Thursday, 8 May 2025

বিদেশী সাহেব

 


অবশেষে শ্রীমান সাহেব চক্রবর্তী ধরাধামে এলেন। তবে নিজের দেশে নয়, বিদেশে। তাই তো তিনি বিদেশী সাহেব। আসার কথা ছিল  আরও কয়েক দিন পরে। কিন্ত কয়েকদিন আগেই চলে এসেছেন। হয়তো মায়ের কাছে ঐ জায়গাতে থাকতে থাকতে হাপিয়ে উঠে নানা চিন্তা ভাবনা নিয়ে বেড়িয়ে এলেন সবার সাথে পরিচিত হতে। সৌন্দর্য্যপূর্ন এই পৃথিবীর রুপ কেই বা না দেখতে চায়। এছাড়া মাতৃগর্ভে তার বাস .......কতদিন আগে থেকেই আরম্ভ হয়েছে। মাতৃগর্ভে আসার পর থেকে সৃষ্টিকর্তা তাকে নানা ভাবে সাজিয়ে চলেছেন।  সৃষ্টিকর্তা প্রজাপতি নিজেই  এই দায়িত্ব নিয়ে জীবের নিজস্ব কাজকর্মের ফল স্বরূপ যে পাপপুণ্য অর্জন করেছে তা তার কপালে লিখতে আরম্ভ করে দিয়েছেন।  এর জন্যই তো কারও রাজকুলে জন্ম হয় বা কারও দরিদ্র কুলে। কেহ বা খর্বাকৃতি আবার সৌমদর্শন হয়ে থাকে। এ যেন এক বৈচিত্র্যের খেলা । কারও সাথে কারও মিল নেই ।

মায়ের কাছে  ভ্রুন হিসেবে আসা। পাঁচ রাত্রে পেশি, চৌদ্দরাত্রে অব্বুর্দ,  পঁচিশ রাতে অস্থি, এক মাসে আকৃতি, দুই মাসে মাথা, তিন মাসে গলা, চার মাসে গায়ের চামড়া,  পাঁচ মাসে নখ ও লোম, ছয় মাসে মুখ, কান ও চোখ, সাত মাসে বুদ্ধি, নয় মাসে সর্বাঙ্গ অবয়ব তৈরি হয়। নয় বা দশ মাসে মায়ের পেটেই জীবনের সব লক্ষনই প্রকাশ পেয়ে যায় । তখন মায়ের খাবার থেকেই খাওয়া দাওয়া সেরে ফেলা। সেইজন্যই মাকে সবসময় উপযুক্ত খাবার খেতে হয় সুস্থ ও সবল থাকার জন্য।  আর সেইজন্যই শাস্ত্রে বিধানে তৈরি হয়েছে পঞ্চমৃত,  সপ্তামৃত বা সাদভক্ষন প্রভৃতি নানারকম অনুষ্ঠান। এগুলি বাঙালিদের গর্ভাবস্থা কালীন ঐতিহ্যবাহী আচার অনুষ্ঠান।  এর মধ্যে সাধভক্ষন অনুষ্ঠান বিশেষ ভাবে প্রচলিত।  এ শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, অন্য প্রদেশেও অন্য নামে এ বহুল প্রচলিত। গর্ভধারনের সাত মাস পূর্ন হলে আট বা নয় মাসে মায়ের ও সন্তানের সুস্বাস্থ্য কামনায় মাকে ভালো ভালো জিনিস খাওয়ানোর প্রথাকেই বলা হয় সাধভক্ষন।  শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায়  বলা হয় যে এই অনুষ্ঠানে জীবাত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন ঘটে। বঙ্গ ছাড়াও অন্য রাজ্যে অন্য নামে যেমন কেরালায় সীমান্তধাম,  তামিলনাড়ুর ভালকাপ্পু, পাঞ্জাবে ও বিহারে গোধ ভারাই, গুজরাতে গোধ ভরনা ও মহারাষ্ট্রে দোহাল জেভান নামে প্রচলিত।  সহজ কথায় বলা হয় মা এর ইচ্ছা / আকাঙ্খা অনুযায়ী খাবারের উৎসব বা অনুষ্ঠান।  এর অনুষ্ঠানে হরেক রকম  খাবারের পাশাপাশি উপহার সামগ্রী দিয়েও হবু মায়ের কোল পূর্ন করা হয। এখানেও বিদেশী সাহেবের মা এর সাধভক্ষন প্রথম হল ৩০শে মার্চ ২০২৫, বাংলা পঞ্জিকার ১৬ই চৈত্র ১৪৩১।  দিন ছিল  রবিবার।  আর দ্বিতীয় সাধভক্ষন হল ৩রা এপ্রিল ২০২৫, দিন পরেছিল বৃহস্পতিবার ২০ই চৈত্র ১৪৩১ সাল। এদিন আবার ছিল বাসন্তী দূর্গাপূজোর ষষ্ঠী।

ক্রমবিবর্তনে আস্তে আস্তে  সেই ভ্রুন দেহের আকার নেয় ও চৈতন্যসত্ত্বা লাভ করে ও সব কিছু চিন্তা করতে আরম্ভ করে। চিন্তা আর কিছুই নয় বুদ্ধির উন্মেষ।  বুদ্ধিগুলি কি কি...... শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস,  গন্ধ  এই  পাঁচটি। সে এই নয় মাসে  পূর্ন অবয়ব  নিয়ে উপরোক্ত বিভিন্ন ইন্দ্রীয়গুলির সাথে যুক্ত হয়। আর তাতেই তার জ্ঞান , বুদ্ধি, দর্শন,  বিবেক বিষয়ে  কিছু কিছু ঞ্জান সঞ্চয় হতে থাকে। আর  এটা হওয়া আরম্ভ হলে সে তখন মা এর গর্ভে এপাশ ওপাশ নড়াচড়া আরম্ভ করতে থাকে। আর তখনই মনে পরে যায় পূর্ব জন্মের কথা । স্মরণ করে জন্ম জন্মান্তরের শুভ ও অশুভ কর্মের কথা। মনে মনে বলতে থাকে .......... এর আগে কত হাজার হাজার বার বিভিন্ন গর্ভে বাস করেছি, কত রকম খাদ্য খেয়েছি আবার কত জীবজন্তুর গর্ভে জন্মে কত রকমের স্তন্যপান করেছি। আমি বহু জন্ম এইভাবে পরিভ্রমন করে এই মনুষ্যজন্ম লাভ করেছি। হে শুভাশিস ফলদানকারী পরমেশ্বর, এবার আমায় মুক্তি দাও। তোমার তৈরী এই প্রকৃতির সঙ্গে মিলে মিশে যেন তোমাকেই  স্মরণ করিতে পারি.... এই আমার  করজোড়ে তোমার কাছে প্রার্থনা। 

এই রকম এক চঞ্চলতা নিয়ে , বিশ্বের রূপ, রস, গন্ধ,  স্পর্শ  ও শব্দের স্বাদ নেওয়ার প্রবল ইচ্ছায়   বিধাতার স্থির করা ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন ক্ষনে, যা কিনা চিকিৎসকের নির্ধারিত দিনের আগেই , সাহেব  বাবু ধরাধামে এসে উপস্থিত হলেন। মা র  গর্ভে ৩৭ সপ্তাহ ২ দিন থাকার পর, পৃথিবীকে চিনলেন,  দেখলেন  যা কিনা নির্ধারিত দিনের অর্থাত ৫ই মে ২০২৫ এর বেশ কিছুদিন আগেই।  তবে তারিখাটা কি ভাবে জানাবো। এ তো বিদেশী বাবু।  বিদেশের তারিখ ও সময় হল ....১৬ই এপ্রিল , ২০২৫,  বুধবার  , রাত ৯টা ৩২ মিনিট।  আর  আমাদের দেশের তারিখ ও সময় ...... ১৭ই এপ্রিল ২০২৫, বৃহস্পতিবার,  সকাল  ৭টা ২মিনিট। এত দিন মায়ের গর্ভে থেকে খাওয়া দাওয়া করে ৩ কিলোগ্রাম ২৫ গ্রাম  ( 6 lb 11 oz ) ওজন  ও  ৫২.১ সেমি উচ্চতা নিয়ে ধরাধামে এলেন।  এলেন তিনি আমেরিকার  North Carolina র Charlotte শহরের এক সরকারি হাসপাতালে। এই জন্মস্থান চেনার জন্য নাম,  ঠিকানা ...... Atrium Health University City,     8800 N Tryon st, Charlotte NC 28262.

পৃথিবীর রুপ দেখে মা বাবার সাথে বেশ কয়েকদিন জন্মস্থানে অর্থাত নার্সিংহোমে / হাসপাতালে ভালোভাবে কাটানোর  পর  ২০ তারিখে বাড়ীর পথে রওনা। তবে নিজের গাড়িতে বসে নিজের আলাদা সীটে বসে আনন্দের সাথে বাড়ীতে এসে উঠলেন। কিন্ত মা বাবাকে সবসময় কাছে চাই।  

এখন যেন খুব আনন্দের সাথে দিন কাটছে। হাত পা ছোরা, কান্নাকাটি,  খাওয়া দাওয়া ,ঘুম সবকিছুর সাথেই এক আনন্দের ছোয়া লেগে রয়েছে। আস্তে আস্তে ষষ্ঠীর দিন এসে গেল। বাচ্চাদের এই ষষ্ঠীপুজো মূলত এক হিন্দু ব্রত। যা সন্তানের জন্মানোর  ছয় দিন পর পালন করা হয়। বিশেষত এটি গ্রাম বাংলায় বেশি প্রচলিত। এই ব্রত মায়ের মঙ্গল এবং সন্তানের ভালো ভবিষ্যতের জন্য করা হয়ে থাকে। বিদেশে যখন জন্ম তখন বিদেশের জন্ম তারিখ ধরলে ছয় দিন পর অর্থাত ২২ তারিখে ষষ্ঠী পালন করা হল। ষষ্ঠী দেবী এক হিন্দু দেবী যাঁকে শিশুদের কল্যাণদাতা এবং রক্ষাকর্তা হিসেবে পূজা করা হয়। ইনাকে সন্তান দায়িত্ব এবং সন্তান পালনের দেবী হিসেবে ধরা। নবজাত শিশুর রক্ষয়িত্রী।  প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী ষষ্ঠী দেবী ঐ দিন  নবজাতকের কপালে ভবিষ্যত লিখে দেন। সেই বিশ্বাসে নবজাতকের পাশে কলম, কাগজ, ধূপ, দ্বীপ রাখা হয়। সাথে থাকে নানা রকম ফলমূল , মিষ্টান্ন জল ইত্যাদি। 

যদিও সাহেব বাবু, সব কিছুই তো ইংরেজি মতেই চলবে। তবুও অনেক সময়ই  বাংলা তারিখ, তিথি, রাশি, নক্ষত্র ইত্যাদির দরকার হয়ে পরে। জন্মের তারিখ বাংলা ক্যালেন্ডার মতে কি হল জানা হল না। একটু আধটু পঞ্জিকা ঘেটে যা জানতে পারলাম সেগুলি এইরকম....... সাহেবি জন্মতারিখ অর্থাত বিদেশের জন্মতারিখ  ধরলে সেটা বাংলায় হবে ২রা বৈশাখ, ১৪৩২ সাল।  বুধবার,  অনুরাধা নক্ষত্র। আর হ'ল বৃশ্চিক রাশি, বিপ্রবর্ন,  দেবগন, মাহেন্দ্রযোগ,  অষ্টোত্তরী ও বিংশোত্তরী শনির দশা। আর রাশিফল দেখলে দেখা যাচ্ছে .... বৃশ্চিক.... পারিবারিক শুভ। এবার আসি আমাদের দেশের জন্ম তারিখ ধরলে কি দেখা যায়।  তা এইরকম.... ৩রা বৈশাখ, ১৪৩২ সাল ।  বৃহস্পতিবার , জ্যেষ্ঠানক্ষত্র। আর হ'ল বৃশ্চিক রাশি, বিপ্রবর্ন, রাক্ষসগন, অষ্টোত্তরী শনির ও বিংশোত্তরী বুধের দশা। আর  রাশিফল দেখলে দেখা যাচ্ছে..... বৃশ্চিক.... গৌরব বৃদ্ধি। এবার আরও একটু এগুলে জানতে ইচ্ছা করবে জন্মতারিখের মূলাঙ্ক কত? তবে প্রশ্ন জাগে জন্মতারিখ কি ধরে মূলাঙ্ক নির্ণয় করা হবে। যেহেতু সাহেব বিদেশে জন্মেছে, বিদেশের জন্মতারিখ অর্থাত ১৬ই এপ্রিল ২০২৫ জন্মতারিখ ধরা-ই ঠিক হবে। তাই বিদেশী সাহেবের জন্মতারিখ মূলাঙ্ক তখন হবে .... ১+৬= ৭ । সাহেবের জন্মতারিখ মূলাঙ্ক হলো ৭। নিউমেরোলজি  বা সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী সবচেয়ে ভাগ্যবান নম্বর হল সাত।  জ্যোতিষ শাস্ত্রে ৭ নম্বরকে কেতু এবং জ্যোতির্বিদ্যায়  নেপচুনের প্রতিনিধি হিসেবে দেখা হয়।      যাঁদের মূলাঙ্ক ৭ , তাঁরা সবার থেকে অন্যরকম হয়। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুযায়ী আমরা বলতে পারি এই  জন্মতারিখ মূলাঙ্ক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ভাগ্য অত্যন্ত উজ্জ্বল হয়। অভিব্যাক্তির ক্ষমতা এই মূলাঙ্কের ব্যক্তিদের মধ্যে খুব ভালো। এঁদের কল্পনাশক্তিও তীব্র।  এই ধরনের লোকেরা স্পষ্টভাষী,  অকুতোভয় ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে থাকে। সাধারণত ৭ সংখ্যাটিকে শুভ সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অনেক ক্ষেত্রেই ৭ এর সঙ্গে শুভ কাছের সম্পর্ক রয়েছে। ৭ নম্বরকে লাকি নম্বর বলা হয় কেননা ব্যবহারিক জীবনে আমরা দেখতে  পায় যেমন ৭ দিনে সপ্তাহ হয়, রামধনুর রঙও সাতটি, মানব শরীরের চক্রের সংখাও ৭  , আবারও স্বর্গে যাওয়ার ৭টি ধাপ রয়েছে বলে বিশ্বাস।  তাই ৭ কে সম্পূর্ন  ও ভাগ্যশালী সংখ্যা হিসেবে মনে করা হয়।

এবার নামকরণের পালা। আমাদের মধ্যে প্রচলিত এক সংস্কার যাকে বলা হয় নামকরণ অর্থাত শিশুর নাম রাখা। সাধারণত এটি সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার দশম,  একাদশ,  দ্বাদশ  বা শততম দিনে হয়ে থাকে। এদিন শিশুকে স্নান করিয়ে নতুন জামা পরানো হয়। পরে পিতামাতার দেওয়া নির্বাচিত নাম ঘোষণা করা হয়। বেশিরভাগ সময়  অন্নপ্রাশনের দিন নামকরণ করা হয়। অর্থাত অনুষ্ঠানটি একটি পূজো বা বিশেষ আয়োজনের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। সাধারণত বলা হয়ে থাকে নবজাতকের রাশি, নক্ষত্র,  মাস, পারিবারিক দেবতা এবং জাগতিক নাম অনুসারে সবচেয়ে বেশি পাঁচটি নাম দেওয়া যেতে পারে। তবে ইনি তো সাহেব বাবু। দেশী নিয়ম কোনো কিছুই চলবে না। বিদেশী নিয়মে বলছে যে...... জন্মের পর নার্সিংহোম থেকে বাড়ী যাবার আগে নামকরন করতে হবে। বিদেশী সাহেবের ক্ষেত্রে একই নিয়ম প্রজন্ম হ'ল।  বাড়ি যাওয়ার আগে বাবা মা নাম রাখলো।  নাম হ'লো "আহির " যার ইংরেজী বানান হ'ল  AHIR. আহির নামের অর্থ হলো 'সাহসী' বা 'উদাত্ত ' অর্থাত উচ্চস্বর বিশেষ। এছাড়াও এটি 'বিজেতা' বা "বিজয়ী" এবং 'জাগ্রত ' বা "ভোর" এর মত বিভিন্ন অর্থের ব্যবহার হয়ে থাকে। আবার "আহির " শব্দের আরেকটি অর্থ হল " শেষ" বা " ভক্ত এবং ঈশ্বর এক"। সাধারণত এই নামটি প্রিয় বাংলী ছেলের নাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আরবী ভাষায় "আহির" শব্দের অর্থ 'বিজয়ী' হয়। এই  নামের ভাগ্যবান  সংখ্যা  " ৯  " ।  যাই হোক একটি শিশুর জন্য বাংলা নাম নির্বাচন করা একটি চিন্তাশীল প্রক্রিয়া। কারণ এটি তাদের পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠে। বাংলায় হিন্দু নাম আহিরের অর্থ সৌন্দর্য্য এবং গভীরতার প্রতীক। তাই কেউ যদি বাংলায় গভীর অর্থ সহ নাম বিবেচনা করেন, তাহলে আহির এমন একটি নাম যা সৌন্দর্য্য এবং তাৎপর্য উভয়ই ধারণ করেন। 

দিন এভাবে চলতে থাকে। একুশ দিনের মাথায় আবার ষষ্ঠী পূজো করতে হবে। দেশে হলে এ দিন পুরোহিত ডেকে বাড়ীতে ষষ্ঠী পুজো করা হয়। যদিও ষষ্ঠী দেবীর কোনো নির্দিষ্ট অবয়ব নেই।  পূজোর জায়গাতে মাটির পুতুল রাখা হয়। অনেক জায়গাতে শিশুর চুল কামানো হয়। নখ কেটে দেওয়া হয়।  চলতি কথায় নবজাতক ও তার পরিবারের সদস্যদের অশৌচের সমাপ্তি ঘটে। তাই শিশুকে স্নান করিয়ে নতুন জামা পরিয়ে পূজোর কাছে রাখা হয়।  সাথে   মা-ও নতুন শাড়ি পরে ষষ্ঠী পূজোর কাছে বসে। এসব যে কিছু বললাম সবই আমাদের দেশের কথা। কিন্ত এ তো বিদেশী বাবু। বাড়িতে পূজো করার বদলে স্থানীয় ঠাকুরের মন্দিরে গিয়ে পূজো দিয়ে ঠাকুরের আশীর্বাদ প্রার্থনা করা হল। অবশ্য সেখানে সাহেববাবুও গিয়েছিলেন। জন্মের পরে তার এই প্রথম বাড়ি থেকে বেরোনো। ইংরেজীর ৬ ই মে সেজেগুজে তার জীবনের প্রথম সফর হলো । 

হিন্দুমতের বিশ্বাস অনুযায়ী , শিশু মা-র গর্ভ হতে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই মায়া এসে তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এর ফলে শিশু মোহাচ্ছন্ন হয়ে পরে। আর সেজন্যই মায়ের পেটে থাকাকালীন পূর্ব্ব জন্মের স্মৃতি সম্পূর্ণ ভাবে ভুলে যায়। আমাদের বিদেশী সাহেবের তাই হয়েছে। এখন তার পৃথিবীর নতুন এই জল-আবাহায়াতে, সূর্যালোকের প্রভাবে ও সুষম খাদ্যের প্রভাবে ক্রমে ক্রমে স্বাভাবিক নিয়মে পরিপুষ্ঠ হচ্ছে।মন , বুদ্ধি একত্রিত হয়ে বিভিন্ন ইন্দ্রীয়গুলি আরও সক্রিয় হচ্ছে। এর ফলে পৃথিবীর রুপ, রস, গন্ধ  ইত্যাদির প্রতি আরও আকৃষ্ট হচ্ছে।  প্রকৃতির মনমুগ্ধকারী সৌন্দর্যের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। আর তার সাথে রয়েছে মা বাবার অকৃত্রিম স্নেহ ভালবাসা।



Saturday, 19 April 2025

কর্মযোগ ** কর্মফল

 



সংস্কৃত 'কৃ' ধাতু থেকে কর্ম শব্দের উৎপত্তি। এই কর্ম শব্দের অর্থ হল কিছু কাজ করা। শারীরিক বা মানসিক সব ধরনের কাজ করা কর্ম। এই কর্মের সাথে কর্মফলের একটি কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ তার কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করে। সৎ কর্মের ফল পুন্য এবং অসৎ কর্মের ফল পাপ বলে আমাদের ধারনা। 

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে স্বজন বধের আশঙ্কায় বিষন্ন অর্জুনকে যুদ্ধে উদ্ধত বা উদ্বুদ্ধ করার জন্য ভগবান শ্রীকৃষ্ণ ২ প্রকার কর্মের কথা বলেছেন। প্রথমত সকাম কর্ম ও দ্বিতীয়ত নিষ্কাম কর্ম। ফল আকাঙ্ক্ষা সহ কর্ম হল সকাম কর্ম এবং ফল আকাঙ্ক্ষা বর্জিত যে কর্ম তা হলো নিষ্কাম কর্ম। নিষ্কাম কর্ম যেমন কর্মফল সঞ্চয় করে না, তেমনি আবার সঞ্চিত কর্মফলকেও বিনষ্ট করে। নিষ্কাম কর্মে কোনো বাসনা না থাকায় কোন ফল ভোগ থাকে না। নিষ্কাম কর্ম সম্পাদন করে অর্থাৎ ফলাফলের চিন্তা না করে কামনা, বাসনা শূন্যভাবে অর্থাৎ নিষ্কাম ভাবে নিজে ও বুদ্ধিকে পরমাত্তা ঈশ্বরের বুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত করে কর্ম সম্পাদন করলে সংসার থেকেই মুক্তি লাভ করতে পারে।

অবার নিষ্কাম কর্ম হল অহং মুক্ত  বা অকাঙ্খাহীন কর্ম, কোন ফলাফল ছাড়া সম্পাদিত কর্ম এবং মুক্তির কর্মযোগ পথের কেন্দ্রীয় নীতি।  এটি ভগবত গীতার কেন্দ্রীয় বার্তা হিসাবে  সুপরিচিত। অর্থাত যে কর্ম স্বার্থযুক্ত থাকে তাকে সকাম কর্ম  আর যে কর্ম স্বার্থবর্জিত তাহাই নিষ্কাম কর্ম।  

ভগবত গীতার নিষ্কাম কর্মের ফলাফল সম্বন্ধে বলা হয়েছে ..... শরীর দিয়ে, মন , বুদ্ধি দিয়ে, এমনকি নিছক ইন্দ্রিয় দিয়ে যোগীরা আসক্তি ত্যাগ করে আত্মশুদ্ধির কাজ করে। যিনি যোগে শৃঙ্খলাবদ্ধ কর্মফল ত্যাগ করেন, তিনি স্থির শান্তি লাভ করেন।

যে কর্মের ফল আকাঙ্ক্ষা নেই, ফল ভোগ নেই, সেই কর্মই নিষ্কাম কর্ম। আর যে কর্মে ফল আকাঙ্ক্ষা আছে, ফলভোগ আছে, বাসনা আছে, সেই কর্মই সকাম কর্ম।  প্রসঙ্গত গীতার নিস্কাম কর্মকে কর্মযোগ বলা হয়েছে। 

তবে স্বাভাবিকভাবেই সংশয় হতে পারে যে  নিস্কাম কর্ম কি উদ্দেশ্যবিহীন? কিন্ত উদ্দেশ্য ছাড়া কোনও কর্ম করা যায় না। নিষ্কাম কর্ম যদি উদ্দেশ্যবিহীন হয় তবে এই কর্মের অনুষ্ঠান অসম্ভব। তাহলে এর উত্তর যে নিষ্কাম কর্ম উদ্দেশ্যবিহীন নয়।  সকাম কর্মের মত নিষ্কাম কর্মেরও উদ্দেশ্য থাকে। পার্থক্য হল, সকাম কর্মের উদ্দেশ্য হল বিষয়াশক্তি,  যা জীবের বন্ধনের কারন।  অপরদিকে নিষ্কাম কর্মের উদ্দেশ্য হল ঈশ্বর। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে যঞ্জরূপে কর্ম সম্পাদন করলে সেই কর্ম নিষ্কাম হয়। 

কিন্ত নিস্কাম কর্ম করব কি ভাবে ? গীতায় নিষ্কাম কর্মের অনুষ্ঠানকে এক প্রকার কৌশল বলা হয়েছে। এই  কৌশল হল :: যোগস্থ হয়ে কর্ম করতে হবে।  কর্মফলে অধিকার ত্যাগ করতে হবে। তাই  গীতায় বলা হয়েছে :: যোগস্থ কুরু কর্মাণি । কর্মণ্যেবাধিকারস্তে মা ফলেষু কদাচন। ফলের আকাঙ্ক্ষা  ত্যাগ করে, কর্ম করার কুশলতাই হল যোগ শব্দের অর্থ।  মনে রাখতে হবে ঈশ্বর এই জগতের স্রষ্টা,  প্রতিপালক ও পরিচালক।  মানুষ হল সৃষ্ট জীব।  মানুষের  সত্তা ঈশ্বরে  আশ্রিত। মানুষের কর্ম ঈশ্বর দ্বারা পরিচালিত।  তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী মানুষ কর্ম করে। মানুষ যন্ত্র,  তিনি যন্ত্রী। তিনিই আমাদের কর্মের কর্তা। আমরা নিমিত্ত মাত্র।  তারই উদ্দেশ্যে কর্ম করতে হবে । কিন্ত মূঢ় ব্যাক্তি অহংকার বশে মনে করে যে আমিই সব। তাই অহংবোধ ত্যাগ করে ঈশ্বর প্রীতির জন্য বা ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে কর্ম সম্পাদন করতে হবে।


বিবেকানন্দও  নিষ্কাম কর্মের অনুশীলনের কথা বলেছেন। কর্মফলের প্রতি আসক্তি পরিত্যাগ করে আনাসক্তভাবে কর্ম সম্পাদনই নিষ্কাম কর্মের অর্থ।  আসক্তি বর্জনের দুটি পথ রয়েছে। একটি হল কর্মফল ঈশ্বরে সমার্পন করা। গীতা এইরূপ নিষ্কাম কর্মের প্রচার করে। দ্বিতীয় পথের অনুসারী ব্যক্তিরা বলেন নিজের ইচ্ছাশক্তি,  মনের শক্তি ও বিচার বিশ্লেষণ অনুযায়ী কর্ম করলে কর্ম অনাসক্ত হয়।  অনাসক্ত কর্ম কর্ম জগতের মঙ্গল সাধন করে। জীবনকে মহৎ করে। মহৎ ব্যক্তিরা জগতের মঙ্গলের জন্য নিজেদের উৎসর্গ করেন। 

এই নিষ্কাম কর্ম সংসারের মধ্যে থেকে দু ভাবে হয়ে থাকে। এক অনাগ্রহ ভাবে , অপরটি অনাসক্ত ভাবে। অনাগ্রহ ভাবে কাজ করলে এর মধ্যে একটা বিতৃষ্ঞা ভাব জড়িয়ে থাকে। তখন সবসময়ই মনে হয় এই কাজটা করে আমি তো কোনো কিছু পাবো না। তাই যখন কাজটা করতেই হবে, তখন কোনো রকমে সেরে ফেলি। কিন্ত অপরদিকে অনাসক্ত ভাবে কাজ করার মধ্যে নিজের একটা স্বাধীনতা লুকিয়ে থাকে। সেই কাজটার দ্বায়িত্বভাব নিজে নিয়ে , চারদিক দেখে শুনে কাজগুলির সমস্ত খুটিনাটি নিজেই আগ্রহভরে সেরে ফেলি। যেমন পূজো করবার সময়  নিজের ইচ্ছামতন যতটা পারি যোগারযন্ত্র করে থাকি, ইচ্ছামতন ঠাকুর সাজানো,  মন্ত্র উচ্চারণ জোরে না আস্তে ....... সব কিছুই যিনি পূজো করেন  তার উপর নির্ভর করে। কিন্ত এসবের পিছনে কোনও চাওয়া পাওয়ার থাকে না। জীবনে আধ্যাত্মিক পথে  কিছুটা এগোলেই এগুলি করা সম্ভব।   তাই জীবনকে আধ্যাত্মিক করে তোলার চেষ্টা করতে হবে। অর্থাৎ  সংসার দৃষ্টি ত্যাগ করে ব্রহ্মদৃষ্টির অনুসন্ধান করার চেষ্টা........ এক কথায় যে দৃষ্টির দ্বারা মানুষ সবকিছুর মধ্যে ঈশ্বরকে দেখতে পাবে, ঈশ্বরের কৃপা অনুভব করতে পারবে, তবেই সে আসল ঈশ্বরের উপাসনা করতে পারবে।

 ভগবান শ্রী কৃষ্ণ সকাম কর্মের কতগুলি উন্নতির জন্য সকাম ও নিষ্কাম কর্মের পৃথক পৃথক (সকাম এবং নিস্কাম কর্মের মধ্যে পার্থক্য) উল্লেখ করেছেন –

১) সকাম কর্মে নানা আয়োজন প্রয়োজন হয় বলে তা অনেক জটিলতায় পূর্ণ , এজন্য কর্মটি অনেক ক্ষেত্রে  অসম্পূর্ণ থাকে এবং ওই  অসম্পূর্ণতার জন্য কর্মকর্তাকে  ভীত থাকতে  হয়, বিনাশের ভয় এবং প্রাননাশের  ভয় ইত্যাদি। কিন্তু নিষ্কাম কর্মে কর্মটি আংশিকভাবে নিস্পন্ন হলেও ফল আকাঙ্খিত না থাকার জন্য বিভিন্ন ভয় থেকে মুক্তি থাকে।

২) সকাম কর্মের ক্ষেত্রে যাগ-যঞ্জ তপস্যাদি শেষ না হলে তা চালু হয়। কাজটি  পুনরায় আরম্ভ করতে হয়। কৃষি কর্মাদি ও উচ্চবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি ইত্যাদি কারণে বন্ধ হয় এবং কাজটি পুনরায় আরম্ভ করতে হয়। কিন্তু নিষ্কাম কর্মে কখনো কখনো দেখা যায় না এবং সেই কর্মের কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই তা কখনো ব্যার্থ হতে পারে না।

৩) সকাম কর্ম কেবলমাত্র ব্যার্থ না হয়, তা অঞ্চল বিশেষে পাপের কারণও হয়। অপরের সম্পদ  অন্যায় ভাবে অধিকারের জন্য যে প্রবঞ্চনামূলক, প্রতারণামূলক কর্ম তা পাপের কারণ হয়। নিষ্কাম কর্মে আকাঙ্ক্ষা আর্থাৎ ফলাকাঙ্ক্ষা না থাকায় সেই কর্ম কখনো প্রতারণামূলক হতে পারে না এবং পাপের কারণও হয় না।

৪) সকাম কর্মে শক্তি বহির্মুখী হওয়ায় প্রকাশ-বাসনার অন্ত থাকে  না। কিন্তু নিষ্কাম কর্মের ক্ষেত্রে নিজের বুদ্ধিকে পরমাত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে যুক্ত করার ফলে সেই জ্ঞান নিশ্চয়াত্মক ও  একনিষ্ঠ হয়ে থাকে, নানাদিকে ধাবিত হয় না। ফলে নিষ্কাম কর্মে-বাসনাও থাকে না।

৫) সকাম কর্মের ক্ষেত্রে সমস্ত রকম কর্ম স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে থাকে এবং  স্বপক্ষে কর্মে সম্পাদিত হয়। অন্যদিকে নিষ্কাম  কর্ম হলো এমন কর্ম যা সকল প্রকার স্বার্থের ঊর্ধ্বে থাকে এবং ঈশ্বরের প্রতি উৎসর্গ করা হয়।

৬) সকাম কর্ম মূলত আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। অর্থাৎ এইরূপ কর্মে আকাঙ্ক্ষা থাকে, চাহিদাও থাকে। কিন্তু নিষ্কাম কর্মের ক্ষেত্রে এরূপ কোন চাহিদা থাকে না। অর্থাৎ তা সমগ্রভাবে আকাঙ্ক্ষা মুক্ত এবং যেখানে কোনও রূপ কামনার জায়গা থাকেনা।

উপসংহার হিসেবে বলা যায় ... কর্ম হল এমন একটা বিষয় যার মধ্যে ভালো এবং মন্দ উভয়েরই স্থান রয়েছে। তাই কামনা বাসনা দ্বারা ঘটিত কর্ম  এবং  কামনা বাসনা বর্জিত কর্ম,  এই দায়ের পরিপ্রেক্ষিতেই সকাম ও নিষ্কাম কর্মের পার্থক্য করা যায়। কিন্ত সর্বপরি  নিষ্কাম কর্মেই হল শ্রেষ্ঠ যা সকাম কর্মের থেকে ভিন্ন এবং উৎকৃষ্ট।  

Friday, 28 March 2025

বহুলাড়ায় সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির

 সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির,  বহুলাড়া, বাঁকুড়া   





পশ্চিম বাংলার মন্দির স্থাপত্যের কথা বলতে গেলে যার নাম প্রথমেই উঠে আসে .... সে হ'ল বিষ্ণুপুর । এটা ঠিক যে বাংলার স্থাপত্যশৈলীর বিকাশে বিষ্ণুপুরের এক বিরাট অবদান রখেছে। তবে এই আবদান শুধুমাত্র বিষ্ণুপুরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয় । এই উদাহরণ বিষ্ণুপুরের ঠিক বাইরে আশে পাশেও ছড়িয়ে রয়েছে। 






সে রকমই বাংলার এক গ্রামের নাম বহুলারা। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার ওন্দা সি ডি ব্লকের ওন্দা ২ নং গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত বহুলারা গ্রাম।  দ্বারকেশ্বর নদীর দক্ষিণে, এটি মন্দির নগরী বিষ্ণুপুরের থেকে প্রায় ২৫ কি মি বা ওন্দাগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন থেকে প্রায় ৫ কি মি দূরে অবস্থিত।  এখানেই রয়েছে অনন্য স্থাপত্য শৈলী ও কাটা ইট এবং চুন-স্টুকো অলঙ্কার পরিচিত সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির।  মধ্যযুগীয় রেখা দেউল মন্দিরের সর্বোত্তম নমুনা হিসেবে এটিকে অনুমান করা হয়। মন্দিরের উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুটের মতন। মন্দিরটির ভিত্তিমাত্রা প্রায় ২৩ বর্গফুটের মতন যা মন্দিরটিকে তার স্থাপত্য এবং অসাধারণ সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত করে তুলেছে। এটি আনুমানিক ৮ম -- ১১শ শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে বৌদ্ধ  / জৈন  মন্দির হিসেবে নির্মিত হয়েছিল।  কিন্ত পরে বিষ্ণুপুরের মল্ল রাজারা এটিকে শৈব স্মৃতিস্তম্ভ হিসেবে পুন নির্মাণ করেছিলেন।  তবে এটি  কখন হিন্দুমন্দিরে রুপান্তরিত হয়েছিল তার কোনও নথিপত্র নেই। তাই শিবলিঙ্গ ছাড়া গর্ভগৃহে গনেশ,  জৈন তীর্থঙ্কর পার্শ্বনাথ এবং মহিসাসুরমর্দিনির  মূর্তি রয়েছে। নগ্ন জৈন দন্ডায়মান মূর্তিটি সেই সময়ের জৈন ধর্মের অস্তিত্বর স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। তবে যাই হোক এখানকার শিবলিঙ্গ সিদ্ধেশ্বর মহাদেব নামে পরিচিত।  মন্দিরটি পশ্চিমমুখী এবং ওড়িশার মন্দিরগুলির সাথে কিছু কিছু  মিল দেখা যায়। অতীতে কোনও এক সময়ে এর চূড়ার সর্ব্বোচ্চ অংশটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।  সাম্প্রতিক কালে সরকার কিছু সংস্কার করা সত্ত্বেও মন্দিরের মূল অলংকরনে বেশিরভাগ অংশই নষ্ট হয়ে গিয়েছে। 






মন্দিরের অভ্যন্তরীণ গর্ভগৃহটি একটি নিখুঁত বর্গাকার হলেও বাইরে থেকে এটি দেখা যায় না। কারণ বাইরের পৃষ্টটি  " রথ " শৈলীতে নির্মিত।  উত্তর ভারতীয় নাগর স্থাপত্য শৈলীর একটি উপাদান রথ। সেইজন্য এই মন্দিরটি এক অসাধারন চেহারা এবং দুর্দান্ত গভীরতা বহন করে। উড়িষ্যা বা খাজুরাহোর মন্দিরগুলি এই রকম রথ শৈলীতে নির্মিত এবং এই মন্দিরটিও ঐ রকম ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। 






বহুলাড়া মন্দিরের চারপাশের আবাসস্থল এবং যে ধর্মীয় ঢিবি রয়েছে সেগুলি দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকদের অনুমান যে এটি প্রাচীনকালে একটি জৈন / বৌদ্ধ  কেন্দ্র ছিল। দেউলের পাশে ইট ও পাথরের তৈরী ঢিবিগুলি দেখে ধারনা করা হয় যে এগুলি বৌদ্ধস্তূপের ধ্বংসাবশেষ।  মনে করা হয় যে এখানে বৌদ্ধ ভিক্ষুক বা ভিক্ষুণীদের দেহাবশেষ দাহের পর সমাহিত করা হত। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় যে এই অঞ্চল অর্থাৎ বাঁকুড়া  অঞ্চল বৌদ্ধ  / জৈন ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত ছিল। মল্লরাজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মন্দিরগুলি শিব মন্দিরে রূপান্তরিত হয়। 






ওন্দাগ্রাম রেল ষ্টেশনের কাছেই বহুলাড়া গ্রাম। তাই ষ্টেশন থেকে সাইকেল রিক্সা বা টোটোতে করে মন্দিরে যাওয়া যায়। কিন্ত এই পথের উপর নির্ভর না করায় শ্রেয়। কেননা এই পথে রেল পরিষবা এখনও যথেষ্ট নয়। তাই রেলে বা বাসে বাঁকুড়ায় এসে, সেখান থেকে বাসে করে ওন্দা বাস ষ্টপে নেমে রিকশা বা টোটোতে যাওয়া যেতে পারে মন্দিরে। এছাড়া যদি সড়ক পথে গাড়ি নিয়ে আসা যায় তবে ওন্দা মোড় থেকে ডানদিকের রাস্তা ধরে বহুলারা গ্রামে আসা যায়।







চৈত্র মাসে আজও বহুলারা শিবমন্দিরে তিন দিন ধরে গাজন উৎসব পালিত হয়। তাতে আঞ্চলিক ও দূরের শত শত ভক্ত যোগদান করে। এছাড়াও শিবরাত্রি আর বাংলার  নববর্ষ ধুমধামের সাথে পালিত হয়। মন্দিরটি গ্রামের এক মনোরম শান্তিপূর্ণ স্থানে অবস্থিত।  তাই আপনি যদি বাংলার গ্রামীণ জীবনের স্বাদ উপভোগ করতে চান তবে বহুলাড়া সিদ্ধেশ্বর শিব মন্দির দেখতে পারেন। আর আপনি যদি একটু ঐতিহাসিক মনোভাবাপন্ন হন অর্থাত আপনার ইতিহাস জানার আগ্রহ থাকে তবে অবশ্যই এটি আপনার সঠিক পচ্ছন্দের স্থান হবে।







Thursday, 13 March 2025

বঙ্গে সূর্য মন্দির

 

সোনাতপলের সূর্য মন্দির -- আলোকমন্দির  

বিশ্বে ভারতবর্ষ হ'ল এক রহস্যের দেশ হিসেবে পরিচিত। সেই রহস্যময় দেশ হিসেবে এক বিশেষ গৌরবও আছে। আর এই গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলেছে তার প্রাচীন সূর্য মন্দিরগুলি। সবগুলি মন্দিরই সূর্যদেব সূর্যকে উৎসর্গীকৃত।ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে প্রায় প্রত্যেকটি মন্দিরই  প্রাচীন ভারতীয় শাসকদের দ্বারা বহু বছর আগে নির্মিত হয়েছিল।  এই মন্দিরগুলি ভারতীয় হিন্দুদের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।




সূর্য মন্দির কি ?? সূর্য মন্দির বা সৌর মন্দির হ'ল এমন একটি ভবন যা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন প্রার্থনা বা বলিদান...... যা সূর্য বা সৌর দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। এই ধরণর মন্দিরগুলো বিভিন্ন সংস্কৃতি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং ভারত, চীন,  জাপান , মিশর ও পেরু সহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।  এর মধ্যে কিছু মন্দির ধ্বংসস্তূপে রয়েছে, খনন, সংরক্ষণ  বা পুনরুদ্ধার কাজ চলছে এবং কয়েকটি বৃহত্তর স্থানের অংশ হিসেবে বিশ্ব-ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত। 



ভারতে বেশ কয়েকটি ( প্রায় ১৪টি ) উল্লেখযোগ্য সূর্য মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে মেধরার সূর্য মন্দিরটি, যা কিনা গুজরাতে অবস্থিত। ১০২৬-২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল।  চালুক্য রাজবংশের প্রথম ভীমসেনের শাসনকালে এর নির্মাণ হয়। এই মন্দিরের স্থাপত্য শৈলী মারু-গুর্জরা শৈলীর।  এটি পশুপতি নদীর তীরে অবস্থিত।




সূর্য মন্দির মাতন্ড..... যা জম্ম্-কাশ্মীরে অবস্থিত।  এটি একটি অসাধারণ মন্দির। কারকোটা রাজবংশ এটি নির্মাণ করেছিলেন ৮ম শতাব্দীতে। মন্দিরটির আশ্চর্যজনক খোদাই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিনত হয়েছে। মন্দিরটি মালভূমির উপর অবস্থিত হওয়ায়, এখান থেকে সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকার দৃশ্য দেখা যায়।




দক্ষিণার্ক মন্দির যা গয়ায় অবস্থিত।  হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বায়ু পুরাণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। গয়ায় পিন্ডদান স্থানের কাছেই রয়েছে এই মন্দির।  আবার বিষ্ণুপদ মন্দিরটি এর কাছেই।  গয়ায় আরও দুটি সূর্য মন্দির রয়েছে..... সেগুলি হ'ল উত্তরকা মন্দির আর গয়াদিত্য মন্দির।  




তবে ভারতে সূর্য মন্দিরের কথা বললেই...... যে মন্দিরের কথা মাথায় আসে তা হল কোনারকের সূর্য মন্দির। এটি সাতটি বিস্মেয়ের একটি। ইউনেস্কো ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির মধ্যে কোণার্ক সূর্য মন্দির হ'ল একটি প্রাচীন  সূর্য মন্দির।  এটি পুরী থেকে ৩৫ কি মি দূরে অবস্থিত।  ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্দিরে আপনি দেখতে পাবেন ছয়টি ঘোড়া দ্বারা পরিচালিত ২৪ চাকার সূর্যদেবের রথ। কিন্ত  আজ মন্দিরের বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।





তবে আজ আর পুরীর সূর্য মন্দিরের কথা নয়, এমন একটি সূর্য মন্দিরের কথা লিখছি যেটা কিনা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গেই। শোনা যায় এই মন্দির কোনারকের সূর্য মন্দিরের থেকেও প্রাচীন।  তাই আজ সে ন্যাশনাল হেরিটেজের  তকমায় পুরস্কৃত। কিন্ত কোথায় রয়েছে সেই মন্দির  ??  সেই মন্দির রয়েছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গেরই লাল মাটির দেশে, বাঁকুড়া জেলার ওন্দা থানার অন্তর্গত সোনাতপল গ্রামে সোনাতপল সূর্য মন্দির।   সূর্য মন্দির বলা হয় কারন মন্দিরটি পূর্বমুখী হওয়ায় দিনের প্রথম সূর্যকিরণ এসে পড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহে। আলোকিত করে এই মন্দিরের গর্ভগৃহকে। তাই এটি সূর্য মন্দির নামে পরিচিত।  এই দেউলে আগে কোন দেবদেবী ছিল না। কিন্ত বর্তমানে একটি ত্রিশূল ও  শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়েছে।  দারকেশ্বর নদীর দক্ষিণ-পশ্চিমে, বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় ১০ কি মি দূরে এই প্রাচীন গ্রাম সোনাতপল। সোনাতপলের সূর্য মন্দিরটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও কিছুটা রহস্যময়। মন্দিরে লাগানো সরকারী বোর্ড থেকে জানা যায় আনুমানিক খ্রীস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে মন্দিরটি তৈরী হয়েছিল।  ঔপনিবেশিক সময়ে তৈরী এটি ইটের রেখা দেউল। উচু ইটের ভিতের উপর তৈরী এই সূর্য মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ১২০ ফুট। এত উচু মন্দির এই অঞ্চলে আর নেই।  এটি জেলার অন্যতম পুরাকীর্তি।




তবে কবে এই মন্দির তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই মন্দির বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের তত্ত্বাবধনে গড়ে উঠেছিল। আবার একসময় বাঁকুড়া ছিল বৌদ্ধ ও জৈনদের বাস।  তাই এই অঞ্চলে রয়েছে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নানা পুরাকীর্তির। এই মন্দিরের গায়ে অনেক উপরে দেখা যায় এক ছোট্ট বৌদ্ধ মূর্তি। তাই কেউ মত প্রকাশ করেন যে এই মন্দির বৌদ্ধ বা জৈনদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল।  ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পায় যে সোনাতপল গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল হামিরডাঙা। মন্দিরটির নির্মানকাল এগারো শতকে। শোনা যায় যে শালবাহন নামের কোনও এক রাজা এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন।  তৎকালীন হামিরডাঙায় শাকদ্বীপি ব্রাহ্মণদের  বাস ছিল। তাঁরা সূর্যের উপাসনা করতেন।  তবে অন্য এক ঐতিহাসিকের মত যে জনশ্রুতির মাধ্যমেই ঐ রাজার নাম জানতে পারা যায়। ওন্দার কোথাও সেই রাজার কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সূর্য মন্দির যে জৈন বা বৌদ্ধ স্থাপত্য---- এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 




ট্রেনে যেতে হলে নিকটতম রেল ষ্টেশন বাঁকুড়া জংশন।  এখান থেকে দশ কি মি গাড়ী বা অটোতে যেতে পারেন। আর গাড়ি নিয়ে গেলে আরামবাগ- জয়পুর-বিষ্নুপুর-ওন্দা হয়ে কিছুটা গিয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরে সোনাতপল গ্রামে পৌঁচ্ছাতে পারেন। এছাড়া বাঁকুড়া-বিষ্নুপুর রাস্তা ধরে ধলডাঙ্গার মোর থেকে বেকে এই মন্দিরে যেতে পারেন। 




হাজারো বছরের প্রাচীন এই মন্দিরের সংস্কার এখনই প্রয়োজন।  স্থানীয়দের দাবী...... এত পুরানো মন্দির আজ ভেঙে পরেছে সংস্কারের অভাবে। এখানে যাতায়াতের রাস্তা পর্যন্ত নেই।  আলপথ পেরিয়ে এই মন্দির দেখতে যেতে হয়। একখানা সরু রাস্তা থাকলেও বর্ষাকালে তা বেহাল হয়ে পরে। আগাছায় পরিপূর্ণ মন্দির।  এলাকাবাসী বারবার বিভিন্ন মহলে মন্দির সংস্কারের আবেদন  জানালেও কোনো কাজ হয়নি।   ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ এই মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক হলেও সরকার শুধুমাত্র এলাকাটির চারপাশে প্রাচীর দিয়েছে। মন্দিরের অবস্থা বেশ জরাজীর্ন ও ভগ্নপ্রায়।  মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বর্তমানে শ্রী ষষ্ঠী মল্ল নামে একজন গ্রামবাসী নিযুক্ত আছেন। এর আগে তাঁর মা শ্রীমতী সবিতা মল্ল দেখাশোনা করতেন। তবে একার পক্ষে এই স্থাপত্য রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয়। কথায় কথায় ষষ্ঠী মল্ল ক্ষোভের সাথে জানালেন ......" অনেকেই মন্দির দেখতে  আসেন।  গ্রামে আসার রাস্তাটি লাল মাটির।  কিন্ত মন্দির দেখতে হলে জমির আলপথ মাড়িয়ে আসতে হয়। সেই কারণে অনেকে দূর থেকে মন্দির দেখে ফিরে যান। সরকার সচেষ্ট হলে এই মন্দিরটিকে ঘিরে  গ্রামটিকে একটি পর্যটন স্থল হিসেবেও গড়া যেতে পারে। আর তখনই স্বাভাবিকভাবেই গ্রামের মানুষের রুজি রোজগারের একটা ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।"





এখন প্রশ্ন হ'ল ........ ইতিহাসের হাত ধরে এই এলাকা কি ভবিষ্যতের পর্যটন স্থান হিসেবে উঠে আসবে ?? এর জবাব পেতে হলে আগামী দিনগুলির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই।