্যিও খাস, আর নরেন যদি রোজ হোটেলে মাংস খায়, তা হলেও তুই নরেনের সমান হতে পারবি না।’





শোনা যায়, তিনি কালীঘাটের মায়ের মন্দিরের পাঁঠাবলির মাংস অনেক সময় বেলুড় মঠে এনে রান্না করে খেতেন এবং গুরুভাইদেরও খাওয়াতেন। বিবেকানন্দের মাংসপ্রীতি সম্বন্ধে স্বামী অভেদানন্দ লিখেছেন, ‘সে দিন নরেন বলিল, চল আজ তোদের কুসংস্কার ভাঙিয়া দিই…। সন্ধ্যার সময় কাশীপুর বাগান হইতে পদব্রজে আমরা নরেনের সঙ্গে বিডন স্ট্রিটে বর্তমানে যেখানে মিনার্ভা থিয়েটার, তাহার নিকটে পীরুর দোকানে উপস্থিত হইলাম। নরেন ফাউলকারি অর্ডার দিল…। রাত্রে কাশীপুরে ঠাকুর জিজ্ঞাসা করিলেন, কোথায় গিয়েছিলি? আমি বলিলাম কলিকাতার বিডন স্ট্রিটে পীরুর দোকানে।… জানতে চাইলেন কী খেলি? আমি বলিলাম মুরগির ডালনা। শেষ পর্যন্ত ঠাকুর ঈষৎ হাস্য করিয়া বলিলেন, বেশ করেছিস।’

খাদ্যপ্রিয় স্বামী বিবেকানন্দের পছন্দের তালিকায় ছিল কই মাছের ঝাল। চায়ের নেশাও ছিল তাঁর। আমিষ খাবার তিনি এতটাই পছন্দ করতেন যে মঠ-মিশনের থাকার সময়ও তিনি আমিষ খাবারই খেতেন। মৃত্যুর দিনেও স্বামীজি দুপুরে পেটপুরে ভাত আর ইলিশ মাছের ঝোল খেয়েছিলেন। তার পর বলেছিলেন, একাদশীতে না খেয়ে পেটটা কেমন হয়ে গিয়েছিল। এবার একটু স্বস্তি পেলাম। দক্ষিণেশ্বরের রসগোল্লা স্বামীজির খুব পছন্দের ছিল। একবার নাকি তিনি রসগোল্লার লোভে সিমলা থেকে পায়ে হেঁটে দক্ষিণশ্বরে এসেছিলেন।


লঙ্কা খাওয়ার কম্পিটিশনে বিবেকানন্দ, তার পর


নিজে যেমন খেতে ভালোবাসতেন, তেমনই রান্না করে খাওয়াতেও ভালোবাসতেন স্বামী বিবেকানন্দ। তাঁর রান্না করা ঝাল খাবার খেয়ে চোখে জল এসে যাওয়ার অবস্থা। রাতে খাওয়ার পর ধূমপানও ছিল বাঁধাধরা! 

তখন তিনি স্বামী বিবেকানন্দ হননি, শুধুই নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পড়াশোনা করছেন। পেটুক এবং খাদ্যরসিক বন্ধুদের নিয়ে পাড়ায় তৈরি করেছিলেন ‘পেটুক সঙ্ঘ’। বন্ধুদের কাছে স্বামীজি বলতেন, দেখবি একটা সময় আসবে যখন কলকাতার প্রত্যেক গলির মোড়ে মোড়ে পানের দোকানের মতো চপ-কাটলেটের দোকান হবে। স্বামীজির এই ভবিষ্যৎবাণী যে কতটা সত্যি হয়েছে, তা এখন আমাদের চারপাশ দেখলেই বোঝা যায়। চপ-কাটলেট-সিঙাড়া তাঁর খুব পছন্দের ছিল।

খাবার পাশাপাশি রান্না করতেও বেশ ভালোবাসতেন তিনি। মাংসের নানা পদ তিনি রান্না করতে পারতেন। শিকাগো যাত্রার আগে তৎকালীন বোম্বাইতে স্বামীজি ১৪ টাকা খরচ করে এক হাঁড়ি পোলাও রান্না করে শিষ্যদের খাইয়েছিলেন। নিজে হাতে রেঁধে নিবেদিতাকেও খাইয়েছিলেন। কলকাতার বিভিন্ন দোকানের চপ ও ফুলুরি তাঁর বিকেলের খাবার ছিল। স্বামীজি চপ ও কাটলেট খুব সুন্দর বানাতে পারতেন এবং তা বানিয়ে একাধিকবার তাঁর শিষ্যদেরও খাইয়েছেন। বেলুড় মঠে একবার স্বামীজি নাকি পেশাদার চপওয়ালাদের মতো চপ ও ফুলুরি বিক্রিও করেছিলেন। বিকেলবেলায় আলুর চপ, ফুলুরি আর মুড়ি না হলে স্বামীজির বিকেলের ভোজনটাই হত না। কড়া ঝালের চানাচুর তাঁর বিশেষ পছন্দের ছিল। তাঁর কাছে বেশিরভাগ সময়ই চানাচুরের প্যাকেট থাকত। তিনি যখনই একা থাকতেন শালপাতার ঠোঙা থেকে চানাচুর বার করে খেতেন এবং বালকের মতো আনন্দ পেতেন।




কাঁচালঙ্কা ছিল স্বামীজির পরম প্রিয়। একবার এক অবাঙালি সাধুর কাছে স্বামীজি সেই কথা স্বীকারও করে নিয়েছিলেন। সেই সাধুর সঙ্গে তিনি লঙ্কা খাওয়ার কম্পিটিশন করেছিলেন। স্বামীজি কম্পিটিশনে টপাটপ করে বেশ কয়েকটি লঙ্কা খেয়ে ফেললেন, অপর দিকে সেই সাধু মাত্র দু’টি লঙ্কা খেয়েই কাঁদো কাঁদো। বিদেশি সাহেবদের লঙ্কা খাওয়া শেখাতেন স্বামীজি। একবার লন্ডনে থাকাকালীন স্বামীজির লঙ্কা খেতে ইচ্ছা হয়। তখন বিলেতে লঙ্কা পাওয়া খুবই কঠিন। স্বামীজি অনেক খুঁজে এক দোকানদারের কাছ থেকে তিন শিলিংয়ের বিনিময়ে তিনটি কাঁচালঙ্কা কিনেছিলেন। ঝাল খাওয়া প্রসঙ্গে তাঁর ছোট ভাই মহেন্দ্রনাথ জানিয়েছেন, স্বামীজির অত্যন্ত প্রিয় ছিল তীব্র ঝাল। রামকৃষ্ণর মৃত্যুর পরে বরানগরে সাধনভজনের সময় প্রবল অনটন। দারিদ্র্য এমনই যে মুষ্টিভিক্ষা করে এনে তাই ফুটিয়ে একটা কাপড়ের ওপর ঢেলে দেওয়া হত। একটা বাটিতে থাকত নুন আর লঙ্কার জল। একটু ঝালজল মুখে দিয়ে এক এক গ্রাস ভাত উদরস্থ করা হত।

বিদেশে তিনি যেখানেই যেতেন নিজের কাছে রাখতেন ভারতীয় গুঁড়ো মশলা। একাধিকবার তিনি নানা বিদেশি অনুরাগীদের রান্না করে ভারতীয় খাবার খাওয়াতেন। বলাই বাহুল্য, তাঁর রান্নায় ঝালের আধিক্য ছিল খুবই বেশি। তাঁর রান্না খেয়ে ঝালের চোটে চোখে জল এসে যেত। স্বামীজির আমেরিকায় থাকাকালীন প্রাতরাশের তালিকা ছিল বেশ লম্বা। প্রথমেই খেতেন কমলালেবু এবং আঙুর। তার পর ডবল ডিমের পোচ সহযোগে দু’পিস টোস্ট। সব শেষে ক্রিম ও চিনি দিয়ে দু’কাপ কফি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে স্যুপ এবং মাংস বা মাছের সঙ্গে রাতের আহার সারতেন। ডেসার্ট হিসেবে মিষ্টি আর আইসক্রিম তো আবশ্যিক ছিল। খাওয়ার পর আবার জমিয়ে ধূমপানও করতেন।




স্বামীজির আমেরিকান শিষ্য এলিজাবেথ ডাচার তাঁকে একবার তাঁদের কটেজে আমন্ত্রণ জানান। নিউইয়র্ক শহর থেকে প্রায় ৫৩০ কিলোমিটার দূরে সেন্ট লরেন্স নদীর তীরে ওয়েলেসলি দ্বীপে ছিল সেই কটেজ। ১৮৯৫ সালের ১৮ জুন দশজন শিষ্যকে নিয়ে কটেজে আসেন স্বামীজি। সেখানে প্রথমে দেন বক্তৃতা। তার পর শিষ্যদের জন্য রান্না করলেন বাঙালি খাবার। নিজেও খেলেন, খাওয়ালেন সকলকে।


Monday, 8 February 2021

শ্রী শ্রী সারদা মার শেষ কটা দিন












১৯২০ খ্রীষ্টাব্দে ২৭ শে ফেব্রুয়ারি মাসে উদ্বোধনের বাড়িতে মাকে নিয়ে এলেন সারদানন্দজী মহারাজ । মহা উদ্ -বেগ নিয়ে ভক্তের দল অপেক্ষা করছিলেন । মাকে দেখে সকলে চমকে উঠলেন । যোগিন-মা কাঁদোমাদো হয়ে বললেন,---'তোমরা কী মাকেই নিয়ে এসেছো গো ! কেবল চামড়া ও হাড় কখানি নিয়ে হাজির করলে গো ! মার শরীর যে এত খারাপ, তা আমরা মোটেই বুঝতে পারিনি ।'

ডাক্তার কাঞ্জিলাল যথানিয়মে তাঁর হোমিয়োপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করলেন । কিন্তু জ্বর কমলেও আবার সপ্তাহখানিক পরে জ্বর দেখ দিল । এবার কবিরাজ শ্যামাদাস বাচস্পতি এসে চিকিৎসা শুরু করলেন । দিন দশেকের মধ্যে মা সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেলেন ।

কবিরাজি চিকিৎসায় মায়ের জ্বর দিন পনেরো বন্ধ ছিল । আবার এসে মাকে জ্বর আক্রমণ করল । দেখা দিল খাবারে তাঁর ভীষণ অরুচি । কবিরাজি চিকিৎসা অনুসারে মাকে তেঁতো পাঁচন খাওয়ানো হল । ওই পাঁচন খেতে মায়ের ভীষণ কষ্ট হত । ফলে কবিরাজি বন্ধ করে দেওয়া হয় ।

আস্তে আস্তে রাধুর উপর থেকেও মায়ের মন ক্রমশ উঠে আসতে লাগল । তিনি নিজেই বললেন,-- এখন মনটা সর্বদা তাঁকে(ঠাকুরকে) চায়, অন্যকিছু আর ভাল লাগে না । এই দেখ না, রাধুকে এত ভালবাসতুম, ওর সুখ- স্বচ্ছন্দ্যের জন্য কত করেছি । এখন ভাব ঠিক উলটে গেছে । ও সামনে এলে ব্যাজার বোধহয় । ঠাকুর তাঁর কাজের জন্য এতকাল এইসব দিয়ে মনটাকে নামিয়ে রেখেছিলেন । নইলে তিনি যখন চলে গেলেন,তারপর কি আমার থাকা সম্ভব হত ? '

অবশেষে মা একদিন পরিস্কার বললেন,--'শরৎকে বল ওদের জয়রামবাটী পাঠিয়ে দিতে ।' সেবিকা জিজ্ঞাসা করলেন,--'কেন ওদের পাঠিয়ে দিতে বলছেন ? রাধুকে ছেড়ে থাকতে পারবেন কি ?' মা দৃঢ়স্বরে বললেন,--'খুব পারব, মন তুলে নিয়েছি ।' সারদানন্দজী সব শুনে ভারাক্রান্ত হৃদয়ে বললেন,--'তবে আর মাকে রাখা গেল না । রাধুর উপর থেকে যখন মন তুলে নিয়েছেন, তখন আর আসা নেই ।'

এলেন বিখ্যাত ডাক্তার বিপিনবিহারী ঘোষ । কিন্তু মায়ের জ্বর ভালো হল না । শরীরে এত জ্বালাযে তিনি মাঝে মাঝে বলতে লাগলেন,------- 'পানাপুকুরের জলে গা ডুবিয়ে থাকব ।' ভক্তের দল বরফে হাত ঠান্ডা করে সেই হাত মায়ের গায়ে রাখলে মা আরাম বোধ করতেন । বিপিবাবুর চিকিৎসা দেড় মাস করেও যখন কোনো লাভ হল না তখন ডাক্তার প্রাণধন বসুকে ডেকে নিয়ে আসা হল । অসুখটা যে প্রকৃত কী তা জানার জন্য ডাক্তার সুরেশচন্দ্র ভট্রাচার্য এবং সুবিখ্যাত ডাক্তার নীলরতন সরকারও উপস্হিত হলেন ।

মাকে পরীক্ষা করে নীলরতনবাবু বললেন মায়ের কালাজ্বর হয়েছে । দীর্ঘদিন রোগযন্ত্রণায় ভুগে ভুগে মায়ের মন ছোট্ট মেয়েটির মতো হয়ে গিয়েছিল । তাঁর আবদার অনুসারে একদিন রাসবিহারী মহারাজ সেখানে উপস্হিত হলেন । তাঁকে দেখেই শ্রীমা বললেন,---' আমায় কোলে করে বসো ।' তখন মায়ের সেবিকা ছিলেন সারলা দেবী । তাঁকে দেখে রাসবিহারী মহারাজ বললেন,---'মাকে একটু কোলে করে বসো, তোমরা মেয়েছেলে ।' কিন্তু সারলাদেবী সাহস পেলেন না ।

মা যখন এইভাবে রোগের সঙ্গে লড়াই করে চলেছেন তখন পরপর তিনটি শোকের আঘাত তাঁর উপর এসে পড়ল । মায়ের পরম স্নেহভাজন লাটু মহারাজ ১৯২০ সালে২৪শে এপ্রিল কাশীতে দেহত্যাগ করেছেন ।১৯২০ সালে ১৪ মে বলরাম বসু মহাশয়ের একমাত্র পুত্র শ্রীরামকৃষ্ণ বসু মারা গেলেন । ১৯২০ সালে ২০ জুন মায়ের পরম স্নেহের ছোট ভাই বরদাপ্রসন্ন জয়রামবাটিতে নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলেন । প্রথম প্রথম খবরগুলি মাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল । কিন্তু যখন তিনি টের পেলেন তখন শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন ।

মায়ের অবস্হা দেখে ডাক্তাররা বলে দিলেন মাকে আর সুস্হ করে তোলা সম্ভব নয় । ক্রমেই তাঁর কথাবার্তা বলা বন্ধ হয়ে গেল । ঔষধপথ্যও আর খেতে চাইলেন না ভক্তরা তাঁর সামনে কাঁদতে শুরু করলে তিনি ক্ষীণকন্ঠে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন,--'শরৎ রইল ভয় কি ? ঠাকুর আছেন ইহকালে, পরকাল দেখবেন ।

মা সারদার হাতের ছাপ 



এল ২১শে জুলাই ১৯২০ । বাংলার ৪ঠা শ্রাবণ ১৩২৭ । মঙ্গলবার রাত্রি দেড়টা । শিবযোগে শ্রীশ্রীমা আমাদের কাঁদিয়ে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের চরণে গিয়ে মিলিত হলেন । তখন মায়ের বয়স ৬৬ বৎসর ।

দেহত্যাগের কয়েকদিন আগে জনৈকা এক ভক্তমহিলাকে মা বলেছিলেন,---' যদি শান্তি চাও মা, কারও দোষ দেখো না । দোষ দেখবে নিজের । জগৎকে আপনার করে নিতে শেখ । কেউ পর নয় মা , জগৎ তোমার ।' জগতের উদ্দেশ্যে এই তাঁর শেষ বাণী । আর সবাইকে জানিয়ে গেলেন আশীর্বাদ;---' যারা এসেছে, যারা আসেনি, আর যারা আসবে, আমার সকল সন্তানদের জানিয়ে দিও মা--- আমার ভালবাসা, আমার আশীর্বাদ সকলের উপর আছে ।

পরের দিন সকাল সাড়ে দশটায় । স্বামী সারদানন্দজীর পরিচালনায় মায়ের পবিত্র দেহকে গন্ধপুষ্প মালা ইত্যাদিতে সাজানো হল । দলে দলে ভক্তগণ এসে মায়ের চরণে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদতে লাগলেন । উদ্বোধনের মায়ের বাড়ি থেকে সন্ন্যাসী ভক্তগণ মায়ের পালঙ্ক কাঁধে নিয়ে রামনাম কীর্তন করতে করতে বেলুড়মঠে এগিয়ে চললেন । স্ত্রী ভক্তগণ মাকে গঙ্গাস্নান করালেন । নতুন কাপড় পরালেন । ফুলমালা দিয়ে সাজিয়ে আরতি করলেন ।

তখন বেলা তিনটা । বেলুড়মঠে স্বামী বিবেকানন্দের মন্দিরের উওর দিকে চন্দন কাঠের চিতা সাজানো হয়েছে । সেই চিতায় মাকে শায়িত করা হল । গঙ্গার ওপারে কলকাতায় দেখাগেল প্রবল ধারায় বৃষ্টি চলছে । কিন্তু এখানে কিছু নেই । যখন চিতাগ্নি নির্বাপন হতে চলেছে তখন শরৎ মহারাজ গঙ্গা থেকে প্রথম কলসীজল এনে চিতায় ঢাললেন । আর ঠিক তার পরেই এখানেও মুষলধারায় বৃষ্টি নেমে এল । উপস্হিত শত শত ভক্তদের চোখের জলও ধুইয়ে দিয়ে গেল সেই বৃষ্টির জল ।

প্রণাম মা……











🌺🌺 যেদিন মা চলে গেলেন 🌺🌺

শরীর যাবার আগের দিন সকাল থেকেই মায়ের শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। আমার আবার তার আগের দিন পেট খুব খারাপ হওয়াতে শরীর এত দুর্বল যে নড়বার শক্তি নেই। মহারাজ (শরৎ) আমাকে তাঁর ঘরে বসেই মাছের ঝোলভাত খেয়ে নিতে বললেন। 

এদিকে মার  শ্বাসকষ্ট এত বাড়ছে যে তাঁর সে কষ্ট যেন চোখে দেখা যায় না। একতলা থেকে তিনতলা - সারাবাড়ি সেই শব্দ শোনা যাচ্ছে। চোখদুটি যেন বেরিয়ে আসছে। মা তো কোনও বাছবিচার করেন নি। যত পাপীতাপীকে বুকে নিয়েছেন বলে তাঁর এই কষ্ট! সাধুভক্তে বাড়ী ভরে গেল। 

সারারাত্রি আমি আর সুধীরাদি মায়ের পায়ের কাছটিতে বসেছিলুম। যোগীনমা আমাকে একঘটি জলে মায়ের পায়ের কাছটিতে আঙুল ডুবিয়ে চরণামৃত করে নিতে বললেন। শ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের মুখে ফোঁটা ফোঁটা গঙ্গাজল দিতে লাগলুম। ধীরে ধীরে শব্দ কমে আসতে লাগল, ক্রমে সব শান্ত। তখন রাত একটা বেজে গেছে। সেদিন চৌঠা শ্রাবণ (১৩২৭)।

যে মায়ের মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছিল না, এখন সেই মায়ের রূপ আর ধরছে না - একেবারে দুর্গাপ্রতিমার মতো! 




মাকে সরু লালপেড়ে গরদের কাপড় পরিয়ে দেওয়া হলো। পরদিন বেলা এগারটায় মায়ের খাট মাথায় করে কাশীপুর হয়ে বরানগর কুঠিঘাট অবধি নিয়ে আসা হলো। আমাকে গোলাপ-মা, যোগীন-মা সঙ্গে যেতে বারণ করেছিলেন। সুধীরাদি জোর করে আমার হাত ধরে বের করে নিয়ে এলেন। তখন খুব ভগবানের নাম, হরি-সঙ্কীর্তন হচ্ছে। ওদের সঙ্গে সঙ্গে কুঠিঘাট পর্যন্ত গেলুম। সেখান থেকে মহারাজেরা ও ভক্তেরা মাকে নিয়ে একটা বড় নৌকায় উঠলেন। আমরা মেয়েরা পাশে পাশে একটা ছোট নৌকায়।

বেলা দুটোয় বেলুড়ের ঘাটে পৌঁছে মাকে আমতলায় নিয়ে যাওয়া হলো। তারপর সেখানে পূজা ও ভোগ নিবেদন। পরে গঙ্গার ঘাটে মাকে স্নান করানো হবে। কাপড় দিয়ে আড়াল করা হলো। আমি আর সুধীরা-দি মায়ের শরীর তুলে নিয়ে গঙ্গার জলে রেখে তাঁকে স্নান করালুম। ইদানীং অসহ্য গায়ের জ্বালায় মা প্রায়ই বলতেন, "গঙ্গায় নিয়ে চল, গঙ্গায় নিয়ে চল।" তখন মায়ের শরীর যে কী হালকা ও নরম লাগছিল।

ঐ কাপড়খানা বদল করে তাঁকে আর একটা নতুন সরু লালপেড়ে গরদ পরানো হলো। এবার সাধুরা তাঁকে আবার আমতলায় নিয়ে গেলেন। সেখানে দ্বিতীয়বার মাকে আরতি করা হয়। আমি সব দেখলুম, মনে কিছুই হলো না। তারপর যেখানে বর্তমানে মায়ের মন্দির সেখানে চিতা সাজানো হলো। আমি আর সে দৃশ্য দেখতে পারছি না, কী দেখব? সুধীরা-দির পিছনটিতে শুয়ে পড়লুম। 

চন্দনকাঠের চিতায় মাকে শুইয়ে দিয়ে শরৎ মহারাজ ও অন্যসব মহারাজরা বেলপাতা, ধুনো ও গুগগুল প্রদক্ষিণ করে করে আহুতি দিতে লাগলেন।

প্রবোধ-দি জোর করে আমার হাত ধরে টেনে তুলে বললেন, "একবার দেখ না কী সুন্দর দেখাচ্ছে!" দেখলুম আগুনের শিখা আকাশ ছুঁয়ে কত উঁচুতে উঠেছে। তখন তো এখনকার মতো ট্রাম-বাসের সুবিধা ছিল না, তাই খুব বেশী ভিড় হয়নি। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। ওপারে তখন বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু এপারে বৃষ্টি নেই।

মায়ের শরীরের কিছুই চোখে পড়ল না, কি জানি কি দেখব ভেবে এতক্ষণ চোখ তুলে তাকাইনি। এখন আমরাও প্রদক্ষিণ করে তিনবার আহুতি দিলুম। 

ফিরে...দু-তিন দিন আর উদ্বোধনে যাইনি, মন সরছিল না। ফাঁকা বাড়ি, কী দেখতে যাব? যোগীন-মা ডেকে পাঠালেন। মায়ের ঘর তখনো খালি পড়ে ছিল। সেদিকে আর তাকানো গেল না, কেবলই চোখ ফেটে জল আসছে। যোগীন-মা কাঁদছেন আর বলছেন, "তোরাও যদি না আসবি, আমরা কি করে থাকব? মা চলে গেলেন, সব শূন্য লাগছে।"

[প্রব্রাজিকা ভারতীপ্রাণা বিরচিত শ্রীশ্রীমায়ের চরণপ্রান্তে থেকে নিবেদিত]

Sunday, 15 November 2020

কবি গুরুর শেষ দিনগুলি

শেষ বার শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাবার সময় চোখে রুমাল দেওয়া। শেষ দিকে সংশয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ নিজেও, আর কি ফেরা হবে শান্তিনিকেতনে! এর কয়েকদিন পরেই ২২শে শ্রাবন।


" মৃত্যু না থাকলে জীবনের কোন মানে নেই। আর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে জীবনকে না দেখলে অমৃতের সন্ধান মেলে না। এই জীবন মরনের খেলা দিয়েই জগৎ সত্য হয়ে উঠেছে"....... মৃত্যু সম্পর্কে নির্মলকুমারী মহলানবীশ কে প্রায়শ এই কথা বলতেন রবীন্দ্রনাথ।

জীবনে তিনি বহু প্রিয় জনের মৃত্যু দেখেছেন, তাই হয়তো দৃপ্ত স্বরে বলে গেছেন "করি না ভয়, তোমারি জয় গাহিয়া যাব চলিয়া, দাঁড়াবো আসি তবে দুয়ারে"। জীবনের শেষ লগ্নে রোগশষ্যায় অলংকৃত শরীরে অসুস্থতার কথা একেবারেই বলতে চাননি। খাতা নিয়ে লিখতে শুরু করলে, একটু পরেই হাত কেঁপে পেশি শিথিল হয়ে পড়ত। সে সময় তিনি মুখে মুখে বলে যেতেন, তাঁর লিপিকার সুধীর চন্দ্র কর লিখে নিতেন। মৃত্যু সম্পর্কে সুধীরবাবু লেখেন " কোনদিনও তিনি মৃত্যুপথের বীভৎসতাকে কিংবা তার অনিশ্চয় ভয়কে মনে আমল দেননি। উপরন্তু জীবনের প্রথম থেকেই দেখি মৃত্যুর নিবিড় উপলব্ধি তাঁর কাব্যে একটি বিশেষ ধারায় নানা বাণীতে প্রকাশ পেয়েছে।"  

"জল পড়ে পাতা নড়ে" :: রবি-শিশু
প্রথম জীবনে তিনি "মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে" বলে শুরু করলেও মধ্য জীবনে " বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি সে আমার নয়" এ কথাও ঘোষণা করেন। শেষ জীবনে যে কজন তাঁর সঙ্গে থাকতেন, তাদের সঙ্গে রীতিমতো হাসি-ঠাট্টা করতেন। গভীর আগ্রহ ছিল আশ্রমিক অনুষ্ঠানে দেশ-বিদেশের অতিথিদের সঙ্গে রোগ দেওয়ার। কিন্তু শরীর একেবারেই ভেঙে পড়ায় রোগশষ্যায় একেবারেই ঘরবন্দি। সেখানেই একদিন চিনের অতিথি তাই-চি-তাও' কে ঠেকে এনে আলাপ করলেন। ইতিপূর্বে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধি মিস র্্যাথবোন ভারতীয় নেতাদের স্বাধীনতার দাবিকে ব্রিটেনের প্রতি অকৃতজ্ঞা বলে, জওহরলাল সহ অন্যান্য নেতাদের নিন্দা করে প্রবন্ধ লিখেছিলেন। মৃত্যুর কয়েক দিন পূর্বে কবি তার উত্তরে যে জ্বলন্ত বিবৃতি লিখেছিলেন, সেটাই ছিল তাঁর সর্বশেষ বিবৃতি। 

তাঁর শুশ্রুষাকারীদের ভার লাঘবের জন্য আর শারীরিক যন্ত্রনা ঢাকার জন্য, এ সময় নানা রকমের মজাদার ছড়া শুনিয়ে পরিবেশ হালকা করতে চাইতেন। ৪-১২-১৯৪০ তারিখে তাঁর সেবারতা পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে উদ্দেশ্য করে বলেন " ডাবও ভালো , ঘোলও ভালো / ভালো সজনে ডাটা/ বৌমা বলেন ভালো নহে/ শুধু সিঙ্গি মাছের কাঁটা।" তাঁর নাতনি উদ্দেশ্যে করে লেখেন " ঘড়ি ধরা নিদ্রা আমার / নিয়ম ঘেরা জাগা / একটুকু তার সীমার পারেই / আছে তোমার রাখা। / কি কব আর রবি ঠাকুর / ভয়ে তরস্ত/ এত বড় মানুষ ছোট্ট / হাতের করস্ত।" 

রোগশয্যায় বিশ্বকবি তখন চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ। তাঁর গভীর ঘুমের সময় সকলে তটস্থ হয়ে দূর থেকে দেখে ___ শ্বাস প্রশ্বাসযথাযথ হচ্ছে কিনা।  ফিসফিস করে খবর চালাচালি হতে থাকে।  বেশির ভাগ সময় সোফায় আচ্ছন্ন ভাবে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন।  এক সময় নিজের অজান্তে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস।  এক দিন রাত বারোটার পর তন্দ্রা ভেঙ্গে গেলে জানতে চান  "দারোয়ানের যেন পেটে ব্যথা হয়েছিল।  কেমন আছে সে  ? "কোনও দিন কুকুরটাকে খাবার দিয়ে আদর করতেন।  কৌতূহল নিয়ে দেখতেন চড়ুইটাকে। তাদের নিয়ে তাঁর অজস্র প্রশ্ন।  মৃত্যুভয় তাঁকে কখনও কাবু করতে পারেনি।  একদিন মজা করে তাাঁকে বলা হয়েছিল *** বুড়ো বয়সে সবাই ঠাকুর দেবতার নাম জপ করে।  আর আপনি পশুপাখি লোকজন নিয়ে হাসি গল্প করছেন। লোকে কি বলবে আপনাকে।*** কবি আরও ছন্দ গাম্ভীর্যে  বললেন  " সত্যিই তো লোকে কি বলবে!"


রোগশয্যায় পা ঠিকমতো নড়াচড়া করতে পারেন না। সবাই বলে বিশ্রাম নিতে।  নাতনি ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়াতে চায়। সবার পীড়াপীড়িতে কিছুক্ষণ ঘুমের ভান করে থাকেন। রাত তিনটের সময় চিরদিনের অভ্যাসমত লিখতে চান।  সবাই বলে __ এখনও ওঠার সময় হইনি।  তাঁর বিশ্বাস হয় না--- " নিশ্চয়ই আমাকে তোরা ফাঁকি দিচ্ছিস।" এরই মধ্যে খাতায় লেখা ভরে ওঠে।  এ রকম শয্যাশায়ী অবস্থায় এক দিন  'প্রবাসী ' থেকে লেখা আছে কি না জানতে চাওয়া হলে,  কবি সেই মজার ছড়াগুলি দিয়ে বললেন "তোমরা তো আমার যা পাও ঠেসে ভরে দাও  প্রবাসীতে। দাও নিয়ে এগুলোও।" যিনি লেখা আনতে গিয়েছিলেন,  তিনি এই নতুন ধরনের মজার ছ্ড়া পেয়ে তো দারুণ খুশি।  রবীন্দ্রনাথ অবাক হয়ে বললেন  " আরে  ঠাট্টা করে বললুম তোমাকে।  ছেলেমানুষি এই লেখাগুলো বের হতে পারে না। " অনেক কষ্টে কবির কাছ থেকে অনুমতি আদায় করে,  সবার রস গ্রহণের সুবিধার জন্য প্রসঙ্গ উল্লেখ করে একটু লিখে দেওয়ার অনুরোধ করলে,  তিনি সকৌতুুুকে বলে উঠেন "তুলো ধুনতে গেলে পরে,  কতকটা সেই তুলো  / লেপের মধ্যে প্রবেশ করে,  কতক ঢাকে ধুলো।" 

জোড়াসাঁকোয় অসুস্থ কবিকে সারাক্ষণ দেখাশোনা করতেন প্রশান্ত মহলানবিশের স্ত্রী  নির্মলকুমারী মহলানবিশ (রাণী)।কবি তাঁকে মজা করে বলতেন "হেডনার্স"। কবির শেষ দিনগুলির রোজনামচা লিখে গেছেন " বাইশে শ্রাবণ " বইটিতে। শ্রীমতী  মহলানবিশের কোথাও যাওয়ার কথা হলে কবি হুমকি দিতেন " শেষ পর্যন্ত এমন একটা অসুখ করবো, তখন দেখি আমার হেডনার্স কি করে যায়। "কবির   অপারেশন জোড়াসাঁকোয় হবে বলে ঝকঝকে করে পরিস্কার করা হয়েছে।  ডাক্তার সত্যেন্দ্ররনাথ রায় গ্লুকোজ ইনজেকশন দেওয়ার পর  ম্যালেরিয়া রোগীর মতো জ্বর এলো। পরের দিন ইনজেকশনেরএই প্রতিক্রিয়া কেটে যাওয়ার পর বেশ হাসিমুখে রানী মহলানবিশকে বললেন  " জানো আজও আর একটা কবিতা হয়েছে সকালে । এ কী পাগলামি বল তো  ? প্রত্যেকবারই ভাবি এই বুঝি শেষ, কিন্তু তারপরেই দেখি আবার একটা বেরোয়। এ লোকটিকে  নিয়ে কি করা যাবে?" লেখাটি ছিল ''প্রথম দিনের সূূূূর্য্"  নামে বিখ্যাত কবিতায়।





দুর্বল শরীরে টানা কাজ করতে পারেন না। কপালের শিরায় ফুটে ওঠে শীর্ণতা। দৃষ্টি ক্ষীন। শ্রবণশক্তিও। দু-তিন জন মেয়ে পালা করে , তাঁর ফরমায়েশী গানগুলো গায়। তাই শুনে বলেন  " ওরে গানটা ভালো করে গা তো। সিন্ধুপারে চাদ তো বুঝি আমার জন্য আর উঠবে না ।" শান্তিনিকেতন ছেড়ে যাওয়ার সময় ভুবনডাঙ্গার রাস্তার ধারে নতুন পাওয়ার হাউস  দেখে তিনি নাতনি নন্দিতাকে ঠাট্টা করে বলেছিলেন  " পুরোনো আলো চললো, আসবে বুঝি তোদের নতুন আলো।" উদয়নের দোতলা থেকে নামার পর তাঁর প্রিয় 'বাঙিল' ক্ষিতিমোহন সেনকে বলেন  " একমাস পরে ফিরবো। দেখো ছড়ার বইটা যেন ছাপানো শেষ হয়ে থাকে। " প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন  : " শান্তিনিকেতনের সত্তর বৎসরের  স্মৃতি জড়িত। কবি কি বুঝতে পেরেছিলেন  এই তাঁর শেষ যাত্রা ? যাবার সময় চোখে রুমাল দিচ্ছেন দেখা গেল। "

জীবনের গভীর কষ্টের মধ্যেই তাঁর লেখনী যেন আরও গতিময় হয়ে উঠেছে।  তিনিও বলেছিলেন  " জীবনের গভীর দুঃখের সময়ই দেখি লেখা আপনি সহজে আসে। মন বোধহয় নিজের রচনা শক্তির ভিতরে ছুটি পেতে চায়। " একমাত্র নাতি নীতীন্দ্রনাথের মৃত্যু সংবাদ আসায় অনেকে বর্ষামমঙ্গল অনুষ্ঠান বাতিলের কথা বললে তিনি রাজি হননি।  এ সম্পর্কে   মেয়ে মীরাকে বলেন   " নিতুকে খুব ভালোবাসতুম, তাছাড়া তোর কথা ভেবে প্রচন্ড দুঃখ চেপে বসেছিল বুকের মধ্যে।  কিন্তু সর্বলোকের সামনে নিজের গভীরতম দুঃখকে ক্ষুদ্র করতে লজ্জা করে।  ক্ষুদ্র হয় যখন সেই শোক সহজ জীবন যাত্রাকে বিপর্যস্ত করে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।" এই কারণেই বোধহয় নিজের শারীরিক ও মানসিক কষ্ট প্রকাশ করতে এত কুন্ঠা। অপরাশনের দিনটি চেপে রাখা হয়েছিল , কিন্ত কবিতার সাথে যার নিরন্তর যাপন, সেই 1941 সালের 30শে জুলাইয়ে রচনা করেন তাঁর শেষ কবিতাটি রানী চন্দের কলম ধরে।  তারপর অপারেশনর কথা শুনে রানীকে বললেন কবিতাটা পড়ে শুনাতে। তিনি কবির কানের কাছে জোরে কবিতাটি আবৃত্তি করলে  তা শোনার পর কবি বললেন  " কিছু গোলমাল আছে, তা থাক _____ ডাক্তারা  তো বলেছে অপারেশনর পরে মাথাটা আরো পরিষ্কার হয়ে যাবে। ভালো হয়ে পরে ওটা মেজে ঘোষে দেবো।"




অস্ত্রোপচারের পরে প্রসাবের সমস্যা দেখা দিল।  তাও অতি ক্লান্ত শরীরে শষ্যার পাশে নির্মলকুমারীর উদ্বিগ্ন মুখ দেখে  " হা: "  করে চেচালে শ্রীমতী মহলানবীশ হেসে ফেলেন। কবি তৎক্ষনাৎ বলে উঠেন  " এই  তো একটু হাসো। তা না গম্ভীর মুখ করে এসে দাড়ালেন। এতো গম্ভীর কেন  ? " এর পর ঘন ঘন   হিক্কা কবিকে বিপর্যস্ত করে।  তখন দেশীয় টোটকা মিছরি এলাচগুরো কয়েকবার দেওয়ার পর কিছুটা কমলে বললেন  " আ: বাচলুম, এই জন্যই তো হেডনার্স বলি।" 

অবশেষে এল 22শে শ্রাবণ,  রাখী পূর্ণিমার দিন। কবির মুখ পূব দিক করে রাখা। অস্তমিত রবির প্রাকমুহূর্ত। আগের রাতে চিনা ভবনের অধ্যাপককে কবির খাটের পাশে অ্যাম্বারের জপমালা নিয়ে জপ করতে দেখার পর থেকেই সে ঘরে ভগবানের নাম ধ্বনিত হয়। অমিতা দেবী কানের কাছে " শান্তম্ শিবম্ অদ্বৈতম্ " মন্ত্র আর বিধুশেখর শাস্ত্রী পায়ের কাছে মাটিতে বসে  " ওঁ পিতা নোহসি" মন্ত্রপাঠ শুরু করলেন।  শেষ রাত্রি থেকেই ব্রহ্মসঙ্গীত শুরু হয়। মধ্যাহ্নের ঠিক শেষ মুহূর্তের আগে ডান হাতখানা কাঁপতে কাঁপতে উপরে তুলে কপালে ঠেকাতেই হাত পড়ে গেল। অস্তমিত হলেন রবি কবি। 

কবির একান্তই ইচ্ছা ছিল কলকাতার উন্মত্ত কোলাহলের মধ্যে " জয় বিশ্বকবি কি জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দমাতরম্ " এ সব  জয়ধ্বনির মধ্যে শেষ যাত্রা না করে, শান্তিনিকেতনের উদার মাঠে উন্মুক্ত আকাশের তলায় স্তব্ধ প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে। সে ইচ্ছা পূরণ করতে পারতেন যারা, সেই রথীন্দ্রনাথ তখন শোকে মূহ্যমান , প্রশান্ত মহলানবিশ অসুস্থ শরীরে শষ্যাশায়ী । শান্তিনিকেতনের ছাত্র প্রদ্যোতকুমার সেনও সেই জনতাকে রাজী করাতে পারেনি।সবাই বলছে, শান্তিনিকেতনে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। এখানেই সব আয়োজন হয়ে গিয়েছে। শ্রীমতী মহলানবীশ জানান,  বেলা তিনটের সময় এক দল বরবেশী কবিকে তুলে নিয়ে গেল।  সেই মিছিলে যথারীতি গর্জিত হল  " জয় বিশ্বকবির জয়, জয় রবীন্দ্রনাথের জয়, বন্দেমাতরম্ ।"





Sunday, 23 August 2020

দান ও দাতা*****কিছু কথা

 

সব ধর্মমতে দান প্রশঙসিত। দান করতে হয় দীন হয়ে, কোনো প্রত্যাশা না রেখে। দান করলে দাতার অন্তরে দয়া noর দরজা খুলে যায়। দয়া করা হিসেবে দান করা উচিত নয়। এতে দাতার মনে অহঙ্কার জন্মে। তিনি দান গ্রহন করেন গুরুরূপে তিনি দাতার হৃদয়ে দয়াভাব জাগ্রত করেন। তাই দান করে দাতার কাছে গ্রহীতার কাছে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

দাতা যাকে দান করবে তার অর্থাৎ গ্রহীতার দু:খ অনুভব করে তাকে তার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করতে হবে। তাকে সাহস দিতে হবে। সান্ত্বনা দিতে হবে। পরে সাধ্যমতো যা সম্ভব যত্নসহকারে দিতে হবে। এর ফলে দাতা প্রেমের অধিকারী হবে। তার দান সিদ্ধ হবে।

দান করে প্রকাশ করতে নেই। এমনভাবে দান করতে হবে যাতে কেউ যানতে না পারে। ডান হাতের দানের কথা বা-হাতও জানতে না পারে। কেউ কিছু চাইলে দিতে হয়। যাচ্ঞাকারীকে ফেরাতে নেই। অর্থ না থাকলে সহানুভূতি দেখাতে হবে, সাহস দিতে হবে, সান্ত্বনা দিতে হবে। তার সঙ্গে মিষ্টি কথা বলতে হবে। এতে হৃদয় কোমল হবে।

শাস্ত্রে আছে ‌...... ভিয়া দেয়ম্, শ্রিয়া দেয়ম্, হ্রিয়া দেয়ম্, সংবিদা দেয়ম্, শ্রদ্ধায়া দেয়ম্, অশ্রদ্ধায় অদেয়ম্ ।  ভিয়া দেয়ম্ --- দাতাকে ভয়ে ভয়ে দান করতে হবে। কারন দাতা যাকে দান করতে যাচ্ছে, সে দান নাও গ্রহন করতে পারে। শ্রিয়া দেয়ম্ --- দাতার দান যে গ্রহন করে সে গ্রীহিতা। দাতা গ্রীহিতার মঙ্গল কামনা করে দান করবে। হ্রিয়া দেয়ম্ --- দাতা লজ্জার সঙ্গে দান করবে। হ্রী ___ লজ্জা, লাজ। সঙবিদা দেয়ম্ --- দাতা সঞ্জানে দান করবেন। দান করে যেন অনুতাপ না করতে হয়। এক দাতা এক ভিখারিকে ২৫ পয়সার কয়েন দিতে গিয়ে ভুল করে পাঁচ টাকার একটি কয়েন দিয়ে ফেলেছেন। তাঁর সে কি অনুতাপ। দান করার পর দাতার অবস্থা এমন যেন না হয়। শ্রদ্ধায় দেয়ম্ --- দান করতে হবে শ্রদ্ধার সঙ্গে। অশ্রদ্ধায় অদেয়ম্ --- গ্রীহিতাকে অশ্রদ্ধা করে দান করতে নেই। 

দাতা দান করবেন, গ্রীহিতা গ্রহন করবেন। দান গ্রহণ করে গ্রীহিতা যে আনন্দ পাবেন, দাতা দান করে তার থেকে ঢের বেশি আনন্দ পাবেন। গ্রীহিতা পেয়ে ধন্য, দাতা দিয়ে ধন্য।

দান করতে হয় প্রত্যাশা না রেখে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। এক ভক্ত এক দু:স্থকে তার দুটি রুটি দিয়ে সেবা করলেন। একটু পরে দশজন অতিথি এসে উপস্থিত। কিন্তু তার ঘরে তো কিছুই নেই। এই সময় এক ব্যক্তি একটি পাত্রে ১৮টি রুটি নিয়ে আসে। ভক্ত ব্যক্তিটিকে বলেন যে এ রুটি তুমি নিয়ে যাও। এ রুটি আমার নয়। লোকটি বাড়ি গিয়ে দেখে , ভূল করে দু'খানা রুটি সে বাড়িতে ফেলে গেছে। লোকটি সে দু'খানা  রুটি সহ ২০টি রুটি ভক্তকে আবার এনে দেয়। ভক্ত তা গ্রহন করে। ভক্তটি খুবই ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি জানতেন ঈশ্বরকে যা দেওয়া যায় , তার দশগুন পাওয়া যায়। ইতিপূর্বে তিনি একজনকে দুখানা রুটি দিয়েছেন, তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস ঈশ্বর তাঁকে ২০ খানা রুটিই দেবেন, ১৮ খানা নয়। এ সাধারণ মানুষের কথা নয়। এ উচ্চকোটির সাধনর্গের ভক্তের কথা। 

দাতা দিতে চাইলেই একজন গ্রহন করবেন তার কোনও কথা নেই।

:: এক রাজা এক ব্রাহ্মনকে বলেন, আমি আপনাকে কিছু দিতে চাই। বলুন আপনার কি লাগবে? সেই ব্রাহ্মন বলেন..... নদীর জল, গাছের ফল, কোমল তৃনশয্যা আছে। আমার তো সবই আছে, তোমার কাছে কি চাইব? দাতা দিলেই যে মানুষ নেবে তার কোনও মানে নেই।

:: আলেকজান্ডার তাঁর গুরু অ্যারিস্টটলকে বলেন আমি আপনাকে কিছু দিতে চাই। আপনার কি লাগবে বলুন। শিক্ষা গুরু শীতের সকালে উঠোনে বসে রোদ পোহাচ্ছিলেন। আলেকজান্ডার তাঁর সামনে দাড়ানোয় তাঁর গায়ে রোদ লাগছিল না। শিক্ষা গুরু আলেকজান্ডারকে বলেন, তুমি একটু সরে দাড়াও। আলেকজান্ডার সরে দাঁড়ালেন। শিক্ষা গুরু বললেন, তুমি আমাকে রোদ দিয়েছ, আর আমার কি লাগে।



শ্রীকৃষ্ণের কাছে কর্ণই বড় দাতা। আর অর্জুন মনে করেন , তাঁর দাদা যুধিষ্ঠির বড় দাতা। পরীক্ষা করার জন্য শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন ব্রাহ্মনের জদ্মবেশে যুধিষ্ঠিরের কাছে যান এবং বলেন , শীতে বড় কষ্ট পাচ্ছি। একটু চন্দনকাঠের আগুন লাগবে। চন্দনকাঠ আছে ? যুধিষ্ঠির বলেন, চন্দনকাঠ নেই। অন্য কাঠ দেব। সুগন্ধি গেলে দেব। শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুন এবার কর্ণের কাছে গিয়ে কীছু চন্দনকাঠ চাইলেন। কর্ণ ঘরের চন্দনকাঠের দরজা জানালা ভেঙ্গে চন্দনকাঠ দিলেন। 

এই খানেই শেষ নয়। এরপর কর্ণ মৃত্যু শয্যায়। তাঁকে পরীক্ষা করার জন্য অর্জুনকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণ বললেন, কর্ণ , তুমি আমাকে কিছু সোনা দাও। কর্ণ একটু চিন্তা করে বললেন , অর্জুন, তুমি আমার একটা দাঁত খুলে নাও। ওকি সোনার। সঙ্গে সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণ তাঁর চতুর্ভুজ , শঙ্খচক্রধারী রূপ দেখালেন। দানের জন্যই কর্ণ মুক্তি লাভ করেন। এইভাবে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বোঝালেন, যুধিষ্ঠির ও অর্জুনের মধ্যে কে বড় দাতা।

জনৈক মহর্ষি বলেছেন....... দিতে যে পারে না, পাওয়া তাঁর ঘটে না। দিয়ে দাও, নিজের জন্য কিছু চেও না। দেখবে সব তোমার হয়ে যাবে।

এ ভক্তি ও বিশ্বাসের কথা। আর ধর্মজগতে ভক্তি ও বিশ্বাসই তো সব।



Tuesday, 18 August 2020

মহৎ আশ্রয়



মহৎ আশ্রয়

তখন সবেমাত্র এসেছি বিবেকানন্দ বিদ্যাভবন কলেজে। এগারোক্লাসে পড়ি। স্বামীজীর তিথিপূজায় দল বেঁধে আবাসিক ছাত্রীরা গেছি সারদা মঠে। সেখানে সকলে মন্দির দর্শন করবো, প্রসাদ পাবো এবং সভায় বক্তৃতা শুনবো। পনেরো-ষোল বছরের কিশোরী সবাই। গুরুগম্ভীর বক্তৃতায় তেমন উৎসাহ নেই, তবুও সভায় বসে মন দিয়েই শুনে যাচ্ছি। সবশেষে বলতে উঠলেন সভানেত্রী। রাশভারি চেহারা, মুখে মৃদু হাসি। তাঁর সামনেই মাঠে আমরা বসে আছি। আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আজ তোমাদের একটা প্রেমের গল্প শোনাবো।’ চমকে উঠলাম, সাধু বলে কি? নড়েচড়ে বসলাম সবাই। ‘নাঃ, কোনো জোলো প্রেমের গল্প নয়। এ হল ঠাকুর এবং স্বামীজীর প্রেমের গল্প।” বলে চললেন তিনি, আর আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনে গেলাম সেই অপার্থিব প্রেমকথা। গোটা মাঠ জুড়ে ছিল নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ, কোনো চাঞ্চল্য নেই অল্পবয়সী ছাত্রীদের মধ্যে। সবাই যেন রূপকথার গল্প শুনছে। এই মানুষটিই শ্রীসারদা মঠের তৎকালীন সহ সম্পাদিকা প্রব্রাজিকা শ্রদ্ধাপ্রাণা মাতাজী।

                     স্বামীজী স্বপ্ন দেখেছিলেন, নারীমুক্তির জন্য একটি স্বাধীন নারীসঙ্ঘ চাই। সারা ভারতে ঘুরতে ঘুরতে মেয়েদের দুঃখ, যন্ত্রণা দেখতে দেখতে তাঁর মনে হয়েছিল আগে মা আর মার মেয়েরা তারপর বাবা আর তার ছেলেরা। আগে মেয়েদের মঠ চাই। সেখানে যথার্থ অধ্যাত্ম এবং লৌকিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মেয়েরা ছড়িয়ে যাবে দিকে দিকে, জ্বালিয়ে তুলবে আরও লক্ষ প্রদীপ। স্বামীজীর জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি, কারণ সেই বাল্যবিবাহের যুগে কোথায় পাওয়া যাবে ঘরের টান উপেক্ষা করে বেরিয়ে আসা একঝাঁক স্বপ্নিল চোখকে? কিন্তু স্বাধীনতার পর একে একে জড়ো হতে শুরু করেছিল কিছু সাহসী স্বাধীন কন্যারা, যারা চিরাচরিত বাসরঘরে যাওয়ার রীতিকে মনের থেকে সম্পূর্ণ উপড়ে ফেলে দিয়ে ঘরের বাইরে আসার সাহস দেখিয়েছিল। একমাত্র শ্রীরামকৃষ্ণ - সারদা আমাদের আপন, দেশ আমাদের কর্মক্ষেত্র, স্বামীজী আমাদের নেতা। সেই গুটিকয় পুরোবর্তিনীকে নিয়ে বেলুড় মঠ প্রতিষ্ঠা করলেন শ্রীসারদা মঠ ১৯৫৪ খ্রীষ্টাব্দে, শ্রীশ্রীসারদা দেবীর শতবর্ষে।

পাঁচ বছর বেলুড় মঠের অধীনে রইল সারদা মঠ । পাঁচ বছর পরে মেয়েদের যথেষ্ট উপযুক্ত বিবেচনা করে স্বামীজীর ইচ্ছা অনুযায়ী বেলুড় মঠ কর্তৃপক্ষ শ্রী সারদা মঠকে স্বাধীন স্ত্রী মঠের মর্যাদা দিলেন। বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীন নারীমঠ। সেই মঠে যে আট জন প্রথম সন্ন্যাসব্রতে দীক্ষা নিয়ে একটা নতুন যুগের সুচনা করেছিলেন তাদের অন্যতমা ছিলেন শ্রদ্ধাপ্রাণা মাতাজী। কারণ হিন্দু মেয়েদের সন্ন্যাসের অধিকার দেন নি সমাজপতিরা। বিবাহিত জীবনই তাদের একমাত্র পরিনতি ছিল। স্বামীজী তাঁর যুগান্তকারী দূরদৃষ্টিতে প্রথম অন্য ধাঁচে নারীমুক্তির কল্পনা করেন। আর সেই কল্পনার সাকার রূপ দেন একাধারে রামকৃষ্ণ মঠ এবং এই সব অত্যন্ত উচ্চশিক্ষিতা, অথচ বৈরাগ্যপ্রবণ গার্গী মৈত্রেয়ীরা। শ্রদ্ধাপ্রাণা মাতাজী, আগের জীবনে লক্ষ্মী সিংহ, সে যুগে ইংরাজীতে মাস্টার ডিগ্রি করে কাশীতে একটি কলেজে অধ্যাপনা করছিলেন। কিন্তু স্বামীজীর ডাক  প্রাণে বাজলে ঘর তুচ্ছ হয়, যেমন স্বাধীনতার যুগে তাঁর বাণী সম্বল করে ঘর ছেড়েছিল বহু তরুণ তরুণী। স্বাধীনতা চলে এলেও গড়ে ওঠার এবং গড়ে তোলার লড়াই তো থামে নি, তাই পায়ে পায়ে এগিয়ে এসেছিলেন এসব অলোকসামান্যারা, বুকের রক্ত দিয়ে তৈরি করেছিলেন রাস্তা , যে রাস্তায় আজ আমরা অতি সহজে হাঁটছি।

অসাধারণ ব্যক্তিত্বময়ী মাতাজীকে ছাত্রীজীবনে আমরা পেয়েছিলাম প্রধাণত বক্তৃতামঞ্চে। আক্ষরিক অর্থেই তাঁর কথাগুলি যেন শুধু কান দিয়ে নয়, প্রতিটি জ্ঞানেন্দ্রিয় দিয়ে গ্রহণ করতাম। প্রতি বছর বিদ্যাভবনে হত তিনদিনের আধ্যাত্মিক শিবির। সেখানে প্রায় প্রতিবার তাঁর বলা থাকতো। কখনো কথাপ্রসঙ্গে বলছেন, ‘ব্যাকুল সুদাস কহে, প্রভু আর কিছু নহে চরণের ধুলি এককণা।’ কখনো বা বলছেন, ‘যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মান না মণি/ তাহারই খানিক/ মাগি আমি নতশিরে।’ রবীন্দ্রকবিতাগুলি অক্ষরের বাঁধন থেকে বেরিয়ে এসে আমাদের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠতো। এখন অনেকে বক্তৃতার সঙ্গে projector এ ছবি দেখান। তিনি কথার তুলিতে সেই ছবি আঁকতেন আমাদের চোখের সামনে।

একবার আধ্যাত্মিক শিবির থেকে ফিরে যাব যা যা মম্প আমরা কেমনভাবে সেটা বোঝাতে গিয়ে মাতাজী একটি কাহিনি বলেছিলেন। এক সন্ন্যাসী প্রতিদিন গঙ্গাস্নান করে ওঁকার ধ্বনি করতে করতে ফিরতেন। কেমন ছিল সেই প্রণব ধ্বনি সেটা বোঝাতে মাতাজী মাইকের সামনে নিজে সেই প্রণবধ্বনি ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, ‘ ও -ও -ও - ও - ও -ম্‌’। কী সেই ওঁকারের অনুরণন! সারা সভাগৃহে ছড়িয়ে পড়লো সেই অপূর্ব ধ্বনির রেশ। মাতাজী বললেন, ‘তোমরা এইরকম রেশ নিয়ে বাড়ি ফিরে যাবে।’                                                                                                                          প্রব্রাজিকা বেদরূপপ্রাণা, ‘তোমার আলোয়’ প্রব্রাজিকা শ্রদ্ধাপ্রাণা জন্মশতবর্ষ স্মরণিকা, পৃঃ৮২



দীক্ষা কী দিচ্ছি তা মা-ই জানেন ! সব(দীক্ষার্থীগণ) আসে --আমি কেবল নৈবেদ্য ফুলের মতো মায়ের পায়ে দিয়ে দিই ! বেশ লাগে !!! আমাদের তো গুরুবুদ্ধি নেই --ঠাকুরই তো সব। যদি গুরুবুদ্ধি থাকত তাহলে এত মজা লাগত কি না কে জানে ? আমি আর কী ? আমি তো কেবল সম্বন্ধ পাতিয়ে দিয়েই খালাস --আমি তো কেবল ঘটকালির কাজ করি।...দেখ, ঠাকুর একটা কানাকড়ি দিয়ে কী করছেন ! ..সব (দীক্ষাপ্রার্থীগণকে) তো আমি দেখেশুনে নিতে পারি না। শান্তিজল, আচমনটা ওরা (সহকারী সন্ন‍্যসীগণ) করে দেয়। অধ‍্যক্ষদের ওপর এটার ভার দিয়েছি।...গুরুকে নিয়ে মাতামাতি করতে বলি না। করতে চাও তো বাড়িতে বসে কর। আমি বলি,গুরুকে অল্প ধ‍্যান করে ইষ্টে লীন করে।আমি তো পাঁকাল মাছ।তিনিই সব,ঠাকুরই সব।...ঠাকুর ও মায়ের ছবি সামনে নিয়ে অভ‍্যাস করবে,ক্রমে হবে।প্রথম প্রথম পরিষ্কারভাবে দেখা যায় না, তার কারণ মন এখন চঞ্চল অভ‍্যাস করতে করতে মন যখন রজঃ থেকে একটু সত্ত্বে উঠবে তখন স্পষ্ট ধ‍্যান হবে। উন্নতি যে হচ্ছে, তা বোঝা যাবে মনের তৃপ্তিতে।..কাজকর্মের মধ‍্যে তাঁর কাজ ; ঠাকুরকে কেন্দ্র করেই সব --এটি সবসময় চিন্তা করতে হবে।সংসার --কেবল 'আমি',' আমার' ,'আমিময়'। আমাদের এখানে --কেবল 'ঠাকুর','ঠাকুরের','ঠাকুরময়।'তুমি','তোমার', 'তুমিময়'। "কাজকর্মের মধ্যে মধ্যে এই চিন্তাটি থাকা চাই।তাই একটু সময়মতো ঐ চিন্তাটি করে ঐ ভাবটিতে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে।ঐ চিন্তাটি না থাকলে কাজ চাকুরীর সামিল। ঠাকুরের জন‍্যই সব।তাঁকে ভালবাসতে হবে।...আগে 'রামকৃষ্ণ' পরে 'মিশন' ; আগে 'মিশন'পরে 'রামকৃষ্ণ' নয়।

*-------স্বামী বিশুদ্ধানন্দ।
স্থানঃ সারগাছি।জানুয়ারী,১৯৬০খৃঃ।* মুসাফিরের গাঁটরি  -- স্বামী সুহিতান্দ।


 হর হর মহাদেব

শিবের সাতটি জিনিসের মহাত্ব্য ::



১) সাপঃ সর্প হচ্ছে সদা জাগ্রত থাকার প্রতীক। যদি আপনার গলায় একটি সাপ প্যাঁচানো থাকে, তাহলে আপনি কিছুতেই
ঘুমাতে পারবেন না।
২) ভষ্মঃ এটা জীবনের অনিত্যতাকে স্মরন করিয়ে দেয়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদেরও একদিন ভষ্মে পরিণত হতে হবে।
৩) চন্দ্রঃ চন্দ্র সর্বদাই মনের সাথে সম্পর্কিত। এটি জীবনের সকল পরিস্থিতিতে সুখী থাকা এবং মনের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রতীক।
৪) ডমরুঃ এটা দেখতে ইনফিনিটি চিহ্নের মত। যা শিবের অসীম তথা উন্মুক্ত চিন্তাচেতনার প্রতীক।
৫) ত্রিশুলঃ শিব প্রকৃতির তিনগুন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন, এটি তারই প্রতীক। তিনি এটির মাধ্যমে সকলকে নিজ নিজ ধর্ম
পালনে উৎসাহিত করে থাকেন।
৬) নীলাভ শরীরঃ আকাশ অন্তহীন, শিবও তেমনি অন্তহীন। নীলাভ শরীর অন্তহীন আকাশের মতই শিবের অন্তহীনতা
তথা অসীমতার প্রতীক।
৭) গঙ্গাঃ গঙ্গা নিষ্কলুষ জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে। যখন শিবের মতই আমাদের হৃদয় স্থির হয়, তখনই তাতে নিষ্কলুষ জ্ঞান প্রবাহিত হয়।
💥💥💥💥💥💥💥

🕉️ হর হর মহাদেব 🕉️






***********  অমৃত   কথা  ***********"***"""""""               স্বামী  বিশুদ্ধানন্দ


কাশী সেবাশ্রমের জনৈক ডাক্তার এসেছেন মহারাজকে প্রণাম করতে। মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন  " কেমন আছ ? " ডাক্তার বাবু ---- " ভাল নয়। মন একটুতেই চঞ্চল হয়ে যায়। মনের এরূপ অস্থিরতার জন্য বড়ই অশান্তি ভোগ করছি।"
মহারাজ সব কথা মন দিয়ে শুনে বললেন, " সত্যিই তো বড় মুশকিলের কথা। তুমি এক কাজ করো। যখনি ঐসব মনে হবে, তখন জোর করে হাততালি দিয়ে দিয়ে ' জয় রামকৃষ্ণ , জয় রামকৃষ্ণ  ' বলবে। মনে মনে জপ নয় --- জোরে জোরে। তাহলে দেখবে সব চলে যাবে। এই রকম মনের অশান্তির কথা অনেকেই বলে। আমি তাদের বলি, ' মন্দিরের সামনে বসে ঠাকুরের দিকে চেয়ে খুব জপ করো, দেখবে সব চলে গেছে। ' 

 " মনে কর নর্দমায় ময়লা জমেছে। তখন জোর করে বালতি বালতি জল ঢাললে তবেই ময়লা যায়। সেইরকম জোর করে নাম, জপ আর প্রার্থনা করতে হয়। ছাড়বে না , দেখবে তাতেই সব ময়লা চলে গেছে।  উপাসনা মানে কি ?  ' উপ ' মানে নিকটে ---- ' আসনা ' মানে 
' আসন গ্রহণ করা '  অর্থাৎ নিকটে আসন গ্রহণ করা। কার নিকট ? --- না ভগবানের নিকট। তিনি কোথায় ? আমাদের হৃদয়ে ! অর্থাৎ হৃদয়ে তাঁকে চিন্তা করাই উপাসনা। তিনি আমাদের সর্বাপেক্ষা নিকটে আছেন। তাঁর কাছেই যেতে হবে, তাঁকেই চিন্তা করতে হবে।

 " কথামৃতের একটি scene চিন্তা করলে তাতেও উপকার হবে।  মা কি বাবা যাকে হোক ধরে থাকো। তাঁদের চিন্তা করতে করতে দেখবে, ক্রমে ক্রমে সব চলে যাচ্ছে। কেমন জানো --- একটা কড়াইতে জল গরম করতে দিয়েছ। প্রথম তাপ লাগলে কড়ার চারপাশে ছোট ছোট ফুট হয়। পরে যত ই কড়াই গরম হতে থাকে, তত ই জলটা টগবগ করে ফুটতে থাকে। সেইরকম প্রথমে নাম করতে হয়। নাম ও প্রার্থনা করতে করতে জপ হয়। জপ করতে করতে ধ‍্যান হবে। তারপর আরও কত কী? প্রথমে ভক্তি ও ভালবাসা চাই।



#কালিবাড়ির_প্রতিষ্ঠাদিবস ১৮৫৫ সাল, ৩১ শে  মে, বৃহস্পতিবার 


আজ এক বিশেস দিন। আজ  দক্ষিণেশ্বর  কালীবাড়ির 
১৬৬তম প্রতিষ্ঠা দিবস।
১৮৫৫ সালের ৩১এ মে , ১৮ই জ্যৈষ্ঠ , বৃহস্পতিবার , 
পুণ্য স্নানযাত্রার দিনে দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা 
করেন লোকমাতা রানী রাসমণি।

১৮৪৭-তে মন্দির নির্মাণ শুরু হয়ে শেষ হয় ১৮৫৫-য়। 
১০০ ফুটেরও বেশি উঁচু এই নবরত্ন মন্দিরের স্থাপত্য 
দেখার মতো। গর্ভগৃহে সহস্র পাপড়ির রৌপ্য-পদ্মের 
উপর শায়িত শিবের বুকে দেবী কালী দাঁড়িয়ে। এক 
খণ্ড পাথর কুঁদে তৈরি হয়েছে এই দেবীমূর্তি।আট
বছরে নয় লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় এই মন্দিরটি।






মন্ত্র  কি  এবং এর উপকার :::


ভক্ত – তা একটু একটু রোজই করি-খানিকক্ষণ জপ, ধ্যান, প্রার্থনা নিত্যই করে থাকি। কিন্তু তাতে তো তৃপ্তি হয় না। ইচ্ছা হয় আরো করি, কিন্তু সময় হয়ে ওঠে না ।
মহারাজ – যা করছ, তাই করে যাও অন্তরিকতার সঙ্গে। তাতেই তোমার কল্যাণ হবে ।
ভক্ত –আর একটিমাত্র কথা জিজ্ঞসা করব । আপনার শরীর অসুস্থ তাই বেশি কথা বলতে ভয় হচ্ছে।
মহারাজ-তা বল না, বেশ তো।
ভক্ত – মা ঠাকরুন যে মন্ত্র দিয়েছেন, সেই মন্ত্রই জপ করে যাচ্ছি। কিন্তু মন্ত্রের কি অর্থ তা তো জানিনে, আর তিনিও বলে দেননি ।
মহারাজ – ঐ মন্ত্র জপ করছ তো? তবেই হলো। মন্ত্রের আবার অর্থ কি? মন্ত্র হলো ভগবানের নাম । আর নামের সঙ্গে যে বীজ আছে, তা হলো সংক্ষেপে বিশেষ দেবদেবীর ভাবপ্রকাশ। বীজ এবং নাম একত্রেই হলো মন্ত্র। মোট কথা মন্ত্র ভগবানকেই বোঝাচ্ছে । মন্ত্র জপ করলে তাঁকেই ডাকা হয় । আর বেশি অর্থ জেনে কি হবে, বাবা? সরল বিশ্বাসে সেই মহামন্ত্র জপ করে যাও, তাতে তোমার কল্যাণ হবে ।
ভক্ত – আপনি আশীর্বাদ করুন যাতে এ ভববন্ধন থেকে মুক্ত হতে পারি।
মহারাজ-খুব আশীর্বাদ করছি, বাবা তাই হবে । মায়ের কৃপায় তুমি মুক্ত হয়ে যাবে ।

-- শিবানন্দ বাণী।

রামকৃষ্ণ ওঁ হরি ॥ 


হাওড়া হইতে বালী পর্যন্ত বাস চলাচল আরম্ভ হইবার প্রায় তিন মাস পরে একদিন বৈকালে পূজনীয় শঙ্করানন্দ মহারাজ কলিকাতা হইতে বাসে বেলুড় মঠে ফিরিতেছিলেন। কিয়দ্দুর বাসটি আসিবার পর পার্শ্বস্থ জনৈক সহযাত্রী তাঁহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, “ আপনি কি রামকৃষ্ণ পরমহংস মঠের ”? মহারাজজী বলিলেন, “হাঁ, কিছু বলবেন কি ?”

তিনি বলিতে লাগিলেন,

“ বাল্যকালে বাবার নিকট শুনেছি রামকৃষ্ণ পরমহংস আমাদের যে কি উপকার করেছেন তা মুখে বলা যায় না। আমরা জাতিতে মুসলমান এবং কামারপুকুর অঞ্চলে আমাদের বাড়ী। এখন কলকাতার চাঁদনীতে একটি দোকান আছে। বাবা কয়েক বৎসর হল গত হয়েছেন।

“ বাবা বলেছিলেন, আমাদের তখন মধ্যবিত্ত অবস্থা ও তদুপযুক্ত ঘরদ্বার খামার ধানের গোলা ইত্যাদি ছিল। কিন্তু দৈবদুর্বিপাকে প্রতি বৎসর আগুন লেগে সমস্ত পুড়ে যেত। এইরূপ ২।৩ বার হওয়ার পর একদিন জনৈক ব্রাহ্মণবন্ধুর নিকট আমার দুঃখের কাহিনী বলছিলাম। সে সময়ে রামকৃষ্ণ পরমহংস ঐ পথ দিয়ে লোকজন পরিবেষ্টিত হয়ে কীর্তন করতে করতে গ্রামান্তরে যাচ্ছিলেন। আমার বন্ধু তাঁকে অদূরে দেখে আমাকে বলেন, ঐ যে মহাপুরুষ কীর্তন করতে করতে যাচ্ছেন, তাঁহার শরণ লও। তিনি তোমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবেন।

“ পিতা এই কথা শুনে সেই মহাপুরুষকে নিবেদন করবার জন্য ভক্তিভাবে বিনয়সহ ভূমিস্পর্শ ক’রে সেলাম করতে করতে তাঁর সম্মুখে উপস্থিত হন। পরমহংস পিতাকে প্রশ্ন করেন, ‘ কি বাবা ?’ পিতা বলিলেন, ‘ বাবা, আমরা ছা-পোষা মধ্যবিত্ত লোক, যা কিছু ঘর বাড়ী খামার আছে প্রতি বৎসর আগুনে পুড়ে গেলে কি প্রকারে আমরা বাঁচতে পারি ? এইজন্য আপনার শরণ নিচ্ছি, একটা উপায় দয়া করে করুন’ । এই কথা শুনে পরমহংস জিজ্ঞাসা করলেন, - ‘কোথায় তোমার ঘর ?’ রাস্তার অনতিদূরে নির্দেশ করিয়া পিতা বলিলেন, -‘ঐ খানে, এখনও পোড়ার সব চিহ্ন রহিয়াছে।’

পরমহংস পিতাকে বলিলেন, ‘ আচ্ছা চল’। অন্যান্য লোকজনদের একটু অপেক্ষা করতে বলে নিজে পিতার সঙ্গে অগ্রসর হতে লাগলেন। বাড়ীর কাছাকাছি পৌঁছলে তিনি বাবাকে কয়েকটি ফুল আনতে বললেন। পিতা কয়েকটি ফুল নিয়ে এলে তিনি হাত পেতে নিলেন ও বললেন, ‘ কতটা জায়গা জুড়ে তোমার বাড়ী খামার যা আগুনে নষ্ট হয়, দেখিয়ে নিয়ে চল ’। পিতা তাঁর কথামত আগে আগে চলতে লাগলেন। পরমহংস বিড়বিড় করে কি বলে যাচ্ছেন ও মধ্যে মধ্যে এক একটি ফুল ফেলতে লাগলেন। এইভাবে বাড়ী খামার প্রদক্ষিণ করে পিতা একস্থানে দাঁড়ালে পরমহংস জিজ্ঞাসা করলেন ‘ সবটা হয়েছে ?’ পিতা তদুত্তরে ‘আজ্ঞে হয়েছে ’ বললেন। এর পর থেকে এযাবৎ আর আমাদের বাড়ীতে আগুন লাগে নি। এজন্য আমরা পরমহংস মহাশয়ের নিকট চিরকৃতজ্ঞ।”

রামকৃষ্ণ শরণম্ ।


শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ ও শ্রী শ্রী তোতাপুরি  ::

তোতাপুরী গঙ্গাসাগর হইতে ফিরিয়া রামকৃষ্ণের কাছে কয়েকমাস অবস্থিতি করিলেন। এই অবস্থিতি সময়ে তোতাপুরির সহিত রামকৃষ্ণের নানা  বিষয়ে আলোচনা হইত। তোতাপুরি নানা শাস্ত্রপাঠে কঠোর সাধনার যে সব বিষয় বুঝিয়াছিলেন-রামকৃষ্ণ লেখাপড়া না শিখিয়া সেই সব বিষয়ের সরল মীমাংসা কি প্রকারে করেন ইহা ভাবিয়া অবাক হইতেন। তোতাপুরির সহিত রামকৃষ্ণের কোনও কোনও বিষয়ে মিলিত না। রামকৃষ্ণ কথায় কথায় মা, মা কহিতেন। একদিন তোতাপুরি রামকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করিলেন “বাবা! তুমি ‘মা’ বল কাকে? মা আবার কি?”

রামকৃষ্ণ কোন উত্তর করিলেন না। আপন গৃহে গিয়া ধ্যানস্থ হইয়া মাকে নিবেদন করিলেন! “মা, আমার গুরু কি তোকে জানে না? গুরু বলেন, মা আবার কি? গুরুকে কি বলবো বলে দাও মা?”

মা কহিলেন “তোর গুরুকে আজ রাত্রি দুটার সময় আমার মন্দিরের পিছনে যাইতে বলিস; আমি তোর কি প্রকার মা বুঝিতে পারিবে।“

রামকৃষ্ণ অমনি গুরুর নিকটে গিয়া সমুদয় নিবেদন করিলেন। গুরু বলিলেনঃ আচ্ছা বাবা! আজ রাত্রে আমি যাব।

তোতাপুরি সেই রাত্রে ঠিক দুটার সময় খরমপায়ে কালী মন্দিরের পিছনে চলিলেন। তখন আকাশের চাঁদ অস্ত গিয়াছে। মন্দিরের পিছনে বৃক্ষসকলের ছায়ায় অন্ধকার বড় ঘন হইয়াছে। তোতাপুরি  ধীরে ধীরে যাইতে ছিলেন হঠাৎ পায়ে কিসের আঘাত লাগল। পা হইতে ব্রহ্মরন্ধ্র পর্যন্ত জ্বলিয়া উঠিল-হোঁচট খাইয়া পড়িয়া গেলেন-একবারে অজ্ঞানবৎ ঘুরিতে ঘুরিতে পড়িয়া গেলেন। জীবনে কখনও এমন হোঁচট খান নাই।

রামকৃষ্ণ আপন ঘর হইতে যোগশক্তির বলে এই ঘটনা জানিতে পারিয়া দ্রুত বেগে গুরুর কাছে ধাবিত হইলেন। মন্দিরের পিছনে গিয়া বলিলেন, “বাবা! পড়ে গেছ?”

“হাঁ বাবা আমার আর উঠিবার শক্তি নাই। তোমার মা আমায় ফেলিয়া দিয়াছেন। আমার বোধ হয় শরীরের হাড় চূর্ণ  হইয়াছে। আমি উঠিতে পারিতেছি না-বাবা তোমার মাকে বলে আমায় ভাল করে দাও। তোতাপুরি অতি কাতর স্বরে এই কথা কহিলে রামকৃষ্ণ বালকের মত কাঁদিয়া মাকে ডাকিতে ডাকিতে কহিলেন “মা! ওমা। আমার গুরুকে ফেলে দিলি কেন মা। আমার গুরুকে ভাল করে দে না মা!” রামকৃষ্ণ বালকের ন্যায় রোদন করিতে লাগিলেন, সে কান্না শুনিয়া তোতাপুরির প্রাণের ভিতরে এক আশ্চর্য্য ভক্তিভাবের উদয় হইল। তোতাপুরির জ্ঞান-চক্ষে দেখিলেন “সচ্চিদানন্দ  যিনি, তিনি অবিকৃত মূর্ত্তি ধারণ করিতে পারেন!” অমনি সব যাতনা দূর হইল। তোতাপুরি উঠিলেন। রামকৃষ্ণের পৃষ্ঠে মৃদুভাবে চাপড় মারিতে মারিতে কহিলেন, “বাবা! আমি তোর গুরু নই তুই আমার গুরু বাবা। তোর মা যে কেমন মা, তা বুঝিয়াছি। আজ আমার শুষ্ক ব্রহ্মজ্ঞান সরস হইল।“ –শ্রী শ্রীতোতাপুরী-প্রসঙ্গ (পার্থ প্রতিম বন্দ্যোপাধ্যায়)
🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺🌼🌹🙏🏻🌺




শ্রী  ঈশ্বর  তোতাপুরী সম্বন্ধে দু-চার কথা :



শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেবের গুরু, শ্রী ঈশ্বর তোতাপুরীর একমাত্র ছবি। ছবিটি সম্ভবত ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৬ সালের মধ্যে তোলা হয়।
শ্রী ঈশ্বর তোতাপুরী ১৭৮০ খ্রীষ্টাব্দে পাঞ্জাবে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি একজন পরিব্রাজক সন্যাসী ছিলেন যিনি অদ্বৈত্ব বেদান্তের পথ অনুসরন করতেন। ১৮৬৪ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কলকাতার দক্ষিনেশ্বরে আসেন ও শ্রী রামকৃষ্ণের সাথে সাক্ষাৎ করে, তাঁকে অদ্বৈত্ব বেদান্তের মন্ত্রে দীক্ষা দেন। তোতাপুরী কোন বস্ত্র পরিধান করতেন না (নাগা সন্যাসীদের ন্যায়)। এর জন্য তাঁকে 'উলঙ্গ সন্যাসী' বলেও ডাকা হত। ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে, ৮৬ বছর বয়সে, তাঁর দেহাবসান ঘটে।




বিরাটপুরুষ রূপে শ্রীরামকৃষ্ণ 
-----------------------------------------------
গদাধরের (ঠাকুরের) বয়ঃক্রম তখন সাত-আট মাস হইবে। শ্রীমতী চন্দ্রা একদিন প্রাতে তাহাকে স্তন্যদানে নিযুক্তা ছিলেন। কিছুক্ষণ পরে পুত্রকে নিদ্রিত দেখিয়া মশক দংশন হইতে রক্ষা করিবার জন্য তিনি তাহাকে মশারির মধ্যে শয়ন করাইলেন। অনন্তর ঘরের বাহিরে যাইয়া গৃহকর্মে মনোনিবেশ করিলেন। কিছুকাল গত হইলে প্রয়োজনবশত ঐ ঘরে সহসা প্রবেশ করিয়া তিনি দেখিলেন, মশারির মধ্যে পুত্র নাই, তৎস্থলে এক দীর্ঘকায় অপরিচিত পুরুষ মশারি জুড়িয়া শয়ন করিয়া রহিয়াছে। বিষম আশঙ্কায় চন্দ্রা চিৎকার করিয়া উঠিলেন এবং দ্রুতপদে গৃহের বাহিরে আসিয়া স্বামীকে আহ্বান করিতে লাগিলেন। তিনি উপস্থিত হইলে তাঁহাকে ঐ কথা বলিতে বলিতে উভয়ে পুনরায় গৃহে প্রবেশপূর্বক দেখিলেন কেহ কোথাও নাই, বালক যেমন নিদ্রা যাইতেছিল তেমনি নিদ্রা যাইতেছে। শ্রীমতী চন্দ্রার ভয় দূর হইল না। তিনি পুনঃপুনঃ বলিতে লাগিলেন, "নিশ্চয়ই কোন উপদেবতা হইতে এরূপ হইয়াছে। কারণ স্পষ্ট দেখিয়াছি পুত্রের স্থলে এক দীর্ঘকায় পুরুষ শয়ন করিয়াছিল। কিছুমাত্র ভ্রম হয় নাই।" শ্রীযুক্ত ক্ষুদিরাম তাঁহাকে আশ্বাস প্রদানপূর্বক কহিলেন,"বাটীতে রঘুবীর স্বয়ং বিদ্যমান।... জানিও রঘুবীর সন্তানকে সর্বদা রক্ষা করিতেছেন।"