Friday, 3 July 2026

বার্ধক্যের গল্প গান

 


" বার্ধক্য " মানুষের জীবনে এক অসহায় সময়কাল। কার জন্য জীবনের শেষ অধ্যায়ে কি অপেক্ষা করছে সেটা বলা মুশকিল।  এই অধ্যায়ে এসে মানুষ  অবশ্যম্ভাবী অনাচ্ছিকৃত তজান্তে  এক লটারি খেলায় অংশ গ্রহন করে। তাই  এককথায় বলা যেতে পারে শেষজীবন টুকু প্রায় সকলেরই ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত।  যদি কোনো প্রবীণের টাকা পয়সা, ঘর বাড়ী , ছেলে মেয়ে নিয়ে ভরা সংসার থাকলেও  তিনি যে সুখে দিন কাটাবেন, আনন্দে বাকী জীবনটা কাটিয়ে দেবো  বলে ভাবছেন, হয়তো তিনি একটু ভুলই ভাবছেন। কেননা এই  বয়সকাল অর্থাত বার্ধক্য তাকে বাধ্যতামূলক পরাধীনতার দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে। আর যার টাকাপয়সা নেই বা অন্য ধনসম্পত্তি নেই  বা ছেলে মেয়ে নেই  তাদের তো বেচে থাকার কথা চিন্তা করাই অর্থহীন। 

বার্ধক্যের জীবন যেন এক কৃতজ্ঞতাহীন কঙ্কাল। বিধস্ত, পরাজিত এক অসহায় মানুষ। জীবনের এই শেষ লগ্নে এসে কেউ যদি একান্তেই ভাবে ...... এতদিন পরম মায়ায় যে জীবন কাটিয়ে এলাম তার শেষ পর্বে এসে দেখছি সবাই যেন ঠেকিয়ে দিচ্ছে এই কঙ্কালকে, কোনো  রকম কৃতজ্ঞতা বোধ নেই,  জীবনের সমস্ত কার্যকলাপ সম্পূর্ণ কৃতজ্ঞতাহীন হয়ে পরেছে...... তবে তার চিন্তাধারা মনেহয় সঠিক পথেই এগুচ্ছে।

বর্তমান সমাজে যে সব ঘটনা ঘটছে সে সব শুনলে বা দেখলে সত্যিই মনে হবে বয়স হওয়াটাই যেন অপমানের। বৃদ্ধ মানুষের প্রতি সম্ভ্রম দেখানো বা তাদের প্রতি যত্নশীল হওয়া যেন খানিকটা ঋণ শোধের মত ব্যাপার।  কেননা সমাজের ছোটদের বয়স্ক মানুষের পাশে দু দন্ড বসবাস সময় কোথায় ? যে দাদু-দিদারা, ঠাকুরদা-ঠাকুমারা নাতিনাতনিদের গোটা রাত কোলে নিয়ে ঘুম পাড়িয়াছে, দুপুরবেলা পাশে শুইয়ে গল্প বলেছে,  বিকেলবেলা হাত ধরে পার্কে নিয়ে বেড়িয়েছে, বাইনা শুরু করলে ভাত মেখে খাইয়ে তা ভোলানোর চেষ্টা করছে, বাবা-মার বকুনির হাত থেকে বাচিয়েছে , সেইসব নাতিনাতনিদের একটুও কি ফুরসত আছে যে দাদু-দিদিমা বা ঠাকুরদা-ঠাকুমার  দিকে একবার তাকাবে। বেচারি নাতিনাতিনিদের দোষ কোথায়? বাবা মায়ের কথায় লেখাপড়ার মাঠে দৌড়াতে শেখা..... আশে পাশে পিছনে না তাকিয়ে শুধু সামনে দৌড়ানো আর দৌড়ানো । তৈরি করতে হবে কেরিয়ার  আর কেরিয়ার।  তাহলে ব্যস্ততা কি কম ?? বিয়েতে নাতবৌ এর মুখ দেখে সারে চার ভরির হার লকারে রাখতে নাতবৌকে তো সময় একটু বার করে নিতেই হবে । কিন্ত মিছামিছি অসুস্থ ঠাকুরমা পাশে দু দন্ড বসা কি সম্ভব ? না কি যুক্তিযুক্ত? আর সম্পত্তি ভাগ বাটোয়ারার  সময় তো আসতেই হবে কেননা ঠাকুরদা ঠাকুমার সঙ্গে জেনারেশন গ্যাপ হতে পারে কিন্ত জমি বাড়ির সঙ্গে তো কখনোই হয় না।



বার্ধক্যের এই একাকীত্ব একটি গভীর মানসিক ও সামাজিক সমস্যা। একাকীত্ব  নানা কারনে হতে পারে । প্রিয়জনের মৃত্যু, শারীরিক অক্ষমতা, সন্তানদের / প্রিয়জনের দূরে থাকা বা সামাজিক বৃত্ত ছোট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রবীণরা প্রায়শই নিঃসঙ্গতায় ভোগেন। এটি কেবল মনের কষ্ট নয়, বরং শারীরিক স্বাস্থ্যের অবনতি, স্মৃতিভ্রংশ (ডিমেনশিয়া) এবং বিষণ্ণতার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বয়সের এই  সমস্যা ধনী দরিদ্র বলে কোনো ভেদাভেদ নেই।  যাদের টাকা পয়সা আছে তারা অধুনা ব্যায়বহুল এই চিকিৎসা কিছুদিন চালিয়ে নিতে পারেন। ছেলেমেয়েরা বড়লোক হলে আধুনিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার সাহায্য নিয়ে মা বাবাকে কিছুটা স্বস্তির আলো দেখিয়ে থাকে। তবে টাকা থাকলেও বা না থাকলেও বার্ধক্যের যন্ত্রনা সবার। কারও পেটের খিদের যন্ত্রনা, কারও কোমরের ব্যাপার , কারও হাটুর যন্ত্রনা , সর্বোপরি সকলের একাকীত্বের যন্ত্রনা তো রয়েছে। আলিপুর / নিউটাউন বা রাজারহাটের এগারো তলায় যে বৃদ্ধ দম্পতি রয়েছেন তাদের হয়তো বড় ডাক্তারের চিকিৎসায় হাটুর / কোমরের ব্যাথা কম হতে পারে কিন্ত তাদের একাকীত্বের যন্ত্রনা কে সারাতে পারবে ?? কোম্পানির ভাড়া করা লোক দিয়ে দাবা / তাস খেলা যেতে পারে বা কিছুটা সময় গল্প করা যেতে পারে, তবে সেটা কিছুদিন।  কিছুদিন পর থেকে সেগুলি রোবটের মত মনে হতে আরম্ভ করে। সেই শেষ রাতে ভেঙে ঘুম যাওয়ার পর আগামি দিনকে মনে হতে থাকে অনেক বড় আর একঘেয়ে। 

দেখা গিয়েছে এই  একাকীত্ব  মানসিক অবসাদ ও শারীরিক অসুস্থতা বাড়িয়ে তোলে। প্রাত্যহিক রুটিন তৈরি, সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সময় দেওয়া এই একাকীত্ব কাটাতে অত্যন্ত কার্যকর। 
বার্ধক্যের একাকীত্বের মূল কারণ   
  • সামাজিক বৃত্তের সংকোচন: বন্ধু বা জীবনসঙ্গীর মৃত্যু এবং সন্তানরা কর্মব্যস্ততার কারণে দূরে চলে যাওয়া।
  • শারীরিক সীমাবদ্ধতা: চলাফেরায় অক্ষমতা, দৃষ্টিশক্তি বা শ্রবণশক্তি হ্রাস, এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগ।
  • প্রযুক্তির দূরত্ব: নতুন প্রযুক্তির সাথে মানিয়ে নিতে না পারা এবং যোগাযোগের অসুবিধা ।
স্বাস্থ্যঝুঁকি  ***
গবেষণায় দেখা গেছে, একাকীত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কেবল মানসিক কষ্টের কারণ নয়, এটি হৃদরোগ, স্মৃতিভ্রংশ (Dementia) এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল করার মতো মারাত্মক শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গবেষনার পর জানিয়েছে   সামাজিক সংযোগকে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অপরিহার্য ।
লোকে বলে একাকীত্ব  কিছুটা কাটানো  যেতে পারে .........

  • নিয়মিত যোগাযোগ: আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা।
  • নতুন শখ ও কাজ: বাগান করা, বই পড়া বা পছন্দের কোনো কাজে সময় কাটানো।
  • সামাজিক ক্লাবে অংশগ্রহণ: স্থানীয় প্রবীণদের ক্লাব, লাইব্রেরি বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যুক্ত হওয়া।
  • প্রযুক্তির ব্যবহার: ভিডিও কলের মাধ্যমে দূরে থাকা সন্তান ও নাতি-নাতনিদের সাথে যুক্ত থাকা।
  • পেশাদার সহায়তা: প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য প্রবীণ সেবা সংস্থাগুলির (যেমন: HelpAge India) সাহায্য নেওয়া।


তবে এসবের সাহায্য নিলেই কি একাকীত্বের কুয়াশা কাটে? বর্তমান   প্রযুক্তির  আশীর্বাদে / ব্যবহারে ওয়াট্স্যাপ কলে বিলেতে হোক বা আমেরিকার বা যে কোনো বাইরের দেশে থাকা প্রিয়জনের সাথে কথা বলা যায় বা ছবিতে দেখাও যায়। তাতে অনেকেই বলতে পারেন .... সেটুকুই তো যথেষ্ট এই ব্যস্ততার যুগে। কিন্ত যাদের সাথে অর্থাত ছেলে, মেয়ে, জামাই , বৌমা, নাতি বা নাতনিদের অত সময় কোথায়! কেউ বলে একটু পরেই  মিটিং শুরু হবে , আজ বেশী কথা বলা যাবে না। আবার কেউ " হাই" বলে হাজিরা দিয়ে হাত নারিয়ে নিজের সেদিনের কর্তব্য পালন করে। এদিকে বুড়ো বাবা মা ভেবেছিলো দীর্ঘদিন ভালভাবে মনের কথা না বলার জন্য মনে যে কুয়াশার অন্ধকার জমে ছিল তা হয়তো কেটে গিয়ে আনন্দের আলো জ্বলে উঠবে তা আর বাস্তবে রূপায়িত হল না। মনের অন্ধকার অন্ধকারই থেকে গেল , ওয়াট্স্যাপের লাইন কেটে দিতে হলো।

অনেকের মতামত নিজের সংসারে থাকার চাইতে বৃদ্ধাশ্রমে থাকায় অনেক বেশী শান্তি আনে। এর পিছনে যুক্তি হল একই বয়সের সব মানুষজন পাশাপাশি থাকবে, অন্যের একাকীত্বে নিজের একাকীত্বের দঃখ কিছুটা কমবে। এটাই বাস্তবোচিত। এরকম একটা ধারনা নিয়েই সরকার পরিচালিত বৃদ্ধাশ্রমগুলি প্রথমে খোলা হয়েছিল। কিন্ত যখন চতুর মানবশ্রেনী উপলব্ধি করল যে এই  সভ্য দুনিয়াতে প্রবীণ শ্রেনী মানুষের জায়গা খুব সীমিত  আর    এক প্রবীণ শ্রেণী মানুষের হাতে অঢেল পয়সা আছে , তখন এসব সুযোগ কাজে লাগানোর ব্যবসা আরম্ভ করল। চালু হ'ল বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমের রমরমা ব্যবসা। প্রবীণদের মধ্যে যারা অনুভব করতে পারলো যে পরিবার পরিবার করে মায়া বাড়ানো বোকামি, এ জীবন একারই , আর তাই যাদের টাকা পয়সার অভাব নেই,  তারা কালক্ষেপ  না করে এইসব বিলাসবহুল বেসরকারি বৃদ্ধাশ্রমে আবাসিক হয়ে যাচ্ছেন।  তারা সহজেই স্বীকার করেন যে আজকালকার দিনে ঠুনোকো  এইসব চিন্তা...... প্রিয়জনের সাথে শেয দিনগুলি কাটানো বা পরিবারের সাথে একসাথে কাটানো বা আদরে আহ্লাদে বাকী জীবনটা কাটাবো...... এগুলি সবই বোকো বোকা চিন্তার সামিল।  তার থেকে পূর্ন আত্মমর্যদা নিয়ে বাকী দিনগুলি কাটিয়ে দেওয়া যায় স্বাধীন ভাবে বৃদ্ধশ্রমে থেকে।

প্রবীণদের একাকীত্ব একটি হৃদয়বিদারক বাস্তবতা, যার সমাধান করা আবশ্যক। এই নীরব মহামারীর মোকাবিলা করতে সহানুভূতি, করুণা এবং সক্রিয় পদক্ষেপ অপরিহার্য। অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন, আন্তঃপ্রজন্মীয় সম্পর্ককে মূল্য দেওয়া এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনকে গ্রহণ করার মাধ্যমে আমরা সবাই মিলে এমন একটি সমাজ তৈরি করতে সক্ষম, যেখানে আমাদের প্রবীণ জনগোষ্ঠী নিজেদের সমাদৃত, সংযুক্ত এবং সম্মানিত বোধ করবেন।

আসুন, আমরা আমাদের বয়োজ্যেষ্ঠদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ওপর বিষণ্ণতাকে ছায়া ফেলতে না দিই। আসুন, আমরা একযোগে এমন একটি সমাজ গড়ে তুলি যেখানে সকল প্রবীণ নাগরিক সম্মানিত হবেন, তাঁদের কথা শোনা হবে এবং তাঁরা স্নেহময় সাহচর্যের বলয়ে পরিবেষ্টিত থাকবেন


<<**সংগৃহীত**>>

No comments:

Post a Comment