Tuesday, 6 August 2024

গেরুয়া বসনের অন্তরালে

 

মানুষকে এই বস্তুবাদী দুনিয়া থেকে ত্যাগের পথে নিয়ে যায় এই গেরুয়া রং। তাই সেই বেদের সময় থেকেই গেরুয়া হয়ে গিয়েছিল বস্তুবাদী দুনিয়া ত্যাগ করে বৃহত্তম আধ্যাত্ম্য দুনিয়ায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার রং। তাই গেরুয়া হয়ে গেল সাধু মহাত্মাদের পরিধেয় বসনের রং।



স্বামীজি থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে সাধু মহাত্মাদের দেখা যায়, তাঁরা গেরুয়া বসন পরে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই কিন্তু এ দৃশ্য মানুষ দেখে এসেছেন। কিন্তু কেনই কেবল গেরুয়া বসন? কেন অন্য কোনও রং নয়? এর কারণ খুঁজতে কিন্তু পিছিয়ে যেতে হয় বেদের সময়ে।

গেরুয়া রং হল আগুনের রং। গেরুয়া হল সূর্যের রং। ঋগ্বেদে অগ্নিকে আগুনের দেবতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বৈদিক যে কোনও ক্রিয়ায় আগুনের ব্যবহার আবশ্যিক। সে হোম হোক বা আরতি। বলা হয় আগুন সবকিছুকে পবিত্র করে তোলে। আগুনের রং হল ত্যাগের রং। আর সেই রং হল গেরুয়া। মানুষকে এই বস্তুবাদী দুনিয়া থেকে ত্যাগের পথে নিয়ে যায় এই গেরুয়া রং। তাই সেই বেদের সময় থেকেই গেরুয়া হয়ে গিয়েছিল বস্তুবাদী দুনিয়া ত্যাগ করে বৃহত্তম আধ্যাত্ম্য দুনিয়ায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার রং।

আমাদের অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীতে এত রঙ থাকা সত্ত্বেও কেন সাধু সন্ন্যাসীরা গেরুয়া রঙকে এত পছন্দ করেন? এই রং অনেকটা কমলা রঙের মতো। আসলে গেরুয়া রঙের যোগ রয়েছে পুরাণের সঙ্গে। আধ্যাত্বিক বিশ্বাস সহকারে সাধুরা এই রঙের পোশাক পরিধান করেন। বলা হয় অগ্নিদেবের রঙ্গ গেরুয়া। হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও গেরুয়া রঙের পোশাক পরতে দেখা গিয়েছে। লাল হলুদের মিশেলে পাওয়া এই রঙকে বলা হয় সুখের প্রতীক। কথিত আছে, গেরুয়া রঙের সঙ্গে মানব শরীরের অঙ্গের বিশেষ যোগ রয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে কিডনি, প্রজননতন্ত্র, মলাশয় এবং মূত্রথলি। এই রং নাকি শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখে তাই এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সুস্থ অসুস্থতার বিষয়।

গেরুয়া রং বলতে দেশের জাতীয় পতাকার সর্বোচ্চ রং।  এর পাশাপাশি আরও একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট লক্ষ্যনীয় যা কিনা প্রধানত ধর্মীয় এবং পৌরাণিক তাৎপর্য পূর্ন।   


ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এক সময় এদেশে প্রচলিত ছিল বর্ণাশ্রম প্রথা। কালের গহ্বরে সেই প্রথা এখন প্রায় অস্তমিত। এই প্রথারই শেষ পর্যায় ছিল সন্ন্যাস। অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সের অন্তিম আস্তানা। সন্যাস এখন আর বাধ্যতামূলক নয় ঠিকই, তবে ভারতীয়দের স্মৃতিতে এ প্রথা আজও স্পষ্ট। এখনও বহুজন সন্যাসী রয়েছেন......., একান্তই ব্যক্তিগত ইচ্ছেয় যাঁরা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু সন্ন্যাস এই প্রথার সঙ্গে যে অচিরেই মিলেমিশে গিয়েছে একটি রং, গেরুয়া। এটির আসল কারণ কী? কি কি যুক্তি রয়েছে এর পিছনে।

সাধারণত গেরুয়া রংটি আমরা আধ্যাত্মিক চোখেই দেখে থাকি। রংটি হিন্দু পুরাণের দুটি শুভ জিনিসের সাথে অনুরণিত হয়। তা হল সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের রঙ এবং আগুনের রং। পুরাণ মতে, সূর্য এবং আগুন এই দুটিই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা উল্লেখযোগ্য শক্তি। কিন্তু আধুনিক সময় দাঁড়িয়ে কেবল পুরাণের উপর ভিত্তি করে জীবন চলে না তার সঙ্গে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় বিজ্ঞানও। আপনি কি জানেন শুধু ধর্ম নয়,  সাধুদের গেরুয়া পোশাক পরার পিছনে বৈজ্ঞানিক কারণও আছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন, সাইকো নিউরোবিক্স বিশেষজ্ঞ ডক্টর বি কে চন্দ্রশেখর। তাঁর মতে, সাতটি প্রাথমিক রং আমাদের শরীরের সাতটি চক্রের সাথে যুক্ত। এগুলি হল- লাল, গেরুয়া বা কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল এবং বেগুনি। প্রতিটি রঙেরই রয়েছে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য। যখন আমরা কোনও রঙের দিকে তাকাই, তখন সেই রংগুলি প্রত্যেকেই নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য মেনে আমাদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এটিকেই বলে কালার ভাইব্রেশন থেরাপি।

কিন্তু কী এই কালার ভাইব্রেশন থেরাপি?

যখন আমরা একটি রং দেখি, তখন এটি আমাদের রেটিনায় একটি চিত্র তৈরি করে যা বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হয় এবং তৎক্ষণাৎ মস্তিষ্কে নির্দেশ পাঠায়। চোখের অপটিক নার্ভ এটিকে ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স এবং মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের সাথে সংযুক্ত করে। প্রতিটি রংই আমাদের মস্তিষ্কে আলাদা আলাদা কম্পন তৈরি করে। এবং এই কম্পন থেকেই মানসিক প্রভাব বিস্তার হতে পারে মনে করেন তিনি।

গেরুয়া রংকে এমনিতেই আমরা ত্যাগ ও সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে জেনে থাকি। পাশাপাশি ডাঃ চন্দ্রশেখর ব্যাখ্যা থেকে জানা যায়, এই রঙের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে কম্পন তৈরি হয় তা একজনের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। মানুষের কোলন, মূত্রাশয়, কিডনি, প্রজনন ব্যবস্থা এবং মূত্রথলি জনিত বিভিন্ন ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এই রং।


যদিও বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন কমলা আনন্দের রঙ কারণ এটি লাল এবং হলুদের সংমিশ্রণ। কিন্তু বিশ্বাস যাই হোক এই রঙের যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও যথেষ্ট রয়েছে তা জানা যায় চিকিৎসকের ব্যাখ্যা থেকেই। গেরুয়া রঙের উপর মনোনিবেশ করা একজনের জীবনে মানসিক এবং শারীরিক উভয় ক্ষেত্রেই একাধিক উপকার করতে পারে এটি। এমনকী ক্লান্তি দুর করতেও সহায়তা করে।


সুতরাং সাধুদের পোশাকের এহেন রং কেবল একটা মিথ নয়, অভ্যাসও নয়। এটির নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞান। আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি একজন সাধুর প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এবং আকর্ষণ জোরালো করতেও সাহায্য করে পরনের ওই গেরুয়া বসনটিই।

তবে পুরানো নথিপত্র ঘাটলে এই গেরুয়া রং-এর পোশাক কেন সন্ন্যাসীদের পোশাকের রং হল, তা সম্বন্ধে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। জানা যায় এইরকম..........

শ্মশানে মৃতদেহ নামিয়ে রাখার পর পুরোনো কাপড় ফেলে দিয়ে দেহটি গঙ্গায় স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে শুরু করা হয় মৃতের অন্তিম যাত্রা। ওই ফেলে দেওয়া কাপড় সংগ্রহ করে আনতেন বৌদ্ধ শ্রমণেরা। লাল মাটির উপর অনেক দিন ফেলে রাখলে সেই কাপড়ে মাটির রঙ ধরত। তখন মাটি থেকে কাপড় তুলে নিয়ে সামান্য ধুয়ে তাঁরা গায়ে পরতেন। এইভাবে তৈরি হত সন্ন্যাসীর পরিধেয় আড়াই হাজার বছর আগে।

বৈদিক যুগের সন্ন্যাসী প্রায়শই নগ্ন, লজ্জা তাঁকে ছেড়ে গেছে। তবু দিন পাল্টায়। অরণ্য কেটে যতই বসতি স্থাপন করা হল, ততই সন্ন্যাসীরও প্রয়োজন হল বসনের। সামাজিকতার কারণে তো বটেই, শীত এবং রৌদ্রের তাপ হতে বাঁচার তাগিদেও। 

কাপড়ে মাটির রঙ ধরানো হত একথা মনে রাখার জন্যেই যে, এ দেহ একদিন মাটি হয়ে যাবে। তাই, জড়িয়ে পোড়ো না এ দেহের মায়ায়।  মাটির রঙে রাঙানো কাপড় সদাই সেকথা মনে করাতো। 

কিন্তু কাপড়ের রাঙানোর এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ বলে মনে হল একদিন। কনখলে আর রাজমহেন্দ্রীর মত জায়গায় এমন সব পাহাড় পাওয়া গেল যাদের রঙ লালচে গেরুয়া। তখন সেখান থেকে পাথর নিয়ে আসা হল। দুই খণ্ড বাদামী পাথর দুহাতে ধরে জলের মধ্যে ডুবিয়ে ক্রমাগত ঘষে ঘষে রঙ তৈরি হত। জলের সঙ্গে গুলে সেই আশ্চর্য রঙ তৈরি হলে, কাপড় বারবার ডুবিয়ে ডুবিয়ে নিংড়ে নিংড়ে থুপে থুপে রঙ করার প্রক্রিয়া চলতে লাগল। হাত ব্যথা, কোমর ব্যথা, শিরদাঁড়া ব্যথা হয়ে গেলেও গৈরিক কাপড় শুকিয়ে গেলে গায়ে পরবার সময় সন্ন্যাসীরা অনির্বচনীয় শান্তি ও স্থির ধ্রুব আনন্দের অধিকারী হতেন।

অনেকের মনে প্রশ্ন হতে পারে,  কেন বাজার থেকে গেরুয়া থান কাপড় কিনে আনলেই তো হতো। তার থেকে জামা, কাপড় বানিয়ে নিলেই হল। এত কাণ্ডের দরকার কী? কিন্তু অমন রেডিমেড কাপড়ে এত বছরের ইতিহাস মাখা থাকত কি? মাটির সুঘ্রাণ, মাটি হয়ে যাবে সব একদিন, মনে পড়ত কি? দশনামী সাধুদের কাপড় অন্তত মাটিতে ছুপিয়েই পরার রীতি। 

কালক্রমে কনখল কিংবা রাজমহেন্দ্রীর সেই  গিরিশ্রেণী ধ্বংস হয়ে গেল। মাটির নীচে পাওয়া গেল কপারের মাইন। লাল পাথর চলে গেল, এল এক কেমিকাল। খুব সহজে জলে গুলে যায়। রঙ উজ্জ্বল, পাক্কা। এখন এই কেমিকালেই সাধুরা কাপড় রাঙান। একটা ইতিহাস হারিয়ে গেল।

এই রঙের মূল বৈশিষ্ট্য হল এই রঙ মনের ওপর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রভাব সৃষ্টি করে। ক্রমাগত গৈরিক রঙ ব্যবহার করলে আর কোনও রঙের পোশাক পড়তেই ইচ্ছা করবেনা। এই রঙ পরিধান করলে মনে শান্তি আসে, কালিমা দূর করে, ধীরে ধীরে আত্মচেতনা বৃদ্ধি পায়। মানব জীবনে গৈরিক রঙের প্রভাব সূদূর প্রসারী। গৈরিক রঙ অত্যন্ত শুভ রঙ। এই রঙ মনের কুসংস্কারকে দূর করে সংস্কারি করে তোলে চিত্তকে। ত্যাগের অন্যতম প্রতীক এই গেরুয়া রঙ। এই জন্য সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর সঙ্গে গৈরিক রঙটি ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে আছে। সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে বা উপনয়নের মতো অনুষ্ঠানে এই বসন আবশ্যিক।

 গেরুয়া রঙ 'ত্যাগ, সাহস, শক্তি এবং বীরত্বের ' প্রতীক।

 একজন সন্ন্যাসী তার সমস্ত কামনা ত্যাগ করেছেন, তার লাভের কিছুই নেই। যেহেতু তার কিছু পাওয়ার আশা নেই, তাই কিছু হারানোর ভয়ও তার নেই। যেহেতু তার কোনো ভয় নেই, তাই তার সাহস ও মানসিক শক্তির কোনো অভাব নেই। এই কারণে সন্ন্যাসীরা গেরুয়া পরেন।


<< সংগৃহীত >>

Saturday, 27 April 2024

ভগবান সাধনায় জপ ও দীক্ষা



(******** দীক্ষা********)

'' মানুষ গুরু দীক্ষা দেয় কানে , জগৎ গুরু দীক্ষা দেন প্রাণে ।

আপনারা খুব করে জ্ঞান অর্জন করুন । বিজ্ঞান , দর্শন , ইতিহাস আলোচনা করুন ।

মূর্খ থেকে কি লাভ ?

লোকের কথায় কেবল চালিত  হবেন , কোন কিছুতে নিষ্ঠা সহকারে লেগে থাকতে পারবেন না । তীক্ষ্ণ , তীক্ষ্ণতর বুদ্ধির নিকট ভয় পেয়ে যাবেন ।

একটু জ্ঞান লাভ হলেই বুঝতে পারবেন দেশকাল - ভেদে আপনাদের প্রাণ কি চায় । আপনাদের আকাঙ্ক্ষার স্বরূপ টি কি , আপনার আদর্শই বা কি ।

শুধু হুজুগ করে দীক্ষা দীক্ষা করে মাতলে কি হবে ?

জমি প্রস্তুত হলে ভগবান আপনি ই দীক্ষা দেবেন । সে দীক্ষা লাভের জন্য হৃদয় কপাট খুলে সতত উন্মুখ হয়ে বসে থাকুন । সময় হলে কার মুখ দিয়ে কার হৃদয় থেকে প্রেরণা লাভ করবেন তা কে বলতে পারে ?

কোন পথ দিয়ে প্রভু কাকে তাঁর আঙ্গিনায় নিয়ে যাবেন কে বলতে পারে ?

কিন্তু মনে প্রাণে সত্যি কারের দীক্ষা পেলে তা অমনি বুঝতে পারবেন ।

বাহ্য আনুষ্ঠানিক দীক্ষা র একটা সংক্রামক শক্তি আছে । একজন দীক্ষা র আগ্রহ প্রকাশ করলে তা বহুর মধ্যে সংক্রামিত হয় ; কিন্তু কিছুদিন পরে ঐ আগ্রহ কেটে যায় । তখন সে লোক যে সেই । তাতে বরং অনিষ্ট হয় ।

হুজুক কেটে গেলে জ্ঞান - মার্জিত বিচার - বুদ্ধি নিয়ে গুরুকে পরীক্ষা করে স্থির শান্ত চিত্তে , বজ্র দৃঢ় সংকল্প নিয়ে দীক্ষা গ্রহণ করতে হয় । ''

 দীক্ষা শব্দের বর্ণদুটির প্রথমটি দান-বাচক, কিন্তু দ্বিতীয়টি 'ক্ষয়-বাচক'।

দ-> দান

ক্ষ-> ক্ষয় বা ধ্বংস।

অর্থাৎ দীক্ষা হ'ল সেই প্রক্রিয়া, যার দ্বারা দীক্ষাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে গুরু আধ্যাত্মিক শক্তি ও জ্ঞান *দান* করেন, যা শিষ্যের অজ্ঞান ও বন্ধনকে *ক্ষয়* বা ধ্বংস করে।

আর একটি অর্থে দীক্ষা মূল ক্রিয়াপদ 'দীক্ষ' থেকে উদ্ভূত,  যার অর্থ 'বৃদ্ধি করা', 'উন্নত করা' কিংবা পবিত্র করা। এই অর্থে দীক্ষা হ'ল 'পবিত্রকরণ', যা আমাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটায়।

সুতরাং দীক্ষা একমাত্র তাঁর কাছ থেকেই নেওয়া যেতে পারে যাঁর আধ্যাত্মিক শক্তি দানের যোগ্যতা আছে। 

গুরু এইরূপ যোগ্যতাসম্পন্ন না হ'লে কিন্তু দীক্ষা ব্যর্থ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে মন্ত্রে কোনও কাজ হয় না। 

_দীক্ষাপ্রসঙ্গে_ 🌼🌼🌼

*দীয়তে (দেওয়া) এবং ক্ষীয়তে (ক্ষয় পাওয়া) এই দুটি শব্দ সমন্বয়ে 'দীক্ষা' শব্দটির ব্যুৎপত্তি। আলো দেওয়া এবং অন্ধকার ক্ষয় —এই হল সকল দীক্ষাকর্মের মূল ভাবনা।* 

*কুলার্ণবতন্ত্রে বলা হয়েছে—*

*'দীয়তে বিমলং জ্ঞানং*

*ক্ষীয়তে কর্মবাসনা'*

*—অর্থাৎ দীক্ষা হল তাই যাতে বিমল জ্ঞানের উৎপত্তি ঘটে ও জীবের কর্মবাসনা নিঃশেষে ক্ষয় পায়।*

*দীক্ষা মানে 'দয়াপূর্বক ঈক্ষণ'— পরমেশ্বরের অর্থাৎ সদ্গুরুর সস্নেহ কৃপাদৃষ্টিপাতের নাম দীক্ষা।*

*একটি সুনিদ্দিষ্ট জীবনাদর্শের নিকটে নিজেকে নিঃশেষে নিবেদনের জন্য সঙ্কল্প গ্রহণের নাম দীক্ষা। সেই আদর্শটি কোনও দেবতা, মন্ত্র, মূর্তি, প্রতীক, ভাব, ব্যক্তি বা মতবাদকে অবলম্বন করে প্রকটিত হতে পারে।* 

*যিনি যে মত বা পথেই দীক্ষিত হয়ে থাকুন না কেন, কোন একটা উচ্চ লক্ষ্য বা আদর্শ সামনে না থাকলে তা যথার্থ দীক্ষা হয় না।*

*জন্ম, মৃত্যু, বিবাহের মতনই দীক্ষা মানুষের জীবনের একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। অথবা বলা চলে জন্ম, মৃত্যু বিবাহের চেয়েও তা গুরুত্বপূর্ণ কারণ জন্ম-মৃত্যু-বিবাহ জড় জীবজগতকে নিয়েই কারবার করে। দীক্ষার মধ্য দিয়ে জড় ছাড়িয়ে আমি চৈতন্যের অভিসারী হই অথবা জড়ের মধ্যে চৈতন্যকে খুঁজে পাই।...* 

*দীক্ষা শুধু নবজন্ম নয়, জন্ম-জন্মান্তরের মধ্যে এক ভিন্নতর জন্মের নিশানা।*

*দীক্ষাকে বলা হয় আধ্যাত্মিক বিবাহ -জীবের সঙ্গে পরমেশ্বরের মিলন। গুরু হলেন সেই বিবাহের ঘটক। লৌকিক বিবাহে যেমন দুটি দেহ মন ও প্রাণ একত্রে মিলিত হয়, দীক্ষারূপ বিবাহে জীবাত্মা তেমনি পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হবার উদ্যোগ নেয়। দীক্ষার মধ্য দিয়ে ঘটে সেই দিব্য মিলনের সূচনা।* 

*ঋগ্বেদের কাল থেকে বর্তমানের মহাকাশ যুগ পর্যন্ত দীক্ষার উপযোগিতা সমভাবে বিদ্যমান।*

*দীক্ষা হল সাধারণ অর্থে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান যার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজের অন্তরস্থ আত্মিক সাম্রাজ্যে প্রবেশের চেষ্টা করে। সাংসারিক জীবের আত্মিক ব্যাপারে আলোর জন্য তাগিদ অনুভব করাই হল দীক্ষার যথার্থ মূল প্রেরণা।*

><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><><

○●○●○●○●সাধনা○●○●○●○●

আমরা ভগবানের নাম করব, কত হাজার জপ করব...এটি বড় কথা নয়।

কেউ হয়ত নিরামিষ খায়, কেউ হয়ত এক বস্ত্রে থেকে ভগবানের জন্য তপস্যা করে ।

সেসব কিন্তু কিছুই নয়,যদি না সেগুলিতে আন্তরিকতা থাকে।

আসল কথা হচ্ছে,আমাদের সমস্ত অন্তর দিয়ে ভগবানকে ভালোবাসতে পারছি কি না তা দেখতে হবে...

যে ভালোবাসায় সংসারের অন্য সমস্ত আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে যাবে। এই কথাটি মনে রাখতে হবে।

ভাগবতে বলেছে....

তাঁর প্রতি যে অনুরাগ তা জগতের অন্যসব অনুরাগকে ভুলিয়ে দেয়। সুতরাং তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা কতখানি হলো...এই বিচার করে আমাদের সাধন পথে হাঁটতে হবে।

আমরা তাঁর নামে মুহুর্মুহু মূর্ছা গেলেও কিছু হবে না বা আমাদের সমস্ত জীবনটা বসে বসে ধ্যান করলেও হবে না, বছরের পর বছর লক্ষ লক্ষ জপ করলেও হবে না। তীর্থে তীর্থে ঘুরে বেড়ালেও হবে না।

হবে তখন, যখন দেখব তিনি আমাদের অন্তরকে সর্বদা পরিপূর্ন করে রয়েছেন। তিনি ভিন্ন আর কোনো চিন্তা বা বস্তু বা ব্যক্তির সেখানে স্থান নেই।

আমাদের অন্তরের পূর্ন অনুরাগ তাঁকে দিতে হবে। তাঁর চরণে নিজেদের পরিপূর্ন ভাবে সমর্পণ করতে হবে।

....... এটিই সাধনার সার কথা ।

♤♧♤♧♤♧♤♧♤♧♤♧♤♧♤♧♤

*꧁জপ꧂*

পবিত্র ঈশ্বরীয় নাম অথবা শক্তিশালী ইষ্টমন্ত্রের পুনঃ পুনঃ উচ্চারণই 'জপ'।

অরণি কাঠ বারবার ঘর্ষণ করতে করতে যেমন তা থেকে আগুন বার হয়, ঠিক তেমনই গোপন ইষ্টমন্ত্র সঠিক উচ্চারণে জপ করতে করতে তা থেকে শক্তি নির্গত হয়ে সাধককে অতীন্দ্রিয় রাজ্যের দিকে নিয়ে যায়। তখন স্তরে স্তরে মন উপরে উঠতে থাকে।

জপের সময় মুখ বন্ধ এবং জিভ স্তব্ধ থাকা উচিৎ। অর্থাৎ জপ হবে মনে মনে। 

মন অন্যদিকে নিযুক্ত রেখেও মুখে কোনও শব্দ উচ্চারণ করা সহজ। কিন্তু মনকে জপের দিকে নিযুক্ত না রেখে মানসিক জপ প্রায় অসম্ভব, তাই নীরব মানসজপই শ্রেষ্ঠ। 

মনকে অন্য সকল চিন্তা থেকে মুক্ত করে সর্ব প্রকারে ঈশ্বরমুখী করাই সাধনার উদ্দেশ্য। 

মনের চিন্তা দুই প্রকার : শ্রবণধর্মী এবং দর্শনধর্মী।

অর্থাৎ আমরা কোনও শব্দ চিন্তা করতে পারি অথবা দৃশ্য চিন্তা করতে পারি। 

এই দুইপ্রকার চিন্তনকে ঈশ্বরমুখী করতে গেলে অন্তরে ইষ্টের রূপ (দৃশ্য ) চিন্তন এবং তাঁর ভাব-প্রতিপাদক মন্ত্র (শব্দ) চিন্তন করতে হয়। তাহলে মনে আর অন্য চিন্তা আসেনা।

আর তা না হলে মুখে নাম করে যাচ্ছি কিন্তু মন তার অভ্যাসবশতঃ জাগতিক চিন্তা করে যাচ্ছে তাতে কী লাভ?  

মুখে একটি শব্দ উচ্চারণ করা সহজ, কিন্তু দৈহিক কম্পন বন্ধ করে শুধু মানস জপ করতে গিয়ে দেখা যায় সেটা কত কঠিন! আর কঠিন বলেই সেটা অধিকতর ফল প্রদানকারী।

স্বামী বিবেকানন্দ রাজযোগের আলোচনায় বলছেন,

_‘‘...মন্ত্র জপ করিবার তিন প্রকার নিয়ম আছে — 'বাচিক', 'উপাংশ' ও 'মানস'।_

_বাচিক জপ সর্বনিম্নে এবং মানস জপ সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ।...’’_

মন্ত্র জপের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রের অর্থ অর্থাৎ মন্ত্রের ভাবটি চিন্তা করতে হয়। মহর্ষি পতঞ্জলি শেখাচ্ছেন, _'তজ্জপস্তদর্থ- ভাবনম্';_

— অর্থাৎ জপের সঙ্গে সঙ্গে জপমন্ত্রের অর্থ ভাবার কথা বলা হয়েছে। 

এখানে 'মন্ত্র' বলতে ঈশ্বরীয় নাম এবং তার অর্থ বলতে নামের প্রতিপাদ্য ভাবের কথা বলা হচ্ছে। 

এই ভাব-চিন্তন থেকেই বিক্ষেপহীন ভাবময় স্থিতি বা ধ্যান আসে। এভাবেই জপ থেকে ক্রমে ধ্যানে উন্নীত হতে হয়।

যাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণ-নাম জপ করছেন, তাঁরা জপের সাথে সাথে সেই নামের অর্থ বা ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের রূপ চিন্তন করেন। 

কিন্তু ভগবান শ্রীরামকৃষ্ণের প্রকৃত রূপ আমাদের বুদ্ধির অগম্য। তাঁর অনন্ত ভাব আমাদের ধারণার বাইরে। আমরা তাই নিজেদের সীমাবদ্ধ ক্ষমতা অনুযায়ী আমাদের পক্ষে যতটুকু সম্ভব শুধু ততটুকুই তাঁকে চিন্তা করতে পারি। 

স্বয়ং স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর সম্পর্কে বলেছেন, 

_‘‘এই অদ্ভুত রামকৃষ্ণ-চরিত্র তোমার ক্ষুদ্র বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে যতদূর সাধ্য আলোচনা  কর, অধ্যয়ন কর। আমি তো তাঁর লক্ষাংশের একাংশও এখনও বুঝতে পারিনি। ও যত বুঝবার চেষ্টা করবে, ততই সুখ পাবে, ততই মজবে।’’

কথামৃতে আছে — শ্রীমতি রাধিকা যত কুঞ্জবনের দিকে এগোচ্ছেন তত কৃষ্ণ-গন্ধ নাকে আসছে।

 — এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য হল : আমরা যত পবিত্র হব, যত তাঁর দিকে এগোতে থাকব, ততই তাঁর স্বরূপ আমাদের কাছে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হবে। 

জপের পথে আমরা ভাবময় ইষ্টের কাছাকাছি পৌঁছে যাই।

<><><><><><><><><><><><><><><><><><><><>

(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)(*)


&&&&&&&&&&&প্রনাম &&&&&&&&&&&&


সাধারণত আমরা মন্দিরে প্রবেশ করেই শ্রীরামকৃষ্ণের পট বা বিগ্রহের সম্মুখে ভূমিষ্ঠ বা সাষ্টাঙ্গ হয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই প্রনাম পর্ব শেষ করে ফেলি। কিন্তু প্রনামের এক আদর্শ পদ্ধতি আছে । এ প্রসঙ্গে স্বামী ব্রহ্মানন্দজীর সেবক ও সচিব এবং রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের সপ্তম প্রেসিডেন্ট স্বামী শঙ্করানন্দ একবার বলেছিলেনঃ মন্দিরে ঠাকুরকে কি ভাবে প্রনাম করতে হয় জানো? কখনও মন্দিরে গিয়ে ঢিপ করে প্রনাম করবে না। আগে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ঠাকুরকে কিছুক্ষণ দেখবে। ভাববে, ঠাকুর জীবন্ত, তোমায় দেখছেন। এইভাবে মন স্থির হলে তখন প্রনাম করবে এবং ভাববে ঠাকুরকে পা জড়িয়ে ধরে প্রনাম করছো।

                                                   

Wednesday, 24 April 2024

চেন্না গ্রামের নিরালম্ব আশ্রম


স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে  " নিরালম্ব আশ্রম  "


ইনিই হলেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় , যাকে ভুলতে বসেছে আজকের নতুন প্রজন্ম।  নতুন প্রজন্মের অনেকেই ইনার নামও জানে না। ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিশেষভাবে উল্লিখিত যে দুজন মহান ভারতীয় জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতা সংগ্রামীর নাম উল্লেখ আছে , তাঁদের একজন ইনি আর্থাৎ শ্রী যতীন্দ্র নাথ ব্যানার্জ্জী এবং অপর একজন শ্রী অরবিন্দ ঘোষ।  কিন্ত কে এই  বিপ্লবগুরু যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের যিনি কিনা  " অগ্নিযুগের ব্রহ্মা " বলে পরিচিত ছিলেন।  স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে একাধিক যতীন্দ্রনাথের নামের সাথে আমরা পরিচিত।  একজন যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় , যিনি অবশ্য বাঘা যতীন নামে বিখ্যাত।  দ্বিতীয়জন যতীন্দ্রনাথ দাস, লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় ভগৎ  সিং এর সহযোদ্ধা।  জ্বলন্ত অবস্থায় ৬৩ দিন অনাশনের শেষে শহিদ হয়েছিলেন।  তৃতীয়জন যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় , তারই তৈরী চান্না আশ্রম,  যিনি কিনা পরবর্তীকালে " নিরালম্ব স্বামী" নামে পরিচিত হয়েছিলেন। 

" দেশের মধ্যে, দেশবাসীর মধ্যেই তোমার ভগবান আছেন।  দেশকে ভালবেসে দেশবাসীর সেবা করো...." স্বামী বিবেকানন্দের এই বাণীই ছিল যতীন্দ্রনাথের জীবনের মূলমন্ত্র। 


শ্রী যতীন্দ্রনাথ অনুভব করেছিলেন যে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বিপ্লবী পদ্ধতির অবশ্যই প্রয়োজন  এবং তিনিই এই বিপ্লবী পদ্ধতি গ্রহনের কথা প্রচার করেন। আর বিপ্লবী পদ্ধতি ব্যবহার করার জন্য প্রয়োজন ছিল  এক বিশাল সেনাবাহিনীর  এবং সেজন্য দেশবাসীদের সামরিক প্রশিক্ষণ অপরিহার্য ছিল।  তাই তিনি মার্শাল ট্রেনিং এর সন্ধানে পড়াশোনা অর্ধেক করে ছেড়ে দেন। তিনি তারপর নিজেকে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করেন কিন্ত সফল হতে পারেননি। সেখানে ব্যার্থ হয়ে তিনি চাকরির সন্ধানে চারিদিকে ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন। ঘুরতে ঘুরতে বরোদায় উপস্থিত হয়ে শ্রীঅরবিন্দের সাথে দেখা করেন। শ্রীঅরবিন্দ তাঁর দৃঢ় স্বাস্থ্য দেখে অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং বরোদা সেনাবাহিনীতে চাকরি খুজতে সাহায্য করেন। ১৮৯৭ সালে যতীন্দ্রনাথ বরোদার রাজার দেহরক্ষী হিসেবে বরোদার সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। পরে তিনি শ্রীঅরবিন্দের এক সুযোগ্য সহযোগী হয়ে উঠেন। পরবর্তী কালে         শ্রীঅরবিন্দের পরামর্শে তিনি কলকাতায় ফিরে এসে অনুশীলন সমিতিতে যোগ দেন ।




১৮৭৭ সনে ১৯ শে নভেম্বর (৫ই অগ্ৰহায়ণ, ১২৮৪ বঙ্গাব্দ) ব্রিটিশ ভারতে বর্ধমান জেলার চান্না গ্ৰামে (গলসি থানার অন্তর্গত, বর্তমান পূর্ব বর্ধমান জেলার একটি ছোট্ট গ্ৰাম) এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্ৰহণ করেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে তিনি স্বামী নিরালম্ব রূপে খ্যাতি লাভ করেন। পিতা কালিদাস বন্দোপাধ্যায় এবং মাতা হলেন অসম্ভাবিনী দেবী। গ্ৰামের পাঠশালাতেই তিনি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে বর্ধমান রাজ স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাশ করেন এবং পরবর্তীতে বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে এফ. এ. (First Arts) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এন্ট্রান্স পরীক্ষায় পাশ করার পরেই বঙ্কিমচন্দ্রের ‘আনন্দমঠ’ পড়ে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি দেশ-মাতৃকার মুক্তি সংগ্ৰামের উদ্দেশ্যে নিজেকে উৎসর্গ করার সঙ্কল্প নেন। 






এই সময় বিপ্লবীদের সামরিক শিক্ষার সাথে সাথে চলতে থাকে হিন্দু ধর্মশাস্ত্র পাঠ এবং আধ্যাত্মিক চেতনা জাগ্রত করার কাজ। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে অর্থ সংগ্ৰহের জন্য কয়েকজন স্বদেশীর তারকেশ্বরে ডাকাতি করার কথা শুনে যতীন্দ্রনাথ ক্ষুব্ধ হন। এই সময়ে তাঁর আদর্শ, নীতি, শৃঙ্খলা নিয়ে সমিতির প্রমুখ নেতৃবৃন্দের সাথে মতবিরোধ গড়ে উঠেছিল।   যতীন্দ্রনাথ অনুভব করলেন যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জনের জন্য তার একজন গুরুর সাহায্য প্রয়োজন এবং তাই তিনি একজনের সন্ধান করতে লাগলেন।  সোহম স্বামী যতীন্দ্র নাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আধ্যাত্মিক সাফল্যে খুব খুশি হয়েছিলেন এবং তাই তাকে শ্রীমৎ নিরালাম্বা স্বামী নামে পুনঃনামকরণ করলেন । কিন্তু তিনি পরবর্তীকালে নিরালাম্বা স্বামী নামেই জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন । 




সিপাহী বিদ্রোহ,  আদিবাসীদের বিদ্রোহের স্বপ্ন দেখাতেন যতীন্দ্রনাথ।  তাই বনেজঙ্গেলে ঘেরা এই আশ্রম সংলগ্ন জমিতে আদিবাসীদের এনে বসতি স্থাপন করান। উদ্দেশ্য ছিল,  ব্রিটিশ ভারতের এই অঞ্চলটুকু মুক্তাঞ্চলরূপে গড়ে তোলা। ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারে রোষানলে দগ্ধ হয় সাঁওতালরা। বিদ্রোহের আগুন ধিকি ধিকি জ্বলেছিল তাদের মনে। তাই সাঁওতালদের এনে যতীন্দ্রনাথ সাজিয়েছিলেন নিজ দুর্ভেদ্য দুর্গ। অস্ত্র লুকিয়ে রাখা, ফেরার বিপ্লবীদের আশ্রয়দান, বিভিন্ন বিপ্লবী অভ্যুত্থান পরিকল্পনা করতে দু দশকের বেশি সময় ধরে ব্যস্ত ছিল এই চেন্না আশ্রম।  এছাড়া এই সময় রাজনৈতিক ডাকাতি, ব্রিটিশ গুপ্তেচর হত্যা....... এমন নানা ঘটনার ঘনঘটায় আলোরিত এক নবযুগের সূচনা হয়েছিল এই বাংলায়। এ অগ্নিনির্ঝর সময়ের রণশিঙা যিনি বাজিয়েছিলেন, ধর্মপ্রচারের আছিলায় দেশীয় রাজাদের বিদেশী শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আগুন যিনি প্রজ্বলিত রেখেছিলেন,  সেই সন্ন্যাসীর বিপ্লব প্রচেষ্টা সম্পর্কে দেশবাসী কি কখনও জানবে?? তিনি কি কেবলই এক হিন্দু সন্ন্যাসী হয়ে থেকে যাবেন ইতিহাসে ??



গলসির চান্না গ্রামে আশ্রম তৈরি করে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড চালাতে থাকেন যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় । সংযম, ধৈর্য্য, সাহস, সহিষ্ণুতা, ক্ষমতা, ক্ষমা, ভক্তি বা নিষ্ঠা, সহমর্মিতা এই নীতিগুলিকে ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল এই আশ্রম । মূলত সেই সময় রেলপথে ভালো যোগাযোগের জন্যই খানা জংশনের অদূরে আশ্রম করার কথা চিন্তাভাবনা করেন তিনি । এছাড়া পাশেই খড়ি নদী থাকায় সহজে নদী টপকে বিপ্লবীরা আত্মগোপন করতে পারতেন । আর হাঁটা পথে সেই আশ্রমে যাওয়ার সেভাবে সুযোগ না থাকায় সহজে ব্রিটিশ পুলিশ আশ্রমে পৌঁছতে পারত না । সেই সুযোগে বিপ্লবীরা সেখানে বৈঠক করতে পারতেন।




নিরিবিলি একটা আশ্রম । কোথাও কেউ নেই । আশ্রমের মধ্যে থাকা দুটো মাটির বাড়িরও অবস্থা খারাপ । বাড়ির দরজা ভাঙা । আশ্রমের পাশ দিয়ে বয়ে গিয়েছে খড়ি নদী । ঠিক যেন ভুতুড়ে পরিবেশ । অথচ এই আশ্রমই একদিন হয়ে উঠেছিল বিপ্লবীদের গোপন ডেরা ।    লোকমুখে জানা যায়, এই চান্না আশ্রমে এসেছিলেন ভগত সিং, ভগত সিংয়ের বাবা কিষেণ সিং, বটুকেশ্বর দত্ত, লালা লাজপত রায়, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, বারীন্দ্রনাথ ঘোষ, অরবিন্দ ঘোষ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলি, রাসবিহারী বসু, জীবনতারা হালদার, যদুগোপাল মুখোপাধ্যয়, সোহং স্বামী, তিব্বতি বাবা, প্রজ্ঞান পাদজী (যোগেশ্বর চট্টোপাধ্যায়), ফকির রায়ের মতো বহু স্বাধীনতা সংগ্রামী। দিনের পর দিন রাতের পর রাত জেগে তাঁরা দেশকে স্বাধীন করার পরিকল্পনা করেছেন চান্না আশ্রমে বসে। আজ সেই আশ্রম ধ্বংসের মুখে।  





কলকাতার কাছে মুরারিপুকুরে ছিল অরবিন্দের বাবা ডা: কৃষ্ণধন ঘোষের বাগানবাড়ি। ১৯০২ সালে সেখানে বসেই এক গুপ্ত সমিতি গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের " আনন্দমঠ " কে  বাস্তবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় মনোনিবেশ করেন অরবিন্দের সহযোদ্ধা যতীন্দ্রনাথ।  কিন্ত অরবিন্দের ভাই বারীনের সাথে তাঁর মতান্তর হয়। তাই সঙ্গ ত্যাগ করে বর্ধমানে চলে আসে। তারপর গলসিতে অরন্যে ঘেরা এলাকায় তাঁর শক্তিকেন্দ্র স্থাপন করেন।  যতীন্দ্রনাথ জীবিত থাকাকালীনই এই গুপ্ত সমিতি সম্পর্কে ত্রাস সৃষ্টি হয়েছিল  স্থানীয় স্তরে। সেই অগ্নিনির্ঝর দিন আর নেই।  তবে চান্নার সেই আশ্রম আজও আছে এক বিরাট দন্যদশায়। 


ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে ১৯০৭ থেকে ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ ওরফে স্বামী নিরালম্ব এই আশ্রম তৈরি করেছিলেন।  ১৯০২ সালে সহকর্মী বিপ্লবীদের সাথে মতান্তর হলে যতীন্দ্রনাথ উত্তরভারতের এলাহাবাদের সোহেল স্বামীর সান্নিধ্য লাভের পর শ্যামাকান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে দীক্ষা নিয়ে নিজের মায়ের সাথে দেখা করতে চান্না গ্ৰামে ফিরে আসেন ও আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। তবে চান্না আশ্রমকে আমরা আশ্রম হিসেবে জানলেও আদতে ওটা ছিল বিপ্লবীদের আখড়া। সারারাত চলত বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ ও বিপ্লবীদের আলোচনা। ওখান থেকেই বিপ্লবের সুত্রপাত।   বহু বিপ্লবী এসে আঁখড়ায় ওঁর শিষ্যত্ব গ্রহন করেছিলেন। 




রীতিমত একসময় প্রবাদ হয়ে উঠেছিল একটি বাক্য  ----- " যে যাবে চান্না, ঘরে উঠবে কান্না "। ফলে ব্রিটিশ পুলিশের চরিত্রের জন্য নূন্যতম সাহস কেউ করত না। কিন্ত কিভাবে গড়ে উঠল যতীন্দ্রনাথের এমন ব্রিটিশ বিরোধী মনস্তত্ত্ব। এর উত্তরটা এইরকম  ....... " যতীন্দ্রনাথের দূরন্তপনার নানা ঘটনা গ্রামবাসীদের মধ্যে এখনও জনশ্রুতির মত চালু রয়েছে। একবার তাঁর বাবা কালিদাস বন্দোপাধ্যায় স্থির করলেন ,  যতীনের মন শান্ত করতে মহানগর শ্মশানে আসা এক কালীসাধকের কাছে তিনি নিয়ে যান। সব শুনে সাধুবাবা একটি রক্তাক্ত দিলেন। যতীন তখন পাথরের মত শান্ত।  সাধুকে বললেন,  " শুনেছি আপনি এত মহান, বুলেটও আপনাকে স্পর্শ করে না। সত্যি কি? " রাশভারি সাধুর জবাব  "হ্যা" । তখনই যতীন্দ্রনাথ লুকানো একটা পিস্তল বার করে বলে উঠলেন " বেশ, তবে একটু পরখ করে দেখবো।" আঁতকে উঠে দোড় লাগিলেন সাধু। আশপাশে সবাই চমকে উঠলেন। কালিদাস বাবু টেরই পাননি বাড়ি থেকে কখন তার লাইসেন্স অস্ত্রের নিজের জিম্বায় নিয়েছিলেন দুরন্ত যতীন।এই রকম আরও অনেক সাহসিকতার ঘটনার জন্য যতীন্দ্রনাথকে আজও ঘরের ছেলে বলে মনে রেখেছে চান্না গ্ৰাম। 



ভারতবর্ষের বিশেষ করে বাংলার যে সব স্বাধীনতা সংগ্ৰামীর জীবনের অধিকাংশ অধ্যায় নানা কারণে অনাদরে অবহেলায় ক্ষিতির অতল তলে তলিয়ে গেছে তাদেরই  একজন  হলেন বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। এই মহামানবকে অনেকেই    “অগ্নিযুগের ব্রহ্মা” নামে আখ্যায়িত করেন। ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (স্বামী বিবেকানন্দের ভাই) বর্ধমানে এক ছাত্র সম্মেলনে ভাষন দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “তোমরা নেতা খুঁজে বেড়াচ্ছো কোথায়? বিপ্লবের বড়দা বসে আছেন চান্নায়। যাও তাঁর কাছে।“


গ্ৰামের মানুষের কাছে সরকারের কিছু সুযোগ সুবিধা পৌঁছালেও এই আশ্রমটিকে নিয়ে বিশেষ কেউই চিন্তিত নন।  স্বাধীনতার পর থেকে কোনো  সরকার কেউই এই বিষয়ে বিশেষ উদ্যোগ নেয় নি, বরং প্রতিবছরই যতীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে যে ছোট অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়, সেখানে স্থানীয় এবং রাজ্যস্তরের নেতৃবৃন্দ এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে চলে যান। তাই ভারতের স্বাধীনতা সংগ্ৰামের স্মৃতিচিহ্ন স্বরূপ “আশ্রম চান্না” আজ বিপন্ন এবং ধ্বংসের মুখে। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা বলে থাকেন "এই গ্রামের মাটিতে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু থেকে অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীর পদধূলি পড়েছে।এটাই আমাদের গর্ব"। তাদের অভিযোগও আবার রকম......প্রতিবছরই স্বাধীনতা দিবস  পালন করা হয়। ।কিন্তু যাদের জন্য স্বাধীনতা এই ইতিহাসকে ছোঁয়া সেই 'ভিটেই'ই রক্ষার কোনো উদ্যোগই নেওয়া হয়না।




দেশবাসীর প্রতি তাঁর আহ্বান ছিল  :::
সকলে জেগে উঠুক এবং আত্ম-চেতনা উপলব্ধি করুন।নিজেকে চিনতে হবে। নিজেকে চিনতে না পারলে দেশকে চিনবে কি করে ??  দেশের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে শক্তিশালী হতে হবে।  আর নিজেকে শক্তিশালী করতে হলে আত্ম-ঞ্জান অর্জন করতে হবে। আত্মশক্তিই মানুষকে কঠিন মরুভূমি বা পাহাড়ের অতিক্রম করতে বাধ্য করে। আত্মশক্তির অধিকারী একটি জাতির পক্ষে কিছুই অসম্ভব নয়।







কেবলমাত্র বিপ্লবী বললে তার পরিচয় দেওয়া হয় না। বিংশ শতকের শুরুতেই বাংলার বুকে যে বিপ্লবের আগুন জ্বলেছিল,  তা নিজের কর্মে ধর্মে ধারন করেছিলেন যতীন্দ্রনাথ। অরবিন্দ ঘোষকে তিনিই নিয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী রাজনীতির মঞ্চে। বিপ্লবীদের আশ্রয়, অস্ত্র দিয়ে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন।  অথচ অগ্নিযুগের স্থপতি হিসাবে নিজে চিরকাল রয়ে গেছেন অন্তরালে।

কলকাতার বরানগরের গৌরিশঙ্কর লেনে রয়েছে যতীন্দ্রনাথের এক ফলক। শোনা যায়, ১৪২৮ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে এসেছিলেন স্বয়ং ভগত সিং। সেখানেই তাঁর সাথে পরিচয় হয়েছিল যতীন্দ্রনাথের। শোনা যায় বিপ্লবগুরু এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন। 

বর্ধমান থেকে খানা জংশন কিংবা  কুলগোড়িয়া বাজার থেকে প্রায় পাঁচ কিমি সোজা রাস্তা এগোলেই পাবেন চান্না গ্ৰাম আর খড়ি নদী। নদীর পারেই রয়েছে চেন্না আশ্রম।  চলুন দেশের এই সব স্বাধীনতা সংগ্ৰামীদের শ্রদ্ধা জানাতে আমরা ঘুরে আসি চেন্না গ্রামের প্রায় ২৫ বিঘে জমির উপর জঙ্গলে ঘেরা স্বাধীনতার আঁতুর ঘর হিসেবে পরিচিত এক গৌরবময় ইতিহাসের সাক্ষী " নিরালম্ব  আশ্রম  "।



Wednesday, 25 October 2023

জিরাটের দ্বিভূজা দুর্গা

 



বলাগড় পাটুলির দ্বিভূজা দুর্গার বৌদ্ধতন্ত্রাচারে পূজো 

দুর্গাপূজা বা দুর্গোৎসব হলো  দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে ভারতের প্রধান হিন্দু উৎসব। দুর্গাপূজা মূলত দশ দিনের উৎসব, যার মধ্যে শেষ পাঁচটি দিন সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ। আশ্বিনের নবরাত্রির পূজা শারদীয় পূজা এবং বসন্তের নবরাত্রির পূজা বাসন্তিক  বা বসন্তকালীন দূর্গাপূজা নামে পরিচিত।  পশ্চিমবঙ্গে দুর্গোৎসব মূলত: কালিকা পুরাণ বর্নিত পদ্ধতি নির্ভর। হিন্দুশাস্ত্র অনুসারে, শরৎকালে দেবতারা ঘুমিয়ে থাকেন । তাই এই সময়টি তাদের পূজোর যথাযথ সময় নয়। অকালের পূজো বলে এই পূজোর নাম হয় " অকালবোধন "। তবে রামায়ণের প্রকৃত রচয়িতা বাল্মীকি মুনি রামচন্দ্রকৃত দুর্গাপূজার  কোনো উল্লেখ করেননি। কৃত্তিবাস রামায়ণ অনুসারে , রাবণ ছিলেন শিবভক্ত।  মা পার্বতী তাকে রক্ষা করতেন। তাই ব্রহ্মা রামকে পরামর্শ দিলেন পার্বতীকে পূজা করে তাকে তুষ্ট করতে । তাতে রাবণ বধ রামের পক্ষে সহজ হবে। ব্রহ্মার পরামর্শে রাম শরৎকালে পার্বতীর দুর্গতিনাশিনী রূপের বোধন, চণ্ডীপাঠ,  মহাসপ্তমী, মহাষ্টমী, সন্ধিপূজা ও মহানবমীর ও  দশমীর পূজো করেন। দেবী পার্বতী  রামের পূজোয় সন্তুষ্ট হয়ে রামকে কাঙ্ক্ষিত বর দেন।  সেই থেকেই শরৎকালে দুর্গোৎসব হয়ে আসছে।


পারিবারিক স্তরে দুর্গাপূজা প্রধানত ধনী পরিবারগুলোতেই আয়োজিত হয়।  এই ধনী পরিবারগুলোর দুর্গাপূজা " বোনেদি  বাড়ির পূজা " নামে পরিচিত।  এই পূজোগুলিতে শাস্ত্রাচার পালনের উপরেই বেশি জোর দেওয়া হয়। অন্যদিকে আঞ্চলিক স্তরে অঞ্চলের বাসিন্দারা যৌথভাবে যে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন তা " বারোয়ারি " পূজা নামে পরিচিত। 


আঞ্চলিক ভেদে প্রাচীন বোনেদি এই সব পূজোগুলিতে দেখাযায় দেবীর রূপবৈচিত্র, ব্যতিক্রমী আচার ও পুজোপদ্ধতি। হুগলি জেলার বলাগড় ব্লকের পাটুলিতে এমনই এক ব্যতিক্রমী দুর্গাপুজো হয়ে আসছে কয়েকশো বছর ধরে। পাটুলির মঠবাড়ির সেই দ্বিভুজা দুর্গার প্রচলিত নাম মঠের মা। 

অতীতে  গ্রামে কংসাবতী নামের এক নদী বয়ে যেত।গ্রামে কুয়ো, পুকুর এমনকী বাড়ির ভিত খুঁড়তে গিয়েও নৌকার ভাঙা অংশ, হাল, পাটাতন পাওয়া গিয়েছে।  বৌদ্ধ যুগে এটি ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতির পীঠস্থান।এখানে ছিল একটি প্রাচীন বৌদ্ধমঠ,যার ধ্বংসাবশেষএলাকার প্রবীণরা দেখেছেন।



পাটুলির মঠবাড়ির পুজো নিয়ে শোনা যায় একাধিক কাহিনি।অতীতে পাটলিপুত্র ছিল বৌদ্ধ সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থান। বৌদ্ধশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে এই গ্রামে গড়ে উঠেছিল একটি বৌদ্ধমঠ। পরবর্তী কালে বৌদ্ধধর্মের অবক্ষয়ের ফলে বহু বৌদ্ধতান্ত্রিক দেব-দেবী হিন্দু লৌকিক দেব-দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছিলেন। খুব সম্ভবত এই মঠবাড়িটি যে বৌদ্ধতান্ত্রিক সম্প্রদায়ের সাধনস্থল ছিল,তাঁদেরআরাধ্য বৌদ্ধ দেবীপরবর্তী কালে দেবী দুর্গার সঙ্গে মিশে যান।তাইদুর্গাপুজোর পদ্ধতির মধ্যে বেশ কিছু তান্ত্রিক প্রভাব রয়ে গিয়েছিল। ঐতিহাসিকদের মতে মঠবাড়ির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বৌদ্ধতান্ত্রিক। আজও মঠবাড়ির পুজোয় দেখা যায় বৌদ্ধতন্ত্রাচারের বিবর্তিত রূপ।


জন্মাষ্টমীর  দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়েই প্রতিমা তৈরি শুরু হয়। আজও বংশপরম্পরায় মৃৎশিল্পরা মূর্তি নির্মাণ করনে। দেবীর সামনের দুটি হাত শুধু দেখা যায়। বাকি আটটি হাত ,যা আঙুলের মতন , চুলে ঢাকা থাকে। দেবীর গায়ের রং শিউলি ফুলের বোটার মতন। ডাকের সাজে সজ্জিত প্রতিমার চোখ বাঁশপাতার মতো। দেবীর ডান দিকে কার্তিক, আর বাঁ দিকে গণেশ। দেবীর বাহন পৌরাণিক সিংহ। তবে গায়ের রং সাদা। এই পূজোয় সন্ধিপূজো হয় না। হয় অর্ধরাত্রি পূজো। সপ্তম ও অষ্টমী সন্ধিক্ষণে এই পূজো হয়। অতীতে দেবীর উদ্দেশ্যে অর্ধরাত্রি পূজোতে নরবলি দেওয়ার প্রথা ছিল।  বলির মানুষটি নাকি সেচ্ছায় আসতেন। ইংরেজ আমলে এই প্রথা নিষিদ্ধ হয়।  পরে পাঁঠা বলি হত।  বলির পর সেই পাঁঠার ছাল ছাড়িয়ে টুকরো টুকরো মাংসের সাথে মাসকলাই  ও দূর্বা দিয়ে চৌষট্টি যোগিনীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হত। এখন চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি নর মূর্তি বলি দেওয়া হয়। বলির পর তা একই উপায়ে নিবেদন করা হয়।অতীতে তালপাতার পুঁথি দেখে পূজো হত। সেটি আংশিক নষ্ট হয়ে যাওয়ায় তা থেকে পুনরুদ্ধার করে এখন পূজো করা হয় এবং আসল তালপাতার পুথিটি সিন্দুকে  রক্ষিত আছে।




সেই সময় এই অঞ্চল জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল।  আবার এ পরিবার এক  আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটাতো। এর মধ্যে দেবীর স্বপ্নাদেশ হল ,  যা কিছু সহজলভ্য তা দিয়েই ভোগ নিবেদন করতে। তখন থেকেই সাদা ভাত,  নানারকম সব্জি ভাজা, মোচা, থোড়,  কচুশাক,  চালতার টক ইত্যাদিসহ ভোগ দেওয়া হয়ে থাকে। প্রতিবছর দশমীর বিকেলে দেবীবরনের পর ২০ থেকে ২৫ জন বেয়ারা প্রতিমাকে নিয়ে ৩ কি মি দূরে গঙ্গার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন।  বেয়ারাও বংশপরম্পরায়  এই কাজ করে আসছেন।  যাত্রা পথে বিভিন্ন যায়গায় প্রতিমাকে নামানো হয় এবং স্থানীয় বৌ -রা সিঁদুর আলতা দেন। প্রথানুযায়ী গঙ্গার ঘাটে মঠের  মা-র বিসর্জন প্রথম হয় এবং পরে অন্য সব ঠাকুর বিসর্জন হয়। আজও নৌকা করে মাঝগঙ্গায় প্রতিমা নিরঞ্জনের সাবেক রীতি বজায় আছে।



এখানে আসতে হলে ব্যান্ডেল  কটোয়া    লাইনের ট্রেনে করে জিরাট ষ্টেশনে নামতে হবে। ব্যান্ডেল স্টেশনের পর  জিরাট  ষষ্ঠ স্টেশন। সেখান থেকে অটো বা টোটোতে করে মঠ বাড়ির কথা বললে যে কেউ নিয়ে আসবে। সড়কপথে এলে ব্যান্ডেল এর পর দিল্লীর রোড হয়ে মগড়া ফ্লাই  ওভার পেড়িয়ে স্টেট হাইওয়ে ৬ ধরে জিরাট স্টেশনের দিকে আসতে হবে। জিরাট বাজারে জিঞ্জাসা করে সহজেই আপনি মঠ বাড়িতে আসতে পারেন।  ব্যান্ডেল থেকে দূরত্ব ২৪ কি মি। গাড়িতে সময় লাগে ৪০ মিনিটের মতন।

বোনেদি  বাড়ির  পুজোর  সঙ্গে  জড়িয়ে  আছে  নানা কিংবদন্তি,  ইতিহাস আর  পরম্পরা।  এখন  হয়তো  আগের  মত  সেই  চোখ-ধাঁধানো জৌলুস  নেই,  ঠিকই।  কিন্তু  এই  সব  বাড়িতে  পুজো  হয় অতীতের  পরম্পরা  মেনে,  নিষ্ঠা  সহকারে।  বাড়ির  বেশির  ভাগ  সভ্য-সভ্যারা  কলকাতার  অন্যত্র,  বাংলার  বাইরে  এমন  কি বিদেশেও  থাকেন।  তাঁরা  পুজো  উপলক্ষ্যে  এক  সঙ্গে  মিলিত হন।  এই  সব  বাড়ির  সাবেকি  পুজোতে  উপস্থিত  হলে  আপনি হয়তো  পৌঁছে  যাবেন  সুদূর  অতীতে।       



Saturday, 14 October 2023

ছিটমহলের পরিচিতি

  


ছিটমহল বা enclave ভৌগলিক সীমানা থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু ভূখন্ড  যা অন্য দেশের মধ্যে একটি দেশের বিচ্ছিন্ন অঞ্চল হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। কোনো দেশের ছিটমহল গুলি সাধারণত সীমান্তের উল্টো দিকে থাকে। এগুলি আসলে বিচ্ছিন্ন কিছু জনপদ মাত্র। তাই ছিটমহল গুলি অন্য কোন রাজ্য দ্বারা সম্পূর্ণ বা কখনও কখনও আংশিক ভাবে পরিবেষ্টিত। ভ্যাটিকান সিটি এবং সান মেরিনো উভয়েই ইতালি দ্বারা পরিবেষ্টিত । লেসোথো হলো দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বারা পরিবেষ্টিত ছিটমহল রাষ্ট্র। 





ইংরেজ শাসনের অবসানের পর ভারত ভাগের সময় কোচবিহারের রাজা কোচের জমিদারির আটটি থানা পূর্ব পাকিস্তানের মধ্যে চলে যায়। আর কুচবিহার চলে আসে ভারতের মধ্যে। তাই কিছু ভূখন্ড চলে যায় বাংলাদেশের মধ্যে আর কিছু ভূখন্ড চলে আসে আমাদের ভারতে। এই ধরনের ভূমি বা জমিজমাকে ছিটমহল বলে। ভারত বাংলাদেশের এই ধরনের ১৬২টি ভূখন্ড ছিল। এরমধ্যে ১১১ টি ছিটমহল ভারতের যা বাংলাদেশের দিকে অবস্থিত। এর আয়তন ১৭ একরের একটু বেশি। বাকি ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল হল ভারতের দিকে। এগুলির আয়তন ৭১১০ একর। এই ৫১টি ছিটমহলের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে ৪৭টি ও জলপাইগুড়ি জেলায় ৪টি ছিটমহল অবস্থিত। ২০১৫ সালে আগষ্ট মাসে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে ছিটমহল বিনিময় চুক্তি দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বারা স্বাখ্খরিত হয়েছিল।






তিনবিঘা করিডোর হল ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে একটি সতন্ত্র ভূমি যা ভারতের মালিকানাধীন তিন বিঘা জায়গার মধ্যে অবস্থিত। ২০১২ সালে বাংলাদেশের দহগ্রাম -আঙ্গারাপোতা ছিটমহল যাতায়াতের সুবিধার্থে এটি বাংলাদেশকে ইজারার মাধ্যমে দেওয়া হয়। এটি পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার মেখলিগঞ্জ মহকুমা ও বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার সীমান্তে অবস্থিত।





নাম কেন ‘তিনবিঘা’?

বাংলা আয়তন পরিমাপের একটি একক হলো ‘বিঘা’ এবং এই ভূমিটির মোট আয়তন ১,৫০০ থেকে ৬,৭৭১ বর্গমিটার (১৬,১৫০ থেকে ৭২,৮৮০ বর্গফুট) যা তিন বিঘা পরিমাপের সমান; এ থেকে ‘তিনবিঘা’ নামের উৎপত্তি।





১৬ মে ১৯৭৪-এর ইন্দিরা গান্ধী-শেখ মুজিবুর রহমান চুক্তি অনুসারে ভারত ও বাংলাদেশ তিনবিঘা করিডোর (১৭৮ বাই ৮৫ মিটার (৫৮৪ ফু × ২৭৯ ফু)) ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর (৭.৩৯ বর্গকিলোমিটার (২.৮৫ বর্গমাইল)) সার্বভৌমত্ব পরস্পরের কাছে হস্তান্তর করে। এরফলে উভয়দেশেই তাদের ছিটমহলে যথাক্রমে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ও দক্ষিণ বেরুবাড়ীর যাতায়াত সুবিধা তৈরি হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ চুক্তি অনুসারে সাথে সাথেই দক্ষিণ বেরুবাড়ী ভারতের কাছে হস্তান্তর করে। তবে ভারত তিনবিঘা করিডোর বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করতে ভারতের সাংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন ছিল, যা রাজনৈতিক কারণে সম্ভব হয়নি।


১২ নং দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়নের  ১১.২৯ বর্গকিলোমিটার  বাংলাদেশ পেয়েছিল। এছাড়াও পূর্বের ভাগ অনুসারে কোচবিহারের চারটি ছিটমহল বাংলাদেশে পড়েছিল যার আয়তন ৬.৮৪ বর্গকিলোমিটার । ১৯৬৭ সালের হিসেব অনুযায়ী এই ভূখন্ডগুলোর মোট জনসংখ্যার ৯০%ই ছিল হিন্দু ধর্মাবলম্বী। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের ছিটমহল দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা ভারতে হস্তান্তরের কথা ছিল। যার মোট আয়তন ১৮.৬৮ বর্গকিলোমিটার । ১৯৬৭ সালের হিসেব অনুযায়ী মোট জনসংখ্যার ৮০% ছিল মুসলমান। যদি এই হস্তান্তর সফল হতো তাহলে এটি জাতিগত দাঙ্গা সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকত। ফলে তখন বেরুবাড়ীর জনগণ এই হস্তান্তরের বিরোধিতা করেছিল



১৯৭১ এর পর ভারত বাংলাদেশকে প্রস্তাব দেয় বেরুবাড়ীর অর্ধাংশ ভারতের অধীন থাকবে এবং দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা বাংলাদেশেই থাকবে। এই চুক্তি অনুসারে ভারত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীর বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডের সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য একটি তিনবিঘা আয়তনের জায়গা ইজারা হিসেবে দিয়েছিল। এটি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত হয়েছিল এবং তিনবিঘার চারপাশে সতর্কতার সাথে বেষ্টনী দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭৪ সালের ১৬ই মে ইন্দিরা গান্ধী ও শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত বেরুবাড়ী  বিরোধের অবসান ঘটে। চুক্তি অনুসারে: "ভারত দক্ষিণ বেরুবাড়ীর দক্ষিণাংশের অর্ধেক নিয়ন্ত্রণ করবে যার আনুমানিক আয়তন ৬.৮ বর্গকিলোমিটার  এবং বিনিময়ে বাংলাদেশ দহগ্রাম-আঙ্গরপোতা নিয়ন্ত্রণ করবে। ভারত দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাবাসীদের বাংলাদেশের মূল ভূখন্ডের সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৭৮ বাই ৮৫ মিটার (৫৮৪ ফু × ২৭৯ ফু) আয়তনের একটি ভূমি বাংলাদেশকে ইজারা হিসেবে দেবে।" 





দহগ্রাম ইউনিয়ন বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার একটি ইউনিয়ন ও বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ছিটমহল, যা ভারতের মূল ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত। এর তিন দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের কোচবিহার জেলা, একদিকে তিস্তা নদী, নদীর ওপারেও ভারতীয় ভূখণ্ড। ভৌগোলিক কারণে এটি দহগ্রাম-আঙ্গোরপোতা ছিটমহল নামেই বেশি পরিচিত। এ ইউনিয়নের মোট আয়তন ২২.৬৮ বর্গ কিমি. ও মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০,০০০ জন। ১৯৮৫ সালে দহগ্রাম ও আঙ্গরপোতা ছিটমহল একত্রে পাটগ্রাম উপজেলার একটি স্বতন্ত্র ইউনিয়ন (দহগ্রাম ইউনিয়ন) হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ আগস্টে এখানে ইউনিয়ন পরিষদের উদ্বোধন করা হয়।




Berubari is a village in Jalpaiguri Block, Jalpaipuri District, West Bengal, India . এটি বাংলাদেশের সীমান্তের কাছে অবস্থিত, জেলা এবং ব্লকের রাজধানী জলপাইগুড়ি থেকে প্রায় 12.7 কিলোমিটার দক্ষিণে। 2011 সালে, এর মোট জনসংখ্যা 41,593 জন।


  • মুজিব-ইন্দিরা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়: ১৬ মে, ১৯৭৪ সালে।
  • চুক্তি কার্যকর: ১ আগস্ট, ২০১৫ সালে।
  • চুক্তি অনুমোদনে সংশোধনী: বাংলাদেশের ১৯৭৪ সালের ৩য় সংশোধনী আনে সিটমহল সমস্যা সমাধানে।
  • ভারতের ২০১৫ সালের ১০০তম সংশোধনী করা হয়।
  • ভারতে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের মোট আয়তন ছিল-৭,১১০ একর।
  • বাংলাদেশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের মোট আয়তন ছিল- ১৭,১৫৮.৭৫ একর।
  • ছিটমহল বিনিময়ের ফলফল: বাংলাদেশের সাথে যুক্ত হয়েছে- ১০,০৪১.২৫ একর ।
  • প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় কুড়িগ্রামের দশিয়ারছড়া ছিটমহলে ।
  • দশিয়ারছড়া ছিটমহলের বর্তমান নাম- মুজিব-ইন্দিরা ইউনিয়ন ।
  • বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায়- ৯৭৯ জন ভারত থেকে কেউ আসেনি



কুচলিবাড়ীর একমাত্র স্থল যোগাযোগের মাধ্যম তিন বিঘা করিডোরঃ-বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ড থেকে তিনবিঘা করিডোরে ঢুকে সামান্য কিছুদূর এগুতেই ভারতের মূল ভূ-খন্ড থেকে অপেক্ষাকৃত প্রশস্থ আরেকটা পিচ ঢালা রাস্তা তিনবিঘা করিডোরে ঢুকে বাংলাদেশের রাস্তাটি ক্রস করে কুচলিবাড়ী চলে গেছে। ভারতের মূল ভূ-খন্ডের সাথে কুচলিবাড়ীর লোকজনের স্থল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এই রোডটি। অর্থাৎ ভারতের মূল ভূ-খন্ডের সাথে কুচলিবাড়ীর লোকজনের স্থল যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যমও তিনবিঘা করিডোর।



তিনবিঘা করিডোরের চার মাথা

কারণ তিস্তা নদী ভারতের চর খড়খড়িয়াতে বাঁধা পেয়ে এর বড় মুখটা চর খড়খড়িয়ার ডান পাশ দিয়ে বাংলাদেশের দহগ্রামে ঢুকে পড়েছে। আর ছোট মুখটা চর খড়খড়িয়ার বাম পাশ দিয়ে সরাসরি বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ডে ঢুকেছে। ওদিকে তিস্তার বড় মুখটা দহগ্রাম থেকে বের হয়ে আবার চর খড়খড়িয়ার ডান পাশ দিয়ে ভারতীয় ভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে সরাসরি বাংলাদেশের মূল ভূ-খন্ডে স্থায়ীভাবে ঢুকে পড়েছে। তিনবিঘা করিডোর ছাড়া কুচলিবাড়ীর লোকজনকে হলদিবাড়ী বা ভারতের মূল ভূ-খন্ডে যেতে হলে জলপথ(দুই বার তিস্তা পার হতে হবে)ছাড়া কোন পথ নেই। সেখানে কুচলিবাড়ীর লোকজনকে একবার তিস্তা নদী পার হয়ে চর খড়খড়িয়াতে যেতে হবে। আবার চর খড়খড়িয়া থেকে মূল তিস্তা পার হয়ে হলদিবাড়ী বা ভারতের মূল ভূ-খন্ডে প্রবেশ করতে হবে।





২০১১ সালের পূর্বে দহগ্রাম-আঙ্গরপোতাতে কোন হাসপাতাল  বা কলেজ ছিল না। ২০১১ সালের ১৯শে অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দহগ্রামে একটি দশ শয্যার হাসপাতাল ও দহগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের উদ্বোধন করেন।




১৯৭৪ সালে ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি অনুযায়ী তিনবিঘা দিয়ে যাতায়াতের সুযোগ পেয়েছিলেন বাংলাদেশের নাগরিকরা। তিনবিঘা সংগ্রাম কমিটির সম্পাদক ছিলেন পরেশ অধিকারী। তিনি জানান, ১৯৮১ তে সুধীর রায় জমি জরিপ সংক্রান্ত আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। ১৯৯২ সালে মারা যান ক্ষীতেন অধিকারী ও জীতেন রায়। তিনবিঘার ৯৯৯ বছরের লিজের প্রতিবাদ করতে গিয়ে এঁদের মৃত্যু হয়।