Wednesday, 10 June 2026

শান্তি সন্ধানে "অলোকা"

 






অলোকা......এক ভারতীয় পথকুকুরের নাম। বয়স হয়তো হবে ৪ বছরের কাছাকাছি। আমরা ভারতীয়রা এদেরকে PARIAH (প্যারিয়া) বা চলতি কথায় দেশী কুকুর বলে থাকি। এর জন্ম কলকাতাতেই , কেননা কলকাতা থেকে একে উদ্ধার করা হয়েছিল। প্যারিয়া কোন শ্রেনীর কুকুরদের বলা হয় বা এই শব্দের অর্থ কি ? 

ভারতের নিজস্ব কুকুরদের প্রজাতির প্যারিয়া কুকুর বলা হয়। ভারতে এরাই একমাত্র কুকুরদের প্রজাতি যাদের প্রকৃত অর্থে দেশীয় বলতে পারি। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার [৪৫০০] বছর আগে প্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার সময় থেকে এরা আমাদের অর্থাত ভারতীয়দের সাথে বসবাস করছে। যাদের প্রামাণ্য কঙ্কাল মহেঞ্জোদড়োতে খননকার্যের সময় খুঁজে পাওয়া যায়। অথচ আজকের ভারতীয়  সমাজে ভারতের এই আদি বাসিন্দারাই উপেক্ষিত,  অবহেলিত।  বিদেশী কুকুরদের রমরমার এই বাজারে আমরা ভুলে গিয়েছি সাড়ে চার হাজার বছরের বন্ধুত্ব , আর তাই ভারতীয় প্যারিয়াদের স্হান হয়েছে  রাস্তায়।  গবেষণার ফলে দেখা গিয়েছে যে ভারতীয় পথকুকুরের ইমিউনিটি পাওয়ার বিদেশী প্রজাতির থেকে অনেক বেশি।     সামান্য সমস্যা  কাহিল করতে পারে না ওদের।   সেই  কারণেই চিকিৎসকের কাছেও যেতে হয় না বিশেষ।  কিন্ত বিদেশী প্রজাতির কুকুরদের ক্ষেত্রে পান থেকে চুন খসলেই ছুটতে হয় ডাক্তারের কাছে। যা রীতিমত খরচ সাপেক্ষ।  

পথবাসী তো দূরের কথা, পারিয়া পশুরা ঐতিহ্যগতভাবে সমাজে একটি শান্ত কিন্তু মর্যাদাপূর্ণ স্থান অধিকার করে:

গ্রামরক্ষী: ঐতিহ্যগতভাবে, তারা বসতি পাহারা দিত, বিপদের সতর্কতা অবলম্বন করে এবং ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করে।

আদিবাসী সম্প্রদায় সঙ্গী: অনেক আদিবাসী তাদের শিকারের সংগী ও রক্ষক হিসাবে মূল্যায়ন করে।

প্রাচীন শিল্প কর্মে উপস্থিতি: আদি গুহাচিত্র এবং পোড়ামাটির মূর্তিকলের সাথে পারিয়া দলের স্বতন্ত্র কান এবং কীলকাকৃতির মাথার দৃশ্যমান রয়েছে।

আনুগত্যের প্রতীক: প্রায় লোককথায় পথকুকুর বা দেশি কুকুর সন্ত্রাসের বিশ্বস্ত রক্ষক এবং আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসাবে চিত্রিত করা হয়।


এই রকমের একটি পারিয়া কুকুর, যে ভবঘুরে জীবনযাপন করত। সালটি ছিল ২০২২ ।  ভারতে একটি শান্তি তীর্থযাত্রায় অংশ নেওয়া একদল ভিয়েতনামী-আমেরিকান বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে তার দেখা হয় । ভিক্ষুদের মতে, হাঁটার সময় আলোকা তাদের অনুসরণ করতে শুরু করে এবং যাত্রাপথে গাড়ির ধাক্কা খাওয়া ও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, সে বারবার মিছিলে পুনরায় যোগ দেয়। এরপর ভিক্ষুরা কুকুরটিকে দত্তক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। 



"শান্তির জন্য পদযাত্রা" নামক একটি বৃহত্তর উদ্যোগে যোগদানের পর আলোকার খ্যাতি বৃদ্ধি পায়। এই কর্মসূচিটি শুরু হয়েছিল ২৬শে অক্টোবর, ২০২৫-এ, যখন টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থের হুয়ং দাও বিপাসনা ভাবনা কেন্দ্রের প্রায় ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষু ফোর্ট ওয়ার্থ থেকে ওয়াশিংটন ডিসি পর্যন্ত প্রায় ২,৩০০ মাইল পথ হেঁটে যাত্রা শুরু করেন। আলোকা ভিক্ষুদের পাশে হেঁটেছেন, কখনও পায়ে হেঁটে এবং অন্য সময়ে প্রয়োজনে সহায়ক যানবাহনে চড়ে। তার কপালে একটি স্বতন্ত্র হৃদয় আকৃতির চিহ্ন রয়েছে এবং তিনি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মগুলিতে প্রচুর অনুসারী অর্জন করেছেন। 



ভিয়েতনামী-আমেরিকান থেরবাদ ভিক্ষুগনের-এর নির্দেশনায় টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে অবস্থিত হুয়ং দাও বিপাসনা ভাবনা কেন্দ্রের সাথে যুক্ত ভিক্ষুগণ ‘শান্তির জন্য পদযাত্রা’র আয়োজন করেন । এই আন্দোলনটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ঐতিহ্যবাহী পরিভ্রমণ প্রথা এবং গৌতম বুদ্ধের ৪৫ বছরের শিক্ষাদান যাত্রা থেকে অনুপ্রেরণা গ্রহণ করে। অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহ্যবাহী ধুতঙ্গ [ [ধুতাঙ্গ (Dhutanga) হলো বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য ১৩টি বিশেষ কঠোর তপস্যা বা কৃচ্ছ্রসাধনের অনুশীলনলোভ, দ্বেষ ও মোহরূপী মানসিক ক্লেশ দূর করে চিত্তকে বিশুদ্ধ ও সংযমী করাই এর মূল উদ্দেশ্য। গৌতম বুদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য এই অনুশীলনগুলো ঐচ্ছিক হিসেবে অনুমোদন করেছিলেন। ] ] অনুশীলনের কিছু সীমিত উপাদানও পালন করেছেন, যেমন দিনে একবার আহার করা এবং মাটিতে ঘুমানো, যা আমেরিকান পরিবেশের বাস্তবতার সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়েছে।

এই আন্দোলনের মূল বার্তা হলো, "শান্তির সূচনা হয় অন্তর থেকে।" অংশগ্রহণকারীরা সামাজিক বিভাজন, সংঘাত ও দুর্ভোগের প্রতিক্রিয়া হিসেবে মননশীলতা , মৈত্রী ( মেত্তা ), আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং অহিংস আচরণের প্রচার করেন।

২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে উদ্বোধনী পদযাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রায় ১৫ থেকে ২৪ জন থেরাবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটি দল পায়ে হেঁটে প্রায় ২,৩০০ মাইল (৩,৭০১ কিমি) পথ অতিক্রম করেন। এই যাত্রাপথে তারা টেক্সাস , লুইজিয়ানা , মিসিসিপি , অ্যালাবামা , জর্জিয়া , সাউথ ক্যারোলাইনা , নর্থ ক্যারোলাইনা , ভার্জিনিয়া এবং মেরিল্যান্ড—এই নয়টি রাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসি অতিক্রম করেন।

২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে অংশগ্রহণকারীরা প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৩ মাইল (৩২ থেকে ৩৭ কিমি) গতি বজায় রেখেছিলেন। ১১০ দিনের এই যাত্রা ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ শেষ হয়, যখন সন্ন্যাসীরা মেরিল্যান্ডের অ্যানাপোলিস থেকে বাসে করে ফোর্ট ওয়ার্থের হুয়ং দাও বিপাসনা ভবন কেন্দ্রে ফিরে আসেন, যেখানে এই পদযাত্রাটি মূলত শুরু হয়েছিল।  ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ তাদের প্রত্যাবর্তনের পর একটি প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়।

এই পদযাত্রার এক কেন্দ্রীয় চরিত্র হলো আলোকা, একটি উদ্ধারকৃত কুকুর যার পালি ভাষায় নামের অর্থ ‘আলো’ । আলোকা ছিল একটি পথকুকুর, যার দেখা মেলে ২০২২ সালে ভারতে এক তীর্থযাত্রার সময় সন্ন্যাসীদের । সেই সময়ে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়া সত্ত্বেও, সে সন্ন্যাসীদের অনুসরণ করে এবং পরবর্তীতে তাকে দত্তক নেওয়া হয় । সে পুরো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে দলটির সঙ্গী হয় এবং আন্তর্জাতিক পর্বের জন্য তাকে শ্রীলঙ্কায় নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে সে পশু অধিকারের মাসকট এবং সার্বজনীন সহানুভূতির প্রতীক হয়ে ওঠে।



২০২৫ সালের ২৬শে অক্টোবর টেক্সাসের ফোর্ট ওয়ার্থে উদ্বোধনী পদযাত্রা শুরু হয়েছিল। প্রায় ১৫ থেকে ২৪ জন থেরাবাদ বৌদ্ধ ভিক্ষুদের একটি দল পায়ে হেঁটে প্রায় ২,৩০০ মাইল (৩,৭০১ কিমি) পথ অতিক্রম করেন। এই যাত্রাপথে তারা টেক্সাস , লুইজিয়ানা , মিসিসিপি , অ্যালাবামা , জর্জিয়া , সাউথ    ক্যারোলাইনা , নর্থ ক্যারোলাইনা , ভার্জিনিয়া এবং মেরিল্যান্ড—এই নয়টি রাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসি অতিক্রম করেন।

অংশগ্রহণকারীরা প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৩ মাইল (৩২ থেকে ৩৭ কিমি) গতি বজায় রেখেছিলেন। ১১০ দিনের এই যাত্রা ১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ শেষ হয়, যখন সন্ন্যাসীরা মেরিল্যান্ডের অ্যানাপোলিস থেকে বাসে করে ফোর্ট ওয়ার্থের হুয়ং দাও বিপাসনা ভবন কেন্দ্রে ফিরে আসেন, যেখানে এই পদযাত্রাটি মূলত শুরু হয়েছিল।  ১৪ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬-এ তাদের প্রত্যাবর্তনের পর একটি প্রত্যাবর্তন অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

যাত্রাপথে একজন অংশগ্রহণকারী সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে তাঁর একটি পা কেটে বাদ দিতে হয়। এই ঘটনাটি আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমর্থন ও জনদৃষ্টি আকর্ষণ করে, যা একদিকে যেমন দীর্ঘ এই যাত্রার শারীরিক কষ্টকে তুলে ধরে, তেমনই অন্যদিকে ‘শান্তির পথে পদযাত্রা’ দ্বারা প্রচারিত সহানুভূতি ও সহনশীলতার বৃহত্তর বার্তাকেও প্রকাশ করে।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ইজ়রায়েলের গাজ়া দখলের চেষ্টা, বাংলাদেশে অশান্তি কিংবা ভেনেজ়ুয়েলায় ঢুকে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে আমেরিকার অপহরণ— বিশ্ব জুড়ে যখন নানান অস্থিরতার বাতাবরণ, সে সময়ই ভিক্ষুদের সঙ্গে আলোকের শান্তিযাত্রা!

ওয়াক ফর পিস কেবল একটি ধর্মীয় যাত্রা নয়, এটি মানুষের সঙ্গে প্রকৃতি ও প্রাণীর সম্পর্কেরও এক প্রতীক। আলোকা প্রমাণ করেছে, শান্তির ভাষা বোঝার জন্য শব্দের প্রয়োজন নেই। সহানুভূতি, বিশ্বস্ততা আর ভালোবাসা এই অনুভূতিগুলোই তাকে ভিক্ষুদের সঙ্গে এক নীবির সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে।

এই :ওয়াক ফর পিস :কী ??

ওয়াক ফর পিস বা শান্তি পদযাত্রা কোনো একদিনের কর্মসূচি নয়। এটি একটি দীর্ঘ আন্দোলন। ভিক্ষুদের মতে, শান্তি কোনো স্লোগান নয়, এটি একটি চর্চা। আর সেই চর্চা শুরু হয় নিজের শরীর দিয়ে, নিজের গতির মধ্য দিয়ে। তাই তাঁরা হাঁটেন খালি পায়ে। হাতে কোনো ব্যানার থাকে না, মুখে কোনো দাবি থাকে না। তাঁদের হাঁটার ভঙ্গি, ধৈর্য, নীরবতা—সব মিলিয়েই হয়ে ওঠে বার্তা। মানুষ রাস্তার ধারে থেমে দেখে, ভাবতে শুরু করে। একদল বৌদ্ধ ভিক্ষু নিয়মিত এই ধরনের পদযাত্রা করেন বিশ্বের নানা প্রান্তে।

আলোক কোনো প্রশিক্ষিত পোষা কুকুর নয়। বাংলাদেশ কিংবা পশ্চিমবাংলার রাস্তায় রাস্তায় এমন চেহারার অসংখ্য কুকুরকে ঘুরতে দেখা যায়। সে জন্মেছিল কলকাতার রাস্তায়।   আর দশটা দেশি কুকুরদের মতোই তার জীবন শুরু হয়েছিল অনিশ্চয়তায়। কোনো মালিক কিংবা নির্দিষ্ট আশ্রয় ছিল না। কখনো ফুটপাতে, কখনো গলির ধারে, কখনো কোনো দোকানের শাটারের নিচে তার রাত কাটত। খাবার জুটত কখনো মানুষের দয়া থেকে, কখনো উচ্ছিষ্ট থেকে। টিকে থাকাই ছিল প্রতিদিনের একমাত্র কাজ। এখন যুক্তরাষ্ট্রের পথে হেঁটে চলেছিল কলকাতার ‘পথের কুকুর’ আলোক। এখন সবাই তাকে চেনে ‘দ্য পিস ডগ’ নামে।আর এখন " ওয়াক ফর পিস  বা ‘শান্তি পদযাত্রা’র অংশ গ্রহন করে হয়ে উঠেছে ১৯ বৌদ্ধ ভিক্ষুর সর্বক্ষণের সঙ্গী । 




এই যাত্রাপথেই আলোক হয়ে উঠেছে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তার নিজের ইনস্টাগ্রাম আছে। ফেসবুকে লাইভ ট্র্যাকার দিয়ে যাত্রার আপডেট দেওয়া হচ্ছিল। ধীরে ধীরে সে হয়ে উঠেছিল এই শান্তিযাত্রার সবচেয়ে চেনা মুখ। রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে অনেকে থেমে ছবি তুলছেন, কেউ কেউ সেলফিও নিচ্ছেন। সেই সব ছবি আর ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

কয়েক মাস আগে কলকাতায় ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুর একটি দল শান্তি পদযাত্রার অংশ হিসেবে এসেছিলেন। তাঁরা তখন ভারতে ১১২ দিনের এক পদযাত্রায় বেরিয়েছেন। অচেনা পোশাক বা চেহারার ১৯ জন বৌদ্ধ ভিক্ষুকে একসঙ্গে দেখে হয়ত কৌতূহলী হয়ে পড়েছিল আলোক। প্রথমে সেই কৌতূহলের বশেই তাঁদের সঙ্গে হাঁটা শুরু করে।

দিনের পর দিন ভিক্ষুরা হাঁটছেন, আর আলোক তাঁদের পাশেই আছে। তাঁরা যেখানে থামেন, সেখানেই সে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। ভিক্ষুরা ভোরে ঘুম থেকে উঠে হাঁটা শুরু করলে, আলোকও উঠে দাঁড়ায়। কেউ তাকে বেঁধে রাখেনি, কেউ বাধ্য করেনি। তবু সে যায়নি। ধীরে ধীরে সে আর ‘পথে পাওয়া এক কুকুর’ থাকে না। সে হয়ে ওঠে যাত্রারই অংশ।


শান্তি ও করুণার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতীক হয়ে ওঠা ভারতীয় উদ্ধারকৃত কুকুর অলোকা, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও শান্তি কর্মীদের একটি আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সফরকালে  নয়াদিল্লিতে প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও পশু অধিকার কর্মী মানেকা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে।

গান্ধীর জোরবাগ বাসভবনে আয়োজিত এই সমাবেশে বৌদ্ধ ভিক্ষু, শান্তিযাত্রী এবং পশু কল্যাণ সমর্থকরা একত্রিত হয়েছিলেন, যাঁরা একটি সাধারণ পাড়ার কুকুর থেকে অহিংসা ও সহাবস্থানের বিশ্বব্যাপী দূত হয়ে ওঠার অলোকার যাত্রাপথ তুলে ধরেন।

এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে গান্ধী বলেন, অলোকার গল্পটি ভারতের পথকুকুরদের মধ্যে প্রায়শই দেখা যায় এমন গুণাবলী তুলে ধরে এবং তিনি এইসব সম্প্রদায়ের পশুদের প্রতি আরও বেশি সহানুভূতি দেখানোর আহ্বান জানান।

"বিশ্ব , আলোকার মধ্যে যা দেখে, মানুষ যদি প্রতিটি পাড়ার কুকুরের মধ্যে তার সামান্য অংশও দেখতে পেত, তাহলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ভিন্ন হতো। আলোকা ভারতের পথকুকুরদের সেরা গুণাবলীর মূর্ত প্রতীক...... আনুগত্য, সাহস, সহনশীলতা, শান্তি এবং নিঃশর্ত ভালোবাসা," তিনি বলেন।

প্রতিনিধিদলের সদস্যদের মতে, আলোকার জন্ম হয়েছিল ওড়িশ্যায় এবং তাঁদের সাথে হাঁটবার সময়  মাঝে মাঝে অসুস্থতা ও আঘাতসহ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও, সে দলটির সঙ্গেই ছিল এবং অবশেষে ভিক্ষুরা তাকে দত্তক নেন ও তার নাম রাখেন "আলোকা", যার অর্থ "আলো" বা "আলোক"।

মেনকা গান্ধী সহ ঐ দলের সকলেই আশা প্রকাশ করেন যে, আলোকার ভারত সফর গৃহপালিত পশুদের প্রতি আরও বেশি সহানুভূতি জাগিয়ে তুলবে ।

সহনাভূতি, অহিংসা এবং প্রাণীদের প্রতি মানবিক আচরণ প্রসারে একটি অঙ্গীকারও নেওয়া হয় সেই  সভাতে। 


:<সংগৃহীত>:



Sunday, 28 December 2025

বরানগরের সতীদাহ ঘাট

 


" বরাহনগর " বা যাকে আমরা চলতি কথায় " বরানগর" বলে থাকি, সেটি হলো উত্তর কলকাতার এক প্রাচীন জনপদ। বিভিন্ন কারনে এই অঞ্চল বাংলার ইতিহাসের এক বিরাট জায়গা দখল করে রেখেছে। তবে প্রাচীন এই শহরের এরকম নামকরণ হবার কারন কি ছিল  ?? সঠিক কারণ জানা না থাকলেও মনে করা হয়.......(১) গঙ্গার ধারে এই গ্রামে সেইসময় প্রচুর শুয়োরের উৎপাত ছিল বলে এর নাম হয়েছিল  "বরাহনগর "। আবার কেউ কেউ বলেন.....(২) "বরাহ" নামে এক সিদ্ধ মুনি এই অঞ্চলে বাস করতেন বলে এর নাম এইরকম হয়েছিল।  কারও মতে আবার....(৩) "বরহা" শব্দের মানে হ'ল ময়ূরের লেজ। তিন চারশ বছর আগে এখানে ময়ূর আর ময়ূরপুচ্ছের বাজার ছিল।  হয়তো এইজন্য এই অঞ্চলের নাম ছিল বরাহনগর। আবার অনেকে বলে থাকেন..... (৪) বিক্রমাদিত্যের রাজসভার নবরত্নের  অন্যতম রত্ন বরামিহিরের নাম থেকেই নাকি এসেছে " বরাহনগর " বা " বরানগর "। তবে এ কথার সত্যতা কতখনি  সে বিষয়ে সন্দেহ আছে।    আর এই অঞ্চলের সাথে মিল রেখে পাশের গ্রামটিকে চিড়িয়ামোড় বলে ডাকা হ'ত। তবে যাই হোক এই জনপদ পশ্চিমবাংলার মানচিত্রে চব্বিশ পরগনার  (উত্তর) জেলার এক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে  পরিচিত।  


এই বরানগরের ইতিহাস মোটামুটি পাঁচশ বছরের পুরানো। বরানগর ছিল ওলন্দাজ বা ডাচেদের ঘাটি। তারা এখানে প্রথম কুঠি স্থাপন করেন।  এরপর পর্তুগীজরাও এখানে কুঠি স্থাপন করে । এই সব কারনে এখানে তৈরি হয়েছিল কুঠিঘাট। এরপর রাজত্ব করেছিল ব্রিটিশরা। সেইসময় এই কুঠিঘাট রোডের দুধারে তুলোর গুদাম ছিল।  আর সমস্ত অঞ্চল ছিল  গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।  এই জঙ্গলের ভিতর থেকেই মাঝে মধ্যেই শোনা যেত মর্মভেদি / গগনভেদি  কোনো নারীর কন্ঠস্বর, চিৎকার। আর তার সাথে শোনা যেত কাঁসর,  ঘন্টা, ঢাক, ঢোলের এক প্রবল আওয়াজ। আশেপাশের লোকেরা বুঝতে পারতেন গঙ্গার পারের থেকেই এই আওয়াজ আসছে।  এবং এটা কিসের আওয়াজ তা তারা সহজেই বুঝতে পারতেন। এ ছিল মৃত স্বামীর সাথে সহমরনের পৌশাচিক কালো সতীদাহ প্রথার বয়স্কা বা কিশোরী বধূর আর্তনাদ। এই হ'ল সেই " সতীদাহ ঘাট " যেখানে সেই সময়ের সামাজিক কুপ্রথার ক্রিয়াকর্ম চলতো। বর্তমান ঠিকানা ১১৮ নং মথুরানাথ চৌধুরী ষ্ট্রীট, কুঠিঘাট বাজার,  বরানগর,  কলিকাতা - ৩৬। 




কথিত আছে বরানগরের প্রসিদ্ধ তুলো ব্যবসায়ী দত্তরাম চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ীতে এক রাতে ডাকাত পরে। নগদ টাকা ছাড়া দামি দামি জিনিস ডাকাতি করে ডাকাতরা পালানোর সময় দত্তরাম বাধা দিলে ডাকাতরা তাকে একাধিক বার রামদা দিয়ে আঘাত করে এবং তাতে তিনি মারা যান।  এবং সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী তার স্ত্রী তাঁর সাথে সহমরনে গিয়ে সতী হন। এই ঘাটই ছিল  সতীদাহ ঘাট এবং এটাই ছিল ঐ ঘাটে শেষ সতীদাহ। 


তখনকার সমাজে এই অন্ধকারময় অধ্যায়ে সহমরন ছিল স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্য ও ভক্তির প্রতীক। সহমরনে গেলে বিধবা স্বর্গে আরোহন করবে---- এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল।  রাজা রামমোহন রায় ভারতের এই অন্ধকার অধ্যায়ের সমাপ্তির জন্য তীব্র আলোরণ সৃষ্টি করেন এবং সহমরন রদের জন্য চারিদিকে আন্দোলন জোরদার করেন। এই প্রথাকে আইনের সাহায্যে নিষিদ্ধ করবার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের কাছে আবেদন করেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেন। রাজা রামমোহন রায়ের সেই প্রতিবাদ ভারতবর্ষের মানুষের কাছে এক বিরাট অবদান । খুব সহজ কথায় বলা যেতে পারে তাঁর এই অবদানই ভারতবর্ষের নারীমুক্তি বা নারীশিক্ষার পথ মসৃণ করেছে। 




এটি এখন একটি পর্যটন কেন্দ্র বলা যেতে পারে। চারিদিকে ঘর বাড়ী হয়ে যাওয়ার ফলে গঙ্গার পাড়ের এই জায়গার এক সামান্য অংশ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তেমন কেউ আসে না। আর এর ফলে এই স্থানের ঐতিহাসিক  গুরুত্ব/ সম্বন্ধে কেই-ই বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল নয়। পর্যটকদের জন্য সুন্দর বসার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে বসে আপনি গঙ্গার সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন আর তার সাথে অতীতের ঘটনাগুলি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে সেই  বর্বরতাময় অন্ধকার যুগের কথা। এখানে রয়েছে রাজা রামমোহন রায়ের আবক্ষ মূর্তি যা কিনা এক সংস্কারের প্রতীক বা পরিবর্তনের প্রতীক।  আপনিও একদিন চলে আসুন। বি টি রোডের সিঁথির মোড় স্টপেজে নেমে কুঠিঘাটের অটো ধরুন। আপনাকে নামিয়ে দেবে গঙ্গার ঘাটে।  একটু হেটে এসে  এই  নিরালায় বসে থাকতে থাকতে হয়তো আপনিও শুনতে পেতে পারেন বাতাসে ভেসে আসা রাজা রামমোহন রায়ের সেই প্রতিবাদের আওয়াজ। 

( সংগৃহীত  )

Sunday, 6 July 2025

গুরু ও গুরুপূর্নিমা

 


আষাঢ় মাসের পূর্ণিমা তিথিকে গুরু পূর্ণিমা বলে চিহ্নিত করা হয়। এদিন মহর্ষি বেদ ব্যাসের জন্মবার্ষিকীর দিন হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতের হিন্দু ঐতিহ্যে মহর্ষি বেদব্যাসের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এদিন বেদব্যাসকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানোর জন্যই গুরু পূর্ণিমাকে এতো তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে পালন করা হয়।হিন্দু বিশ্বাস মতে, এই তিথিতে মুণি পরাশর ও মাতা সত্যবতীর ঘরে মহাভারতের রচয়িতা মহর্ষি বেদব্যাস জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আর এই দিনটিকে বিশেষ মর্যাদা দিতেই ব্যাস পূর্ণিমাও বলা হয়।

হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, মহাদেব হলেন আদি গুরু। তাঁর প্রথম শিষ্য ছিলেন সপ্তর্ষির সাত ঋষি- অত্রি, বশিষ্ঠ, পুলহ, অঙ্গীরা, পুলস্থ্য, মরীচি, কেতু। আদিযোগী শিব এই তিথিতে আদিগুরু রুপে রূপান্তরিত হন। তিনিই এই সাতঋষিকে মহাজ্ঞান প্রদান করেন । তাই এই তিথি হল গুরুপূর্ণিমা। শুধু হিন্দু ধর্মেই গুরুপূর্ণিমার মাহাত্ম্য  রয়েছে তা নয়, বৌদ্ধ ধর্মেও গুরুপূর্ণিমার গুরুত্ব রয়েছে। জানা যায়, বোধিজ্ঞান লাভের পরে আষাঢ় মাসের পূর্ণিমায় সারনাথে প্রথম উপদেশ দেন গৌতম বুদ্ধ। আর সেই সময় থেকেই গুরুর স্থানে বিরাজ করছেন বুদ্ধ। ভারতের অনেক জায়গায় গুরু পূর্ণিমার দিনে মহাঋষি বেদব্যাসের জন্মতিথি হিসেবে পালন করা হয়। ঋষি পরাশর ও মত্স্যগন্ধা সত্বতীর সন্তান ছিলেন বেদব্যাস। পরবর্তীকালে  তিনিই মহাঋষিতে পরিণত হন। তিনি চতুর্বেদের সম্পাদনা ও পরিমার্জনা করেন। ১৮টি পুরাণ ছাড়াও রচনা করেন মহাভারত ও শ্রীমদ্ভগবত।

ভারত হল ঋষি-মুনিদের দেশ, যেখানে তাঁদের ঈশ্বরতুল্য বলে মনে করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে, ভক্তদের প্রতি ভগবান রুষ্ট হলে গুরুই রক্ষার পথ দেখাতে পারেন। প্রাচীনকাল থেকেই এই দেশে গুরুদের সম্মানজনক স্থান দেওয়া হয়েছে। গুরুর দেখানো পথে চললে, কোনও ব্যক্তি শান্তি, আনন্দ ও মোক্ষ প্রাপ্ত করতে পারেন। তাই গুরুকে শ্রদ্ধা জানাতে বৈদিক যুগ থেকেই গুরু পূর্ণিমা পালিত হয়ে আসছে। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই পূর্ণিমায় গুরুর পূজার্চনা করলে অক্ষয় আশীর্বাদ মেলে।

হিন্দু ও বৌদ্ধদের পাশাপাশি জৈনদের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। ২৪ তম তীর্থঙ্কর মহাবীর প্রথম ও প্রদান শিষ্য হিসেবে গৌতম স্বামীকে বেছে নেন। শিক্ষা ও নির্দেশনার প্রকাশকে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাতে  গুরু পূর্ণিমা পালন করা হয়।

গুরু (সংস্কৃত: गुरु) হলেন নির্দিষ্ট জ্ঞান বা ক্ষেত্রের জন্য "পরামর্শদাতা, প্রদর্শক, বিশেষজ্ঞ বা শিক্ষক"। সর্ব-ভারতীয় ঐতিহ্যে, গুরু শিক্ষকের চেয়েও বেশি শ্রদ্ধেয়: তিনি শিষ্য বা ছাত্রের "শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিত্ব, পরামর্শদাতা, জীবনের আদর্শ, অনুপ্রেরণার উৎস, এবং আধ্যাত্মিক বিবর্তনে সাহায্যকারী"।


*শুভ গুরু পূর্ণিমার আদি কথা*


পরাশর মুনি এবং সত্যবতীর পুত্র যমুনা নদীর এক দ্বীপে জন্মগ্রহণ করলেন। দ্বীপে জন্ম, তাই সেই পুত্র দ্বৈপায়ন নামে পরিচিত হলেন।

তাঁর গায়ের রং কালো। তাই তাঁর পুরো নাম হলো কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন।

কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন তাঁর মার কাছ থেকে তপস্যা যাত্রার অনুমতি নিলেন।

বদরিকাশ্রমে তিনি কঠোর তপস্যায় নিমগ্ন হলেন। তপস্যা বলে তিনি মহর্ষি বৈশিষ্ট্য লাভ করলেন। বদরিকাশ্রমে তপস্যার কারণে তিনি বাদরায়ণ নামেও পরিচিত হন।

মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন মহাসমুদ্র সমান অসীম বেদকে চার ভাগে ভাগ করে সুশৃংখলভাবে লিপিবদ্ধ করলেন।

তাই তিনি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস বা বেদ ব্যাস নামে পরিচিত হলেন। 'ব্যাস' শব্দের অর্থ সংকলক বা ব্যবস্থাকারী। সমগ্র বেদকে চারভাগে বিভক্ত করে লিপিবদ্ধ করার জন্য তিনি এই নামে পরিচিত হলেন।

তিনি মহাভারত, অষ্টাদশ পুরাণ, ব্রহ্মসূত্র রচনা করলেন।

মহর্ষি বেদব্যাসের জন্মদিন সারা ভারতবর্ষে গুরু পূর্ণিমা হিসেবে পালিত হয়।

গুরু শব্দটা 'গু' এবং 'রু'-  এই দুটো শব্দাংশের যোগে তৈরি হয়। 'গু' মানে হল যে অজ্ঞানের অন্ধকারে জগৎ নিমজ্জিত থাকে। আর 'রু' মানে হল সেই অন্ধকার থেকে বের হওয়ার জন্য যে আলোকের প্রয়োজন হয়। সুতরাং যিনি অজ্ঞানের অন্ধকার  থেকে মহান জ্ঞানের মাধ্যমে মুক্তির আলো দেখান তিনি হলেন গুরু।

বেদ ব্যাস তাঁর সব রচনার মাধ্যমে যা বলেছেন তা সমগ্র জগতকে জ্ঞানের আলো দেখিয়েছে। এবং সেটা চিরকালীন- আজকের দিনেও সমান ভাবে প্রযোজ্য।

এর কিছু উদাহরণ হলো-

বৃহৎ মানে জগতের মঙ্গলের জন্য যে কাজই করা হোক না কেন সেটা পুণ্য।

অন্যের প্রতি অত্যাচার,নিপীড়ন এগুলো হল পাপ।

কাউকে ভালো কর্মফল থেকে বঞ্চিত করার অধিকার স্বয়ং দেবতারও নেই।আবার কেউ যত শক্তিশালী বা জ্ঞানী হোক না কেন খারাপ কর্মের ফল তাকে ভোগ করতেই হবে।

সমগ্র জগতকে অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে নিয়ে আসার জন্য মহর্ষি কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস বা বেদব্যাস হলেন আদি গুরু এবং তার জন্মদিন হল ভারতবর্ষে গুরু পূর্ণিমা।

"অখণ্ড মণ্ডলা কারং ব্যাপ্তং যেন চরাচরম।

তদপদং দর্শিতং যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।।

অজ্ঞান তিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া।

চক্ষুরুন্মিলিত যেন তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।।

গুরু ব্রহ্মা গুরু বিষ্ণু গুরুদেব মহেশ্বর।

গুরু রেব পরং ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রী গুরুবে নমঃ।।"

গুরু কে?

— যিনি অন্ধকার থেকে আলোয় আনয়ন করেন, তিনিই গুরু। 

গুরুর কৃপায় জন্ম-জন্মান্তরের অন্ধকার বা অজ্ঞান দূর হয়ে হৃদয়কন্দর জ্ঞানের আলোয় আলোকিত হয়।

প্রাচীন ঋষিরা এই ভাবেই আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ করেছিলেন। যিনি এই ভাবে আত্মজ্ঞানের আলোক সম্পাত করতে পারেন তিনি কখনোই সাধারণ জীব হ'তে পারেন না, তিনি শিব। তাই এই জ্ঞানও মনুষ্যরচিত নয়, তা 'অপৌরুষেয়'।

এই জ্ঞানই 'আত্মতত্ত্ব', এই জ্ঞানই প্রাচীন আর্য-ভারতের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য।


                  🙏 **শ্রী গুরু প্রণাম**🙏

ওম অজ্ঞান-তিমিরন্ধস্য জ্ঞানানঞ্জনা-শলাকায়

চক্ষুর অমিলিতম্ য়েনা তসমই শ্রী-গুরাভে নমঃ

আমি আমার আধ্যাত্মিক গুরুকে আমার শ্রদ্ধার সাথে প্রণাম জানাই, যিনি আমার চোখ খুলে দিয়েছেন, যা অজ্ঞতার অন্ধকারে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল, জ্ঞানের মশালের আলোয আলোকিত হউক। 

🪷 *গুরু বন্দনা*🪷


*ভব-সাগর-তারণ-কারণ হে, রবি-নন্দন-বন্ধন-খণ্ডন হে,*

 *শরণাগত কিঙ্কর ভীত মনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।*

হৃদিকন্দর-তামস-ভাস্কর হে, তুমি বিষ্ণু প্রজাপতি শঙ্কর হে, 

পরব্রহ্ম পরাৎপর বেদ ভণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।

মন-বারণ-শাসন-অঙ্কুশ হে, নরত্রাণ তরে হরি চাক্ষুষ হে, 

গুণগান-পরায়ণ দেবগণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।

কুলকুণ্ডলিনী-ঘুম-ভঞ্জক হে, হৃদি-গ্রন্থি-বিদারণ-কারক হে, 

মম মানস চঞ্চল রাত্রদিনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।


রিপু-সূদন-মঙ্গল-নায়ক হে, সুখ-শান্তি-বরাভয়-দায়ক হে,

 ত্রয়তাপ হরে তব নাম গুণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।


অভিমান-প্রভাব-বিমর্দ্দক হে, গতিহীন জনে তুমি রক্ষক হে,

 চিত-শঙ্কিত-বঞ্চিত-ভক্তিধনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।


তব নাম সদা শুভ-সাধক হে, পতিতাধম-মানব-পাবক হে, 

মহিমা তব গোচর শুদ্ধ মনে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।


জয় সদ্‌গুরু ঈশ্বর-প্রাপক হে, ভব-রোগ-বিকার-বিনাশক হে, 

মন যেন রহে তব শ্রীচরণে, গুরুদেব দয়া কর দীনজনে।।


রচনা - দেবেন্দ্রনাথ মজুমদার 

➖➖➖➖♠︎♠︎♠︎♠︎■■■■☆☆☆☆♥︎♥︎♥︎♥︎¤¿


গুরু কেমন হবেন ???

এ বিষয়ে  স্বামীজি শিক্ষা দেন :

*"...গুরুর মন এরূপ প্রবল আধ্যাত্মিক স্পন্দনবিশিষ্ট হওয়া চাই যে, তাহা যেন সমবেদনাবশে শিষ্যে সঞ্চারিত হইয়া যায়।* 

*গুরুর বাস্তবিক কার্যই এই : কিছু সঞ্চার করা, কেবল শিষ্যের বুদ্ধিশক্তি বা অন্য কোন শক্তি উত্তেজিত করিয়া দেওয়া নয়।* 

*বেশ স্পষ্ট বুঝিতে পারা যায়, গুরু হইতে শিষ্যে যথার্থই একটি শক্তি আসিতেছে।..."* 

ভগবান শঙ্করই আদিগুরু। আজকের পবিত্র তিথিতে তিনি তাঁর দক্ষিণামূর্তিতে পরম আধ্যাত্মিক সনাতন জ্ঞানভান্ডার উন্মুক্ত করেন। 

তাই তাঁর স্মরণেই আজ গুরুপূর্ণিমা।


এই মূর্তিতে দেখা যাচ্ছে, ভগবান রুদ্র পদদলিত করেছেন অজ্ঞানকে এবং চারজন ঋষি লাভ করছেন পরম সত্য সনাতন জ্ঞান। এই শাশ্বত জ্ঞানই ভারতীয় আধ্যাত্মিক দর্শন, আমাদের জাতীয় পরম্পরা।

- সেই রুদ্র আমাদেরকে সনাতন জ্ঞান প্রদান করুন।

সেই আদিগুরু, যাঁর স্মরণে এই গুরুপূর্ণিমা, দক্ষিণামূর্তিধারী সেই শঙ্কর মহেশ্বর শিবের প্রতি আদি শঙ্করাচার্য স্তব করে সকলে।

*_গুরু প্রসঙ্গে ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের শিক্ষা, কিছু উদ্ধৃতি :_*

🌼🌼🌼

প্রতিবেশী -- 'গুরুর উপদেশ বললেন। গুরু কেমন করে পাব?"

শ্রীরামকৃষ্ণ -- *"যে-সে লোক গুরু হতে পারে না। বাহাদুরী কাঠ নিজেও ভেসে চলে যায়, অনেক জীবজন্তুও চড়ে যেতে পারে। হাবাতে কাঠের উপর চড়লে, কাঠও ডুবে যায়, যে চড়ে সেও ডুবে যায়। তাই ঈশ্বর যুগে যুগে লোকশিক্ষার জন্য নিজে গুরুরূপে অবতীর্ণ হন। সচ্চিদানন্দই গুরু।*


🌼🌼🌼

 

শ্রীরামকৃষ্ণ -- *"মানুষের কী সাধ্য অপরকে সংসারবন্ধন থেকে মুক্ত করে?* 

*যাঁর এই ভুবনমোহিনী মায়া, তিনিই সেই মায়া থেকে মুক্ত করতে পারেন। সচ্চিদানন্দগুরু বই আর গতি নাই।*

*যারা ঈশ্বরলাভ করে নাই, তাঁর আদেশ পায় নাই, যারা ঈশ্বরের শক্তিতে শক্তিমান হয় নাই, তাদের কী সাধ্য জীবের ভববন্ধন মোচন করে?*

*আমি একদিন পঞ্চবটীর কাছ দিয়ে ঝাউতলায় বাহ্যে যাচ্ছিলাম। শুনতে পেলুম যে, একটা কোলা ব্যাঙ খুব ডাকছে। বোধ হল সাপে ধরেছে। অনেকক্ষণ পরে যখন ফিরে আসছি, তখনও দেখি, ব্যাঙটা খুব ডাকছে।* 

*একবার উঁকি মেরে দেখলুম কী হয়েছে। দেখি, একটা ঢোঁড়ায় ব্যাঙটাকে ধরেছে -- ছাড়তেও পাচ্ছে না -- গিলতেও পাচ্ছে না -- ব্যাঙটার যন্ত্রণা ঘুচছে না।*

*তখন ভাবলাম, ওরে! যদি জাতসাপে ধরত, তিন ডাকের পর ব্যাঙটা চুপ হয়ে যেত। এ-একটা ঢোঁড়ায় ধরেছে কি না, তাই সাপটারও যন্ত্রণা, ব্যাঙটারও যন্ত্রণা!*

*যদি সদ্‌গুরু হয়, জীবের অহংকার তিন ডাকে ঘুচে। গুরু কাঁচা হলে গুরুরও যন্ত্রণা, শিষ্যেরও যন্ত্রণা! শিষ্যেরও অহংকার আর ঘুচে না, সংসারবন্ধন আর কাটে না।* 

*কাঁচা গুরুর পাল্লায় পড়লে শিষ্য মুক্ত হয় না।”*


🌼🌼🌼


শ্রীরামকৃষ্ণ -- *"ব্যাকুল হয়ে তাঁকে ডাকতে হয়। গুরুর মুখে শুনে নিতে হয় -- কী করলে তাঁকে পাওয়া যায়।*

*গুরু নিজে পূর্ণজ্ঞানী হলে তবে পথ দেখিয়ে দিতে পারে।*

*পূর্ণজ্ঞান হলে বাসনা যায়, পাঁচ বছরের বালকের স্বভাব হয়। দত্তাত্রেয় আর জড়ভরত -- এদের বালকের স্বভাব হয়েছিল।”*

*"মানুষ গুরু হ'তে পারে না। ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সব হচ্ছে। মহাপাতক, অনেকদিনের পাতক, অনেকদিনের অজ্ঞান, তাঁর কৃপা হলে একক্ষণে পালিয়ে যায়।*

*হাজার বছরের অন্ধকার ঘরের ভিতর যদি হঠাৎ আলো আসে, তাহলে সেই হাজার বছরের অন্ধকার কি একটু একটু করে যায়, না একক্ষণে যায়? অবশ্য আলো দেখালেই সমস্ত অন্ধকার পালিয়ে যায়।*

*"যাদের একটু সিদ্ধাই থাকে তাদের প্রতিষ্ঠা, লোকমান্য এই সব হয়। অনেকের ইচ্ছা হয় গুরুগিরি করি -- পাঁচজনে গণে মানে -- শিষ্য-সেবক হয়; লোকে বলবে, গুরুচরণের ভাইয়ের আজকাল বেশ সময় -- কত লোক আসছে যাচ্ছে -- শিষ্য-সেবক অনেক হয়েছে -- ঘরে জিনিসপত্র থইথই করছে! -- কত জিনিস কত লোক এনে দিচ্ছে -- সে যদি মনে করে -- তার এমন শক্তি হয়েছে যে, কত লোককে খাওয়াতে পারে।*

*গুরুগিরি বেশ্যাগিরির মতো। -- ছার টাকা-কড়ি, লোকমান্য হওয়া, শরীরের সেবা, এই সবের জন্য আপনাকে বিক্রি করা। যে শরীর মন আত্মার দ্বারা ঈশ্বরকে লাভ করা যায়, সেই শরীর মন আত্মাকে সামান্য জিনিসের জন্য এরূপ করে রাখা ভাল নয়।”*

🌼🌼🌼

*"গুরুগিরি করা ভাল নয়। ঈশ্বরের আদেশ না পেলে আচার্য হওয়া যায় না। যে নিজে বলে, ‘আমি গুরু’ সে হীনবুদ্ধি। দাঁড়িপাল্লা দেখ নাই? হালকা দিকটা উঁচু হয়, যে ব্যক্তি নিজে উঁচু হয়, সে হালকা। সকলেই গুরু হতে যায়! -- শিষ্য পাওয়া যায় না!”*


_গুরু কে?_


*দীক্ষা প্রদান করেন একজন আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন ব্যক্তি।* 

*একটি প্রদীপ থেকে আরেকটি প্রদীপ জ্বালানোর মতো একটি উন্নত আত্মা (গুরু) থেকে অপর এক অপেক্ষাকৃত অনুন্নত আত্মায় (শিষ্য) আধ্যাত্মিক শক্তির সঞ্চারই দীক্ষা।* 

*বিশেষ আধ্যাত্মিক ক্ষমতাশালী ব্যক্তি  দীক্ষা প্রদান করতে পারেন। কোনও প্রতিষ্ঠান কখনও  দীক্ষা দিতে পারে না। এমনকি যে কোনও সাধক কিন্তু গুরু হ'তে পারেন না।* 

*ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ দুইরকম কাঠের উপমা দিতেন :* *একরকম কাঠ হ'ল 'হাভাতে কাঠ'। এরা নিজেরা জলে ভাসতে পারে কিন্তু উপরে একটা পাখী এসে বসলে টুপ করে ডুবে যায়। অর্থাৎ এরা অপরের ভার নিতে অক্ষম।*  

*আবার আর একরকমের কাঠকে ঠাকুর বলতেন 'বাহাদুরী কাঠ'। এরা নিজেরাও জলে ভেসে থাকতে পারে আবার এদের উপরে হাতি এসে বসলেও ডোবে না।*

*সাধারণ আধ্যাত্মিক সাধক যেন এই 'হাভাতে কাঠ'। এঁরা নিজের নিজের সাধন পথে অগ্রসর হ'তে সক্ষম হ'লেও অন্যকে নিয়ে যেতে পারেন না।*

*আর 'বাহাদুরী কাঠ' হ'ল সেই বিশেষ শক্তিসম্পন্ন সাধক, যাঁরা অন্যের ভার বহন করতে সক্ষম। এঁরাই গুরু।*

*'গুরু' কোনও বিশেষ 'পদমর্যাদা' নয়। 'গুরু' একটি বিশেষ আধ্যাত্মিক শক্তিস্তর। তাই গুরুর যোগ্যতা কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক পদমর্যাদা দ্বারা নির্ধারিত হ'তে পারে না।* *আবার কোনও সাধক কোনও শিষ্যের গুরু হওয়ার যোগ্য হ'লেও অন্য কারও ক্ষেত্রে হয়তো তিনি গুরু হবার যোগ্য নন এমনও হ'তে পারে।* 

*আধ্যাত্মিক  সাধকদের অনেকের জীবনকথায় পাওয়া যায় যে কোনও গুরুর কাছে দীক্ষা গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে তিনি হয়তো বলছেন যে, 'আমি তোমার গুরু নই,  তোমার গুরু অন্য কেউ।'*

*প্রকৃত দীক্ষার জন্য তাই গুরুকরণের আগে গুরুকে যাচাই করে নেওয়া উচিৎ।* *ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন,*

*'সাধুকে দিনে দেখবি রাতে দেখবি।'* *দেখে-শুনে যাচাই করে তবে গ্রহণ করার কথা বলতেন তিনি।*

*এই 'দেখা শোনা'-টি ঠিক কেমন তার কিছুটা পরিচয় স্বামী বিবেকানন্দজীর জীবনীতেও পাওয়া যায়।*

*তিনি ঠাকুরকে গুরুরূপে গ্রহণের আগে যথাসাধ্য পরীক্ষা করেছিলেন।*

*তাই কাউকে গুরু রূপে গ্রহণের আগে তাঁর সঙ্গ করা উচিত,  তাঁকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত। দেখতে হয় তাঁর 'মন-মুখ' এক কিনা। অর্থাৎ যে আদর্শের কথা তিনি মুখে বলছেন সেটা তাঁর জীবনের ছোট ছোট ঘটনাগুলিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা।*

*দ্বিতীয়তঃ দেখতে হয় তিনি তত্ত্বের আক্ষরিক ব্যাখ্যার গভীরে মর্মার্থ গ্রহণে সমর্থ কিনা। স্বামীজি বলতেন, 'গুরু হবেন তত্ত্বসমূহের মর্মদর্শী।'*

*আবার উপরের দুটি শর্ত ঠিকঠাক থাকলেও তিনি আমার পক্ষে উপযুক্ত হবেন এমন নাও হতে পারে।*

*তাই তৃতীয়তঃ দেখতে হবে তিনি আমার অন্তর পড়তে পারছেন কিনা।*

*স্বামী বিবেকানন্দজিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, 'গুরু কাকে করতে পারা যায়?'*

*স্বামীজি উত্তর দিলেন, 'যিনি তোমার ভূত ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারেন তিনিই গুরু।* *দেখনা, আমার গুরু (শ্রীরামকৃষ্ণ) আমার ভূত ভবিষ্যৎ বলে দিয়েছিলেন।*

*স্বামীজি একজনকে দীক্ষা দেবার কালে প্রশ্ন করছেন, 'কোন দেবতা তোর ভাল লাগে?*

*শিষ্য একটি উত্তর দিলে স্বামীজি বললেন,*

 *'তা নয়,  গুরু জানতে পারেন কার কী পথ।'*

*বলে স্বামীজি ওই শিষ্যের হস্তস্পর্শ করে গভীর ভাবে ধ্যানস্থ হলেন।* *তারপর ধ্যানোত্থিত হয়ে হাত ছেড়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করছেন, 'তুই কি কখনও ঘট-স্থাপন করে পুজো করেছিস?'*

*শিষ্যের তখন মনে পড়ল ছেলেবেলায় তিনি একবার ঘট-স্থাপন করে পূজা করেছিলেন। তিনি নিজেই বোধহয় ভুলে গেছিলেন সে কথা।*

অঁ*তখন স্বামীজি বললেন, 'এই দেবতার মন্ত্র তোর উপযুক্ত।'*

*বলে মহাবীজমন্ত্র শিষ্যের কানে উচ্চারণ করলেন।*

*আর শিষ্যটিও দেখলেন স্বামীজি ঠিকই বলেছেন৷ এই দেবতাই তাঁর আশৈশব প্রিয়।*

*এই হ'ল গুরুর ক্ষমতা। তিনি শিষ্যের অন্তর দেখতে পান, সেখানে দেখতে পান তার অতীত সংস্কাররাশি। আর সেই সংস্কার অনুযায়ী শিষ্যকে ভবিষ্যতের পথে পরিচালিত করেন।*

*সুতরাং যে গুরু শিষ্যকে চেনেন না, শিষ্যের অতীত, বর্তমান,  ভবিষ্যত কিছুই জানেন না; তিনি আর যাই হোন ওই শিষ্যের গুরু হ'তে পারেন না।*

*শিষ্য এগুলো দেখে নিতেই পারে। তার জন্য তাকে গুরুর সমান ক্ষমতাবিশিষ্ট হ'তে হয়না।*

*তার হৃদয়ই বলে দেয়, 'ইনিই আমার গুরু।'*

*আরও একটি সহজ পন্থা আছে সঠিক গুরু নির্বাচনের। সেটা হ'ল সম্পূর্ণরূপে ইষ্টের শরণাগত হয়ে ইষ্টের কাছেই সঠিক গুরুলাভের জন্য প্রার্থনা।*

*প্রার্থনা আন্তরিক হ'লে ও দীক্ষালাভের তৃষ্ণা প্রবল হ'লে ইষ্টই গুরু জুটিয়ে দেন, গুরুর মধ্যে দিয়ে তিনিই কৃপা করেন ;  কারণ সেই শরণাগত ভক্তের ভার স্বয়ং ভগবান বহন করেন।* *'যোগক্ষেমং বহাম্যহম্।'*



Thursday, 3 July 2025

নীরবতার ভাষা

 


নীরবতার ভাষা একটি গভীর এবং বহুমাত্রিক ধারনা। শুধুমাত্র "শব্দহীন" বলে বোঝালে হবে না  কেননা এ এক অনুভূতি, অভিজ্ঞতা এবং যোগাযোগের মাধ্যমে। এর প্রকাশ ..... একাকীত্বে, প্রত্যাখ্যান, প্রতিরোধে অথবা বলা যেতে পারে গভীর-অনুসন্ধানে। যার এক  নিজস্ব ধরন বা ছন্দ রয়েছে। সাধারণত এটা ভালো বা খারাপ দুইজনের জন্য ব্যবহার করা হয়। খুব ছোট কথায় বলা যেতে পারে নীরবতা ভাষা যোগাযোগের এক বিশেষ রূপ। তবে এ ভাষার কোনো লিপি নেই। কিন্ত যে কোনো... সে দুঃখের বা সুখের বিষয় হোক না কেন , তা আলোকিত করে প্রদর্শন করবার এক সুদক্ষ যন্ত্র। নীরবতার ভাষার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হ'ল ' মায়া' যা শব্দ ছাড়া  কথা বলে। আর নীরবতা তখনই কথা বলে যখন ভাষা মনের অবস্থা প্রকাশ করতে পারে না। 



নীরবতার ভাষা অনুভূতির গভীরতম প্রকাশ। কোনো কথা বা শব্দ ছাড়া এটি অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে। কখনো এটি শান্তি বা তৃপ্তির প্রতীক হয়। কখনো আবার বেদনা, বিষন্নতা বা অপ্রকাশিত অনুভুতির ইঙ্গিত দেয়। নীরবতা কখনো এমন কিছু প্রকাশ করে, শব্দের  মাধ্যমে যা বলা সম্ভব নয়। তাই এটি শুধুমাত্র শব্দের অনুপস্থিত না, এটি একটি গভীর যোগাযোগের মাধ্যমে। এখানে শব্দ অপ্রয়োজনীয় হয়। তাই অনেক সময়ই দেখা যায় দুটি মানুষ একে অপরের প্রতি সহনাভুতি জানাতে "নীরব" থাকে। 


বলা হয়ে থাকে নীরবতা একটি শিল্প। এটা আমাদের শব্দ ছাড়াই কথা বলতে শেখায়। কখনো কখনো এ এক শক্তিশালী আর্তনাদ  বা  খুব জোড়ে  চিৎকারেরও  সমান হতে পরে। আবার নীরবতা শক্তির এক রূপ। চিন্তাশীল এবং জ্ঞানী ব্যক্তিরা সব সময় কম কথা বলে ।  কিন্ত এর শক্তি এমন,  দেশের যে কোন প্রান্ত থেকে জানা যায় তাদের ব্যক্তব্য। অতীতে আমাদের মুনি ঋষিরা সমাজ থেকে দূরে থাকতেন এবং  সময় ধরে নিরবে বনে প্রার্থনা ও ধ্যান করতেন। যার ফলে তাঁরা আত্মদর্শন বা সার্বজনীন গ্রহনযোগতার দর্শন, নীরবেই গড়ে তুলতে পারতেন। নীরবতা হ'ল ধৈর্যের , সহনশীলতার, তপস্যা, সত্যগ্রহের, ধ্যানের , প্রতিবাদের এক ভাষা। সেইজন্য গান্ধীজী মাঝে মাঝেই মৌন ব্রত পালন করতেন। কবিগুরু নীরবতার সমর্থনে বলেছেন..... এটাই হ'ল সবচেয়ে গভীর ভাষা, যা শব্দের চেয়েও স্পষ্ট করে হৃদয়ের কথা বলে। কাজী নজরুল নীরবতার ব্যাখ্যা এইভাবে করেছেন যে......... নীরবতা কখনো কখনো হ'ল সেই গান যা কেবল হৃদয়ের অন্তর্গত সুরে বাজে।


পশু-পাখিদের নীরবতার ভাষা ব্যাখ্যা করা হয় এভাবে------- অন্য পশু-পাখিদের সাথে যোগাযোগের জন্য তারা সচরাচর কোনো শব্দ ব্যবহার না করে। তারা অঙ্গ ভঙ্গি, শারীরিক ভাষা বা অন্যান্য সংকেত ব্যবহার করে এই যোগাযোগ স্থাপন করে। পশুরা একে অন্যের দিকে তাকিয়ে তাদের মনোভাব প্রকাশ করে। অনেক পশু তাদের শরীরের বিশেষ গ্রন্থি থেকে  গন্ধ জড়িয়ে তাদের উপস্থিতি প্রকাশ করে। একে অপরের সাথে খেলা ও আলিঙ্গন করে ঘনিষ্ঠতা স্থাপন করে। আবার কিছু বিপদ বা সতর্ক বার্তা, সেই অঞ্চলের পশুদের জানানোর জন্য বিশেষ শব্দ ব্যবহার করতে থাকে।      এছাড়া সাধারণ সংকেত হিসেবে আমরা দেখি___ লেজ নাড়ানো, শরীরের অবস্থান পরিবর্তন করা, লোম খাঁড়া করা বা কান ঝাকানো ইত্যাদি। এসবের সাহায্যই তারা নিজেদের মধ্যে ভাব আদান প্রদান করে আর একে অপরের সাথে সংযোগ স্থাপন করে। তবে দেখা গিয়েছে যে বেশিরভাগ মানুষ পশুদের নীরব ভাষা বুঝতে পারে। এর ফলে পশুদের সাথে মানুষের যোগাযোগ সহজেই স্থাপিত হয়। 


প্রকৃতির নীরবতার ভাষাতেও কোনো শব্দ নেই। এখানেও শব্দহীনতা...... সম্পূর্ণ অনুভূতি প্রকাশ। এক গভীর অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় এই অনুভূতির মাধ্যমে। তাইতো আমরা বাতাসের প্রবাহ উপলব্ধি করে, গাছের পাতার নড়াচড়া বা শুকনো ঝড়া পাতার মুচমুচ শব্দ, সমুদ্রের গভীরে ঢেউ অথবা সীমাহীন নীল আকাশের দিকে, আবার কখনো সে আকাশে ছোটাছুটি করা মেঘের দলগুলি দেখে , বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুভুতি করি। নীল উপরে বা কালো মেঘলা আকাশ আর নীচে সবুজ প্রকৃতি। মনে হয় এ বিধাতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ। প্রকৃতির গভীরে তাকালে আমরা আরও কিছু ভাল মতন জানতে পারি। সবুজ প্রকৃতি আমাদের  মনে করিয়ে যে আমরা প্রকৃতির সন্তান।  বর্ষার পর প্রকৃতির সবুজ  তার নতুন প্রান ফিরে পায়  আর মনে হয় পৃথিবী স্নানের পর পরিস্কার হয়েছে। পাখির ডাকে মুখরিত প্রকৃতির এই আঙিনায় নতুন এক দিন শুরু করার সাথে জীবন পূর্ণতা উপলব্ধি করতে পারি। এই সব অনুভুতি সাহায্যই আমরা প্রকৃতির সাথে এক যোগসূত্র স্থাপন করি। আর্থাৎ প্রকৃতির সাথে আমাদের এক বন্ধন হয়। মনে আসে শান্তি ও স্থিরতা। যেগুলি কিনা দৈনন্দিন জীবনের চাপ থেকে আমাদের মুক্তি পেতে সাহায্য করে। এই সংযোগ প্রায় সময়ই প্রকৃতির চিরন্তন সুন্দরের প্রতি আমাদের কৌতুহল বাড়িয়ে তোলে। আর স্বাভাবিক ভাবেই প্রকৃতির প্রতি  আমাদের আকর্ষণ বৃদ্ধি পায়। তাই  বাইরের শব্দ থেকে আমাদের  পালিয়ে যেতে হবে বা শব্দকে শান্ত করে  প্রকৃতির  গানের সুর আমাদের কাছে আসতে দিতে হবে।  ধরিত্রি মাতাকে বাধাহীনভাবে তার নিজের গান গাইতে হবে। আর এই নীরবতার মধ্যে লুকিয়ে আছে সেই শক্তি যার সাহায্যে আমরা শুনতে পারবো সেই গান আর তার সাথে  নিজেদের  ভিতরের গুনাগুনানি স্বরের সাথে তাল মেলানোর এক কঠোর প্রচেষ্টা করে আনন্দের  স্বাদ  পাবো।



মনে রাখতে হবে একজন "নীরব " বলে সে নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে ভাবাটা ঠিক নয়। কেননা ঝড়ের আগে এক ভয়ঙ্কর নিস্তব্ধতা ঝড়ের  পূর্বাভাস দিয়ে থাকে। বিক্ষোভে ভরা এই পৃথিবীতে , নীরবতা কেবল বিলাসিতা নয়। এরও এক বিরাট প্রয়োজন আছে। নীরব মুহুর্তগুলি আলিঙ্গন করলে, আরও ভালভাবে মনোযোগ দিয়ে বিশৃঙ্খলা নিরাময় করতে পারি বা বিশৃঙ্খলতার মাঝে ষ্পটতা খুজে পেতে পারি। শব্দে ভরা এই পৃথিবীতে , নীরবতা আমাদের মনোযোগকে তীক্ষ্ণ করে, মনের চাপ কমায়,  মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা বৃদ্ধি করে ........ এগুলি সব প্রমানিত। প্রকৃতির নীরবতা আমাদের শেখায় কিভাবে শান্ত থাকতে হয়। পাখির গান থেমে গেলেও বাতাসের হাল্কা শব্দ শোনা যায়। এ শব্দেও এক শান্তি লুকিয়ে রয়েছে। বেশি কথা বললে সাধারণত মিথ্যা বলার সম্ভবনা থেকে যায়। কিন্ত নীরব থাকলে অপ্রত্যাশিতভাবে সত্যটা যেন ফুটে উঠে। এই নীরবতা গভীর চিন্তাভাবনা, ধ্যান এবং আত্মউপলব্ধির জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে থাকে। সেজন্যই কিছু কিছু সংস্কৃতিতে নীরবতাকে সন্মান ও শ্রদ্ধার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।


শেষে এখন একটাই প্রশ্ন জাগে ...... মানুষ কি মানুষের নীরবতার ভাষা বোঝে ??? এককথায় উত্তর দেওয়া যেতে পারে " না "। কিছু মানুষ হয়তো এর ব্যাতিক্রম। তবে তাদের সংখ্যা নগন্য।  বলা হয়ে থাকে যে মানুষ যদি কথা না বলার মতো নীরব থাকার ক্ষমতা পেতো বা মানুষ যদি মানুষের নীরবতার ভাষা বুঝতে পারতো, তবে পৃথিবী আরও সুখি হতো। মানুষ অনেকেই পশু-পাখিদের নীরবতার ভাষা বুঝতে পারে বা প্রকৃতির নীরবতার ভাষা বুঝতে পারে ।  তাই তাদের  সাথে এক সুখের সম্পর্ক,  এক আনন্দের সম্পর্ক গড়ে উঠে সহজেই। পৃথিবীর কথা ছেড়েই দিয়ে যদি আমাদের এই ছোট মধ্যবিত্ত সমাজের দিকে তাকাই  , তবে লক্ষ্য করা যায় যে নীরবতার ভাষা না বোঝার কারনেই আমাদের এতো অস্থিরতা, এতো অশান্তি, এতো উত্তেজনা, এতো ভুল বোঝাবুঝি। তাই  আমরা এতো অসুখি। বিশেষ করে বয়স বাড়ার সাথে আমাদের নীরবতা বাড়তে থাকে। অবসর জীবনে সেই  নীরবতা এক বিরাট রূপ নিয়ে থাকে। কিন্ত আমরা সেই নীরবতার ভাষা পাঠ করতে পারি না। আর তারই ফলে সংসারে নেমে আসে অশান্তি।  অসুখি হয়ে বাকি জীবন কাটায় । এ সংসারের সুখ সাচ্ছন্দ তখন জ্বালা হয়ে উঠে। পৃথিবী ত্যাগের ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠে।