Saturday, 18 July 2020

ছোট ছোট কথা



সুখী হওয়ার জন্য এই চারটি সরল সত্য মেনে নিন ...


(১) আপনি যদি সুখী হতে চান তাহলে প্রথমেই অন্যকে দুঃখ দেয়া থেকে বিরত থাকুন। কেননা, এজগতের প্রতিটা ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। তাই আজ যদি আপনি কাউকে দুঃখ দেন, তাহলে কাল সেই দুঃখ আপনার জীবনে আসবেই।

(২) অন্য জনের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্খা ত্যাগ করুন। কেননা, অনিত্য এই জগতে প্রকৃত কোন ভালোবাসা নেই। এটা স্বার্থের দুনিয়া, তাই একটু স্বার্থের কমতি পড়লে যে কেউ যেকোন সময় আপনাকে দুঃখ দেবে।

(৩) এটা অনিত্য জগৎ। প্রকৃত অর্থে, এখানে কেউ আপনার নিত্য সঙ্গী নয়। এ জগতের কেউ একই পূর্বে সবসময় আপনার সাথে ছিল না, ভবিষ্যতেও থাকবে না। পৃথিবী নামক এই রঙ্গমঞ্চে আমরা অভিনয় করার জন্য সাময়িক সময়ের জন্য একত্রিত হয়েছি। তাই এই সরল সত্যটি মেনে নিয়ে এ জগতের কাউকে নিয়ে নিত্যকাল বাঁচার ইচ্ছা করবেন না, যে কেউই যেকোন সময় আপনাকে একা ফেলে রেখে চলে যেতে পারে।

(৪) আপনি মেনে নিন এটা দুঃখের জগৎ। আর এটা মেনে নিয়ে দুঃখ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করুন। এজন্য অবশ্যই পাপশুন্য হয়ে সাধু-গুরু-বৈষ্ণবের নির্দেশ মতো আপনার জীবন পরিচালিত করুন এবং মনগড়া ধর্ম পরিহার করুন।

যদি এই চারটি সত্য মেনে নেন তাহলে দেখবেন যে কোন দুঃখই আপনার মনকে স্পর্শও করতে পারবে না। আপনার ইহকাল ও পরকাল দুটোই আনন্দময় হবে।

------- রাধানাথস্বামী মহারাজ ।



ভগবান কি
 কি করতে পারেন না ।

       কামারপুকুরে একজন বৃদ্ধ সাধু আছেন। তাঁর কথা বলার জন্য এই লেখা। পায়ে বাত,  লাঠি ধরে চলেন‌। তাঁর নাম স্বামী ভবেশ্বরানন্দ মহারাজ। চেয়ারে বসেই তিনি নানা আধ্যাত্মিক প্রসঙ্গ করতেন, এখন আর পারেন না। একটু তোতলা,  মাঝে মাঝে কথা আটকে যায়। প্রথমে মাত্র দুতিনজন উপবিষ্ট ভক্ত নিয়েই প্রসঙ্গ আরম্ভ করে দিতেন। তারপর যাঁরাই ঠাকুর দর্শন করতে আসতেন, তাঁরাই তাঁর মিষ্ট স্বর এবং বলার ভঙ্গিতে আকর্ষিত হয়ে বসে পড়ত। ধীরে ধীরে অনেক লোক হয়ে যেত। ঘণ্টাখানেক বলে শেষ করে আবার লাঠি ধরে ধীরে ধীরে চলে যেতেন। মনে হতো  তিনি যেন পুজো করছেন অথবা এই ভাবেই মানুষের সেবা করছেন।
       একদিন এসে বসেই উপবিষ্ট ভক্তদের বললেন, "বল তো,  ভগবান কি কি করতে পারেন না?" আমরা ভাবছি,  সে আবার কী! ভগবান তো সর্ব শক্তিমান! তিনি পারেন না এমন কিছু আছে নাকি! আমরা নিরুত্তর রইলাম। উনি নিজেই আরম্ভ করলেন।

ভগবান তিনটি জিনিস পারেন না—


১. প্রথমত, তিনি কাউকে ঘৃণা করতে পারেন না। কেন?  কাকে ঘৃণা করবেন?  সব যে নিজের। মানুষ, পশু, পাখি, পোকামাকড় সব যে তাঁর নিজের, সব যে তিনিই। কাকে ঘৃণা করবেন?  তাই ভগবান ঘৃণা করতে পারেন না।

২. দ্বিতীয়ত, তিনি শরণাগতকে অস্বীকার করতে পারেন না। আন্তরিক শরণাগতকে ফিরিয়ে দেওয়া ভগবানের সাধ্যের বাইরে। শরণাগত বিভীষণকে বাঁচাবার জন্য রামচন্দ্র রাবণের ব্রহ্মাস্ত্রের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলেন। মা বলেছেন—শরণাগত শরণাগত শরণাগত। আমাদের প্রভুর চরণে শরণ নিতে বলেছেন। শরণাগত হলে প্রভুর আমাদের রক্ষা না করে উপায় নেই। শ্রীকৃষ্ণ বলছেন—"ন মে ভক্ত প্রণশ্যতি।"

৩.  তৃতীয়ত,  তিনি একবার কৃপা করে ফেললে তা প্রত্যাহার করে নিতে পারেন না। সংসারে ভগবান আমাদের অনেক কিছু দিয়ে থাকেন। ধনসম্পত্তি, জমিজমা, স্বামী-স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, মান-যশ ইত্যাদি। এগুলো তিনি ফেরত নিয়ে নিতে পারেন,  এগুলো সব নিমেষে কেড়ে নিতে পারেন। কিন্ত তিনি যদি একবার কৃপা করে ফেলেন, তবে সেই কৃপাটি আর ফেরত নিতে পারেন না। পরশমণির স্পর্শে লোহা একবার সোনা হয়ে গেলে কেল্লা ফতে ! ভগবানের কৃপাস্পর্শে ভক্ত একবার সোনা হয়ে গেলে আর কোনদিন কৃপাহীন হয় না। ভগবান তা করতে পারেন নাl হাতের তীর একবার ছেড়ে গেলে যেমন ফেরানো যায় না, তেমনি ভগবানের করুণা একবার পেয়ে গেলে তা ভগবান কোনদিন ফেরত নিয়ে নিতে পারেন না।
এই তিনটি জিনিস ভগবান পারেন না।
----------
সংগৃহীত

বয়স  বাড়ার সাথে সাথে আপনি  কি কি করবেন  এবং  করবেন না ::


*বয়স বাড়ার সাথে সাথে দুটো জিনিস নিয়মিত চেক করুন।*
১) ব্লাড প্রেসার।
২) ব্লাড সুগার।

 চারটি জিনিস একেবারেই ভুলে
 যান৷
১) বয়স বাড়ছে এটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করা,
২) অতীত নিয়ে সর্বদা অনুশোচনা করা,
৩) সবসময় দুঃখে কাতর হয়ে থাকা,
৪) মানসিক উৎকণ্ঠা বা উদ্বেগ।

 *পাঁচটি জিনিস খাবার থেকে যত পারুন এরিয়ে চলুন।*
১) লবন,
২) চিনি,
৩) অতিরিক্ত চর্বি জাতীয় খাবার ।
৪) অতিরিক্ত ভাজা ভূজি খাবার
৫) বাইরের কেনা খাবার বা প্রসেসেড ফুড।

 *পাঁচটি জিনিস খাবারে যত পারুন বাড়িয়ে নিন।*
১) সব রকমের সবুজ শাক
২)সব রকম সবুজ সব্জি, সীম বা মটরশুটি ইত্যাদি
৩) ফলমূল,
৪) বাদাম,
৫) প্রোটিন জাতীয় খাবার।

*মানসিক শান্তি বা সুখী হতে  সাতটি জিনিস সবসময় সাথে রাখার চেষ্টা করুন।*
১) একজন প্রকৃত ভালো বন্ধু,
২) নিজের সমগ্ৰ পরিবার,
৩) সবসময় সুচিন্তা,
৪) একটি নিরাপদ ঘর কিংবা আশ্রয়,
৫) অল্পেতে খুশি হওয়ার চেষ্টা,
৬) অতিরিক্ত অর্থ চিন্তা থেকে নিজেকে দূরে রাখা,
৭) কিছু সময় আধ্যাত্মিক চর্চায় বা সৎসঙ্গ দেওয়া।

 *ছয়টি জিনিসের চর্চা রাখুন।*
১) অহংকার, Ego বর্জন করার কৌশল,
২) সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা,
৩) মানুষের সাথে ভালো আচরণ করা,
৪) নিয়মিত শরীর চর্চা করা,যোগ অন্ততঃ 24 মিনিট ।কিছুক্ষণ হাঁটা নিয়মিত ।
৫) ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা।
*৬) সরল ও সৎ জীবন যাপন*

 *সাতটি জিনিস এড়িয়ে চলুন।*
১) কর্য,
২) লোভ,
৩) আলস্য,
৪) ঘৃণা,
৫) সময়ের অপচয়,
৬) পরচর্চা,পরনিন্দা
৭) কোনো রূপ নেশা বা আসক্তি

 *পাঁচটি জিনিস কখনোই করবেন না।*
১) অতিরিক্ত ক্ষুধা নিয়ে খেতে যাওয়া,
২) অতিরিক্ত পিপাসায় কাতর হয়ে জল পান করা,
৩) অতিরিক্ত দূর্বল হয়ে ঘুমোতে যাওয়া,
৪) অতিরিক্ত দূর্বল হয়ে বিশ্রাম নেয়া,
৫) একেবারে অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়া,
🙏🙏সুস্থ থাকুন আনন্দে থাকুন🙏🙏Guru Tarun Kumar


#গুরুপূর্ণিমা#


           গুরুর্ব্রহ্মা গুরুর্বিষ্ণু গুরুর্দেবো মহেশ্বরঃ।
           গুরুরেব পরম ব্রহ্ম তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।

সংস্কৃত শব্দ 'গুরু':  'গু' মানে অন্ধকার/অজ্ঞতা এবং 'রু' মানে যা অন্ধকার দূরীভূত করে ; অর্থাৎ গুরু শব্দটির অর্থ যিনি অন্ধকার দূরীভূত করেন।

       অাজ গুরু পূর্ণিমার এই শুভদিনে জগতের গুরু #ঠাকুর_শ্রীরামকৃষ্ণপরমহংস দেবের শ্রীপাদপদ্মে  অামার শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করি এবং অামার গুরুভাই ও গুরুবোনদের জানাই গুরু পূর্ণিমার বিনম্র শুভেচ্ছা।

       স্বামীজীর দৃষ্টিতে গুরু ও শিষ্যের লক্ষণঃ

       সূর্য্যকে প্রকাশ করতে যেমন মশালের প্রয়োজন নেই, তেমনই লোকগুরুর অাবির্ভাবে অাত্মা স্বভাবতঃই জানতে পারেন তাঁর উপর সত্যর সূর্যালোক-সম্পাত অারম্ভ হইয়াছে। যে-সকল অাচার্যের হৃদয়ে  জ্ঞান ও সত্য সূর্যালোকের ন্যায় প্রতিভাত, তাঁহারা জগতের সর্বোচ্চ মহাপুরুষ, অার জগতের অধিকাংশ লোকই তাঁহাদিগকে 'ঈশ্বর' বলিয়া পূজা করে। কিন্তু অামরা অপেক্ষাকৃত অল্প-জ্ঞানীর নিকটও অাধ্যাত্বিক সাহায্য লাভ করিতে পারি। তবে অামাদের এরুপ অন্তর্দৃষ্টি নাই যে, অামরা গুরু বা অাচার্যের সম্বন্ধে যথার্থ বিচার করতে পারি। তাই গুরু-শিষ্য উভয়ের সম্বন্ধেই কতকগুলি পরীক্ষা অাবশ্যক।

       শিষ্যের এই গুণগুলি অাবশ্যক- পবিত্রতা, প্রকৃত জ্ঞানপিপাসা ও অধ্যাবসায়। অশুদ্ধাত্মা পুরুষ কখনও প্রকৃত ধার্মিক হতে পারে না। ধর্মের জন্য প্রকৃত ব্যাকুলতা ছাড়া হৃদয়ের ধর্মপিপাসা নিবৃত্তি হয় না। যতদিন না প্রাণে এই ব্যাকুলতা জাগ্রত না হয়, ততদিন শিষ্যের নিরন্তর অধ্যাবসায় প্রবৃত্তি প্রয়োজন হয়, অতঃপর সিদ্ধি অবশ্যম্ভাবী।

      তেমনি গুরু যিনি, তিনি যেন শাস্ত্রের মর্মজ্ঞ হন। শাস্ত্রের মর্ম যিনি জানেন, তিনিই যথার্থ ধর্মাচার্য। জগতের প্রধান ধর্মাচার্যগণ কেহই শাস্ত্রের ব্যাখ্যা করিতে অগ্রসর হন নাই। তাঁহারা শুধু জগৎকে শাস্ত্রের মহান ভাব-শিক্ষাই দিয়াছেন।

     ভগবান, শ্রীরামকৃষ্ণ একটি গল্প বলিতেনঃ এক অাম-বাগানে কয়েকজন লোক বেড়াইতে গিয়াছিল; বাগানে ঢুকিয়া তাহারা গণিতে অারম্ভ করিল, কটা অাম গাছ, কোন্ গাছে কটা অাম, এক-একটা ডালে কত পাতা, অামের বর্ণ, অাকার, প্রকার ইত্যাদি নানাবিধ পান্ডিত্যপূর্ণ বিচার করিত লাগিল। অার একজন ছিল বিচক্ষণ, সে এসব গ্রাহ্য না করিয়া অাম পাড়িতে লাগিল ও খাইতে লাগিল। বলো দেখি, কে বেশী বুদ্ধিমান্? অাম খাও, পেট ভরিবে, কেবল পাতা গণিয়া-হিসাব করিয়া লাভ কি? এই পাতা-ডালপালা গোনা ও অপরকে উহার সংখ্যা জানাইবার চেষ্টা একেবারে ছাড়িয়া দাও। অবশ্য এরুপ কার্যের উপযোগিতা অাছে, কিন্তু ধর্মরাজ্যে নয়। যাহারা এইরুপ পাতা গণিয়া বেড়ায়, তাহাদের ভিতর হইতে কখনও একটিও ধর্মবীর বাহির করিতে পারিবে না। ধর্ম- যাহা মানব জীবনরর সর্বোচ্চ লক্ষ্য, মানুষের শ্রেষ্ঠ গৌরবের জিনিস, তাহাতে পাতা-গোণারুপ অত পরিশ্রমের প্রয়োজন নাই। তাহাদের পন্ডিতি তর্কবিচারে 'শান্তিঃ শান্তিঃ' বলিয়া এস অামরা অাম খাইতে থাকি।

       দ্বিতীয়তঃ গুরুর নিষ্পাপ হওয়া অাবশ্যক।
       তৃতীয়তঃ গুরুর উদ্দেশ্য -সমগ্র মানব জাতির প্রতি শুদ্ধ প্রেমই যেন তাঁহার কার্যের নিয়ামক হয়।

      অর্থাৎ 'যিনি বিদ্বান্ নিষ্পাপ ও কামগন্ধহীন, যিনি শ্রেষ্ঠ ব্রহ্মবিৎ', তিনিই প্রকৃত সদ্গুরু। এই সদ্গুরুই ধর্মশিক্ষার্থীর চোখ খুলিয়া দেন। সুতরাং কোন ব্যক্তির সহিত তাহার বংশধরের যে সম্বন্ধ, গুরুর সহিত শিষ্যেরও ঠিক সেই সম্বন্ধ। গুরুর প্রতি বিশ্বাস, বিনয়নম্র অাচরণ, তাঁহার নিকট শরণগ্রহণ ও তাঁহার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ব্যতিরেকে  অামাদের হৃদয়ে ধর্মের বিকাশ হইতেই পারে না।

     ধর্ম- সর্বোচ্চ জ্ঞানস্বরুপ যে ধর্ম, তাহা ধন-বিনিময়ে কিনিবার জিনিস নয়, গ্রন্থ হইতেও পাওয়া যায় না। যতদিন না তোমার হৃদয় ধর্ম গ্রহন করিবার উপযুক্ত হইতেছে এবং যতদিন না তুমি গুরু লাভ করিতেছ, কোথাও ধর্ম খুজিয়া পাইবে না। বিধাতৃনির্দিষ্ট এই গুরু যখনই লাভ করিবে, অমনি বালকবৎ বিশ্বাস ও সরলতা লইয়া তাঁহার সেবা কর, তাঁহার নিকট প্রাণ খুলিয়া দাও, তাঁহাকে সাক্ষাৎ ঈশ্বররুপে দেখ। যাহারা এইরুপ প্রেম ও শ্রদ্ধাসম্পন্ন হইয়া সত্যানুসন্ধান করে, তাহাদের নিকট সত্যের ভগবান্ সত্য শিব ও সুন্দরের অতি অাশ্চর্য তত্ত্বসমূহ প্রকাশ করেন।


অমৃত কথা :


(১) "ঈশ্বরই একমাত্র গুরু, পিতা ও কর্তা । মানুষের কি সাধ্য অপরকে সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত করে ।  যাঁর এই ভুবনমোহিনী মায়া, তিনিই সেই মায়া থেকে মুক্ত করতে পারেন । সচ্চিদানন্দই গুরু । সচ্চিদানন্দ গুরু বই আর গতি নাই । যদি মানুষ গুরুরূপে চৈতন্য করে, তো জানবে যে সচ্চিদানন্দই ঐ রূপ ধারণ করেছেন । গুরু যেন সেথো, হাত ধরে নিয়ে যান । ভগবান্ দর্শন হলে আর গুরু-শিষ্য-বোধ থাকে না । তাই জনক শুকদেবকে বললেন, 'যদি ব্রহ্মজ্ঞান চাও, আগে গুরুদক্ষিণা দাও । কেন-না ব্রহ্মজ্ঞান হ'লে আর গুরু-শিষ্য ভেদ-বুদ্ধি থাকবে না ।' যতক্ষণ ঈশ্বর দর্শন না হয়, ততক্ষণই গুরু-শিষ্য সম্বন্ধ ।"
    -- ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ ।
(২) "মন্ত্রের মধ্য দিয়ে শক্তি যায় । গুরুর শক্তি শিষ্যে যায়, শিষ্যের গুরুতে আসে । শিষ্য পাপ করলে গুরুরও লাগে । ভাল শিষ্য হ'লে গুরুরও উপকার হয় ।"
       -- শ্রীশ্রীমা সারদা ।
(৩) যে ব্যক্তির আত্মা হইতে অপর আত্মার শক্তি সঞ্চারিত হয়, তাঁহাকে 'গুরু' বলে ; এবং যে ব্যক্তির আত্নার শক্তি সঞ্চারিত হয়, তাঁহাকে 'শিষ্য' বলে ।"
          -- স্বামী বিবেকানন্দ ।



সুপ্রভাত, আজ ২০শে আষাঢ় ১৪২৭ বঙ্গাব্দ (১৮৫ রামকৃষ্ণাব্দ) রবিবার (ইং : ৫ই জুলাই ২০২০)।
তিথি : আষাঢ়ী পূর্ণিমা দিবা ১০।৬ পর্যন্ত ।
আজ শ্রীশ্রীগুরু পূর্ণিমা ও শ্রীশ্রী ব্যাস পূজা ।
অমৃত কথা :
(১) "ঈশ্বরই একমাত্র গুরু, পিতা ও কর্তা । মানুষের কি সাধ্য অপরকে সংসার-বন্ধন থেকে মুক্ত করে ।  যাঁর এই ভুবনমোহিনী মায়া, তিনিই সেই মায়া থেকে মুক্ত করতে পারেন । সচ্চিদানন্দই গুরু । সচ্চিদানন্দ গুরু বই আর গতি নাই । যদি মানুষ গুরুরূপে চৈতন্য করে, তো জানবে যে সচ্চিদানন্দই ঐ রূপ ধারণ করেছেন । গুরু যেন সেথো, হাত ধরে নিয়ে যান । ভগবান্ দর্শন হলে আর গুরু-শিষ্য-বোধ থাকে না । তাই জনক শুকদেবকে বললেন, 'যদি ব্রহ্মজ্ঞান চাও, আগে গুরুদক্ষিণা দাও । কেন-না ব্রহ্মজ্ঞান হ'লে আর গুরু-শিষ্য ভেদ-বুদ্ধি থাকবে না ।' যতক্ষণ ঈশ্বর দর্শন না হয়, ততক্ষণই গুরু-শিষ্য সম্বন্ধ ।"
    -- ঠাকুর শ্রীশ্রী রামকৃষ্ণ ।
(২) "মন্ত্রের মধ্য দিয়ে শক্তি যায় । গুরুর শক্তি শিষ্যে যায়, শিষ্যের গুরুতে আসে । শিষ্য পাপ করলে গুরুরও লাগে । ভাল শিষ্য হ'লে গুরুরও উপকার হয় ।"
       -- শ্রীশ্রীমা সারদা ।
(৩) যে ব্যক্তির আত্মা হইতে অপর আত্মার শক্তি সঞ্চারিত হয়, তাঁহাকে 'গুরু' বলে ; এবং যে ব্যক্তির আত্নার শক্তি সঞ্চারিত হয়, তাঁহাকে 'শিষ্য' বলে ।"
          -- স্বামী বিবেকানন্দ ।


জওহরলাল নেহরু ও তাঁর স্ত্রী ::


ভদ্র মহিলা জওহরলাল নেহরুর স্ত্রী #কমলা নেহেরু।,টিবি রোগে আক্রান্ত  হবার কারনে উত্তরখন্ড আলমোরা ও পাহাড়ি এলাকা হাসপাতালে  ছেড়ে  এসেছিলেন। #টিবি হবার পর ও কমলা নেহেরু  #10বছর বেঁচে  ছিলেন কিন্তু জওহরলাল  বিদেশ #ভ্রমণ করলেও এক দিনের জন্য  ও স্ত্রী কে দেখতে যান নি!!#নেতাজী  সুভাষচন্দ্র   বসু  জানার পর কমলা নেহেরু  কে দেখতে যান এবং উন্নত মানের  #চিকিৎসার জন্য  সেই সময়  #70হাজার টাকা জোগাড় করে ভালো হাসপাতালে  ভর্তি করান ।কিন্তু  কমলা নেহেরু মনের দিক থেকে ভেঙে  পরেছিলেন কমলা  নেহেরুর #মৃত্যুর 10দিন আগে নেতাজী  জওহরলাল  কে খবর দিয়েছিলেন তবুও তিনি #যাননি অবশেষে #মৃত্যু  হলেও তার শেষ কৃত সম্পূর্ণ  করার জন্য ও যান নি অবশেষে  নেতাজী  সুভাষ চন্দ্র বসু  কমলা নেহেরুর #অন্তিম  কাজ করেছিলেন।।
ইতিহাস এর পাতা থেকে  আজ এগুলো উধাও  হয়ে  গেছে।


অখ্যয় তৃতীয়া সম্বন্ধে দু-চার কথা :-


অক্ষয় তৃতীয়ার নানা গল্প। সেই পুরাণ থেকে আজ পর্যন্ত

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে বছরের প্রথম শুভ দিন হল ‘অক্ষয় তৃতীয়া।’। বছরের  প্রথম মাস বৈশাখের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিই হিন্দুশাস্ত্রে ‘অক্ষয়  তৃতীয়া’ হিসেবে চিহ্নিত। শাস্ত্রগ্রন্থ অনুসারে, এই দিনটির গুরুত্ব অনেক।  পুরাণে যে চারটি যুগকল্পের কথা বলা হয়েছে, সেই সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলির  মধ্যে প্রথম দুটি যুগের সূচনা হয়েছিল অক্ষয় তৃতীয়ার দিনে। এই তিথিতেই জন্ম  নিয়েছিলেন বিষ্ণুর ষষ্ঠ অবতার পরশুরাম। ভগীরথ এই পুণ্য তিথিতে স্বর্গ থেকে  গঙ্গাকে পৃথিবীর মাটিতে নিয়ে আসেন বলে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা গঙ্গার জলকে  অক্ষয় পবিত্রজ্ঞানে পুজো করে। বেদব্যাসের বলা শ্লোক শুনে গণেশ ‘মহাভারত’  লিপিবদ্ধ করার কাজও শুরু করেন এই অক্ষয় তৃতীয়ার দিন থেকে।

অক্ষয় তৃতীয়ার সর্বাধিক গুরুত্ব বোধ হয়, দানের পুণ্যফল লাভের কারণে। এ  সম্পর্কে মহাভারতের সূত্র ধরে ভবিষ্যপুরাণে একটি আখ্যান আছে। সম্রাট  যুধিষ্ঠির ব্যাসদেবের শিষ্য শতানীক মুনীর কাছে জলদানের মাহাত্ম জানতে  চাইলে, মুনী একটা গল্প বললেন। বৈশাখের এক তীব্র গরমের দিনে এক তৃষ্ণার্ত  ব্রাহ্মণ পথিক পথিমধ্যে আরেক ব্রাহ্মণের গৃহে এসে জল চাইলেন। গৃহস্থ  ব্রাহ্মণ ছিলেন অধার্মিক এবং দুর্মুখ। তিনি জল তো দিলেনই না, উপরন্তু অপমান  করে ব্রাহ্মণকে তাড়িয়ে দিতে উদ্যত হলেন। এমন সময়ে বাড়ির অন্দর থেকে  ব্রাহ্মণের পত্নী বেরিয়ে এসে এই অমানবিক আচরণের জন্য স্বামীকে তিরস্কার  করলেন এবং তৃষ্ণার্তকে অন্নজলে তৃপ্ত করলেন। সে দিনটি ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।  তার পর বহু কাল কেটে গেছে। গৃহস্থ ব্রাহ্মণের আয়ু শেষ হয়ে এলে যমদূতেরা  তাঁকে যমলোকে নিয়ে এল কিন্তু যমরাজ সব বিচার করে ওই দুর্মুখ ব্রাহ্মণকে  স্বর্গে পাঠাবার বিধান দিলেন! বিস্মিত যমদূতেরা এমন অধার্মিক ব্যক্তির  নরকের বদলে স্বর্গপ্রাপ্তির কারণ জানতে চাইলে যমরাজ জানালেন যে এক অক্ষয়  তৃতীয়ার দিন ব্রাহ্মণের পত্নী তৃষ্ণার্ত পথিককে অন্নজলদানে তুষ্ট করেছিলেন।  সতীর সেই পুণ্যের ভাগ পতিও পেয়েছেন এবং তাই তাঁর স্বর্গলাভ হয়েছে।

শিবকে তপস্যায় তুষ্ট করে কুবের এই দিন অতুল ঐশ্বর্য লাভ করেন তাই  লক্ষ্মীলাভের উদ্দেশ্যে এই দিন কোথাও কোথাও বৈভবলক্ষ্মীর পুজোও হয়।  লক্ষ্মীর কৃপা পাওয়ার আশায় অনেক ব্যবসায়ীও পয়লা বৈশাখের পরিবর্তে অক্ষয়  তৃতীয়ার দিন থেকে নতুন ব্যবসা আরম্ভ করেন বা হালখাতা করেন। শ্রীক্ষেত্র  পুরীর জগন্নাথদেবের রথ নির্মাণ শুরু হয় এই তিথি থেকেই।


পানসি  বেলঘরিয়ার কথা :



“চালাও পানসি বেলঘরিয়া” বাংলার এই প্রবাদটি র মধ্যে লুকিয়ে আছে বেলঘরিয়ার গৌরবময় ইতিহাস।  উনিশ শতকের প্রথমার্ধে আরিয়াদহ, বরানগর, বেলঘরিয়ায় গড়ে উঠেছিল অনেক বাগান বাড়ি। কলকাতার জমিদার ও বাবু-কালচারে পুষ্ট একশ্রেণীর ‘হঠাৎ-বড়লোক’ নিজের বাড়ি থেকে নিরাপদ দূরত্বে বিভিন্ন বাগানবাড়ি নির্মাণ করে। কলকাতা থেকে পানসি (একধরনের নৌকা) চেপে ফুরতির উল্লাস গলায় ঢেলে হাক পারত চালাও পানসি বেলঘরিয়া।
তাদের বাগান বাড়ির অস্তিত্ব এখন একদমই নেই বললেই চলে। এই বাড়ি গুলি কাদের ছিল কারা থাকত তার প্রমাণ সেরকম ভাবে কিছু জানা যায়নি। কারণ বেশিরভাগই এখন ভেঙে বসতি গড়ে উঠেছে। মুছে গেছে সে-সময়ের দলিল।

তবু, যেটুকু ইতিহাস জানা যায় প্রাচীনদের মুখ থেকে, প্রধান বাগানবাড়িগুলি ছিল নীলগঞ্জ রোডের আশেপাশেই, দেঁতে খালকে কেন্দ্র করে। এখন যেখানে জেনিথ হসপিটাল, সেখানে ছিল বিশাল একটি বাগানবাড়ি। সেখানে নাচঘরে একটি কাঠের পাটাতনের নিচে জলের ওপর তার লাগানো থাকত, বাইজিরা নাচার সময় বেজে উঠত জলতরঙ্গ। বাকিগুলির কথা তেমনভাবে জানা যায় না এখন আর। এছাড়াও এখন যেখানে স্টেট ট্রান্সপোর্ট অফিস, সেখানেও বাগানবাড়ি ছিল। বর্তমান দু’নম্বর রেলগেটের পাশে ওল্ড নিমতা রোডের ওপরেই ছিল রেমিশনের বাগানবাড়ি, এক ঔষধ প্রস্তুতকারক কম্পানির ছিল। বর্তমানে বাসুদেবপুরের যে অঞ্চলটি ‘মনোভিলা’ নামে পরিচিত, সেখানে ছিল মনোরমা বাইজির বাগানবাড়ি। বৃদ্ধ বয়েসে তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি হয়েছিল বলে জানিয়েছেন অনেকে। তার পাশেই ছিল সুরেন দাসের বাগান।

বরাহনগর ডানলপের কাছে বি.টি. রোডের পশ্চিমদিকে ছিল গুপ্তনিবাস, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এখানে অনেকদিন ছিলেন এবং এখানেই মারা যান ১৯৫১ সালে। এমনকি, তিরিশের দশকের প্রথমার্ধে, অসুস্থ অবস্থায় রবীন্দ্রনাথও কিছুকাল বাস করেন এখানে। সদ্যনির্মিত সিসিআর ব্রিজের ওপর দিয়ে মালগাড়ির অবিরাম যাতায়াতের শব্দে বিরক্ত হয়ে, কিছুটা রসপ্রয়োগেই বেলঘরিয়া’কে ‘ঘড়ঘড়িয়া’ বলে ডাকতেন তিনি।

বেলঘরিয়ায় বিটি রোডের ওপর এখনও অবস্থিত মতি শীলের ঠাকুরবাড়ি ও অতিথিশালা। একে ঠিক বাগানবাড়ি বলা যায় না। মতিলাল শীল ছিলেন উনবিংশ শতকের কলকাতার একজন প্রধান ব্যবসায়ী ও দানশীল ব্যক্তি। ১৮৪১সালে তিনি আড়িয়াদহে স্নানার্থীদের জন্য একটি ঘাট এবং বেলঘরে পথচারীদের জন্য একটি অতিথিশালা নির্মাণ করে দেন।১৮-৬-১৮৮৩ তারিখে ঠাকুর রামকৃষ্ণ সদলবলে পানিহাটীর মহোৎসবে হইতে ফিরিবার পথে সন্ধ্যার সময় এই ঠাকুরবাড়ি ও ঝিল দর্শন করেন।
এছাড়াও ঠাকুর রামকৃষ্ণ হ্রদয় কে সঙ্গে নিয়ে বেলঘরিয়ার জয়গোপাল সেনের বাগান বাড়িতে (আট নং বি টি রোড) এসে কেশব চন্দ্র সেন’ মহাশয়ের সাথে দেখা করেন এবং 14-5-1875 তারিখে ঠাকুর বেলঘরিয়ায় এসে তার সাথে ধর্মালোচনা করেন।

বেলঘরিয়া বা ‘বেলঘর’  নিয়ে প্রচলিত ছিল একটি ছড়া -

‘বাগান পুকুর বাবাঠাকুরের বর
এই তিন নিয়ে বেলঘর।’

আজ থেকে এক-দেড়শো বছর আগে জলাজমি আর পুকুরের অভাব ছিলোনা এখানে। আর, ‘বাবাঠাকুর’ হলেন পঞ্চাননতলার শিব, বাবা পঞ্চানন। ‘বড়ঠাকুর’ নামেও পরিচিত তিনি। বেলঘরিয়ার সবচেয়ে পুরনো মন্দির এই পঞ্চাননতলাতেই। এর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল দূর-দূরান্তে। বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষ আসতেন এখানে পুজো দিতে, মানত করতে। এমনকি, আগেকার দিনে উড়িষ্যার কেওনঝড়ের রাজা, নাটোরের রাজাও এখানে মানত করেছিলেন। এখনও, অশ্বত্থগাছের ডালে দেখতে পাওয়া যায় অনেক মাটির ঘোড়া, ঢিল বাঁধা। এভাবেই, লোকবিশ্বাস ও লোকসংস্কৃতির এক ঐতিহ্য প্রাচীনকাল থেকেই নিজের বুকে পুষে রেখেছে বেলঘরিয়া।
এবার আসি বেলঘরিয়া এই নাম করনের ইতিহাস।
 “সপ্তদশ শতাব্দীতে ঐ অঞ্চল ছিল পাট, মাছ ও তরি-তরকারির প্রধান পাইকারি বাজার। প্রবাদ আছে, আড়িয়াদহে নৌকা থেকে পাট ও অন্যান্য সামগ্রী লোডিং ও আনলোডিং করার কাজে মালবাহকদের ডাকার জন্য ওখানে একটা বড়ো ঘণ্টা লাগানো থাকত, যা থেকে অঞ্চলটার নাম হয়েছে ‘বেলঘর’, ‘বেলঘর’ থেকে ‘বেলঘরিয়া’।”
এই  তত্ত্ব কিছু ইতিহাসবিদ মনে করে।
আবার আরেক দল ,  ‘ঘন্টাঘর’এর তত্ত্ব এর কথা বলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, সিরাজদৌল্লা যখন ১৭৫৬ সালে কলকাতা আক্রমণ করতে আসেন, ইংরেজ’রা এই অঞ্চলে একটি ‘বেল’ বা ‘ঘন্টা’ লাগিয়েছিল, তৎকালীন সাইরেন হিসেবে ব্যবহারের জন্য। তা থেকে নাম হয় ‘বেলঘর’ ।
আবার অনেকে বলে থাকেন এখানে অনেক বেল গাছ ছিল। সেখানে বড়ো বড়ো সাইজের বেল হতো। যা থেকে নাম হয় বেলঘরিয়া। তবে এখানে poঅনেক পুরনো বাড়ির ফলকে BELGHURRIAH নামটা পাওয়া যায়।

তবে অনেক কবিরও পায়ের ধূলা পরেছে এই বেলঘরিয়ায় । যেমন কাজি নজরুল ইসলাম।
১৯২৬-২৭ সালে, কৃষ্ণনগর থেকে কলকাতায় ফেরার পথে নজরুল প্রায়ই হাজির হতেন বেলঘরিয়ায়। স্থানীয় বন্ধু ও কবিদের সঙ্গে আড্ডায় মজলিশে মেতে উঠতেন তিনি। আজ যেখানে কবি চন্ডিচরন মিএ  স্ট্রিট, সেখানেই  কবি চণ্ডীচরণের বাড়িতে জমে উঠত আড্ডা। এছাড়াও, কামারহাটি পৌরসভার কমিশনার বৈদ্যনাথ ঘোষালের বাড়িতে একটি সাহিত্যসভা আয়োজিত হত, নাম ‘রসচক্র’। নজরুল সহ কল্লোল গোষ্ঠীর লেখকরা প্রায়ই আসতেন সেখানে। প্রবেশ করেই সোল্লাসে চেঁচিয়ে উঠতেন নজরুল – ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’। এবং গানে কবিতায় অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে সভার মধ্যমণি হয়ে উঠতেন অচিরেই।

তাঁর জনপ্রিয়তা বেলঘরিয়া সহ আশেপাশের প্রতিটি জনপদেই ছিল তুঙ্গে। চণ্ডীচরণ মিত্রের উদ্যোগে বেলঘরিয়া মিডল ইংলিশ স্কুলে(বর্তমান বেলঘরিয়া হাই স্কুল) আয়োজিত বাৎসরিক ভোজ ও কবিসম্মেলনে নজরুল ছাড়াও গোলাম মোস্তাফা, নরেন্দ্র দেব, জলধর সেন, বুদ্ধদেব বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, দীনেশ দাশ, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত প্রমুখের উপস্থিতি ছিল অনিবার্য।

’৪১এ মারা গেলেন চণ্ডীচরণ মিত্র। ’৪২এ তো চিরতরেই অসুস্থ হয়ে গেলেন কবি। বেলঘরিয়া ও পারিপার্শ্বিক আড়িয়াদহ, পানিহাটি, বরানগর প্রভৃতি জনপদের সঙ্গে সাক্ষাৎ সম্পর্কেও ছেদ পড়ে তারপর।
এছাড়াও ছন্দের জাদুকর কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত র বাড়িও ছিল বেলঘরিয়ার নিমতা’য়। তার নামানুসারে বেলঘরিয়া ব্রিজ এর নাম হয় কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত সেতু।
বেলঘরিয়ার কিছু ফটো আমার বন্ধুদের জন্য share করলাম।




♦️♦️♦️♦️♦️♦️     দিব্যবাণী     ♦️♦️♦️♦️♦️♦️


                " প্রথমে অন্নদান, তারপর বিদ্যাদান, সর্বোপরি জ্ঞানদান ।  এই তিন ভাবের সমন্বয় এই মঠ থেকে করতে হবে ।  অন্নদান করবার চেষ্টা করতে করতে ব্রহ্মচারীদের মনে পরার্থকর্মতৎপরতা ও শিবজ্ঞানে জীবসেবার ভাব দৃঢ় হবে ।  ও থেকে তাদের চিত্ত ক্রমে নির্মল হয়ে তাতে সত্ত্বভাবের স্ফূরণ হবে ।  তা হলেই ব্রহ্মচারিগণ কালে ব্রহ্মবিদ্যালাভের যোগ্যতা ও সন্ন্যাসাশ্রমে প্রবেশাধিকার লাভ করবে ।........
                " এই অন্নহাহাকারের দিনে তুই যদি পরার্থে সেবাকল্পে ভিক্ষা-শিক্ষা করে যেরূপে হোক দুমুঠো অন্ন দীনদুঃখীকে দিতে পারিস, তা হলে জীব-জগতের ও তোর মঙ্গল তো হবেই -------- সঙ্গে সঙ্গে তুই এই সৎকাজের জন্য সকলের sympathy ( সহানুভূতি ) পাবি ।  ঐ সৎকাজের জন্য তোকে বিশ্বাস করে কামকাঞ্চনবদ্ধ সংসারীরা তোর সাহায্য করতে অগ্রসর হবে ।  তুই বিদ্যাদানে বা জ্ঞানদানে যত লোক আকর্ষণ করতে পারবি, তার সহস্রগুণ লোক তোর এই অযাচিত অন্নদানে আকৃষ্ট হবে ।  এই কাজে তুই public sympathy ( সাধারণের সহানুভূতি ) যত পাবি, তত আর কোন কাজে পাবিনি ।  যথার্থ সৎকাজে মানুষ কেন, ভগবানও সহায় হন ।  এরূপে লোক আকৃষ্ট হলে তখন তাদের মধ্য দিয়ে বিদ্যা ও জ্ঞানার্জনের স্পৃহা উদ্দীপিত করতে পারবি ।  তাই আগে অন্নদান ।.........
                 " কর্মের ফলে যদি তোর দৃষ্টি না থাকে এবং  সকল প্রকার কামনা-বাসনার পারে যাবার যদি তোর একান্ত অনুরাগ থাকে, তা হলে ঐ সব সৎকাজ তোর কর্মবন্ধন মোচনেই সহায়তা করবে ।.....  এরূপ পরার্থ কর্মই কর্মবন্ধনের মূলোৎপাটনের একমাত্র উপায় । "

             ------------ স্বামী বিবেকানন্দ ।

   ( বাণী ও রচনা : ৯ম খণ্ড, পৃঃ ১২৬ - ১২৮ )

♦️♦️♦️♦️♦️♦️  জয়  স্বামীজী  ♦️♦️♦️♦️♦️♦️




শ্রীশ্রীরামকৃষ্ঞ কথামৃত থেকে ------     

                         
   ভক্ত--ঠাকুর ,মরলে কি হয় ?                                                      শ্রীরামকৃষ্ঞ --- গীতার মতে , মরবার সময় যা ভাববে ,তাই হবে |ভরত রাজা হরিণ ভেবে হরিণ হয়েছিল |তাই ঈশ্বরকে লাভ করবার জন্য সাধনা করা চাই |রাতদিন ঈশ্বরের চিন্তা করলে মরবার সময়ও সেই চিন্তা আসবে |       ভক্ত ---আচ্ছা ঠাকুর , বিষয়ে বৈরাগ্য হয় না কেন ?                   শ্রীরামকৃষ্ঞ ----- এরই নাম মায়া | মায়াতে সৎকে অসৎ ,অসৎকে সৎ বোধ হয় |                                                        সৎ অর্থাৎ যিনি নিত্য,----পরব্রহ্ম |অসৎ অর্থাৎ সংসার অনিত্য | অভ্যাস কর , দেখবে মনকে যে দিকে নিয়ে যাবে ,সেই দিকেই যাবে |একে অভ্যাস যোগ বলে |                          "" মন ধোপাঘরের কাপড় | তাকে যে রঙে ছোপাবে সেই রঙ হয়ে যাবে |""           🙏🙏🙏🙏🙏 জয় ঠাকুর 🙏🙏🙏🙏🙏🙏         🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹



🪔💥পবিত্র আরতি দর্শনের  অমৃতমহাত্ম্য এবং ফললাভ💥🪔


🌷শাস্ত্র মতে, যে কোনো পূজায় বা সন্ধ্যাকালীন পূজা আরতি বা সন্ধ্যা আরতি হয় কেন? তা দর্শন করলে কি লাভ? এইসব বিধি নিয়মের অর্থই বা কি?..
🪔এই আরতির আর এক নাম নীরাজন। গানে আছে না? নিরাজনে প্রভু নিরাজনে...
পূজা আরতি বা সন্ধ্যা আরতির উপচার বা অঙ্গ কি কি?
💥প্রদীপ (এক,তিন, পাঁচ,সাত,বা বহু শিখা, 108ও হতে পারে) জল- শঙ্খ, বস্ত্র, পুষ্প,এবং চামর।
(বস্ত্রে রন্ধ্র থাকায় ইহা আকাশের প্রতিক।ও মাটির বিশেষ গুণ গন্ধ বলে ফুল উহার সার্থক প্রতীক।)
বলা হয় ,এই উপচারগুলি যথাক্রমে অগ্নি, জল, আকাশ, মাটি, ও বায়ু এই পাঁচটি ভূতের প্রতীক।
এই বিশ্বে যত প্রকার বস্তু রয়েছে তার মূল উপাদান পাঁচটি ভূতের মধ্য দিয়ে যেন সাংকেতিকভাবে সমগ্র পৃথিবী কে শ্রীভগবানের উদ্দেশ্যে নিবেদন করিয়া তাঁহার পূজা করা হইতেছে। তাঁর বিরাট রূপের পূজা। এই পূজা সাংকেতিক পূজা।

🤘উদ্দেশ্য? আমাদের অজ্ঞান নাশ করে... এই জ্যোতির জ্যোতি প্রতীক প্রদীপ আমাদের মন কে উদ্দীপিত করে সেই পরমাত্মা কে লাভ করার জন্য তীর বেগে আমাদের মন তাঁর দিকে ধাবিত হয়। এই পরমাত্মাকে  লাভ করলে সকল প্রকার দুঃখের ও ভববন্ধনের নিবৃত্তি হয়।চিরকালের মতো ভক্ত সাধক ভব বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করেন।
🌺এইযে পঞ্চভূত বললাম, এই পঞ্চ ভূত জগতরুপী কার্য ব্রহ্মের প্রতীক।
আসল কথা, এই জগত রুপী কার্যব্রহ্মের গন্ডিকে অতিক্রম করা। আর এই অতিক্রম করলেই পরমব্রহ্ম সচ্চিদানন্দকে লাভ করা যায়।
আর এই পঞ্চ ভূতকে পূজ্য দেবতার চরণে নিবেদন করে দেবতার বিশ্বাবগাহী বিরাট সত্তার সঙ্গে মিলিত হন। এখানেই এই আরতির সার্থকতা।
👣🌼এই আরতির উপচারগুলি যেমন পঞ্চভূতের প্রতীক আবার বিষয় প্রপঞ্চের ও প্রতীক। যেমন:-
দ্বীপ রূপের প্রতীক। শঙ্খ স্থিত জল-রসের প্রতীক। পুষ্প গন্ধের প্রতীক। চামর বীজন-স্পর্শের প্রতীক।
আর ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে যে আরতি হয়, সেই ঘণ্টাধ্বনি ও শব্দের প্রতীক।
এই আরতির মাধ্যমে সমস্ত উপকরণ ও প্রতীক দেবতা কে উৎসর্গ বা নিবেদন করে, নিজেকে তাঁর চরণে সম্পূর্ণরূপে সমর্পণ করেন।
💐🪔আমরা গৃহস্থবাড়িতে এত উপকরণ না পেয়ে শুধুমাত্র প্রদীপ জ্বালাই। তার অর্থ পরমাত্মা জ্যোতিস্বরূপ।
মনে এইরূপ চিন্তা যে- জ্যোতি রবি, চন্দ্র, বিদ্যুৎ, সুবর্ণ তারকা, এসবই তুমি। আবার এসকল জ্যোতির জ্যোতি ও তুমি। এবং তুমি জ্যোতি রূপে অবস্থিত। তাই তোমাকে এভাবেই ভজনা করি।
এই আরতি একপ্রকার সাংকেতিক পূজা বলা যায়।
🪔🔥প্রথমে ধুপ,ঘৃতের দীপমালা। কর্পূর দীপ ও আরতির অঙ্গ হয়। তারপর জলপূর্ণ শঙ্খ, তারপর বিশুদ্ধ বস্ত্র, পরে সুগন্ধি পুষ্প, সর্বশেষে চামর ও হাতপাখা( সম্ভব হলে)।ইহাই বিধিসম্মত।
আরতি করবার নিয়ম:-
প্রথমে দীপমালা প্রজ্বলিত করে তাকে সম্মুখে একটি ত্রিকোণ মন্ডলের উপর স্থাপন করে অর্চনার দ্বারা দেবতাকে নিবেদন করতে হয়। দীপ বহুশিখাযুক্ত ও অযুগ্ম অর্থাৎ এক,তিন, পাঁচ ইত্যাদি বিষম সংখ্যায় হবে।
🐾🤘🥀দীপমালা অর্চনা ও নিবেদন করার পর, তা  ডান হাতে উঠিয়ে বাম হাতে ঘণ্টা বাজাতে বাজাতে মূলমন্ত্র জপ অথবা দেবতা স্তোত্র পাঠ করতে করতে আরতি  করতে হয়।
🥀🥀🥀 দীপমালা দেবতার শ্রী চরণে চারবার, নাভিদেশে দুবার, মুখমন্ডলে একবার, এবং সর্বাঙ্গে সাতবার ঘুরাতে হয়। তবে মুখমন্ডলে সাধারণত তিনবার ঘোরানো হয়।
🌿🌿🌺🌺🌸🌸
আরতির আগে আচমন, প্রাণায়াম, বিভিন্ন প্রকার শুদ্ধি, নাস্যাদি, ও একটু জপ করে মনে মনে দেবতাকে আমন্ত্রণ করে আসনে বসানো হয়। পরে ফুল, চন্দন, ধূপ, দীপ ও নানাবিধ সুখাদ্য নিবেদন করে তাঁর সেবা করা হয়।
ঠিক যেমন আপন কোন পূজনীয় ব্যক্তি কে সেবা করা হয়।
🌷💥🪔এই নিরাজন বা আরতি করলে যে কোন পূজা তা মন্ত্র বর্জিত হোক আর ক্রিয়া বর্জিত হোক ফলবতী হবেই। যিনি এই আরতি দ্বারা শ্রী ভগবানের পূজা করেন তিনি ইহলোক এবং পরলোক উভয়লোকে মুক্তি প্রাপ্ত হন। এটাই শাস্ত্রতে রয়েছে। আর যিনি ভক্তিচিত্তে দর্শন করেন তিনিও সমান ফলভোগী হন। সাত জন্ম পর্যন্ত তিনি বর্ণশ্রেষ্ঠ দ্বিজ কুলে উৎপন্ন হয়ে অন্তে তাঁর পরমপদ লাভ করেন।
🤘🔥🪔💥💥
মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং যৎকৃতং পূজনং হরেঃ। সর্বং সম্পূর্ণতামেতি কৃতে নীরাজনে শিবে।
🤘🪔🌹
নীরাজনেন যঃ পূজাং করোতি বরবর্ণিনি।
অমৃতং প্রাপ্নুয়াৎ সোহপি ইহলোকে পরত্র চ।
🪔👣🌷
নিরাজনস্য যঃ পশ্যেদ্দেবস্য  চক্রিণঃ।
সপ্তজন্মানি বিপ্রঃ স্যাদন্তে চ পরমং পদম্।
🌿🥀🥀🥀🪔
উপরের অর্থগুলি ও শ্লোক শাস্ত্রে বর্ণিত।🌺🙏🪔

জয় মা জয় ঠাকুর জয় স্বামীজি সকলের মঙ্গল কর🪔🙏🙏🙏🌺



শ্মশানে কেন মা কালীর পূজা হয় ?


“শ্মশান” শব্দের অর্থ হল শম স্থান। মৃত স্থান।চলতি কথায় যেখানে শবদাহ করা হয় সেই ক্ষেত্র শ্মশান ভূমি নামে পরিচিত।করালবদনী আদ্যাশক্তি মায়ের বিচরণ ক্ষেত্র এই শ্মশান।মা কালীকে ধ্বংসের দেবী বলা হয়।

এই “ধ্বংস” বলতে সর্বনাশ করা নয়। এর অর্থ হল
“সংহরন”।অর্থাৎ দেবী নিজেই এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রচনা করেছেন।আবার তিনিই গুটিয়ে নেন।ঠিক যেমন মাকড়শা নিজেই জাল বোনে আবার নিজেই গুটিয়ে নেয়।জীব কর্মফল ভোগান্তে মায়ের কোলে আশ্রয় পেয়ে পায় অসীম শান্তি ও আনন্দ।এই শ্মশান তাই মাকালীর ক্রীড়া ক্ষেত্র।শ্মশানকে বৈরাগ্যভূমি বলা হয়।

শ্মশানকে তপঃ সাধনার ভূমি বলা হয় । ১০ মিনিট
শ্মশানে বসে থাকলে জড় দেহের নশ্বরতার প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে আসে।জীব তাঁর খাঁচা নিয়ে বড়ই অহংকার করে , কিন্তু খাঁচা থেকে পাখী মুক্ত হলে খাঁচা শ্মশানে একমুঠো ভস্মে পরিণত হয়। জ্ঞানী গণ এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে দেহ সুখ বিসর্জন দিয়ে সাধন
ভজনে মন দেয়। শ্মশান কেই তাই তপঃ সাধনার কেন্দ্র বলা হয় ।।শ্মশানে কেন মা কালীর পূজা হয় ?

“শ্মশান” শব্দের অর্থ হল শম স্থান। মৃত স্থান।চলতি কথায় যেখানে শবদাহ করা হয় সেই ক্ষেত্র শ্মশান ভূমি নামে পরিচিত।করালবদনী আদ্যাশক্তি মায়ের বিচরণ ক্ষেত্র এই শ্মশান।মা কালীকে ধ্বংসের দেবী বলা হয়।

এই “ধ্বংস” বলতে সর্বনাশ করা নয়। এর অর্থ হল
“সংহরন”।অর্থাৎ দেবী নিজেই এই সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড রচনা করেছেন।আবার তিনিই গুটিয়ে নেন।ঠিক যেমন মাকড়শা নিজেই জাল বোনে আবার নিজেই গুটিয়ে নেয়।জীব কর্মফল ভোগান্তে মায়ের কোলে আশ্রয় পেয়ে পায় অসীম শান্তি ও আনন্দ।এই শ্মশান তাই মাকালীর ক্রীড়া ক্ষেত্র।শ্মশানকে বৈরাগ্যভূমি বলা হয়।

শ্মশানকে তপঃ সাধনার ভূমি বলা হয় । ১০ মিনিট
শ্মশানে বসে থাকলে জড় দেহের নশ্বরতার প্রতিচ্ছবি আমাদের চোখের সামনে আসে।জীব তাঁর খাঁচা নিয়ে বড়ই অহংকার করে , কিন্তু খাঁচা থেকে পাখী মুক্ত হলে খাঁচা শ্মশানে একমুঠো ভস্মে পরিণত হয়। জ্ঞানী গণ এই তত্ত্ব উপলব্ধি করে দেহ সুখ বিসর্জন দিয়ে সাধন
ভজনে মন দেয়। শ্মশান কেই তাই তপঃ সাধনার কেন্দ্র বলা হয় ।।

 বহুযুগ থেকে অনেক সাধক সাধিকারা সাধন ভজনে নিমগ্ন হয়।মৃত্যু কাউকে ছাড়ে না। এক রূপবতী অপ্সরা তুল্যা কন্যার মৃত্যু হলে শ্মশানে তার দেহ এক মুঠো ভস্ম হয়।                   

অপরদিকে এক কুৎসিত বিকৃত চেহারার ব্যক্তির মৃত্যু হলে তাঁর দেহের পরিণতিও এক মুঠো ছাই।

মৃত্যুর কাছে কোন ভেদাভেদ নেই। ধনী
গরীব নির্ধন কাঙ্গাল সকলের মৃত্যুর পর দেহ ভস্মেই পরিণত হয়।সাধুগণ এই তত্ত্ব জানেন। কালের করাল গ্রাস থেকে কারোর মুক্তি নেই। তাই কালের কাল
মহাকালকে গ্রাসকারীনি আদ্যাশক্তি মহামায়া কালীর
উপাসনাতেই নিমগ্ন হন।                                  

কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার, বাসনা গ্রস্ত এই শরীর । আত্মার এই সকল বোধ নেই।দেহান্তে এই রিপুগণের ক্রীড়া ক্ষেত্র শরীরটি জলন্ত চিতাতে ভস্ম হয়। রিপু গনের নাশ হলেই সাধকের মনে বৈরাগ্য জাগ্রত হয়।                                          

তাই এই রিপুর
খেলার মাঠ শরীর টি জলন্ত চিতায় দগ্ধ হয় বলে মা কালী শ্মশানে বিরাজ করেন।মা তারা  জলন্ত চিতায় অধিষ্ঠান করেন।ভগবতী ছিন্নমস্তা পদতলে মদন রতি দলিতা করেন।এই হোলো শ্মশানের পরিচয়।                                                        

শ্মশান মন্দিরের মতোই পবিত্র। মন্দিরে শাস্ত্র পাঠ করে জড়দেহের পরিণামের কথা বলা হয়। শ্মশানে গেলে সেটার জীবন্ত উদাহরণ সচক্ষে দেখা যায়। তাই শ্মশান
কাম, ক্রোধ, লোভ, হিংসা, অহংকার, বাসনা গ্রস্ত এই শরীর । আত্মার এই সকল বোধ নেই।দেহান্তে এই রিপুগণের ক্রীড়া ক্ষেত্র শরীরটি জলন্ত চিতাতে ভস্ম হয়। রিপু গনের নাশ হলেই সাধকের মনে বৈরাগ্য জাগ্রত হয়।                                          

তাই এই রিপুর
খেলার মাঠ শরীর টি জলন্ত চিতায় দগ্ধ হয় বলে মা কালী শ্মশানে বিরাজ করেন।মা তারা  জলন্ত চিতায় অধিষ্ঠান করেন।ভগবতী ছিন্নমস্তা পদতলে মদন রতি দলিতা করেন।এই হোলো শ্মশানের পরিচয়।                                                        

শ্মশান মন্দিরের মতোই পবিত্র। মন্দিরে শাস্ত্র পাঠ করে জড়দেহের পরিণামের কথা বলা হয়। শ্মশানে গেলে সেটার জীবন্ত  সচক্ষে দেখা যায়। তাই শ্মশান
মা কালীর এত প্রিয় স্থান ।


রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের প্রতীক   : 



 মিশনের প্রতীক চিহ্নের নক্সা করেন স্বামীজি নিজে । প্রতীকের ব্যাখ্যায় স্বামীজি বলেন  ,  ছবির তরঙ্গায়িত জল কর্মের প্রতীক  ,  পদ্মফুল ভক্তি ও উদীয়মান সূর্য জ্ঞানের প্রতীক । ছবিটিকে ঘিরে থাকা সর্প যোগ ও কুণ্ডলীনি শক্তি জাগরণ এবং ছবির রাজহংস পরমাত্মার প্রতীক । অর্থাৎ কর্ম জ্ঞান ও ভক্তি যোগের সমন্বয়ে পরমাত্মার জাগরণই হলো রামকৃষ্ণ মিশনের মূখ্য উদ্দেশ্য ।।



-----:::  জ্ঞান ও ভক্তি  :::------


"১> শিবাংশে জন্মালে জ্ঞানী হয় , ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা এই বোধের দিকে মন যায় । বিষ্ণু অংশে প্রেমভক্তি হয় ।
        ২> জ্ঞানীর জড় সমাধি হয়--- 'আমি' থাকে না । ভক্তিযোগের সমাধিকে চেতনা সমাধি বলে । এতে সেব্য সেবকের, রস রসিকের, আস্বাদ্য আস্বাদকের 'আমি' থাকে । খুব উঁচু ঘর না হলে একাধারে জ্ঞান ও ভক্তি দুই-ই হয় না ।
               ৩> শুদ্ধ জ্ঞান ও শুদ্ধ ভক্তি এক । শুদ্ধ জ্ঞান যেখানে, শুদ্ধা ভক্তিও সেইখানে নিয়ে যায় । সেখানে (অদ্বৈত অবস্হায়) সব শিয়ালের এক রা ।
                 ৪> জ্ঞানীর ভিতর একটানা গঙ্গা বহিতে থাকে । সে সর্ব্বদা স্ব-স্বরূপে থাকে । ভক্তের একটানা নয় -- জোয়ার ভাঁটা । কখনো সাঁতার দেয় , কখনো ডুবে, কখনো উঠে । যেমন জলের ভিতর বরফ টাপুর টুপুর, টাপুর টুপুর করে হাসে,কাঁদে, নাচে গায় ।
৫>  জ্ঞান হলেই মুক্তি, যেখানে থাকে-- ভাগাড়েই মৃত্যু হোক, আর গঙ্গাতীরেই হোক । তবে অজ্ঞানের পক্ষে গঙ্গাতীর ।
৬> জ্ঞান পুরুষ । ভক্তি স্ত্রীলোক, জ্ঞান সদর মহল পর্যন্ত যেতে পারে । ভক্তি অন্দর মহলে যায় ।
                  ৭> ঈশ্বরই কর্তা , আর বাকি সব অকর্ত্তা- এর নাম জ্ঞান । 
৯> 'ভক্তির আমি' তে অহঙ্কার হয় না, অজ্ঞান করে না ।
১০> ভক্তি দ্বারাই মুক্তি হয় , তা ব্রাহ্মণ শরীর না হলে হয় না এমন নয় । শবরী ব্যাধের মেয়ে, রুহিদাস সৎ শুদ্র ছিল, এদের ভক্তির দ্বারাই মুক্তি হয়েছে ।
১১> ভক্তি পথেও ব্রহ্মজ্ঞান হয় , ভক্তের 'আমি' ও যায় । তখন ব্রহ্মজ্ঞানে সমাধিস্থ । কিন্তু বরাবর নয় । সা, রে, গা, মা,পা , ধা, নি ----নি - তে অনেকক্ষন থাকা যায় না ।
১২> তাঁতে মগ্ন হলেই আর অসৎুদ্ধি, পাপবুদ্ধি থাকে না । কথাটা এই--তাঁকে ভালবাসা ।
          ১৩> কোন কামনা নাই, তাঁকে ভালবাসা , এটি বেশ । এর নাম অহৈতুকি ভক্তি । শুদ্ধা ভক্তি দ্বারা তাঁকে পাওয়া যায় । নিস্কাম ভক্তিই আসল । যে লোক বড় মানুষের কাছে কিছু চেয়ে ফেলে সে আর খাতির পায় না ।
১৪>  যাদের রাগভক্তি  ঈশ্বর তাদের ভার নেন । বৈধিভক্তি করতে করতে রাগভক্তি হয় । কারু কারু রাগভক্তি ছেলেবেলা থেকেই আছে । ছেলে বেলা থেকেই ঈশ্বরের জন্য কাঁদে । যেমন প্রহ্লাদ । ঈশ্বরের উপর অনুরাগ, প্রেম এলে জপ, তপ, কর্ম্মত্যাগ হয়ে যায় । হরি-প্রেমে মাতোয়ারা হলে বৈধিকর্ম করবে কে ? বৈধিভক্তি হতেও যেমন , যেতেও তেমন । কিন্তু রাগভক্তির পতন নাই ।
                 ১৫> ভক্তি কামনা কামনার মধ্যে নয় । যেমন হিঙ্চে শাক শাকের মধ্যে নয় । মিছরি মিষ্টি মিষ্টির মধ্যে নয় । ওঁকার শব্দের মধ্যে নয় । হিঙ্চে শাকে পিত্ত নাশ হয়, মিছরিতে অম্বল নাশ হয় ।"
…………শ্রীশ্রীঠাকুর রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব ।
প্রণাম ঠাকুর জয় ঠাকুর, সবার মঙ্গল করো প্রভু……







🌸🌸 *।।সাগর-দর্শন।।* 🌸🌸

*ঠাকুর, শ্রীম'কে বললেন, "আমাকে একদিন বিদ্যাসাগরের কাছে নিয়ে চলো। সাগর দেখতে আমার বড্ড ইচ্ছে করে।" শ্রীম বিদ্যাসাগরের বিদ্যায়তনের 'মাস্টার'। বিদ্যাসাগর যে সাধু সন্ন্যাসী, ভগবান পছন্দ করেননা তিনি বিলক্ষণ জানেন। তাই ঠাকুরের সামনে একটু কিন্তু কিন্তু করে বললেন, "ওনার সাথে আর দেখা করে কি হবে? উনি তো ভগবান ফগবান কিচ্ছু মানেন না।"*

*ঠাকুর নাছোড়বান্দা। তিনি বিদ্যাসাগরকে দেখবেন। বললেন, "সে না মানুন, তাতে কি! উনি একদিকে বিদ্যেসাগর, এক দিকে দয়ার সাগর এমন মানুষকে চোখে দেখবো না?' শ্রীম বললেন, "উনি খুব কঠিন মানুষ...আপনি হয়ত আঘাত পাবেন।"*

*ঠাকুর তবু গোঁ ধরে রইলেনই। তিনি সাগর দর্শন করবেন। বাধ্য হয়ে শ্রীম বললেন, "আচ্ছা বেশ। ওনাকে বলে দেখি।"* 

*পরদিন শ্রীম বিদ্যাসাগরকে জানালেন, "দক্ষিণেশ্বরের কালীবাড়ির ঠাকুর রামকৃষ্ণ আপনার দর্শনপ্রার্থী।" সে সময় রামকৃষ্ণকে চেনেন না এমন মানুষ নেই। বিদ্যাসাগর কিছুটা বিস্মিত হলেন। তারপর ঈষৎ বিব্রত চিত্তে বললেন, "তুমি তো জানো মাস্টার... আমি ওসব...।" শ্রীম বললেন, "বলেছিলাম। তবে উনি ঠিক তেমন সাধু সন্ন্যাসীও নন।"*
*বিদ্যাসাগর জানতে চাইলেন, "গেরুয়া পরেন?" শ্রীম বললেন "না। তিনি লালপেড়ে ধুতি পরেন, জামা পরেন, জুতো পরেন। তক্তার ওপর বিছানায় শোন, আবার মশারিও খাটান"। বিদ্যাসাগর অবাক! "এ কেমন পরমহংস তোমাদের? কোনো ভড়ং টড়ং নেই বলছো?" শ্রীম বললেন, "না। রানী রাসমণির কালীবাড়িতে পুজো করেন, আর সারাক্ষণ ঈশ্বরচিন্তা করেন।"*
 
*বিদ্যাসাগর হেসে ফেললেন, "আচ্ছা আচ্ছা। তাঁকে নিয়ে আসবে একদিন। এত করে যখন বলছেন।"* 

*ঠাকুর সাগর দর্শন করতে চেয়েছিলেন। এক্ষণে সাগরও ঠাকুর দর্শন করতে চান। শ্রীমর সংবাদে খুশি হলেন ঠাকুর। শ্রীম বললেন "কবে যাবেন? আজ, কালের মধ্যেই?" ঠাকুর যেন ধ্যানমগ্ন কন্ঠে বললেন, "যে কোনো দিন কি আর সাগর দর্শন হয় গো? সাগর দর্শন করতে যাব এই শনিবার। ঠিক বিকাল চারটেয়। ওদিন শ্রাবণের কৃষ্ণাষষ্ঠী। বড় ভালো দিন।* 

*১৮৮২ সালের একটা দিন। বিদ্যাসাগরের বয়স বাষট্টি ছুঁইছুঁই। রামকৃষ্ণ ছেচল্লিশে দৌড়াচ্ছে। সাগর তখন বাদুড় বাগানে থাকেন। ঠিক চারটে বাজতে মিনিট দুয়েক বাকি, একটি ঘোড়ার গাড়ি এসে দাঁড়ালো বিদ্যাসাগরের বাড়ির নিকটে। গাড়ি থেকে নামলেন ভবনাথ, মহেন্দ্রনাথ (শ্রীম), হাজরা ও ঠাকুর রামকৃষ্ণ স্বয়ং। বাড়ির ভিতর ঢুকতেই ঠাকুরের চোখ জুড়িয়ে গেল। কি সুন্দর বাহারি ফুলের গাছ। যেন নিজের অজান্তেই বলে ফেললেন, 'আহা, বিদ্যাসাগরের ভেতরটা ভারি নরম গো।' সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় এলেন তিনি। উত্তরে একটি ঘর, পূবদিকে বিশাল বৈঠকখানা, পাশেই একচিলতে শোবার ঘর। কোনোরকম আভিজাত্যের চিহ্ন নেই। প্রত্যেক ঘরের দেওয়ালে সারি সারি বই! এই এত্তবই লোকটা পড়েছেন? হেসে ফেললেন ঠাকুর। বড্ড বিষন্ন হাসি। "এ তো সবই অবিদ্যা! তিনি কই? তাঁকে জানাই তো আসল। এত পড়েছে লোকটা অথচ সে সেই এক-কে জানেনি।"* 

*বিদ্যাসাগর বসার ঘরেই ছিলেন। এগিয়ে এলেন ঠাকুরকে অভ্যর্থনা জানাতে। মুখোমুখি দর্শন হল, ঠাকুর দেখলেন সাগরকে। আর সাগর দেখলেন ঠাকুর। ঠাকুরই প্রথম কথা তুললেন, "এতদিন কত খাল বিল হদ্দ নদী দেখেছি, এখন সাগরে এসে পড়লুম গো।" বিদ্যাসাগর মহাশয় রসিকতা করে বললেন "এসেই যখন পড়েছেন, নোনাজল কিছুটা নিয়ে যান।" ঠাকুর বললেন "নোনা জল কি গো! তুমি যে ক্ষীর সমুদ্র।"* 

*কথা শুরু হল। পরমহংস পরম আত্মীয়তায় বিদ্যাসাগরের দানধ্যানের প্রশংসা করলেন। বিদ্যার প্রশংসা করলেন। বাহুল্য বর্জিত অনাড়ম্বর জীবনের প্রশংসা করলেন। সাগর সব শুনলেন৷ মনে মনে আনন্দও পেলেন। তার ইচ্ছা হল প্রায় নিরক্ষর এই মানুষটির দৌড় দেখা যাক। ষড়দর্শনে মহাপণ্ডিত তিনি। ঠাকুরকে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ব্রহ্ম কি?' ঠাকুর উত্তর দিলেন, "সমস্ত বিদ্যার ওপরে তিনি। বিদ্যা দিয়ে তার নাগাল পাওয়া যায়না"। বিদ্যাসাগর বললেন, "অর্থাৎ...?"*
*ঠাকুর বললেন, "এ জগতে বিদ্যাও মায়া, অবিদ্যাও মায়া। জ্ঞান ভক্তিও আছে, আবার কামিনীকাঞ্চনও আছে।কিন্তু সার কথা কি জানো? ব্রহ্ম হল নির্লিপ্ত। তিনি যেন প্রদীপের আলো। কেউ সেই আলোর সামনে বসে ভাগবত পড়ে। কেউ আবার আদালতের কাগজ জাল করে। তাতে প্রদীপের কিছু আসে যায়না। তার কাজ আলো হয়ে জ্বলে থাকা৷ ব্রহ্মও কতকটা তেমনই।"*




 *বিদ্যাসাগরের চোখে অপার বিস্ময়! শাস্ত্রের কঠিন শ্লোকের এত সহজ ও গভীর ব্যাখ্যা তিনি এর আগে শোনেননি। আবার যার কাছ থেকে শুনলেন তিনি প্রায় নিরক্ষর, এক বামুন ঠাকুর। এও কি সম্ভব? ঠাকুরের থামার বালাই নেই। গড়গড় করে বলে চলেছেন, "শোনো বিদ্যাসাগর, বেদ, পুরাণ তন্ত্র ষড়দর্শন সবই এঁটো। একমাত্র ব্রহ্ম কোনোদিন এঁটো হল না। ব্রহ্ম যে কি আজ পর্যন্ত কেউ বলতে পারেননি।"*

*বিদ্যাসাগর বাধা দিয়ে বললেন, "কিন্তু বেদে যে..." ঠাকুর হাসলেন। "জানি গো জানি, তোমাদের বেদে কি আছে। বেদে আছে বটে ব্রহ্ম আনন্দস্বরূপ, সচ্চিদানন্দ।"*
 
*বিদ্যাসাগর যেন দোয়ালা শিশুর মত চমকে উঠলেন! এ লোকটা বেদ ব্রহ্ম কি বলেছে তাও জানে! আশ্চর্য। ওদিকে ঠাকুর বলে চলেছেন, "একজন সাগর দেখতে এলো। তাকে জিজ্ঞাসা করা হল কেমন সমুদ্দুর দেখলে গো? সে বললে আহা! কি দেখলাম। কি হিল্লোল! কি কল্লোল! বেদে যারা ব্রহ্মের সংজ্ঞা লিখেছেন তারাও কতকটা এমনই। শুকদেবই বলো আর যাই বলো, সবাই সেই ব্রহ্মসাগরের তটে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ ব্রহ্মসাগরে নামেনি।*

*বিদ্যাসাগর আচ্ছন্ন। মোহগ্রস্ত। যেন কোনো জাদুকর সম্মোহিত করেছে তাঁকে। বাহ্যিক কাঠিন্য লুপ্ত। তিনি জানতে চাইলেন "ব্রহ্মজ্ঞান কি পাওয়া সম্ভব?" ঠাকুর বললেন "সম্ভব। তার জন্য সমাধি চাই। কিন্তু সমাধিস্থ হলে বিচার একেবারেই বন্ধ থাকে। কাউকে সেই উপলব্ধির কথা জানানো যায়না। একবার একটা নুনের পুতুল সাগরের গভীরতা মাপতে গেল। যেই সে সাগরের জলে ডুবলো অমনি গলে গেল। তার আর গভীরতা মাপা হল না। ঘি যতক্ষণ কাঁচা ততক্ষণই তার কলকলানি, জমাট ঘিয়ের আর শব্দ কই? শূন্য কলসীতে জল ভরছো ভক-ভক ভক-ভক শব্দ। যেই জল ভর্তি হল আর শব্দ নেই। ব্রহ্ম কতকটা এমনই।*

*বিদ্যাসাগর জানতে চাইলেন, "ব্রহ্ম আর ভগবান কি এক?" ঠাকুর বললেন, "যিনি ব্রহ্ম তিনিই ভগবান। তবে ব্রহ্ম নির্গুণ, নিরাকার। ভগবান ষড়ৈশ্বর্যপূর্ণ। নিরাকার ব্রহ্মের একা থাকতে ভালো লাগেনা। তাই তিনি সাকার হলেন। এক থেকে বহু হলেন। ব্রহ্ম থেকে ভগবান হলেন।"* 

*বিদ্যাসাগর নীরব। এ কি কথামৃত শুনছেন তিনি! ঠাকুর প্রশ্ন করলেন, "আচ্ছা বিদ্যাসাগর, তুমি তো মহাপণ্ডিত। বলো তো গীতার এক কথায় অর্থ কি হবে?" বিদ্যাসাগর ভাবলেন। এক কথায় গীতার অর্থ? অসম্ভব৷ উত্তরটা ঠাকুর নিজেই দিলেন "গীতা শব্দটাকে পর পর দশবার উচ্চারণ করো। দেখো তুমি উচ্চারণ করছো ত্যাগী-ত্যাগী। হেসে ফেললেন ঠাকুর। এই হচ্ছে গীতার শিক্ষা। সব ত্যাগ করে ভগবানকে চাও। শোনো বিদ্যাসাগর অনেক পড়লেই পণ্ডিত হওয়া যায়না। ভগবানকে ভালোবাসতে শেখো।যতদিন পর্যন্ত 'আমার আমার' করবে জানবে সেটাই অবিদ্যা। আর যেই তুমি ভাববে আমার বলতে কিছু নেই সবই ভগবানের, সবই ঈশ্বরের, জানবে তুমি অবিদ্যা থেকে বিদ্যায় এলে।"*

*ঠাকুরের বিদায়ের ক্ষণ উপস্থিত। বিদ্যাসাগর আবারও তাকালেন রামকৃষ্ণের দিকে। বিদ্যা-সাগর মিশে গেলেন 'প্রজ্ঞাপারমিতায়'।* 
       🙏🏻🙏🏻🙏🏻🌹🙏🏻🙏🏻🙏🏻
*তথ্যঋণ: রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়।*
                  *[সংগৃহীত]*

প্রভু যীশু ও রামকৃষ্ণ মিশন ::


 যীশুর সঙ্গে আমাদের রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে। আজকের সন্ধ্যা খ্রীষ্টমাস ইভ, বা যীশুর জন্মের প্রাক্ সন্ধ্যা যা রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ গড়ে ওঠার এক দিকচিহ্ন। ১৮৮৬ সালে ঠাকুরের দেহত্যাগের পর মানসিক ভাবে আশ্রয়হীন বালক ভক্তেরা ছত্রভঙ্গ। তাদের বাবুরাম মহারাজের মা মাতঙ্গিনী দেবী আঁটপুরে কদিন কাটিয়ে যেতে ডাকলেন। প্রথমে নরেন্দ্রনাথ ও বাবুরামের যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যাওয়ার খবর পেতে দলটি সংখ্যায় বড় হয়ে উঠল। নরেন্দ্র,বাবুরাম, শরৎ, শশী, তারক, কালী, নিরঞ্জন, গঙ্গাধর ও সারদা এই ন জনের দল তখনকার তারকেশ্বর লাইনের ট্রেনে চেপে সঙ্গে আনা তানপুরা, তবলা সহযোগে গান গাইতে গাইতে মহানন্দে পৌঁছলেন হরিপাল। তারপর সেখান থেকে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে আঁটপুর। চারিদিক সবুজে ঘেরা গাছ-গাছালির ফাঁকে পুকুর, ধানক্ষেতের উদার উন্মুক্ত প্রকৃতি, গরুর গাড়ি চলা রাস্তায় গাড়োয়ানের গলায় মেঠো গানের আবেশ তাঁদের ঠাকুরকে হারানোর দুঃখ খানিক প্রশমিত করল। ভৃত্যের প্রাচুর্য্য থাকলেও মাতঙ্গিনী দেবী ব্যক্তিগত ভাবে ছেলেদের আদর যত্নের দিকে নজর রাখলেন। তাঁরা ঠাকুরের আদর্শ ও ভাবের আলোচনা, সেই সঙ্গে ভগবৎ চিন্তায় নিমগ্ন হয়ে রইলেন। নরেন্দ্রনাথের শাস্ত্রচর্চা, ভজন সংগীত, নামসংকীর্ত্তনে সবাই যেন পুরোন কাশীপুরের দিনগুলো ফিরে পেলেন। মন এক উচ্চসুরে বাঁধা সবসময়। শীতের রাত, বাইরে ধুনি জ্বেলে ধ্যানে বসা এক নিরালম্ব জীবনের ভাব এনে দিচ্ছে মনে। এইরকম এক রাতে রোজকার মত ধুনি জ্বেলে তাঁরা ধ্যানমগ্ন। নক্ষত্রখচিত আকাশের তলে ধুনির আগুনের শিখায় দীপ্ত ধ্যানমগ্ন মুখগুলির মধ্যে হঠাৎ নরেন্দ্রনাথ যীশুখ্রীষ্টের অপরিসীম ত্যাগ, তপস্যাসমন্বিত জীবনকথা ও তাঁর শিষ্যদের যীশুর বাণী প্রচারে আত্মবিসর্জনের কথা প্রাণস্পর্শী ভাষায় বলে চললেন। সে বাক্যস্রোতে সকলের জীবনের লক্ষ্য যেন স্থির হয়ে গেল। নরেন্দ্রনাথের তীব্র প্রেরণামূলক বর্ণনায় সকলে সেই ধুনির সামনে ঠাকুরের ভাবপ্রচারে নিজ নিজ জীবনদানের ও সংসারত্যাগের অঙ্গীকার করলেন। তখন একজনের হঠাৎ মনে পড়ল আজ যীশুর জন্মদিনের প্রাক সন্ধ্যা—খ্রীষ্টমাস ইভ। সকলে বুঝলেন দৈব নির্দ্দেশে আজ নরেন্দ্রনাথের মুখ দিয়ে ঠাকুর এ শুভ সঙ্কল্প করিয়ে নিলেন। বস্তুত কাশীপুরে ঠাকুরের হাতে যদি সঙ্ঘের বীজ পোঁতা হয়ে থাকে তো আঁটপুরে তার অঙ্কুরোদ্গম হল, আর বরানগর মঠে হল তার বেড়ে ওঠার পরিচর্য্যা। আজও ধুনিমণ্ডপে সে কথা স্মরণ করে ধ্যানের আসর বসে।
                    যীশুর বারজন শিষ্য। ঠাকুরও বুড়োগপাল দাদাকে দিয়ে বারটি গেরুয়া কাপড় আনিয়েছিলেন। পরে অবশ্য তাঁর নামে ষোলজন সন্ন্যাস নেন। সেন্ট পিটারকে যীশু বলেছিলেন ‘তুমি হবে আমার ভিত্তিপ্রস্তর, যার ওপরে ঈশ্বরের সাম্রাজ্য গড়ে উঠবে’। ঠাকুর নরেন্দ্রনাথ সম্পর্কে লিখিত আদেশ দিয়েছিলেন—‘নরেন শিক্ষে দিবে, যখন ঘরে বাইরে হাঁক দিবে’। সেন্ট পিটারকে বিপরীত বিশ্বাসীদের মধ্যে যীশুর ভাব প্রচার করার শাস্তি স্বরূপ তাঁকে উলটো করে ঝুলিয়ে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল। বিপরীতভাবে নিমগ্ন বিশ্ববাসীকে ঠাকুরের উদার ভাব দিতে স্বামিজীকে সেন্ট পিটারের মত প্রতি রক্তবিন্দু মোক্ষণ করে জীবন দিতে হয়েছিল। দিতে হয়েছিল ‘শিক্ষে’ দেবার আদেশে ‘ঘরে বাইরে’ তমসাচ্ছন্ন নিদ্রায় নিদ্রিত মানুষকে জেগে ওঠার ‘হাঁক’। কোন নির্দিষ্ট মত নয়, পথ নয়, যে যেখানে আছ নিজের ভাবের গণ্ডীর পরিধি বাড়িয়ে এগিয়ে চল, যতদিন না মুক্তি নামক চরম লক্ষ্যে পৌঁছচ্ছ। বিশ্বজনীন এক বাণী দিলেন—‘ওঠো, জাগো, লক্ষ্যে না পৌঁছান পর্য্যন্ত থেমো না।
 
                          

"শুকনো ডালপালা কাঠকুটো জোগাড় কর .আজ সন্ধে বেলায় ধুনি জ্বালবো" . দলপতির নির্দেশে ওরা সব জোগাড় করল .ওরা বলতে --বাবুরাম ,শরৎ, শশী ,তারক ,কালী ,নিরঞ্জন ,গঙ্গা আর সারদা .বন্ধু বাবুরামের মা'র আমন্ত্রণে ওরা এসেছে আঁটপুর .সন্ধেবেলা ধুনি জ্বালা হল .চারদিকে হিমেল কুয়াশার আস্তরণ .দাউ দাউ করে জ্বলছে ধুনির আগুন...নরেন্দ্রনাথ যীশুর ত্যাগ বৈরাগ্যপূর্ণ উপদেশ গুলি ব্যাখ্যা করে সেন্ট পল সহ অপরাপর খৃস্ট সন্ত দের বৈরাগ্যমন্ডিত জীবনকথা আলোচনা করতে লাগলেন .সংসার ত্যাগ করে খৃস্ট সন্তদের মত একটি পবিত্র সন্ন্যাসী সংঘ প্রতিষ্ঠায় কৃতসংকল্প হলেন এই যুবকেরা .দিনটা ছিল ২৪শে ডিসেম্বর ১৮৮৬ . সেইথেকে রামকৃষ্ণ সংঘে খ্রীষ্টমাস ইভ যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে .


○○○🔱🌺: #মায়ের_কথা:🌺🔱○○○


       🔸: #স্বামী_সোমেশ্বরানন্দ :🔸

➖〰️➖〰️➖〰️➖〰️➖〰️➖〰️➖

১‍● যেকোনো রামকৃষ্ণ আশ্রমে যান, দেখবেন ঠাকুর-মা-স্বামীজির ফটো পাশপাশি। আপনার বাড়িতেও আপনি এভাবে রাখেন। কিন্তু প্রশ্ন, এভাবে একাসনে দিব্যত্রয়ীর ছবি রাখা কিভাবে শুরু হয়েছিল? 

ঠাকুর ও মায়ের ফটো পাশাপাশি রাখার প্রচলন ছিল আগে থেকেই।স্বামীজির দেহত্যাগের পর এক আশ্রমে ঠাকুর-মা'র ফটোর পাশে একাসনে স্বামীজির ফটো রাখা হয়েছিল। এ দেখে পছন্দ হয়নি এক ভক্তের। স্বামীজি যত বড়ই হ'ন, গুরুর সাথে একই আসনে তাঁকে রাখা কি ঠিক? তিনি শ্রীশ্রীমার কাছে এই প্রসঙ্গ তুললে মা হেসে বলেন : বাবা আজ ঠাকুর থাকলে তিনি নরেনকে কোলে করে রাখতেন, পাশে নয়। অর্থাৎ মা এভাবে তিন জনের ফটো একাসনে রাখাকে স্বীকৃতি দিলেন। তারপর থেকেই এই নিয়ম বিভিন্ন আশ্রমে চালু হয়।

২● মঠ-মিশনে দীক্ষার সময় যে মন্ত্র দেওয়া হয় সেই মন্ত্রগুলির উৎস কি? এ কি শাস্ত্র থেকে, অথবা বেলুড় মঠের তৈরি মন্ত্র? দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর নানা রকম সাধনা শিখিয়েছিলেন শ্রীশ্রীমাকে, বিভিন্ন মন্ত্রও। পরবর্তী কালে মা দীক্ষার সময়ে এই মন্ত্রগুলি ব্যবহার করতেন। কয়েকজন সন্তানকে এ তিনি শেখান এবং দীক্ষা দেবার অনুমতি দেন। এক সন্ন্যাসী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন এই মন্ত্রগুলির ফল নিয়ে। মা বলেন: এগুলি সিদ্ধমন্ত্র, ঠাকুরের দেওয়া। 

মঠ-মিশনে এই মন্ত্রগুলিই গুরুরা দেন দীক্ষার সময়ে। অতএব আপনি যে মন্ত্র পেয়েছেন দীক্ষার সময়ে গুরুদেবের কাছে, তা ঠাকুর থেকে মা হয়ে গুরুর মাধ্যমে এসেছে আপনার কাছে। এ-বিষয়ে বিশদ আলোচনা রয়েছে "উপাসনা ও প্রার্থনার শক্তি" বইয়ে (প্রকাশক : গিরিজা লাইব্রেরী)।

৩● মা মঠে এলে ঘুরে দেখতেন সবকিছু। প্রাচীন সাধুদের কাছে শুনেছি, মঠে শাকসব্জির চাষ, গরু, পুকুর, সাধুদের থাকার ব্যবস্থা ইত্যাদি দেখে মা খুব খুশি হতেন। তিনি চাইতেন না সাধুরা দৈহিক কঠোরতা করুক। এক সাধুকে বলেছিলেন, তুমি কিছু খেয়ে পূজা করবে। আরেক ব্রহ্মচারী যে নিরামিষ খেতো, তাকে মাছ খেতে নির্দেশ দেন। 

মা রান্নাঘরেও যেতেন দেখতে। একবার সেখানে সাধুদের তরকারি কাটতে দেখে মন্তব্য করেছিলেন: বাঃ, ছেলেরা তো বেশ তরকারি কুটতে পারে। এক সাধু তখন মা'কে প্রণাম করে বলেছিলেন, ব্রহ্মময়ীর কৃপা পাওয়া নিয়ে কথা, তা সে তপস্যা করেই হোক কি তরকারি কুটে। মা হেসে সেই কথা সমর্থন করেছিলেন। 

৪● স্বামীজির কর্মযোগ নিয়ে যখন কেউকেউ প্রশ্ন তুলছেন, মা তখন দৃঢ়ভাবে কর্মযোগকে সমর্থন করেছেন। কাশীতে আশ্রমের হাসপাতাল দেখে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, এ ঠাকুরেরই কাজ। এক ভক্ত যখন জিজ্ঞেস করলেন, কিভাবে তিনি মায়ের সেবা করতে পারেন, শ্রীশ্রীমা বলেছিলেন তাকে উদ্বোধন পত্রিকা বিক্রি করতে।

গৌরী মা'র বালিকা বিদ্যালয়ের প্রতি শ্রীশ্রীমার বিশেষ স্নেহদৃষ্টি ছিল। আশ্চর্য, তাঁর নির্দেশেই গৌরী মা ঐ স্কুলে ইংরেজী পড়ানোর ব্যবস্থা করেন। ভগিনী নিবেদিতার স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের তিনি আশীর্বাদ করেছিলেন। ভক্তদের, এমনকি মহিলাদেরও, মা বলতেন কাজ করতে।

৫● প্রায় ১০০ বছর আগে মা দেহত্যাগ করেছেন। কিন্তু আজও অনেকে তাঁর দর্শন পান, গৃহী-সন্ন্যাসী অনেকেই। বহু সাধুর কাছেই শুনেছি তাদের অভিজ্ঞতা, মা'কে দর্শনের কথা। এমনকি মা যে আজও শক্তি দেন নিঃস্বার্থ কর্মীদের, সাহায্য করেন, রাশ ঠেলে দেন, -- এ সত্যি কথা। প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অনেক সাধুরই । ।


জিজ্ঞাসু :— গৃহস্থের ধর্ম কি?

গুরুমহারাজ :— বৈদিক ঋষিরা বলেছেন — 'মাতৃদেবাে ভব', 'পিতৃদেবাে ভব', 'আচার্যদেবাে ভব', 'অতিথিদেবাে ভব, 'সত্যং বদ', 'ধর্মং চর।' — এগুলি গৃহস্থের ধর্ম। গার্হস্থ-আশ্রম তাকে বলা হয়, যে গৃহে গর্ভধারিণী মায়ের সেবা হয়, যে গৃহে পিতার সেবা হয়, যে গৃহে গুরু বা জ্ঞানীদের সেবা হয়, অতিথিদের সেবা হয়। এসব না হলে গৃহস্থাশ্রম নয়। যেমন ধরুন দেখা যায় যে, কেউ গর্ভধারিণী মায়ের সেবা করছে না বা মাকে অপমান করছে — অমর্যাদা করছে আবার 'বিশ্বজননী', 'মা-মা' বলে কাঁদছে তাঁর কাছে, এই ভণ্ডামি কিন্তু ধর্ম নয়। অনেকে মাকে খেতে দেয় না, নিজের গর্ভধারিণীকে শ্রদ্ধা করে না, সেবা করে না, অথচ 'মা জগদম্বা' — ''মা জগদম্বা' করছে। এগুলাে ভণ্ডামি। অনেকে নিজের পিতাকে অশ্রদ্ধা করে, অথচ 'বিশ্বপিতা', 'পরমপিতা' করে চ্যাঁচাচ্ছে, এগুলােকে ভণ্ডামি বলা হয়েছে। যে গৃহে মা-বাবা সেবিত হন তাকে গৃহস্থাশ্রম বলে। গৃহে পিতা বেঁচে থাকলে, পিতার সেবা করবেন। পিতা বৃদ্ধ হলে তিনি পুত্রের ঘাড়ে হাত দিয়েই হাঁটবেন। শাস্ত্রে বলা হয়েছে যে, বয়সকালে পিতার হাত হবে পুত্রের হাত, পিতার পা হবে পুত্রের পা। গৃহস্থাশ্রমের এগুলিই ধর্ম। আর স্ত্রীর প্রতি ব্যবহার করবেন বিবেকোচিত। শাস্ত্রে বলছে — ‘পরপীড়নং পাপম্’ — অপরকে পীড়ন করাই পাপ। এই হিসাবে স্ত্রীকে কখনও পীড়ন করবেন না। যদি বলেন, সংসারের সকল সদস্যদের মধ্যে আমাকেই সবটা করতে হবে? আমি বলব, ‘হ্যাঁ, আপনাকেই সব করতে হবে। কারণ আপনি গৃহস্বামী'। গৃহস্বামী বা Guardian কেই এই খেয়ালগুলি রাখতে হবে। স্ত্রীকে কখনও দৈহিক বা মানসিক পীড়ন করবেন না, পিতা-মাতার সেবা করবেন। যাই থাক আপনার, শাক-অন্ন খেয়েও দেখবেন আপনার বাড়িতে শান্তি থাকবে।

গৃহস্থজীবনে শান্তির জন্য প্রয়ােজন কি জানেন? — স্নেহ, ভালােবাসা, মমতা, সেবা ও প্রেম-প্রীতির। পরিবারে হালুয়া-পােলাও কিংবা ফ্রিজ, টি.ভি, ওয়াশিং মেশিন বা বড় বড় প্যালেসের থেকেও এগুলাের বেশী দরকার। এই জীবনবােধটা হারিয়ে গেছে আজকের সমাজে। কর্তব্যসচেতন নয় মানুষ। মানুষ অবিবেকী হয়ে উঠছে বা বলা যায় অবিবেকোচিত হয়ে উঠেছে মানুষের আচরণ। এই অবস্থায় মানুষকে প্রথমেই বিবেকাশ্রিত হতে হবে, তাহলেই তার সংসার গৃহস্থাশ্রম হয়ে উঠবে। শাস্ত্রে ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস এই যে চারটি আশ্রমের কথা বলা হয়েছে, এই অনুযায়ী গৃহ তাে শুধু গৃহ নয় গৃহস্থাশ্রম। আপনার পিতা যদি জীবিত থাকেন, তাঁকে ভগবৎ-জ্ঞানে সেবা করবেন, আপনার মা যদি জীবিত থাকেন, তাঁকে ভগবতী জ্ঞানে সেবা করবেন, আর আপনার স্ত্রী থাকলে কখনই তার সাথে অবিবেকোচিত ব্যবহার করবেন না, ব্যস — তাহলেই দেখবেন আপনার সংসার শান্তির নীড় হয়ে উঠবে। আর আপনার পুত্র কখনই আমানুষ হবে না, যে গৃহস্থাশ্রমে এইরকম আচরণ হবে সেই গৃহে বা পরিবারে কখনই কুলাঙ্গার জন্মাবে না। কিন্তু হয় উল্টো, আর গৃহস্থাশ্রমের ভণ্ডামির জন্যই এরকম হয় বা সংসারে অশান্তি হয়। এগুলাে জীবের দুর্বলতা

এমন লােকও আছে, যে নিজের মাকে মারধর করে আবার কালীমন্দিরে গিয়ে পুজো দেয়, 'মা দেখা দে, দেখা দে’ও করে। আবার এমন লােকও আছে যে, নারীজাতির গায়ে হাত তুলছে — নিজের স্ত্রীকে মারছে, আবার মায়ের সাধনাও করছে — এগুলাে ভণ্ডামি। চালাকির দ্বারা মহৎ কাজ হয় না। ভগবান কখনই প্রসন্ন হন না এতে। আপনার সংসার শান্তির নীড় বা শান্তিনিকেতন হয়ে উঠবে আপনি শুধু যদি এইগুলিই পালন করেন। দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে।

["পরমানন্দ কথামৃত" গ্রন্থের প্রথম খণ্ড থেকে সংগৃহীত]


আরতি শব্দের অর্থ কি?


“আ” অর্থে ব্যাপ্তি; “রতি” অর্থে প্রেম, ভালাবাসা ও অনুরাগ। যে মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শ্রীভগবানের নিজের প্রীতি বর্ধিত হয় অর্থাৎ তিনি ভক্তের প্রতি প্রসন্ন বা সন্তুষ্ট হন এবং ভগবানের প্রতিও ভক্তের প্রেম, প্রীতি, ভালবাসা, ভক্তি ও অনুরাগ বৃদ্ধি পায় তাকে আরতি বলে।
অতএব আরতি ভগবানের প্রতি ভক্তের অন্তরের গভীর ভাবভক্তি পূর্ণ একটি মহা মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান। ভগবানের প্রতি ভক্তের অন্তরের ভাব ও ভক্তির মাধ্যমে, আকুলতা-ব্যাকুলতা প্রকাশের মাধ্যমে ও সম্পূর্ণ আত্মনিবেদনের মাধ্যমে, আরতির অনুষ্ঠান হয় সার্থক ও সুন্দর। ভাব ও ভক্তি শূন্য আরতি তাই কেবল নাচানাচি বা অঙ্গবিক্ষেপ ছাড়া অন্য কিছু নয়। আর ওরকম আরতির মাধ্যমে ভগবানের আশীর্বাদ পাওয়া যায় না কিছুই।

ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা যুগাচার্য স্বামী প্রণবানন্দজী মহারাজ বলেছেন, আন্তরিক ভাবভক্তি নিয়ে প্রতিদিন পূজারতির মাধ্যমে আমার শক্তি সকলের মধ্যে সঞ্চারিত হয়। গুরু শক্তি লাভের ইহা একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপায়।
শাস্ত্রীয় পূজার বিধান সহজ নয় বরং জটিলও বলা যায়। কিন্তু আরতির অনুষ্ঠান খুবই সহজ সাধ্য। কারণ আরতির অনুষ্ঠান কেবল মাত্র ভাব ও ভক্তির মাধ্যমে সুসম্পন্ন হয়। যারা শাস্ত্রীয় পূজার বিধি ও মন্ত্র জানেন না তারা ভক্তি ভাবের সাথে একমাত্র আরতির মধ্য দিয়ে সকল পূজার ফল লাভ করতে পারেন। তাই ভাব ও ভক্তি পূর্ণ আরতির অনুষ্ঠান হলো সকল পূজার সার।
শাস্ত্রীয় পূজা যদি বিধিহীন ও মন্ত্রহীন হয়, তবে ভক্তি পূর্ণ আরতির মধ্য দিয়ে তা সম্পূর্ণতা লাভ করে। এ প্রসঙ্গে দেবাদিদেব শিব, দেবী পার্বতীকে বলেছেন-
“মন্ত্রহীনং ক্রিয়াহীনং যৎকৃতং পূজনং হরেঃ।
সর্ব্বং সম্পূর্ণতামেতি কৃতে নীরাজনে শিবে ॥”
অর্থঃ হে দেবী পার্বতী, শ্রীভগবানের পূজা যদি মন্ত্রহীন ও ক্রিয়াহীন হয়, তবে নীরাজন বা আরতির মাধ্যমে তা সম্পূর্ণতা লাভ করে।
নানা উপচারে আরতির অর্থ জানা দরকারঃ
- শ্রীভগবানের প্রতি, সদ্গুরুর প্রতি অর্থাৎ আরাধ্য দেবতার প্রতি ভক্তের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদনের মাধ্যমে আরতির অনুষ্ঠান হয় সার্থক। কিন্তু সাধারণ নরনারীর তীব্র আসক্তি বিষয়ের প্রতি, ভোগবিলাসের প্রতি, কামনা ও বাসনার প্রতি। সেই বিষয়াসক্তি ত্যাগের জন্যই তো করতে হয় পূজা-আরতির বিশেষ অনুষ্ঠান। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, এ বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে পাঁচ প্রকার উপাদান থেকে। তা হলো- ক্ষিতি (মাটি), অপ্ (জল), তেজ (অগ্নি), মরুৎ (বায়ু), ও বোম্ (আকাশ)। উল্লিখিত ৫ (পাঁচ) প্রকার উপাদান আরতির মাধ্যমে শ্রীভগবানকে উৎসর্গ করলে, আর কিছু নিবেদন করতে বাকী থাকে না। মানুষের পাঁচ প্রকার ইন্দ্রিয়, পাঁচ প্রকার বিষয় ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়। যেমনঃ নাসিকা- গন্ধের প্রতি। চোখ- রূপের প্রতি। জিহ্বা- রসের প্রতি। কান- শব্দের প্রতি। ত্বক (গাত্রচর্ম)- স্পর্শের প্রতি আকৃষ্ট হয় অর্থাৎ বিষয় ভোগের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

আরতির উপচার ভগবানের উদ্দেশ্যে, সদ্গুরুর উদ্দেশ্যে নিবেদনের মাধ্যমে উল্লিখিত পাঁচ প্রকার ইন্দ্রিয়ের, পাঁচ প্রকার বিষয় ভোগের আসক্তি হতে মুক্ত হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করতে হয়। প্রণব মঠ ও ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ- এর আরতির নিয়মে বলা যায়-
(১) ধূপ বা ধূপতি মাটি বা গন্ধের প্রতীক স্বরূপ।
ধূপ বা ধূপতির মাধ্যমে, আরতি ক’রে সদ্গুরুর নিকট নাসিকা (নাক) ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনার (বহির্জগতের গন্ধ যেমন- নানা প্রকার সুগন্ধি কস্মেটিক দ্রব্যাদি) প্রতি আকর্ষণ মুক্ত হতে পারি- সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। পক্ষান্তরে পবিত্র পূজার ধূপ, ধূনা, কর্পূর প্রভৃতির গন্ধে খুশি থাকতে পারি সেই পার্থনা করতে হবে।
(২) পঞ্চ প্রদীপ তেজ বা অগ্নির প্রতীক, রূপের প্রতীক।
পঞ্চ প্রদীপ দিয়ে আরতির মাধ্যমে, সদ্গুরুর নিকট চক্ষু ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনার (বহির্জগতের রূপ দর্শন যেমন- অচিত্র, কুচিত্র, খারাপ দৃশ্য ইত্যাদি) প্রতি আকর্ষণ মুক্ত হতে পারি- সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। আরও প্রার্থনা জানাতে হয়, “হে ঠাকুর তোমারই রূপ দর্শনে যেন ধন্য হতে পারি।”
(৩) জলশঙ্খ অপ্ বা জলের প্রতীক, রসের প্রতীক।
জল শঙ্খ দিয়ে আরতি ক’রে সদ্গুরুর নিকট জিহ্বা ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনা (যেমন- মাছ, মাংস প্রভৃতি খাদ্য দ্রব্য; মদ, বিড়ি, সিগারেট বা অন্যান্য মাদক দ্রব্য) থেকে আসক্তি মুক্ত হতে পারি সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। সেই সাথে প্রার্থনা করতে হয়, “হে ঠাকুর, তোমার প্রতি নিবেদিত পবিত্র প্রসাদ গ্রহণ ক’রে যেন জীবনকে ধন্য করতে পারি।”
(৪) চামর ও পাখা মরুৎ বা বায়ুর প্রতীক, স্পর্শ সুখের প্রতীক।
চামর ও পাখা দিয়ে আরতির মাধ্যমে সদ্গুরুর নিকট ত্বক ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনা (নর-নারীর একে অপরের প্রতি কু-বাসনা নিয়ে শরীর স্পর্শ করা- বহির্জগতের স্পর্শের প্রতীক) হতে আসক্তি মুক্ত হতে পারি- সেই প্রার্থনা জানাতে হয়। সেই সাথে আরও প্রার্থনা করতে হয়, “হে ঠাকুর, তোমার শ্রীচরণ অভিষেক ক’রে, স্পর্শ ক’রে, যেন জীবনকে ধন্য করতে পারি।”
(৫) বিভিন্ন প্রকার বাদ্যযন্ত্রের শব্দ বোম্ বা আকাশের প্রতীক।
ঘণ্টা, ঢাক, কাসর প্রভৃতি বাজিয়ে আরতি করার মাধ্যমে সদ্গুরুর নিকট কর্ণ ইন্দ্রিয়ের ভোগ বাসনা (বহির্জগতের খারাপ শব্দ, পরনিন্দা, সমালোচনা, কু-সঙ্গীত প্রভৃতি শোনার আসক্তি) হতে মুক্ত হতে পারি- সে প্রার্থনা জানাতে হয়। সেই সাথে আরও প্রার্থনা করতে হয়- “হে ঠাকুর, তোমার পবিত্র ভজন সঙ্গীত শুনে, তোমার গুণগান শুনে, যেন জীবনকে ধন্য করতে পারি।”
(৬) ত্রিশূল, তরবারি, চক্র প্রভৃতি শক্তির প্রতীক। ভিতর ও বাইরের শত্র“ দমনের প্রতীক।
তাই ত্রিশূল দিয়ে বা অন্যান্য অস্ত্র দিয়ে আরতি করার মাধ্যমে- ভেতরের শত্র“ (কাম, ক্রোধ, লোভ প্রভৃতি রিপু ও ইন্দ্রিয়ের বিষয়াসক্তি বা ভোগ বিলাসের আসক্তি) থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য সদ্গুরু ভগবানের নিকট আন্তরিক প্রার্থনা জানাতে হবে। সেই সাথে বাইরের শত্র- দুষ্ট, দূর্বৃত্ত, অত্যাচারীদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য অর্থাৎ আত্মরক্ষা করার জন্য অস্ত্র চর্চা করারও অভ্যাস করতে হবে।
(৭) পুষ্প বা ফুল ভক্তি ও আত্মনিবেদনের প্রতীক।
তাই পুষ্প পাত্র দিয়ে আরতি নিবেদনের মাধ্যমে শ্রীগুরু ভগবানের নিকট প্রার্থনা জানাতে হবে “হে আমার প্রাণের ঠাকুর, আমার এই জীবন কুসুমটিও তোমারই শ্রীপাদপদ্মে ভক্তি অর্ঘ্য রূপে উৎসর্গ করলাম। তুমি কৃপা পূর্বক গ্রহণ ক’রে এই দীন সন্তানকে আশীর্বাদ করো। যেন আমার জীবনকে ফুলের মত পবিত্র করতে পারি অর্থাৎ সৎ চরিত্রবান হতে পারি।”

এভাবে উল্লিখিত সমস্ত উপচারের আরতির মাধ্যমে- গন্ধ, রূপ, রস, শব্দ, স্পর্শ প্রভৃতি ইন্দ্রিয়গুলির বিষয় আসক্তি দূর ক’রে- শ্রীগুরু ভগবানের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মনিবেদন করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। ভগবানের প্রতি ভক্তের আত্মনিবেদনের মাধ্যমে- ভক্তের মধ্যে জাগ্রত হয় শুদ্ধ, পবিত্র ভগবদ্ভক্তি। আর শুদ্ধ, পবিত্র ভগবদ্ভক্তির মাধ্যমে ভক্ত জন্মজন্মান্তরীণ কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত হয়ে পরম শান্তি লাভে ধন্য ও কৃতার্থ হয়।
কলুষমুক্ত  সামাজিক পরিবেশ সৃষ্টির  সৎ
প্রচেষ্টা।



একটা অসাধারণ লেখা:
ভগবান শ্রী রামকৃষ্ণ তোমাকে কি দিলেন ?
------------------------------------------------------------
গাড়ি , ঘোড়া ! সোনাদানা ! কিস্যু না ?

তাহলে কিসের এত ভক্তি , এত গুনগান !

কি দিলেন , সেটা বোঝানো যাবে না l  ওটা যার যার তার তার l  ওটা বোঝা যায় , বোঝানো যায় না l 

তবে এইভাবে বলা যায় , একটা বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট দিয়েছেন l  অদৃশ্য একটা বন্দুক দিয়েছেন শমন দমনের জন্য l  আর একটা ভয়ঙ্কর ক্ষতি করেছেন l 

সেটা কি ?

চোখ দুটো নষ্ট করে দিয়েছেন l  প্রসঙ্গ মাত্রেই চোখ উজ্জ্বল হয় l 

তার মানে শ্রী রামকৃষ্ণ তোমার কাছে শীতল বাতাস ? 

অবশ্যই ! আমি যখন আমার দোতলার পশ্চিমের বারান্দায় গভীর রাতে দাঁড়াই তখন উত্তরে দক্ষিনেশ্বর এর দিক থেকে বয়ে আসে মৃদু মৃদু রামকৃষ্ণ বাতাস l  এক আকাশ তারার নিচে কথা বলে গঙ্গা l  ওপারে বেলুড় মঠের চূড়ায় বিবেকানন্দ - নক্ষত্র l  আলুলায়িত অন্ধকার জননী সারদার কেশদাম l  ছড়িয়ে থাকা নক্ষত্রেরা তাঁর (ঠাকুরের ) অন্তরঙ্গ পার্ষদদের দল l বিশাল এক শিরিষ গাছের দিকে তাকিয়ে আমি নিশব্দে দাঁড়িয়ে থাকি l 

তাতে তোমার কি লাভ হয় ? গতির জগৎ , যন্ত্রের জগৎ , প্রতিযোগিতার জগৎ , অর্থ আর বিত্তের জগৎ খুব জোরে ছুটছে আর তুমি দাঁড়িয়ে কবিতা করছ !

উপায় নেই , আমার সেরিব্রামে রামকৃষ্ণ অ্যাটাক হয়েছে l  বিষয়ের নাড়ি অবশ হয়ে গেছে l রামকৃষ্ণ রূপ গোখর সাপের ছোবল খেয়েছি l  রামকৃষ্ণ -  বিষে, বিষয় বিষ মরে গেছে l 

সর্বনাশ হয়ে গেছে তো !

একেবারে সাড়ে সর্বনাশ !

তোমার , কি হবে গো - বলে ডুকরে কাঁদতে ইচ্ছা করে l 

তুমি কাঁদতে থাকো , আমি ততক্ষণ প্রাণ খুলে হেসে নিই l  একটু পরেই গঙ্গা দিয়ে কেশবের স্টিমার যাবে l  দেখতে পাবো , কেবিন ঘরে বসে আছেন শ্রী রামকৃষ্ণ , ভক্তসঙ্গে ঠাসাঠাসি l  আমি শুনতে পাচ্ছি তাঁর সেই অমোঘ কথা --- "বুঝলে কেশব ! মন নিয়েই সব , মনেতেই বদ্ধ , মনেতেই মুক্ত ! আমি মুক্ত পুরুষ ,সংসারেই থাকি বা অরণ্যে , আমার বন্ধন কি ? আমি ঈশ্বরের সন্তান ; রাজাধিরাজের ছেলে ; আমায় আবার বাঁধে কে ? যদি সাপে কামড়ায়, বিষ নাই কথাটি জোর করে বললে বিষ ছেড়ে যায় ! তেমনি আমি বদ্ধ নই মুক্ত -- এই কথাটি রোখ করে বলতে বলতে তাই হয়ে যায় , মুক্তই হয়ে যায় l

 জয় রামকৃষ্ণ , জয় রামকৃষ্ণ , জয় রামকৃষ্ণ ll
সংগৃহীত...

🙏💐

Thursday, 7 May 2020

বিবেকানন্দের অজানা তথ্য

বিবেকানন্দের অজানা তথ্য:১৭

❣লেখনী: ❣মাতা ঠাকুরাণীর ছেলে



এমা  কালভের নাম শুনেছেন?

------------------------------------------------- বিখ্যাত অপেরা গায়িকা এমা কালভে। যার রূপে গুনে শত শত পুরুষ ছিল পাগল। যার শো দেখার জন্য দর্শক আসন উপচে পড়ত। যার নাম একসময় আমেরিকার খবরের কাগজের পাতার হেড লাইন হত। সেই এমা কালভে।
সেই স্বনামধন্য সুন্দরী এমা কালভের জন্ম হয় 1864 খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সের এই গ্রামে। শৈশব থেকেই এমা জিরো চেতনায় ভরপুর এবং জীবন সংগ্রামে নিপুন সৈনিক ছিলেন । একটু বড় হলে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুনে নিজেকে গায়িকা ও নর্তকী হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন ।পরে ওই সকল বিষয় একাগ্রচিত্তে তালিম নিয়েছেন । হয়ে উঠেছেন বিশ্বের সেরা সুরঞ্জিতের ঊর্বশী।
যেহেতু তিনি সুন্দরী ও শ্রেষ্ঠ অপেরা গায়িকা ছিলেন , কাজেই তাঁর গুন মুগ্ধের অভাব ঘটে নি । বহু ব্যক্তিত্ব তার হৃদয়ের দরজা আঘাত করেছেন এবং ক্ষত গড়ে তুলেছেন।
এভাবে জীবন যখন সাফল্য, যন্ত্রণা, বেদনায় পসার বয়ে নিয়ে চলেছে গর্বিতা কালভে। এমন দিনে হঠাৎ তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো স্বামী বিবেকানন্দের ।
সময়টা 1898 সাল । কালভে এসেছেন শিকাগো শহরে। এক নৃত্য-গীতের আসর এ। মানসিক আঘাতের তখন তার মন প্রাণ আড়ষ্ট অথচ গানের আসরে হাজির হতেই হবে ।মনের উদ্যম আনার জন্য শিকাগোয় সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তার একমাত্র কন্যাকে। সে তখন শিশু । তিনি তাকে রেখেছিলেন এক বন্ধুর নিকট।
অবসাদগ্রস্ত শরীর নিয়ে এমা সেখানে পরপর কয়েকটি অনুষ্ঠান করেছেন। শেষ দিন শেষ অঙ্কের নৃত্যগীত সেরে যখন তিনি গ্রীন রুমে ঢুকলেন তখন তার কাছে খবর এলো, তার একমাত্র কন্যা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। অর্থাৎ তিনি যখন মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করছিলেন তখন তার একমাত্র কন্যা অগ্নিদগ্ধ হচ্ছিল । হায় জীবন !
রূপে গুনে শ্রেষ্ঠ অপেরা সুন্দরী এমার দম্ভ যেন অলংকার। স্টেজে উঠলেই লক্ষ করতালিতে অভিনন্দন জানান হাজারো দর্শক। তা শুনে ভাল লাগে তার । তার গুনপনায় অমিত প্রশংসায় পত্রপত্রিকা মুখর ।
এহেন গায়িকার বুকে জমে থাকে পাহাড়প্রমাণ বিষাদ। আত্মহত্যা করতে গিয়েছেন কিন্তু পারেননি। হয়ত মা কালী তা চান নি।
অবসাদ গ্রস্থ কালভে হোটেলে ফিরলেন ।হঠাৎ তার বন্ধু মিসেস এডমাস তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।এডামস বললেন “এক ভারতীয় সন্ন্যাসী এসেছে শিকাগো তে।যেন জ্যোতিরময় ঈশ্বর তিনি। তুমি যদি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ কর তাহলে তুমি নিশ্চিন্ত শান্তি লাভ করতে সমর্থ হবে । “
কালভের চোখের চাহনি হল বিদ্রূপ। এডামস পুনরায় তাকে অনুরোধ করলেন ।কারণ তিনিও চান যে এই বিশ্ব বিখ্যাত গায়িকা এই যন্ত্রণাময় অবসাদগ্রস্থ জীবন থেকে মুক্ত হন। অবশেষে কালভে রাজি হলেন।
অবশেষে একদিন, সেটি তাঁর এমত প্রয়াসের চতুর্থ বা পঞ্চম দিন, তিনি নিজেকে আবিষ্কার করলেন তাঁর সেই বন্ধুর বাড়ির দরজায় – যেখানে স্বামীজী ছিলেন। সেই গৃহের বাট্‌লার বা খানসামা দরজা খুলে দিলেন এবং এমা বসার ঘরের একটি আরামদায়ক চেয়ারে গিয়ে বসলেন।
এইভাবে ঘোরলাগা অবস্থায় সেখানে বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর তাঁর কানে এল কে যেন পাশের ঘর থেকে অতি মৃদু স্বরে তাঁকে ডাকছেন, ‘এস বাছা! ভয় পেয়ো না!’ প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মত তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং ধীরে ধীরে সেই ঘরটিতে গিয়ে পৌঁছলেন যেখানে একটি টেবিলের অপরদিকে স্বামীজী বসে রয়েছেন।
যেহেতু বাড়িটিতে ঢোকার সময়েই এমাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যে বিবেকানন্দ কথা না বললে কোন কথা না বলতে, তাই তিনি সেই ঘরে গিয়ে স্বামীজীর সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। স্বামীজী ধ্যানরত স্তব্ধতায় অপরূপ ভঙ্গিতে বসেছিলেন, তাঁর গেরুয়া আলখাল্লার নিম্নাংশ লুটিয়ে ছিল মেঝেতে, উষ্ণীষবদ্ধ মাথাটি সামনে ঝুঁকে– দৃষ্টি ভূমিনিবদ্ধ। সামান্যক্ষণ পরেই চোখ না তুলেই তিনি বলে উঠলেন , “কন্যা মোর! তোমার চতুর্দিকে কি না যন্ত্রণা ও সংকটের আবর্ত। শান্ত হও ।তোমার প্রয়োজন শান্তি।”
অপার বিস্ময় তিনি ভাবলেন ,” যে ব্যক্তি আমার নাম পর্যন্ত জানেন না । তিনি আমার মনের গভীরতম বেদনাকে জানলেন কেমন করে ??? “
অভিভূত হয়ে কালভে স্বামীজিকে প্রশ্ন করলেন, “এসব কথা আপনি জানলেন কি করে ?এসব কে বলেছে আপনাকে ? “
স্বামীকে কমোল ভাবে বললেন , “কেউ এসব কথা আমাকে বলেনি ।বলার দরকার আছে কি??? আমি তো তোমার ভিতরটা বইয়ের খোলা পাতার মতো পড়তে পারছি।”
শেষে বললেন,” কা তব কান্তা কস্তে পুত্রঃ সংসারোহয়মতীববিচিত্রঃ।
কস্য ত্বং বা কুতঃ আয়াতঃ তত্ত্বং চিন্তয় তদিদং ভাতঃ।।
কে তোমার স্ত্রী? কেই বা তোমার সন্তান? এই সংসার হল অতীব বিচিত্র। তুমি কার? তুমি কোথা থেকে এসেছ? তত্ত্ব সহকারে এই বিষয়ে চিন্তা করে দেখ।
যা ঘটে গেছে তাকে ভুলতে হবে । আবার উৎফুল্ল স্বাস্থ্য রক্ষা কর । নিজের দুঃখ নিয়ে একান্তে নাড়াচাড়া করো না । গহন বেদনাকে বাহ্য অভিব্যক্তিতে খুলে দাও। তা তোমার আধ্যাত্মিক জীবনের জন্য প্রয়োজন , তা তোমার শিল্পের জন্য প্রোয়জন।”
এই স্বল্প আলাপচারিতায় কালভে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলেন ।
এমার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তিনি সেদিন যখন বিবেকানন্দ সান্নিধ্যমুগ্ধ অভিজ্ঞতা নিয়ে সেই বাড়িটি থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন, তখন তিনি স্বামীজীর বাণী ও ব্যক্তিত্ব দ্বারা গভীরভাবে আচ্ছন্ন। তাঁর মাথা থেকে অসুস্থ ও জটিল চিন্তাদি অপসৃত হয়ে স্বামীজীর তীব্র ইচ্ছাশক্তির প্রভাবে শান্ত-স্বচ্ছ ভাবে পরিপূর্ণ।
এমা একথাও বলেছেন যে স্বামীজী কোন সম্মোহন শক্তি কাজে লাগান নি, তিনি শুধু তাঁর চারিত্রিক শক্তি, পবিত্রতা এবং লক্ষ্যের প্রতি তীব্র মনঃসংযোগ দিয়ে তাঁর মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। মানসিক শক্তি আর স্থৈর্য ফিরিয়ে আনার উদ্দেশ্যে বিবেকানন্দ যে কথা এমাকে বলেছিলেন, সেটি এই অনন্যা নারীর আত্মজীবনীর পাতায় পরে স্থান করে নিয়েছিল।
পরবর্তী কালে এই দিনের অভিজ্ঞতাকে তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন এইভাবে:
” বিবেকানন্দএর বাক্য ব্যক্তিত্বে গভীর ভাবে প্রভাবিত হয়ে আমি চলে এলাম। যেন আমার মস্তিষ্ক থেকে সকল রুগ্ণ জটিলতাকে তুলে নিয়ে সেখানে ভরে দিলেন শান্ত শুদ্ধ ভাবনা।”
1900 সালে দ্বিতীয়বার প্রাশ্চাত্য সফরে বের হয়ে কালভের প্যারিসে স্বামীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে। ম্যাকলাউড, কালভে, ফাদার হিয়াসান্ত প্রমুখ ব্যক্তির সঙ্গে তিনি মিশর ভ্রমণে বের হয়েছিলেন।
স্বামীজির সঙ্গে এই ভ্রমণকে কালভে বলেছেন “,আমার জীবনে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা রূপে চিহ্নিত হয়ে আছে ।। সেটি আমার জীবনের সর্বোত্তম কাল। স্বামীজির নিকট থাকার অর্থ অবিরাম প্রেরণার মধ্যে থাকা । ওই কালে আমারা গভীর তীব্র আধ্যাত্মিক আবহাওয়ার মধ্যে বাস করেছি। যে কোন ব্যাপারেই তার মুখে এনে দিত গল্পকথা , নীতি কাহিনী , নানা উদ্ধৃতি হিন্দু পুরাণ থেকে শুরু করে গভীর দার্শনিক শাস্ত্র পর্যন্ত। “
পরে আবার লিখেছেন, ” সেকি তীর্থযাত্রা বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাসের কোন রহস্যই স্বামীজির কাছে অনালোকিত নয় । “
মিশরের কায়রো ভ্রমণকালে স্বামীজি এক বিচিত্র অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছিলেন সে কথা জানিয়েছেন তাঁর স্মৃতিকথায়:
” একদিন কায়রোয় আমরা পথ হারিয়ে ফেলেছি মনে হয় খুবই মগ্ন হয়ে আমারা কথাবার্তা বলছিলাম। যেভাবেই তা ঘটুক আমরা সচেতন হয়ে দেখলাম একটি নোংরা কটুগন্ধময় পথে হাজির হয়েছি যেখানে অর্ধ নগ্ন নারীদের কেউ জানলা থেকে উঁকি দিচ্ছে, কেউবা দরজার গোড়ায় পা হাত ছড়িয়ে এলিয়ে বসে আছে।………. স্বামীজি পরিবেশ বিশেষ লক্ষ্য করেননি ,যতক্ষণ না একটি জীর্ণ বাড়ির ছায়ায় বসে থাকা একদল অত্যন্ত প্রগলভা নারী খিলখিল করে হেসে তাকে ডাকাডাকি করছিল ।।
আমাদের দলের জনৈক মহিলা তাড়াতাড়ি ওখান থেকে আমাদের সরিয়ে নিয়ে যেতে ব্যস্ত হলেন।কিন্তু স্বামীজি মৃদুভাবে নিজেকে দল থেকে বিচ্ছিন্ন করে বেঞ্চে বসে থাকা মেয়েগুলির দিকে এগিয়ে গেলেন।
‘হায় হতভাগিনী রা !হায় হতভাগ্য সন্তানেরা !এরা নিজেদের ঈশ্বরত্ব কে টেনে নামিয়েছে দেহের রূপে! দেখো একবার ওদের!’ এরপর তিনি কাঁদতে লাগলেন― যে কান্না প্রভু কাঁদতে পারেন ব্যভিচারিণী নারীদের সামনে।
মেয়েগুলি স্তব্ধ হয়ে গেল। অত্যন্ত অপ্রতিভ হয়ে উঠল ।তাদের একজন নতজানু হয়ে তার বসনপ্রান্ত চুম্বন করে ভাঙ্গা ভাঙ্গা স্প্যানিশে অস্ফুট বলতে লাগলো ,’ঈশ্বর পুত্র !ঈশ্বর পুত্র !’ অন্য একজন সহসা লজ্জায় আতঙ্কে অভিভুত হয়ে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফেলল ।সে যেন ঐ পবিত্র আত্মা থেকে নিজের সংকুচিত আত্মাকে ঢেকে রাখতে চাইছিল।”
1902 সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে স্বামীজিকে পত্র দিয়েছিলেন উত্তরে স্বামীজী তাকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। 15 মে 1902 স্বামীজী এমা কালভেকে তাঁর পিতৃবিয়োগের জন্য সান্ত্বনা জানিয়ে এই চিঠি লিখেছিলেন।
প্রসঙ্গত, পিতার মৃত্যুসংবাদও এমার কাছে পৌঁছেছিল যখন তিনি মঞ্চে কারমেন-এর ভূমিকায় অভিনয়রত। স্বামীজী লিখছেন, ‘অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে আমি তোমার উপর নেমে আসা স্বজন হারানো ব্যথার কথা জেনেছি। এ আঘাত আমাদের সবার জীবনে আসবেই আসবে। প্রকৃতির এই নিয়ম, অথচ একে মেনে নেওয়া অতীব কঠিন।আমাদের মধ্যেকার এই সব সম্পর্কের এমনই শক্তি যে তার ফলে এই মায়াময় জগতকে সত্য বলে মনে হয়; এবং সান্নিধ্য যত দীর্ঘ হবে, ততই তা মায়াকে অধিকতর সত্য বলে প্রতিভাত করবে। কিন্তু দিন আসবেই, যখন এই মায়া আবার মায়াতেই বিলীন হয়ে যাবে, এবং তাকে মেনে নেওয়া বড় দুঃখের। অথচ সেইটি, যা সত্য বা মায়ার অতীত –অর্থাৎ আমাদের আত্মা, তা সর্বদাই আমাদের ঘিরে রয়েছে – সেটি সর্বত্র বিদ্যমান। তিনিই ধন্য যিনি এই অপস্রিয়মাণ ছায়াময় জগতের মধ্যে সত্যরূপটিকে চিনে নিতে পারেন। … বিবেকানন্দের সদাই এই প্রার্থনা যে, প্রভু তাঁর শ্রেষ্ঠ আশীর্বাদ তোমার উপর বর্ষণ করুন।’
স্বামীজীর মহাপ্রয়াণের 8 বছর পর 1910 সালে কালভে এসেছিলেন কলকাতায়। এসেছিলেন বেলুড় মঠে। সঙ্গী ছিলেন পূর্ণচন্দ্র ঘোষ ও কুমুদবন্ধু সেন । তাকে অভ্যর্থনা জানান স্বামী সারদানন্দ ।বেলুড় মঠে তিনি দর্শন স্বামীজির সমাধি মন্দির (মন্দির তখনো নির্মীয়মান) দর্শন করে। দর্শন করেন শ্রী রামকৃষ্ণ দেবের মন্দির। কালভের অনুরোধে স্বামী সারদানন্দ জি তাঁকে আবৃত্তি করে শোনান:
ওঁ অসতো মা সদ্গময়।
তমসো মা জ্যোতির্গময়।
মৃত্যোর্মামৃতং গময়। ( – বৃহদারণ্যক উপনিষদ্‌ ১।৩।২৮)
পাশ্চাত্যের সংগীত রানীকে ভারতীয় সংগীত শোনাবার জন্য প্রসিদ্ধ বংশীবাদক স্বামীজীর খুড়তুতো ভাই হাবু দত্ত কে সদলবলে মঠে আনিয়েছিলেন সারদানন্দ। সারদানন্দএর অনুরোধে কালভে মঠে কয়েকটি ফরাসি সংগীত ঠাকুরকে শোনালেন । কালভের ইচ্ছা ছিল ভারতীয় সুর ও সঙ্গীতের সঙ্গে পরিচিত হতে।
যাতে পাশ্চাত্যের সুর ও সংগীতে সেই সুর আরোপ করা যায়। সেই উদ্যোগে হাবু দত্ত কালভকে থে শোনালেন এসরাজ ও ক্লেয়ারিঅনেট ।অতিথি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন হাবু দত্তের দলের এরপর তারা মঠ ত্যাগ করে কলকাতার অ হোটেলের অভিমুখে যাত্রা করেন।
এই সুর ও নৃত্যের ঊর্বশী দীর্ঘায়ু ছিলেন। 1942 সালের 6 জানুয়ারি 83 বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে জানিয়েছেন , “আমার সৌভাগ্য, আমার পরমানন্দ ,আমি এমন একজন মানুষকে জেনেছিলাম যিনি সত্যই “ঈশ্বরের সহযাত্রী” তিনি মহান, তিনি ঋষি, দার্শনিক এবং যথার্থ বন্ধু। আমার সামনে তিনি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছেন ।আমার আত্মা অনন্ত কৃতজ্ঞতা তাঁর প্রতি।”

বিপ্লবী নায়ক হেমচন্দ্র ঘোষ



বিবেকানন্দের পা ছুঁয়েছিলেন বলে, সেই হাত দিয়ে  গান্ধীজিকে প্রনাম করেননি বিপ্লবী হেমচন্দ্র!!!
                                                                            জীবনে আর দ্বিতীয় একজন মানুষকেও দেখিনি যাঁকে স্বামীজির পাশে দাঁড় করাতে পারি। গান্ধীজির সঙ্গে যখন আমার প্রথম দেখা হয় তখন দেখলাম সবাই তাঁকে প্রনাম করছেন। কিন্তু আমি করিনি।একজন সেই  বিষয়ে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।বললেন গান্ধীজিকে প্রনাম করার কথা।আমি বললাম আমার এই দক্ষিণ হস্ত দিয়ে আমি স্বামী বিবেকানন্দের চরণ স্পর্শ করেছি।আমার এই দক্ষিণ হস্ত দিয়ে আর কারও পা আমি স্পর্শ করতে পারবনা।যে মস্তক স্বামী বিবেকানন্দের চরণতলে নত হয়েছে , সে মস্তক আর কোথাও নত হবেনা।জীবনে আর কখনও কাউকে প্রনাম করিনি, আর কারও পায়ে মাথা নোয়াইনি। আমার মাথায় , পিঠে তাঁর অগ্নিস্পর্শ এখনও লেগে রয়েছে।
                              -বিপ্লবী নায়ক হেমচন্দ্র ঘোষ

(Amit Dutta র টাইমলাইন থেকে নেওয়া)





*এই বাস্তব সত্য আমাদের সকলকে জানা উচিত, উচিত প্রায়শ্চিত্ত করার...............*


 **সেই সময় স্বামিজি প্রাপ‍্য 
সন্মান পাননি---বাঙালিদের কাছে।** 

স্বামীজির মহাপ্রয়াণ হয় ৩৯ বছর বয়েসে ১৯০২ সালে । বেলুড় মঠে তখন রাত ৯ টা ১০ মিনিট। তখন বেলুড় মঠে বা তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে বিদ‍্যূৎ ছিল না । কিন্তু টেলিফোন ছিল তবুও কোন সংবাদমাধ্যম আসেনি এবং পরের দিন বাঙ্গলাদেশের কোন কাগজেই বিবেকানন্দের মৃত্যূ সংবাদ প্রকাশিত হয়নি,এমন কি  কোন রাষ্ট্রনেতা বা কোন বিখ্যাত বাঙ্গালী কোন শোকজ্ঞাপনও করেননি । 
ভাবতে পারেন ???

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর স্বল্প জীবনে অপমান, অবহেলা বহু পেয়েছেন,উপেক্ষিত হয়েছেন বার বার। পিতার মৃত্যূর পর স্বজ্ঞাতির সঙ্গে কোর্ট কাছারী করতে হয়েছে তাঁকে ।বহু বার হাজিরা দিয়েছেন কাঠগড়ায় l

 নিদারুণ দরিদ্রের সংসারে সকালে উঠে অফিস পাড়া ঘুরে ঘুরে চাকরির খোঁজে বেরুতেন । দিনের পর দিন মা কে বলতেন মা আজ রাতে বন্ধুর বাড়িতে খেতে যাবো। প্রায় দিন দেখতেন সংসারে চাল,ডাল,নুন ,তেল কিছুই নেই কিন্তু ভাই ও বোন নিয়ে 5 টা পেটের খাবার কি ভাবে জুটবে ? মুদির দোকানে ধার করে মাকে এক- দুই দিনের চাল ডাল দিয়ে ... মা কে বলতেন আমার রান্না কোরো না... মা ! দিন দুই বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ আছে কিন্তু..কোথায় নিমন্ত্রণ ? .. আনাহার আর অর্ধপেটে থাকতেন তৎ কালীন নরেন্দ্র .........

 ভাবা যায় !!!!!!!

চরম দারিদ্রের মধ্যে সারা জীবনটাই টেনে নিয়ে গেছেন । ২৩ বছর বয়েসে শিক্ষকের চাকরি পেলেন মেট্রোপলিটন স্কূলে । যাঁর প্রতিষ্ঠাতা বিদ্যাসাগর মশাই আর হেডমাস্টার বিদ্যাসাগরের জামাতা । জামাতা পছন্দ করতেন না নরেন্দ্রনাথ দত্তকে .. শ্বশুরকে বলে..." *খারাপ পড়ানোর অপরাধে"* বিদ‍্যালয় থেকে তাড়িয়ে দিলেন বিবেকানন্দকে । অথছ, যাঁর জ্ঞান,বুদ্ধি,ব্যুৎপত্তি তর্কাতীত, অন্তত সেই সময়েও।
 আবার বেকার বিবেকানন্দ। বিদেশেও তাঁর নামে এক বাঙ্গালি গুরু প্রচার করেন .. বিবেকানন্দ বেশ কয়েকটি বৌ ও দশ -বারো ছেলে পুলের পিতা ও এক আস্ত ভন্ড ও জুয়াখোর। ......

দেশে ও বিদেশে অর্ধপেটে বা অভুক্ত থেকেছেন দিন থেকে দিনান্তে.... 

চিঠিতে লিখেছিলেন :- 

"-কতবার দিনের পর দিন অনাহারে কাটিয়েছি । মনে হয়েছে আজই হয়ত মরে যাবো ... জয় ব্রহ্ম বলে উঠে দাঁড়িয়েছি .... বলেছি . ..আমার ভয় নেই,নেই মৃত্যূ, নেই ক্ষুধা, আমি পিপাসা বিহীন । জগতের কি ক্ষমতা আমাকে ধ্বংস করে ?" ...

অসুস্থ বিবেকানন্দ বিশ্ব জয় করে কলকাতায় এলে তাঁর সংবর্ধনা দিতে বা সংবর্ধনা সভা তে আসতে রাজি হয় নি অনেক বিখ্যাত বাঙ্গালী ( নাম গুলি অব্যক্ত রইল) শেষে প্যারিচাঁদ মিত্র রাজি হলেও ... তিনি বলেছিলেন .. ব্রাহ্মণ নয় বিবেকানন্দ । ও কায়েত... তাই সন্ন্যাসী হতে পারে না , আমি ওকে brother বিবেকানন্দ বলে মঞ্চে সম্বোধন করবো । 
১৮৯৮, বিদেশের কাগজে তাঁর বাণী ও ভাষণ পড়ে আমেরিকানরা অভিভূত আর বাঙ্গালীরা !
সেই  বছরই অক্টোবরে অসুস্থ স্বামীজি কলকাতার বিখ্যাত ডক্টর রসিকলাল দত্তকে দেখাতে যান,(চেম্বার- 2 সদর স্ট্রিট। কলকাতা যাদুঘরে পাশের রাস্তা )। রুগী বিবেকানন্দ কে দেখে সেই সময় 40 টাকা ও ঔষুধের জন্যে 10 টাকা মানে আজ ২০২০র হিসাবে প্রায় ১৬০০০ টাকা নিলেন 
বিবিধ রোগে আক্রান্ত বিশ্বজয়ী দরিদ্র সন্ন্যাসীর কাছ থেকে . বেলুড় মঠের জন্যে তোলা অর্থ থেকে স্বামী ব্রহ্মনন্দ এই টাকা বিখ্যাত বাঙ্গালী(?) ডক্টর রসিকলাল কে দিয়েছিলেন। ..

আরও আছে .........!!!


 বিবেকানন্দের মৃত্যূর কোন ফটো নেই । এমনকি বীরপুরুষের কোন ডেথ সার্টিফিকেটও নেই কিন্তু সে সময় বালি - বেলুড় মিউনিসিপালিটি ছিলো। 

 আর এই municipality বেলুড় মঠে প্রমোদ কর বা amusement tax ধার্য করেছিলো ।
বলা হয়েছিল ওটা ছেলে ছোকরাদের আড্ডার ঠেক আর সাধারণ মানুষ বিবেকানন্দকে ব্যঙ্গ করে মঠকে বলতো .. "বিচিত্র আনন্দ" বা "বিবি- কা আনন্দ" । ( মহিলা /বধূ / ... নিয়ে আনন্দ ধাম)। এই ছিলো তৎকালীন মুষ্টিমেয় বাঙ্গালীদের মনোবৃত্তি l 

সাধে কি শেষ সময় বলে গিয়েছিলেন- " *একমাত্র আর একজন বিবেকানন্দই বুঝেতে পারবে যে এই বিবেকানন্দ কি করে গেল।"* 
ঋণস্বীকার---

শংকরের অচেনা অজানা  বিবেকানন্দ।



এক বিদেশী মেয়ের  গল্প ::


একবার এক বিদেশী মেয়ে স্বামী বিবেকান্দকে এসে বলে "আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।"


স্বামীজি বলেন: কেন? আমি তো ব্রহ্মচারী।
মেয়েটি বলে: কারন আমি আপনার মতন একজন সন্তান চাই , যে সারা পৃথিবীতে আমার নাম উজ্জ্বল করবে। সেটা আপনাকে বিয়ে করলেই সম্ভব।
স্বামীজি বলেন: সেটার জন্য আরো একটি উপায় আছে।
মেয়ে জিজ্ঞেস করে: কি উপায়?
স্বামীজি মৃদু হেসে বলেন: আমাকে আপনার পুত্র বানিয়ে নেন। আর আমিও আপনাকে মা বলে ডাকব। এরফলে আপনার মনোবাসনাও পূর্ণ হবে আর আমার ব্রহ্মচর্যও অটুট থাকবে।
 এমনটাই হলো মহাত্মাদের বিচারধারা।
পুরো সমুদ্রের জল একটি জাহাজকে ততক্ষন ডুবোতে পারেনা , যতক্ষন না সমুদ্রের জল জাহাজের ভেতর প্রবেশ করছে।
ঠিক তেমনি খারাপ কুবুদ্ধি ও অসামাজিক কাজ দ্বারা আপনি প্রভাবিত হবেন না, যতক্ষন না পর্যন্ত আপনি নিজে সেগুলি আপনার অন্তরে প্রবেশের অনুমতি দিচ্ছেন।




এই জগৎ , সমাজ এই কারনে খারাপ নয় যে. খারাপ মানুষের সংখ্যা বেশী। খারাপ কারন ভালো মানুষেরা চুপ থাকে...

A professor and Swami Vivekananda ::



😫      In 1881, a professor asked his student, whether it was God, who created EVERYTHING, that exists in the universe..?
🙄     Student replied : YES..
😫    He again asked : What about EVIL..? Has God created, EVIL ALSO.. ?
🙄     The student got silent. Somehow, the student requested that may he ask 2 questions..?
😫     Professor allowed him, to do so..
🙄     Student asked : Does COLD exists..?
😫     Professor said : Yes. Don't you feel the cold.. ?
🙄     Student said :  I am sorry, but you are wrong sir. Cold is a complete ABSENCE OF HEAT. There is no cold. It is only, an absence of heat..
🙄      Student asked again : Does DARKNESS exists..?
😫     Professor said :  YES..
🙄    Student replied : You are again wrong, sir. There is nothing like darkness. It is actually the ABSENCE OF LIGHT..
🙄       Sir, we always study LIGHT & HEAT, but not cold & darkness. Similarly, the evil does not exist. Actually it is the absence of LOVE, FAITH & BELIEF IN GOD ALMIGHTY. Name of this student was : VIVEKANANDA..



🍂🍂🍂🍂🍂   দেওঘরে   স্বামীজী   🍂🍂🍂🍂🍂


                                      ( ৬ )

        স্বামীজী ষষ্ঠবার অর্থাৎ শেষবারের মতো দেওঘরে আসেন ১৯০০ খ্রীষ্টাব্দের ডিসেম্বরে ।  সেই সময়ের একটি বিশেষ ঘটনা জানা যায় হরিচরণ মিশ্রের অপ্রকাশিত রচনা থেকে ---------
                 
                 " দেওঘরে থাকাকালীন স্বামীজী প্রায়ই পাশ্ববর্তী গ্রামের সাঁওতালপল্লী ভ্রমণ করতেন ।  তিনি বলেছিলেন, 'এই সাঁওতালরাই এদেশের আদি অধিবাসী ।  এরা সরল, সৎ ও উদার ।  মহাজন, জমিদার ও ফড়েদাররাই এদের ঠকায় ।  এরা এদের সততার মূল্য পায় না ।'  সাঁওতালদের প্রতি স্বামীজীর গভীর ভালবাসা ছিল ।
                 " মুনিয়া মাঝির কথা মনে পড়ে ।  প্রিয়বাবুর আনন্দকুটিরে যেখানে স্বামীজী এসে থাকতেন, কাজ করত মুন্না সাঁওতাল ও তার স্ত্রী ঝরি সাঁওতাল ।  তাদের একমাত্র মেয়ে মুনিয়া মাঝি ।  মুনিয়ার যখন সাত বছর বয়স, তার বাবা মারা যায় কলেরায় । এরপর থেকে  মা-মেয়ে প্রিয়বাবুর বাড়িতে ঘরমোছা, জলতোলা, বাসনমাজা, কাপড়কাচা প্রভৃতি কাজ করত ।
                  " মুনিয়া স্বামীজীর স্নানের জল তুলে দিত, কাপড় কেচে দিত, খড়ম ধুয়ে দিত ।  মুনিয়া স্বামীজীকে বলত 'সাধুবাবা' ।  স্বামীজী দেওঘরে এলে নিমকাঠি দিয়ে দাঁত মাজতেন ।  এই নিমকাঠি জোগাড় করে আনত মুনিয়া ।  পেটের গোলমালে ভুগতেন বলে স্বামীজীর জন্য মুনিয়া হিঞ্চেশাক এনে তার রস করে কাঁচা দুধ দিয়ে খেতে দিত তাঁকে ।  স্বামীজী তা খেয়ে বলতেন, 'মুনিয়া আমার এখানকার গার্জেন !'  একবার মুনিয়া অনেকগুলো ভুট্টা এনে স্বামীজীকে বলল, 'সাধুবাবা এগুলো পুড়িয়ে দেব খাবি ----- খুব ভাল খেতে ।'  স্বামীজী মুনিয়ার কথা শুনে হো হো করে হাসতে লাগলেন ।  বাপ-মরা এই মেয়েটির প্রতি স্বামীজীর অপরিসীম করুণা ছিল ।  তাই আমাকে বলেছিলেন, 'এই অনাথা আদিবাসী মেয়েটাকে একটু লেখাপড়া শেখানোর ব্যবস্থা করুন ।'
                    " স্বামীজীর নির্দেশমত মুনিয়াকে প্রাথমিক লেখাপড়া শিখিয়ে কুষ্ঠাশ্রমে একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম ।  কাজ করার সুবাদে সংসার একটু সচ্ছল হল ।  সে লেখাপড়া জানায় পরমহংসদেবের নাম জানতে পারল ।  স্বামীজীর কর্মকাণ্ডও কিছু জানল ।  এদিকে বয়স হওয়ায় তার মা তার বিয়ে দিতে চাইল । কিন্তু সে কোনমতেই রাজি হল না ।  সে বলেছিল, 'সাধুবাবা আমার মাথা ছুঁয়ে আশীর্বাদ করেছে ----- সেই-ই আমাকে রক্ষা করবে ।'
                    " মা-মেয়ের সংসার ।  থাকত ধারোয়া নদীর তীরে ।  স্বামীজীর প্রয়াণের সংবাদ পেয়ে মুনিয়া খুব কেঁদেছিল ।  তখন কুড়ি-বাইশ বছর বয়স তার, মারণ জ্বরে পড়ল সে ।  সংবাদ পেয়ে তাদের বাড়ি ছুটলাম ।  পাড়াতে পৌঁছেই কান্নার রোল শুনতে পেলাম, বুকটা ধড়াস করে উঠল ।  শুনলাম, আজই মুনিয়া আমাদের ছেড়ে চলে গেছে ।  বাড়িতে গিয়ে দেখি, দাওয়ায় চেটায়ের ওপর মুনিয়া চিরঘুমে ঘুমিয়ে আছে ।  তার মাথার কাছে একজোড়া খড়ম ।  জিজ্ঞাসা করলাম, 'ওর মাথার কাছে খড়মজোড়া কেন ?' তার মা বলল, 'পাণ্ডাজী, ঐ খড়মজোড়া হল সাধুবাবার ।  পুজো করার লেগে মুনিয়া বাবুর কাছ থেকে চেয়ে নিয়েছিল ।  অসুখের সময় বলেছিল, মা তুই সাধুবাবার খড়ম-দুটো মাথায় ঠেকিয়ে মাথার কাছে রাখ ।  সাধুবাবা এসে পড়বে ।'  এ কথা বলে মুনিয়ার মা কান্নায় ভেঙে পড়ল ।
                    " স্বামীজী মুনিয়ার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করেছিলেন ।  মুনিয়া নিশ্চিত স্বামীজীর আশীর্বাদ পেয়েছিল ।  তা না হলে অশিক্ষিত সাঁওতাল গোষ্ঠীর মেয়ে হয়ে রোগীদের সেবায় নিজেকে বলি দেওয়ার সাহস পেল কোথা থেকে ?  ধন্য মুনিয়া মাঝি ------- ধন্য তার সাধুবাবার প্রতি ভক্তি ! "

                                              ( উদ্বোধন : ৯ / ১৪১৯ )

🍂🍂🍂🍂🍂🍂  জয়  স্বামীজী  🍂🍂🍂🍂🍂🍂



স্বামী বিবেকানন্দ ও সূর্যগ্রহণ


আজ সূর্যগ্রহণ -সর্বগ্রাসী গ্রহণ। জ্যোতির্বিদগণও গ্রহণ দেখতে নানাস্থানে গেছেন। ধর্মপিপাসু নরনারীগণ গঙ্গা স্নান করতে বহুদূর থেকে এসে উৎসুক হয়ে গ্রহণবেলার প্রতীক্ষা করছেন। স্বামীজীর কিন্তু গ্রহণ সম্বন্ধে বিশেষ কোন উৎসাহ নেই। কয়েকদিন হল তিঁনি বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে আছেন। সকালে ,দুপুরে বা সন্ধ্যায় তাঁর কিছুমাত্র বিরাম নেই।বহু উৎসাহী মানুষ ,কলেজের ছাত্র তাঁকে দর্শনের জন্য আসছেন।
স্বামীজী শিষ্যকে(শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী) বলেছেন নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াতে।সেইমত শিষ্যও মাছ ,তরকারি ও রান্নার সব জিনিস নিয়ে বলরাম বাবুর বাড়িতে সকাল ৮টার মধ্যে এসেছেন।তাকে দেখে স্বামীজী বললেন,"তোদের দেশের মতো রান্না হওয়া চাই আর গ্রহণের আগে খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়া চাই।"
বলরামবাবুদের বাড়ির মেয়েছেলেরা কেউ কলকাতাতে নেই ।শিষ্য বাড়ির ভিতরে রন্ধনশালায়  গিয়ে রান্না শুরু করলেন।আজ তার পরম আনন্দের দিন ,তার গুরুকে রান্না করে খাওয়াবেন।যোগীন মা সেদিন বলরাম বাবুর বাড়িতে ছিলেন।তিনি দাঁড়িয়ে শিষ্যকে নানারকম  রান্না বিষয়ে সাহায্য করছিলেন।স্বামীজীও মাঝে মাঝে ভিতরে এসে শিষ্যকে উৎসাহিত করে যাচ্ছিলেন ;দেখিস মাছের "জুল" যেন ঠিক বাঙ্গালদিশি ধরনের হয় বলে রঙ্গ করছিলেন। ভাত ,মুগের ডাল ,কই মাছের ঝোল ,মাছের টক ও মাছের সুক্তনী রান্না প্রায় শেষ হয়েছে ,এমন সময় স্বামীজী স্নান করে এসে নিজেই পাতা নিয়ে খেতে বসে পড়লেন।এখনো কিছু রান্না বাকি আছে বলাতেও আবদেরে ছেলের মত বললেন ,"যা হয়েছে নিয়ে আয় ,আমি আর বসতে পারছি না ,পেট খিদেয় জ্বলে যাচ্ছে।"শিষ্য তাড়াতাড়ি আগে মাছের সুক্তনী ও ভাত দিয়ে খেতে দিলেন।তারপর শিষ্য বাটিতে করে অন্য যা রান্না হয়েছিল সেগুলিও পরিবেশন করলেন।এবার তিনি ভিতরে গিয়ে প্রেমানন্দ ও যোগানন্দ প্রমুখ সন্ন্যাসী মহারাজদের  কেও ডেকে এনে খেতে দিলেন।
শিষ্য কোনকালেই রান্নায় পটু ছিলেন না।কিন্তু স্বামীজী আজ শিষ্যের রান্নার ভূয়সী প্রশংসা করতে লাগলেন।কলকাতার লোক মাছের সুক্তনী নামে খুব ঠাট্টা তামাশা করে কিন্তু সেই সুক্তনী খেয়ে বললেন,"এমন কখনো খাই নি।" কিন্তু মাছের 'জুল'টা যেমন ঝাল হয়েছে ,এমন আর কোনটা ই হয় নি।মাছের টক খেয়ে বললেন ,"এটা ঠিক যেন বর্ধমানী ধরনের হয়েছে।অনন্তর দই ও সন্দেশ খেয়ে স্বামীজী ভোজন শেষ করে আচমনান্তে ঘরে এসে খাটে বসলেন।স্বামীজী তামাক টানিতে টানিতে বললেন ,"যে ভাল রাঁধতে পারে না ,সে ভাল সাধু হতে পারে না -মন শুদ্ধ না হলে ভাল সুস্বাদু রান্না হয় না।"

কিছুক্ষণ পরে চারিদিকে শাঁক ঘন্টা বেজে উঠল এবং স্ত্রীকণ্ঠের উলুধ্বনি শোনা যেতে লাগল। স্বামীজী বলে উঠলেন ,"ওরে গেরন লেগেছে - আমি ঘুমোই ,তুই আমার পা টিপে দে।" এই বলে একটু তন্দ্রা অনুভব করতে লাগলেন। শিষ্যও তাঁহার পদসেবা করতে করতে ভাবলেন ,"এই পূণ্যক্ষণে গুরুপদসেবাই আমার গঙ্গাস্নান ও জপ।" তিনি শান্তমনে গুরুর পদসেবা করতে লাগলেন। গ্রহণে সর্বগ্রাস হয়ে ক্রমে চারদিক  সন্ধ্যাকালের মত তমসাছন্ন হয়ে গেল।
গ্রহণ ছেড়ে যাবার ১৫/২০ মিনিট বাকি থাকতে স্বামীজীর নিদ্রাভঙ্গ হয়ে গেল।নিদ্রা থেকে উঠে মুখ হাত ধুয়ে তামাক খেতে চাইলেন। তামাক খেতে খেতে শিষ্যকে পরিহাস করে বললেন,"লোকে বলে ,গেরনের সময় যে যা করে ,সে নাকি তাই কোটিগুণে পায় ; তাই ভাবলুম মহামায়া এ শরীরে সুনিদ্রা দেননি,যদি এই সময়ে একটু ঘুমুতে পারি তো বেশ ঘুম হবে, কিন্তু তা হলো না  ; জোর ১৫ মিনিট ঘুম হয়েছে ।"

(১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ২২ জানুয়ারি মধ্যাহ্নে পূর্ণ সূর্যগ্রহণ হয়েছিল)

ঠিক কি ঘটেছিল ৪ঠা জুলাই ১৯০২ সালে...........


স্বামীজীর তিরোধান দিবসে জানাই স্বশ্রদ্ধ প্রণাম !!

II আজ  সেই চৌঠা জুলাই - এইদিনে স্বামী বিবেকানন্দ ছেড়ে গিয়েছিলেন আমাদের কে ......

ঠিক কী ঘটেছিলো এই দিন.... ৪ঠা জুলাই, ১৯০২
========


ভোরবেলা ঘুম ভাঙল বিবেকানন্দের । তাকালেন ক্যালেন্ডারের দিকে । আজই তো সেই দিন । আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। আর আমার দেহত্যাগের দিন। মা ভুবনেশ্বরী দেবীর মুখটি মনে পড়ল তাঁর। ধ্যান করলেন সেই দয়াময় প্রসন্ন মুখটি। বুকের মধ্যে অনুভব করলেন নিবিড় বেদনা ।তারপর সেই বিচ্ছেদবেদনার সব ছায়া সরে গেল ।ভারী উৎফুল্ল বোধ করলেন বিবেকানন্দ। মনে নতুন আনন্দ, শরীরে নতুন শক্তি । তিনি অনুভব করলেন, তাঁর সব অসুখ সেরে গিয়েছে । শরীর ঝরঝর করছে । শরীরে আর কোনো কষ্ট নেই।

মন্দিরে গেলেন স্বামীজি । ধ্যানমগ্ন উপাসনায় কাটালেন অনেকক্ষন । আজ সকাল থেকেই তাঁর মনের মধ্যে গুন গুন করছে গান । অসুস্থতার লক্ষন নেই বলেই ফিরে এসেছে গান, সুর, আনন্দ । তাঁর মনে আর কোনও অশান্তি নেই । শান্ত , স্নিগ্ধ হয়ে আছে তাঁর অন্তর।উপাসনার পরে গুরুভাইদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করতে করতে সামান্য ফল আর গরম দুধ খেলেন ।

বেলা বাড়ল। সাড়ে আটটা নাগাদ প্রেমানন্দকে ডাকলেন তিনি। বললেন, আমার পুজোর আসন কর ঠাকুরের পূজাগৃহে । সকাল সাড়ে নটায় স্বামী প্রেমানন্দও সেখানে এলেন পূজা করতে ।

 বিবেকানন্দ একা হতে চান ।
প্রেমানন্দকে বললেন‚ আমার ধ্যানের আসনটা ঠাকুরের শয়নঘরে পেতে দে ।
এখন আমি সেখানে বসেই ধ্যান করব ।

অন্যদিন বিবেকানন্দ পুজোর ঘরে বসেই ধ্যান করেন । আজ ঠাকুরের শয়নঘরে প্রেমানন্দ পেতে দিলেন তাঁর ধ্যানের আসন ।চারদিকের দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিতে বললেন স্বামীজি ।

বেলা এগারোটা পর্যন্ত ধ্যানে মগ্ন রইলেন স্বামীজি । ধ্যান ভাঙলে ঠাকুরের বিছানা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে এলেন তিনি --

মা কি আমার কালো,
কালোরূপা এলোকেশী
হৃদিপদ্ম করে আলো ।
তরুন সন্ন্যাসীর রূপের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে গুরুভাইরা ।

বেলা সাড়ে এগারোটার মধ্যেই দুপুরের খাওয়া সারতে বললেন বিবেকানন্দ । আজ নিজে একলা খাচ্ছেন না । খেতে বসলেন সবার সঙ্গে ।

সকালবেলা বেলুড়ঘাটে জেলেদের নৌকো ভিড়েছিল । নৌকোভর্তি গঙ্গার ইলিশ । স্বামীজির কানে খবর আসতেই তিনি মহাউত্‍সাহে ইলিশ কিনিয়েছেন । তাঁরই আদেশে রান্না হয়েছে ইলিশের অনেকরকম পদ ।

 গুরুভাইদের সঙ্গে মহানন্দে ইলিশভক্ষনে বসলেন বিবেকানন্দ । তিনি জানেন, আর মাত্র কয়েকঘন্টার পথ তাঁকে পেরোতে হবে । ডাক্তারের উপদেশ মেনে চলার আর প্রয়োজন নেই । জীবনের শেষ দিনটা তো আনন্দেই কাটানো উচিত।

'একাদশী করে খিদেটা খুব বেড়েছে। ঘটিবাটিগুলোও খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে ।' বললেন স্বামীজি ।

পেট ভরে খেলেন ইলিশের ঝোল, ইলিশের অম্বল. ইলিশ ভাজা ।

দুপুরে মিনিট পনেরো বিছানায় গড়িয়ে নিয়ে প্রেমানন্দকে বললেন, সন্ন্যাসীর দিবানিদ্রা পাপ। চল, একটু লেখাপড়া করা যাক ।

 বিবেকানন্দ শুদ্ধানন্দকে বললেন‚ লাইব্রেরি থেকে শুক্লযজুর্বেদটি নিয়ে আয় ।
তারপর হঠাৎ বললেন‚ এই বেদের মহীধরকৃতভাষ্য আমার মনে লাগে না |
আমাদের দেহের অভ্যন্তরে মেরুদণ্ডের মধ্যস্থ শিরাগুচ্ছে‚ ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী যে সুষুন্মা নাড়িটি রয়েছে‚ তার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আছে তন্ত্রশাস্ত্রে । আর এই ব্যাখ্যা ও বর্ণনার প্রাথমিক বীজটি নিহিত আছে বৈদিক মন্ত্রের গভীর সংকেতে । মহীধর সেটি ধরতে পারেননি ।
বিবেকানন্দ এইটুকু বলেই থামলেন ।

এরপর দুপুর একটা থেকে চারটে পর্যন্ত তিনঘন্টা স্বামীজী লাইব্রেরী ঘরে ব্যাকরণ চর্চা করলেন ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে ।

তিনি পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলি নানারকম মজার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলেন ।
ব্যাকরণশাস্ত্রের ক্লাস হাসির হুল্লোড়ে পরিণত হল ।

ব্যাকরনের ক্লাস শেষ হতেই এক কাপ গরম দুধ খেয়ে প্রেমানন্দকে সঙ্গে নিয়ে বেলুড় বাজার পর্যন্ত প্রায় দু মাইল পথ হাঁটলেন ।
এতটা হাঁটা তাঁর শরীর ইদানিং নিতে পারছে না ।

কিন্তু ১৯০২ এর ৪ ঠা জুলাইয়ের গল্প অন্যরকম । কোনও কষ্টই আজ আর অনুভব করলেন না।
বুকে এতটুকু হাঁফ ধরল না । আজ তিনি অক্লেশে হাঁটলেন ।

বিকেল পাঁচটা নাগাদ মঠে ফিরলেন বিবেকানন্দ । সেখানে আমগাছের তলায় একটা বেঞ্চি পাতা । গঙ্গার ধারে মনোরম আড্ডার জায়গা । স্বামীজির শরীর ভাল থাকে না বলে এখানে বসেন না । আজ শরীর -মন একেবারে সুস্থ । তামাক খেতে খেতে আড্ডায় বসলেন বিবেকানন্দ ।
আড্ডা দিতে দিতে ঘন্টা দেড়েক কেটে গেল ।

সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা হবে । সন্ন্যাসীরা কজন মিলে চা খাচ্ছেন । স্বামীজি এক কাপ চা চাইলেন ।

সন্ধ্যে ঠিক সাতটা। শুরু হলো সন্ধ্যারতি । স্বামীজি জানেন আর দেরি করা চলবে না । শরীরটাকে জীর্ন বস্ত্রের মতো ত্যাগ করার পরমলগ্ন এগিয়ে আসছে ।

তিনি বাঙাল ব্রজেন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন । ব্রজেন্দ্রকে বললেন , 'আমাকে দুছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর ।

 আমি না ডাকলে আসবি না ।'
স্বামীজি হয়তো বুঝতে পারছেন যে এটাই তাঁর শেষ ধ্যান ।

তখন ঠিক সন্ধ্যে সাতটা পঁয়তাল্লিশ । স্বামীজি যা চেয়েছিলেন তা ঘটিয়ে দিয়েছেন ।

ব্রজেন্দ্রকে ডাকলেন তিনি ।  বললেন , জানলা খুলে দে । গরম লাগছে ।মেঝেতে বিছানা পাতা । সেখানে শুয়ে পড়লেন স্বামীজি । হাতে তাঁর জপের মালা ।

ব্রজেন্দ্র বাতাস করছেন স্বামীজিকে । স্বামীজি ঘামছেন । বললেন , আর বাতাস করিসনে । একটু পা টিপে দে ।

রাত ন'টা নাগাদ স্বামীজি বাঁপাশে ফিরলেন । তাঁর ডান হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল । কুন্ডলিনীর শেষ ছোবল । বুঝতে পারলেন বিবেকানন্দ । শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন তিনি ।

 দীর্ঘশ্বাস ফেললেন । গভীর সেই শ্বাস । মাথাটা নড়ে উঠেই বালিশ থেকে পড়ে গেল ।

 ঠোঁট আর নাকের কোনে রক্তের ফোঁটা । দিব্যজ্যোতিতে উজ্জ্বল তাঁর মুখ । ঠোঁটা হাসি ।
ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন , 'তুই যেদিন নিজেকে চিনতে পারবি সেদিন তোর এই দেহ আর থাকবে না ।'

স্বামীজি বলেছিলেন , 'তাঁর চল্লিশ পেরোবে না ।'
বয়েস ঠিক উনচল্লিশ বছর পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন ।

পরের দিন ভোরবেলা ।
একটি সুন্দর গালিচার ওপর শায়িত দিব্যভাবদীপ্ত‚ বিভূতি-বিভূষিত‚ বিবেকানন্দ ।

তাঁর মাথায় ফুলের মুকুট ।
তাঁর পরনে নবরঞ্জিত গৈরিক বসন ।
তাঁর প্রসারিত ডান হাতের আঙুলে জড়িয়ে আছে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি ।
তাঁর চোখদুটি যেন ধ্যানমগ্ন শিবের চোখ‚ অর্ধনিমীলিত‚ অন্তর্মুখী‚ অক্ষিতারা ।

নিবেদিতা ভোরবেলাতেই চলে এসেছেন ।
স্বামীজির পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে অনবরত বাতাস করছেন ।তাঁর দুটি গাল বেয়ে নামছে নীরব অজস্র অশ্রুধারা ।

স্বামীজির মাথা পশ্চিমদিকে ।
পা-দুখানি পুবে‚ গঙ্গার দিকে ।
শায়িত বিবেকানন্দের পাশেই নিবেদিতাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সেই গুরুগতপ্রাণা‚ ত্যাগতিতিক্ষানুরাগিণী বিদেশিনী তপস্বিনীর হৃদয় যেন গলে পড়ছে সহস্রধারে । আজকের ভোরবেলাটি তাঁর কাছে বহন করে এনেছে বিশুদ্ধ বেদনা ।অসীম ব্যথার পবিত্র পাবকে জ্বলছেন‚ পুড়ছেন তিনি ।

এ বেদনার সমুদ্রে তিনি একা ।নির্জনবাসিনী নিবেদিতা ।বিবেকানন্দের দেহ স্থাপন করা হল চন্দন কাঠের চিতায় ।

আর তখুনি সেখানে এসে পৌঁছলেন জননী ভুবনেশ্বরী ।চিৎকার করে কাঁদতে- কাঁদতে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে ।

কী হল আমার নরেনের ?
হঠাৎ চলে গেল কেন ?
ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয় ।
আমাকে ছেড়ে যাসনি বাবা ।
আমি কী নিয়ে থাকব নরেন ?
ফিরে আয় । ফিরে আয় ।
সন্ন্যাসীরা তাঁকে কী যেন বোঝালেন ।

তারপর তাঁকে তুলে দিলেন নৌকায় ।
জ্বলে উঠল বিবেকানন্দের চিতা ।
মাঝগঙ্গা থেকে তখনো ভেসে আসছে ভুবনেশ্বরীর বুকফাটা কান্না ।

ফিরে আয় নরেন ফিরে আয় ।
ভুবনেশ্বরীর নৌকো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল ।
তাঁর কান্না‚ ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয়‚ ভেসে থাকল গঙ্গার বুকে ।

নিবেদিতা মনে মনে ভাবলেন‚ প্রভুর ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ডের এক টুকরো যদি পেতাম !

সন্ধে ছটা ।
দাহকার্য সম্পন্ন হল । আর নিবেদিতা অনুভব করলেন‚ কে যেন তাঁর জামার হাতায় টান দিল । তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন‚ অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে‚ ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি‚ সেখানেই উড়ে এসে পড়ল ততটুকু জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড যতটুকু তিনি প্রার্থনা করেছিলেন ।

নিবেদিতার মনে হল‚ মহাসমাধির ওপার থেকে উড়ে-আসা এই বহ্নিমান পবিত্র বস্ত্রখণ্ড তাঁর প্রভুর‚ তাঁর প্রাণসখার শেষ চিঠি ।




আ  বা  র  জানুন ::


 *সেই 4ঠা জুলাই ১৯০২ এর স্বামীজীর  শেষ দিনটা কেমন ছিল জানুন*
**************************
 *৪ঠা জুলাই ১৯০২  ভোর*
====≠= ============
ভোরবেলা ঘুম ভাঙল বিবেকানন্দের। তাকালেন ক্যালেন্ডারের দিকে। আজই তো সেই দিন। আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। আর আমার দেহত্যাগের দিন। মা ভুবনেশ্বরী দেবীর মুখটি মনে পড়ল তাঁর। ধ্যান করলেন সেই দয়াময় প্রসন্ন মুখটি। বুকের মধ্যে অনুভব করলেন নিবিড় বেদনা।

তারপর সেই বিচ্ছেদবেদনার সব ছায়া সরে গেল।
ভারী উৎফুল্ল বোধ করলেন বিবেকানন্দ। মনে নতুন আনন্দ, শরীরে নতুন শক্তি। তিনি অনুভব করলেন, তাঁর সব অসুখ সেরে গিয়েছে। শরীর ঝরঝর করছে। শরীরে আর কোনো কষ্ট নেই।

মন্দিরে গেলেন স্বামীজি। ধ্যানমগ্ন উপাসনায় কাটালেন অনেকক্ষন। আজ সকাল থেকেই তাঁর মনের মধ্যে গুন গুন করছে গান। অসুস্থতার লক্ষন নেই বলেই ফিরে এসেছে গান, সুর, আনন্দ। তাঁর মনে আর কোনও অশান্তি নেই। শান্ত , স্নিগ্ধ হয়ে আছে তাঁর অন্তর।

উপাসনার পরে গুরুভাইদের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করতে করতে সামান্য ফল আর গরম দুধ খেলেন।

 *৪ঠা জুলাই সকাল সাড়ে আটটা*
===============

প্রেমানন্দকে ডাকলেন তিনি। বললেন, আমার পুজোর আসন কর ঠাকুরের পূজাগৃহে। সকাল সাড়ে নটায় স্বামী প্রেমানন্দও সেখানে এলেন পূজা করতে। বিবেকানন্দ একা হতে চান।

প্রেমানন্দকে বললেন‚ আমার ধ্যানের আসনটা ঠাকুরের শয়নঘরে পেতে দে।
এখন আমি সেখানে বসেই ধ্যান করব।

অন্যদিন বিবেকানন্দ পুজোর ঘরে বসেই ধ্যান করেন।
আজ ঠাকুরের শয়নঘরে প্রেমানন্দ পেতে দিলেন তাঁর ধ্যানের আসন ।চারদিকের দরজা জানালা সব বন্ধ করে দিতে বললেন স্বামীজি।

 *৪ঠা জুলাই বেলা এগারোটা*
=============
ধ্যান ভাঙলে ঠাকুরের বিছানা ছেড়ে গান গাইতে গাইতে বেরিয়ে এলেন তিনি --

মা কি আমার কালো,
কালোরূপা এলোকেশী
হৃদিপদ্ম করে আলো।

তরুন সন্ন্যাসীর রূপের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে গুরুভাইরা।

বেলা সাড়ে এগারোটার মধ্যেই দুপুরের খাওয়া সারতে বললেন বিবেকানন্দ। আজ নিজে একলা খাচ্ছেন না। খেতে বসলেন সবার সঙ্গে।

 *সকালবেলা বেলুড়ঘাটে জেলেদের নৌকো ভিড়েছিল। নৌকোভর্তি গঙ্গার ইলিশ। স্বামীজির কানে খবর আসতেই তিনি মহাউত্‍সাহে ইলিশ কিনিয়েছেন। তাঁরই আদেশে রান্না হয়েছে ইলিশের অনেকরকম পদ।*

গুরুভাইদের সঙ্গে মহানন্দে ইলিশ ভক্ষনে বসলেন বিবেকানন্দ।

 *তিনি জানেন, আর মাত্র কয়েকঘন্টার পথ তাঁকে পেরোতে হবে। ডাক্তারের উপদেশ মেনে চলার আর প্রয়োজন নেই। জীবনের শেষ দিনটা তো আনন্দেই কাটানো উচিত।*

'একাদশী করে খিদেটা খুব বেড়েছে। ঘটিবাটিগুলোও খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে।' বললেন স্বামীজি । *পেট ভরে খেলেন ইলিশের ঝোল, ইলিশের অম্বল, ইলিশ ভাজা।*

দুপুরে মিনিট পনেরো বিছানায় গড়িয়ে নিয়ে প্রেমানন্দকে বললেন, সন্ন্যাসীর দিবানিদ্রা পাপ। চল, একটু লেখাপড়া করা যাক। বিবেকানন্দ শুদ্ধানন্দকে বললেন‚ লাইব্রেরি থেকে শুক্ল যজুর্বেদটি নিয়ে আয়।
তারপর হঠাৎ বললেন‚ এই বেদের মহীধরকৃতভাষ্য আমার মনে লাগে না।

আমাদের দেহের অভ্যন্তরে মেরুদণ্ডের মধ্যস্থ শিরাগুচ্ছে‚ ইড়া ও পিঙ্গলার মধ্যবর্তী যে সুষুন্মা নাড়িটি রয়েছে‚ তার বর্ণনা ও ব্যাখ্যা আছে তন্ত্রশাস্ত্রে। আর এই ব্যাখ্যা ও বর্ণনার প্রাথমিক বীজটি নিহিত আছে বৈদিক মন্ত্রের গভীর সংকেতে। মহীধর সেটি ধরতে পারেননি।
বিবেকানন্দ এইটুকু বলেই থামলেন।

 *৪ঠা জুলাই দুপুর একটা থেকে চারটে*
==================
এই  তিনঘন্টা স্বামীজী লাইব্রেরী ঘরে ব্যাকরণ চর্চা করলেন ব্রহ্মচারীদের সঙ্গে।
তিনি পাণিনির ব্যাকরণের সূত্রগুলি নানারকম মজার গল্পের সঙ্গে জুড়ে দিতে লাগলেন।

ব্যাকরণশাস্ত্রের ক্লাস হাসির হুল্লোড়ে পরিণত হল।
ব্যাকরনের ক্লাস শেষ হতেই এক কাপ গরম দুধ খেয়ে প্রেমানন্দকে সঙ্গে নিয়ে বেলুড় বাজার পর্যন্ত প্রায় দু মাইল পথ হাঁটলেন।

এতটা হাঁটা তাঁর শরীর ইদানিং নিতে পারছে না। কিন্তু ১৯০২ এর ৪ ঠা জুলাইয়ের গল্প অন্যরকম। কোনও কষ্টই আজ আর অনুভব করলেন না।

বুকে এতটুকু হাঁফ ধরল না। আজ তিনি অক্লেশে হাঁটলেন।


 *৪ঠা জুলাই বিকেল পাঁচটা*
==============
মঠে ফিরলেন বিবেকানন্দ। সেখানে আমগাছের তলায় একটা বেঞ্চি পাতা। গঙ্গার ধারে মনোরম আড্ডার জায়গা। স্বামীজির শরীর ভাল থাকে না বলে এখানে বসেন না।আজ শরীর -মন একেবারে সুস্থ। তামাক খেতে খেতে আড্ডায় বসলেন বিবেকানন্দ।

 *৪ঠা জুলাই সন্ধে  ছটা*
=================
আড্ডা দিতে দিতে সন্ধ্যে সাড়ে ছ'টা হলো । সন্ন্যাসীরা কজন মিলে চা খাচ্ছেন। স্বামীজি এক কাপ চা চাইলেন।

 *৪ঠা জুলাই সন্ধ্যে ঠিক সাতটা।*
===============
শুরু হলো সন্ধ্যারতি। স্বামীজি জানেন আর দেরি করা চলবে না। শরীরটাকে জীর্ন বস্ত্রের মতো ত্যাগ করার পরমলগ্ন এগিয়ে আসছে।

তিনি বাঙাল ব্রজেন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন। ব্রজেন্দ্রকে বললেন , 'আমাকে দুছড়া মালা দিয়ে তুই বাইরে বসে জপ কর। আমি না ডাকলে আসবি না।'

স্বামীজি হয়তো বুঝতে পারছেন যে এটাই তাঁর শেষ ধ্যান।

 *৪ঠা জুলাই ঠিক সন্ধ্যে সাতটা পঁয়তাল্লিশ।*
=================
 স্বামীজি যা চেয়েছিলেন তা ঘটিয়ে দিয়েছেন। ব্রজেন্দ্রকে ডাকলেন তিনি। বললেন , জানলা খুলে দে। গরম লাগছে।
মেঝেতে বিছানা পাতা। সেখানে শুয়ে পড়লেন স্বামীজি। হাতে তাঁর জপের মালা।

ব্রজেন্দ্র বাতাস করছেন স্বামীজিকে। স্বামীজি ঘামছেন। বললেন , আর বাতাস করিসনে। একটু পা টিপে দে।

 *৪ঠা জুলাই রাত ন'টা দশ মিনিট*
================
স্বামীজি বাঁপাশে ফিরলেন। তাঁর ডান হাতটা থরথর করে কেঁপে উঠল। কুন্ডলিনীর শেষ ছোবল। বুঝতে পারলেন বিবেকানন্দ। শিশুর মতো কাঁদতে লাগলেন তিনি। দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। গভীর সেই শ্বাস। মাথাটা নড়ে উঠেই বালিশ থেকে পড়ে গেল। ঠোঁট আর নাকের কোনে রক্তের ফোঁটা। দিব্যজ্যোতিতে উজ্জ্বল তাঁর মুখ। ঠোঁটে হাসি,
 *চলে গেলেন ঠিক  রাত নটা  দশ মিনিট এ*

ঠাকুর তাঁকে বলেছিলেন , 'তুই যেদিন নিজেকে চিনতে পারবি সেদিন তোর এই দেহ আর থাকবে না।'

 *স্বামীজি বলেছিলেন , 'তাঁর চল্লিশ পেরোবে না।' বয়েস ঠিক উনচল্লিশ বছর পাঁচ মাস, চব্বিশ দিন।**

 *পরের দিন 5ই জুলাই ভোরবেলা।*
================

একটি সুন্দর গালিচার ওপর শায়িত দিব্যভাবদীপ্ত‚ বিভূতি-বিভূষিত‚ বিবেকানন্দ।
তাঁর মাথায় ফুলের মুকুট।
তাঁর পরনে নবরঞ্জিত গৈরিক বসন।

তাঁর প্রসারিত ডান হাতের আঙুলে জড়িয়ে আছে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি।
তাঁর চোখদুটি যেন ধ্যানমগ্ন শিবের চোখ‚ অর্ধনিমীলিত‚ অন্তর্মুখী‚ অক্ষিতারা।
নিবেদিতা ভোরবেলাতেই চলে এসেছেন।

স্বামীজির পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে অনবরত বাতাস করছেন।
তাঁর দুটি গাল বেয়ে নামছে নীরব অজস্র অশ্রুধারা।
স্বামীজির মাথা পশ্চিমদিকে।
পা-দুখানি পুবে‚ গঙ্গার দিকে।

শায়িত বিবেকানন্দের পাশেই নিবেদিতাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে সেই গুরুগতপ্রাণা‚ ত্যাগতিতিক্ষানুরাগিণী বিদেশিনী তপস্বিনীর হৃদয় যেন গলে পড়ছে সহস্রধারে।আজকের ভোরবেলাটি তাঁর কাছে বহন করে এনেছে বিশুদ্ধ বেদনা।
অসীম ব্যথার পবিত্র পাবকে জ্বলছেন‚ পুড়ছেন তিনি।
এই বেদনার সমুদ্রে তিনি একা।

নির্জনবাসিনী নিবেদিতা।
বিবেকানন্দের দেহ স্থাপন করা হল চন্দন কাঠের চিতায়।

 *আর তখুনি সেখানে এসে পৌঁছলেন জননী ভুবনেশ্বরী।*

চিৎকার করে কাঁদতে- কাঁদতে লুটিয়ে পড়লেন মাটিতে।*

কী হল আমার নরেনের ?
হঠাৎ চলে গেল কেন ?
ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয়।
আমাকে ছেড়ে যাসনি বাবা।
আমি কী নিয়ে থাকব নরেন ?
ফিরে আয়। ফিরে আয়।

সন্ন্যাসীরা তাঁকে কী যেন বোঝালেন।

তারপর তাঁকে তুলে দিলেন নৌকায়। জ্বলে উঠল বিবেকানন্দের চিতা।
মাঝগঙ্গা থেকে তখনো ভেসে আসছে ভুবনেশ্বরীর বুকফাটা কান্না। ফিরে আয় নরেন ফিরে আয়। ভুবনেশ্বরীর নৌকো ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।

তাঁর কান্না‚ ফিরে আয় নরেন‚ ফিরে আয়‚ ভেসে থাকল গঙ্গার বুকে।
নিবেদিতা মনে মনে ভাবলেন‚ প্রভুর ওই জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ডের এক টুকরো যদি পেতাম!

 *৫ই জুলাই সন্ধে ছটা।*
================

দাহকার্য সম্পন্ন হল। আর নিবেদিতা অনুভব করলেন‚ কে যেন তাঁর জামার হাতায় টান দিল। তিনি চোখ নামিয়ে দেখলেন‚ অগ্নি ও অঙ্গার থেকে অনেক দূরে‚ ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে তিনি‚ সেখানেই উড়ে এসে পড়ল ততটুকু জ্বলন্ত বস্ত্রখণ্ড যতটুকু তিনি প্রার্থনা করেছিলেন।

 নিবেদিতার মনে হল‚ মহাসমাধির ওপার থেকে উড়ে আসা এই বহ্নিমান পবিত্র বস্ত্রখণ্ড তাঁর প্রভুর‚ তাঁর প্রাণসখার শেষ চিঠি।
🙏🏼🙏🏼🙏🏼🙏🏼
(সংগৃহীত)






আ র ও  জানুন...... ৪ঠার  পর ________


※※  আজ স্বামীজীর শেষ  পূজা তোর হাতেই হোক ********************************


   ( স্বামীজীর  মহাপ্রয়াণের পর ৫ জুলাই১৯০২   )


    ৪ জুলাই ১৯০২ ----- রাত ৯ টার পরে নব্যভারতের মন্ত্রদ্রষ্টা শ্রীমৎ স্বামী বিবেকানন্দ ধ্যানযোগে মহাসমাধির আনন্দে চিরমগ্ন হয়েছেন | আষাঢ়ের ঘন-অন্ধকারে ধর্ম জগতের  উজ্জ্বল আলোক স্তম্ভের জীবন প্রদীপটি হঠাৎ নিভে গেল | এই দুঃসংবাদ পর দিন সকালে কলকাতা সহ ভারতের  সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল | আমাদের আহিরিটোলার বাড়ীতে স্বামীজীর শিষ্য কানাই মহারাজ ( স্বামী নির্ভয়ানন্দ ) এসে শোক-সংবাদটি জানিয়ে গেছেন | আমি তখন পাশে কোন ঠাকুর মন্দিরে পূজা করতে গিয়েছিলাম  |  ৯টায় বাড়ি ফিরে দেখলাম আমার মা শোকবিহ্বল হয়ে কান্নাকাটি করছেন | কারণ জিজ্ঞাসা করায়

 মা বললেন ,  ""  বাবা !  তোদের সর্বনাশ হয়ে
                     গেছে ----- মঠের স্বামীজী আর নেই  ,
         
দেহ রেখেছেন ,  আমাকে একবার
                      তাঁকে দেখালি না  !  ""

আমি বললাম ,  ""  মঠের সকল সাধুই "স্বামী" ,
                            তুমি কোন স্বামীজীর কথা
                            বলছো  ?  তুমি বোধ হয়
                                 ভুল  শুনেছো  | ""

 মা বলেন ,   ""  ওরে না ,  কানাই ভোরে এসে
                     খবর দিয়ে গেছে ------ বড় স্বামীজী
                       গতকাল রাত ৯টায় শরীর ছেড়ে
                       চলে গেছেন  |  কানাই তোদের
                      মঠে যেতে বলেছে  |  ""

ক্রন্দনরত মাকে আশ্বস্ত করে বললাম  ,  ""  সাধুর
                            দেহত্যাগে শোক করতে নেই | ""

 সেই সময়  বন্ধু নিবারণচন্দ্র ( শ্রীশ্রীমায়ের শিষ্য )  আসাতে তাকে ও আমর ভাই দুলালশশীকে নিয়ে  অফিসে না গিয়ে স্বামীজীকে শেষ দর্শন করার জন্য আহিরিটোলা ঘাট থেকে  নৌকায়  বেলুড় মঠে পৌঁছলাম বেলা দশটায় | তখন সামান্য বৃষ্টি হয়েছে |  দেখলাম পুজনীয় রাখাল মহারাজ ( স্বামী ব্রহ্মানন্দজী ) প্রমুখ কয়েকজন মহারাজ পশ্চিম দিকের নীচের বারান্দায় খাটে ফুল সাজাচ্ছেন |

 আমাদের দেখে শ্রীরাখাল মহারাজ কেঁদে ফেললেন , তাঁর বাক্য বের হলো না ----- হাত ইশারা করে উপরে যেতে ইঙ্গিত করলেন |

      উপরে   স্বামীজীর ঘরে পৌঁছে দেখলাম ------ একটি সুন্দর গালিচার উপর শয়ান স্বামীজীর মুখমণ্ডল  দিব্যভাবদীপ্ত , সমস্ত শরীর নতুন রং করা গেরুয়া বস্ত্রে  ঢাকা রয়েছে  |  ডানহাতে রুদ্রাক্ষের জপমালাটি  জড়িয়ে আছে | ঠিক ধ্যানমগ্ন  মহাদেবের মতো তাঁর চোখ দুটি অন্তর্মুখী  ও  অর্ধনিমীলিত  |  স্বামীজীর বাঁ দিকে ভগিনী  নিবেদিতা অশ্রুপূর্ণচোখে  স্বামীজীর মাথায় একভাবে  পাখার  বাতাস করছেন  | স্বামীজীর মাথাটি পশ্চিমদিকে ও পা দুখানি পূর্বদিকে গঙ্গারদিকে শয়ন করা | তাঁর পায়ের কাছে নন্দলাল ব্রহ্মচারী বিষাদ মৌনমুখে নীরবে বসে আছেন | আমরা তিনজনে মাথা নিচু করে স্বামীজীর পাদপদ্ম স্পর্শ ও প্রণাম  করে সেখানে বসলাম | স্পর্শ করে অনুভব করলাম স্বামীজীর দেহ বরফের মতোন ঠাণ্ডা হয়ে  গেছে |

         স্বামীজীর ডানহাতের আঙুলে রুদ্রাক্ষের মালার দানাগুলিতে আমি গুরুদত্ত মন্ত্র জপ করে নিলাম | ইতিমধ্যে অনেক ভক্ত স্বামীজীকে শেষ দর্শন করতে উপরে  এসেছেন ও  প্রণাম  করে  একে একে  চলে  যাচ্ছেন  | আমার জপ শেষ হলে নিবেদিতা আমাকে ডেকে চুপি চুপি বললেনঃ ------ ""  Can you sing , my friend  ?  Would you mind singing those  which our  Thakur  used to  sing  ?  ""

ঐ বিষয়ে আমার অক্ষমতা জানালে ,
 নিবেদিতা আবার অনুরোধ করলেন ,
       ""  Will  you  please request  your
              friend  on  my  behalf  ?   ""

তখন বন্ধু নিবারণ  প্রাণ খুলে কয়েকটি  গান  গাইলেন ,  ""  ১) যতনে হৃদয়ে রেখো  আদরিনী .শ্যামা মাকে  ,   ২) গয়াগঙ্গাপ্রভাসাদি কাশী কাঞ্চি কেবা চায়  |  ৩) কে বলে  শ্যামা  আমার  কালো  , মা যদি কালো তবে কেন আমার হৃদয় করে আলো  ,  ৪)  মজলো আমার মন ভ্রমরা , শ্যামাপদ নীলকমলে  ,  ৫ )  মন আমার কালী কালী বলনা ,  কালী কালী বললে পরে , কালের ভয় আর রবে না    ইত্যাদি

       আকুল আগ্রহভরে সুমধুর  গান  শুনতে  শুনতে বিষণ্ণ ভগিনী নিবেদিতার অন্তর থেকে বেদনার স্রোত বুক ফেটে বেরিয়ে এসে  চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রু নির্গত হতে লাগল | এই দৃশ্যটি বড় করুণ , অবিস্মরণীয় ------ এই স্মৃতিটুকু তো ভুলবার নয় |  যদিও স্রোতের মতো  ৪৫টা বছর চলে গিয়েছে |  তবুও সেই স্মৃতি আজও আমাদের মনে সোনার অক্ষরে লিখিত আছে

※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※※

      বেলা প্রায় একটার সময় শ্রীশরৎ মহারাজ ( স্বামী সীরদানন্দজী ) দোতলায় স্বামীজীর ঘরে এসে আমাদের তিনজন ও ব্রহ্মচারীকে ডেকে বললেন ,  ""  বাবা !  স্বামীজী চলে যাওয়াতে
                        আমরা ভেঙে পড়েছি |
                    ------ আমাদের বল টুটে গেছে  |
                      তোরা  সকলে  ধরাধরি করে
                         স্বামীজীর দেহটি নিচে নামিয়ে
                         আনতে পারবি  ?  ""

তৎক্ষণাৎ  আমরা তিনজন গৃহিভক্ত ও নন্দলাল ব্রহ্মচারীজি স্বামীজীর দেহটি বহন করে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে এসে বারান্দায় রাখা পুষ্পসজ্জিত খাটটিতে শুইয়ে দিলাম |  সেইসময় কয়েকটি বেদানা , আপেল , ন্যাসপাতি , আঙুর স্বামীজীর বুকের উপর সাজিয়ে দেওয়া হলো |

তখন বুড়োগোপালদাদা ( স্বামী অদ্বৈতানন্দজী ) ব্রহ্মচারীকে বললেন ,  ""   ওরে  নন্দলাল  !
                         আমাদের চেয়ে স্বামীজী তোকেই
                       বেশি ভালোবাসতেন |  আজ  তাঁর
                       শেষ  পুজো তোর হাতেই হোক্  |  ""

 এই প্রস্তাব শ্রীরাখাল মহারাজ ও অন্যান্য মহারাজও অনুমোদন করায় , নন্দলাল স্বামীজীকে ফুল-মালা এবং নানা ফলাদি  মিষ্টান্ন প্রভৃতি নিবেদনের পর আরতি করে স্তোত্রপাঠ করলেন |  এই সময়  স্বামীজীর শেষ ফটো তোলার প্রস্তাব হলে ,
শ্রীরাখাল মহারাজ (স্বামী ব্রহ্মানন্দজী )
 বলেন ,  ""  স্বামীজীর কত রকমের ভাল
                   ফটো রয়েছে , এই বিষাদ মাখা
               ছবি সকলের হৃদয়কে বিদীর্ণ করবে  | ""

 তারপর শ্রীরাখাল মহারাজ প্রমুখ সন্ন্যাসীবৃন্দ ও ব্রহ্মচারীরা একে একে স্বামীজীর শ্রীচরণে পুষ্পাঞ্জলি প্রদান করলেন |  পরে  স্বামীজীর বন্ধু হরমোহন ও অন্যান্য গৃহিভক্তরাও পুষ্পাঞ্জলি দিলেন | পরে স্বামীজী চরণতলে আলতা মাখিয়ে  পায়ের ছাপ রাখা হলো | ভগিনী নিবেদিতাও একটি রুমালে স্বামীজীর চরণের ছাপ তুলে নিলেন | একটি ফুটন্ত " মার্শাল নীল " জাতীয় গোলাপ  ফুলে  চন্দন মাখিয়ে স্বামীজীর চরণতলে বুলিয়ে আমার বুকপকেট রাখলাম |

         স্বামীজীর পূজাদি কার্য শেষ হলে শ্রীশরৎ মবারাজ আমাদের চারজনকেই  পালঙ্কটি বহন করে যেখানে অগ্নিসংস্কার করা হবে সেখানে নিয়ে যেতে অনুমতি দিলেন | আমরা তাই করলাম , বাকি সকলে পিছে পিছে আসতে লাগলেন |  সেইদিন পূর্বেই বৃষ্টি হওয়াতে মঠ প্রাঙ্গন পিচ্ছিল হওয়ায় অতি সাবধানে বহন করে পূর্বে সজ্জিত চন্দন কাঠের চিতার উপরে স্থাপন করা হলো  |

 তারপর শ্রীশরৎ মহারাজ
উপস্থিৎ সকলকে বললেন ,  ""  তোমরা     বাণ্ডিল পাঁকাঠি আগুন  ধরিয়ে এই বেদিকে
                                      সাতবার প্রদক্ষিণ  করে
                                      শেষে খাটের নিচে
                         স্বামীজীর পায়ের তলায় জ্বলন্ত
                  আগুন রেখে প্রণাম করে চলে এস  |  ""

     তাঁর আদেশ মতো স্বামীজীর শরীরকে চন্দন কাঠে অগ্নি সংযোগ করে জ্বলন্ত চিতাকে বেষ্টন করে ভক্তেরা পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল |  চিতার আগুন ক্রমশ লেলিহমান হয়ে  উর্ধমুখী অনেকগুলি  জিহ্বা বের করে ধূ ধূ করে জ্বলতে লাগল  |  সেসময়  মহাকবি গিরিশ ঘোষ , মাস্টার মহাশয় মহেন্দ্র গুপ্ত , শাঁখচুন্নী ( অক্ষয় কুমার সেন ) , জলধর সেন , বসুমতীর উপেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি ভক্তেরা বেলতলার কাছে রকে বসে এই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখতে লাগলেন |

               গিরিশবাবু তো ভগ্নহৃদয়ে
         চিৎকার করে বলতে লাগলেন ,

                 ""  নরেন ! কোথায় তুমি বেঁচে থেকে
                    আমার কথা লোকের কাছে বলে
                        ঠাকুরের মহিমা প্রচার করবে -------
                       কিন্তু সে সাধে পোড়া বিধি হলো
                          বাদী , আমি  বুড়ো বেঁচে  রইলুম
                  তোমার এই দৃশ্য দেখবার  জন্য  ?
                        তুমি  তো  ঠাকুরের  ছেলে  ,
                     ঠাকুরের  কোলে  গিয়ে  উঠলে  ,
                    বল  দেখি  এখানে  আমাদের কি
                          দশায় ফেলে অকালে চলে
                              গেলে  ?  নিশ্চয়ই  আমাদের
                               কপাল  ভেঙ্গেছে  |  ""

এই কথা শুনে নিবেদিতা শোকচ্ছাস চেপে রাখতে পারলেন না | তিনি জ্বলন্ত চিতার কাছে গিয়ে চারদিক ঘুরতে লাগলেন |  পাথে তাঁর গাউনে আগুন লাগে , তাই মহারাজজীর নির্দেশে কানাই মহারাজ নিবেদিতার হাত ধরে দূরে গঙ্গার ধারে নিয়ে গিয়ে বসালেন ও  সাহস দিতে লাগলেন  | স্বামীজীর নারায়ণী শরীরটির নিম্নাংশ অনুকুল বায়ুর প্রভাবে অল্প সময়েই ভস্মিভুত হলো  |  কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় , তাঁর বুকে , মুখে মাথায় আগুন  স্পর্শ না করায় সেই মুখভঙ্গি , আয়ত চোখ দুটির দৃষ্টি কী সুন্দর দেখাতে লাগল |  স্বামীজীর সন্ন্যাসী শিষ্য শ্রীনিশ্চয়ানন্দ নিকটের একটি গাছে উঠে শুকনো কাঠ সংগ্রহ করে জ্বলন্ত চিতার উপর সাজিয়ে দিতে লাগলেন |

     এই সময় শ্রীরাখাল মহারাজ আমাকে একটু তফাতে নিয়ে একটি দশটাকার নোট দিয়ে

 বললেন , ""  তুমি নিবারণকে সঙ্গে নিয়ে
                            গিরিশবাবুর নৌকায় ওপারে
                           বরানগর বাজার থেকে কিছু
                          সন্দেশ ও খাবার কিনে আনো |   
 কাল  রাত্তির থেকে সাধুরা কেউজল মুখে দেয় নি ------ আরউপস্থিৎ অনেক ভক্তদেরওখাওয়া হয় নি |  ""

 মহারাজের কথা মতো কাজ করতে যেতে দেখে বরানগরের এক ভক্ত বিপিন সাহা আরও পাঁচ টাকা দিয়ে আমাদের সঙ্গে ওপারে গিয়ে গরম লুচি , কচুরী ও সন্দেশ নিয়ে ঝুড়ি নিজের মাথায় বহন করে আমাদের সঙ্গে মঠে ফিরলেন |  এসে দেখলাম চিতা নিভিয়ে স্বামীজীর দেহাবশেষ সংগ্রহ করে সন্ন্যাসী ও ভক্তরা স্নান করে গঙ্গায় তর্পণ  করছেন |
 
             মাস্টার মহাশয় ( শ্রীম )আমাকে বললেন ,  ""  তুমি শব ছঁয়েছো ,  স্নান তর্পণ কর |   "" 

একথায় আমি বললাম ,   ""  সাধু  নারায়ণ  -------
                                   সেই নারায়ণী দেহ স্পর্শ
                        করাতে আমি অপবিত্র হয়েছি  ?
                       এই কাপড়েই  মহারাজের  আদেশে
                         ঠাকুরের ভোগের জিনিস বহন
                                 করে এনেছি  |  ""

আমার মনের ভাব বুঝতে পেরে স্বামী প্রেমানন্দজী বললেন  ,  ""  তোমার স্নান
                                       করবার  দরকার নেই  ,
                                   তোমার  মাথায়  গঙ্গাজল
                                  দিলুম  ,  ঠাকুরঘরে  খাবার
                                রেখে  এসে  তুমি  গঙ্গায়
                  স্বামীজীকে  তর্পণ  অঞ্জলি  দাও | ""
সমস্ত দিনের পর ঠাকুরের এই প্রথম  সান্ধ্য-জলপানি   ভোগ  ও. আরতি  হয়ে  গেলে  নিচের  তলায়  সংবেত  সাধু ও  ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে চা , সরবৎ এবং প্রসাদ  বিতরিত হল  |
 স্বামীজীর  অন্তিম ইচ্ছাপূরণেরজন্য ৪ জুলাইয়ের পরদিনের অমাবস্যাতে রাতে বেলুড়মঠে শ্রীশ্রীকালীপূজা অনুষ্ঠান | বাইরের কাউকেই আমন্ত্রণ করা হয়নি  |কেবল স্বামীজীর ছোটভাই ভূপেন্দ্রনাথ মহাশয় এসেছিলেন |  মাখন মহারাজ নিবারণ ও আমাকে হোমের জন্য পনের সের বেল কাঠ আনার আদেশ দিলেন | সেই নির্দিষ্ট তিথিতে শনিবার বিকালে আমরা দুজন ঐ বেলকাঠ বহন করে আনলে মহারাজজী খুশী হয়ে উচ্চারণ করেন ,

  ""   চন্দ্রশেখর চন্দ্রশেখর চন্দ্রশেখর পাহি মাম্  |
        চন্দ্রশেখর চন্দ্রশেখর চন্দ্রশেখর রক্ষ মাম্  ||

    বাঁচালে বাবা  !  আজ এমন ঝড় বৃষ্টি দূর্যোগে শুকনো বেলকাঠ এনেছো  ----- মা তোমাদের মঙ্গল করুন  |  ""

      রাত দশটার পরে দোতলায় ঠাকুরঘরে শ্রীশ্রীকালী পূজা আরম্ভ হলো |  রামকৃষ্ণানন্দজীর পিতা প্রাচীন তান্ত্রিক সাধক  ঁঈশ্বরচন্দ্র চক্রবর্তী  মহাশয়  পূজকের আসন গ্রহন করেন  |  সাধূ  ব্রহ্মচারীরা  ঠাকুর  প্রণাম করে স্বামীজীর ঘরে  গিয়ে  বসলেন | সেদিন রাতে প্রসাদ পাবার পর আমরা তিনজন মঠেই থাকলাম  | রাত্রে মধ্যে মধ্যেই স্বামীজীর বৃদ্ধ শিষ্য নিত্যানন্দ স্বামীর সকরুণ  ক্রন্দন ধ্বনিতে  বেলুড় মঠ যেন মুখরিত হয়ে উঠল | রাত তিনটার পরে শ্রীশরৎ মহারাজ আমাদের জাগিয়ে উপরের ঠাকুর ঘরে যেতে বললেন |  উপরে ঠাকুর ঘরে গেলে  মহারাজজী আমাকে আচমন করে কিছুক্ষণ জপ করতে বললেন | কিছু পরে মহারাজজীর আদেশে সকলে নিচে বিরাট হোমকুণ্ডের চারদিকে বসে জপ করতে লাগলাম |  হোমক্রিয়া শেষ হলে যেখানে স্বামীজীর দেহ দাহ হয়েছে , সেখানে এসে সাতবার প্রদক্ষিণ করে প্রণাম করলাম এবং বেলতলায় বসে জপ করে ফিরে এসে ঠাকুর ঘরে প্রণামের পরে প্রসাদ গ্রহণ করলাম |

※※※ জয় স্বামীজী মহারাজজী কী জয় |
প্রণাম নাও হে অমর-আত্মা,ভারত-আত্মা স্বামীজী***

                       
                        ※※※※※
                     ※※※※※※※
                  ※※※প্রণাম※※※
               ※※※※※※※※※※※※
             ※※※※ভালবাসা※※※※
            ※※※※※※※※※※※※※※※※
           ※※※※※※※জানাই※※※※※※
           ※※※※※※※※※※※※※※※※※※
           ※※※※※※ বুদ্ধদেব ※※※※※※
           ※※※※※※※※※※※※※※※※※
            ※※※※※※※※※※※※※※※
            ※※※※※※※※※※※※
             ※※※※※※※※※※※※
               ※※※※※※※※※※※
                ※※※※※※※※※※※
                 ※※※※※※※※※※※
                  ※※※※※※※※※※
                   ※※※※※※※※※
                    ※※※※※※※※
                     ※※※※※※※
                       ※※※※※※
                        ※※※※※
                         ※※※※
                         ※※※
                        ※※







বিবেকানন্দর মায়ের দুঃখের জীবনি.....


শ্রীমতী ভুবনেশ্বরী দাসী। জগতবিখ্যাত সন্ন্যাসী বিবেকানন্দর জননী।
১৮৪১ সালে অভিজাত পরিবারে জন্ম। ছেলেবলায় মেমের কাছে ইংরাজি শিখেছিলেন। শিশু নরেন জননীর কাছেই প্রথম ইংরাজির পাঠ নেন। পরবর্তী কালে বিবেকানন্দর বিদেশি ভক্তদের সঙ্গে ইংরাজি তে কথাও বলেছেন। চরিত্রগুণে ছিলেন মহীয়সী। আর আক্ষরিক অর্থেই ছিলেন সর্বংসহা। এত সহ্যশক্তির পরীক্ষা ঈশ্বর আর কারোর কাছে নিয়েছেন কিনা জানিনা।

আদরে ও ঐশ্বর্যে লালিত বাবা মার একমাত্র সন্তান ভুবনেশ্বরীর সারা জীবন শুধু দুঃখের কাহিনী। দশ বছর বয়সে বিয়ে। ছটি কন্যা ও চার পুত্রের জননী। অতি অল্প বয়সে বৈধব্য। অপরিসীম অভাব। তারপর কখনো আদরের কন্যাদের আত্মহনন, প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানের সন্ন্যাসী হয়ে যাওয়া। শরিকি মামলায় বিপর্যস্ত হয়ে স্বামীর ভিটে থেকে বিতাড়ন এবং প্রায় কপর্দকশূন্য হয়ে পড়া। 

দুর্ভাগ্যের এখানেই শেষ নয়। মধ্যমপুত্র মহেন্দ্রনাথ নিখোঁজ, কনিষ্ঠ ভূপেন্দ্রনাথ ইংরেজের বিরুদ্ধাচার করে জেলে এবং শেষ অব্দি মায়ের শেষ সম্বল গয়নাগুলো বেচে মার্কিন দেশে যাত্রা। এতকিছু নীরবে সহ্য করে নিঃসহায় অবস্থায় বিধবা মায়ের আশ্রয়ে জীবনের বাকী দিনগুলো কাটান।

১৯১১ সালের ২৫ শে জুলাই  মেনিনজাইটিস রোগে মৃত্যু। শেষকৃত্যে শ্মশানে উপস্থিত ছিলেন মেজছেলে মহেন্দ্রনাথ ও সিস্টার নিবেদিতা। কনিষ্ঠ ভূপেন্দ্রনাথ তখন আমেরিকায় নির্বাসিতের জীবন যাপন করছেন। আর বিশ্ববন্দিত সন্ন্যাসীপুত্র বিবেকানন্দ ন'বছর আগেই মহাসমাধিতে মগ্ন।

নীচে একটি ছবি দিলাম। নির্মম দারিদ্র্য, বিচ্ছেদ, আত্মীয়দের অপমান ও পুত্রকন্যা র অকালমৃত্যুতে শোকজর্জরিত বিবেকানন্দজননীর এই হৃদয়বিদারক ছবিটি ছেপেছিলেন ব্রহ্মানন্দ উপাধ্যায়, সন ১৩১৪ র বৈশাখ সংখ্যায়, স্বরাজ পত্রিকায়। 
ক্যাপশনে লেখা ছিল নিম্নরুপে...

"নরেন্দ্রর মাতার চিত্রও দিলাম। নরেন্দ্রর মাতা রত্নগর্ভা।.... আহা- মায়ের ছবিখানি দেখ-দেখিলে বুঝিতে পারিবে যে নরেন্দ্র মায়ের ছেলে বটে---আর মাতা ছেলের মা বটে "





আজকের দিনে ২৫ জুলাই,১৯১১ স্বামীজীর মা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে অমৃতলোকে যাত্রা করেন  |প্রণাম গ্রহণ করুন বীরেশ্বর বিবেকানন্দের মা ভূবনেশ্বরী দেবী।
   এই প্রসঙ্গে খেতড়ি মহারাজকে লেখা স্বামীজীর একটি চিঠি মায়ের জন্য----
১ ডিসেম্বর,১৮৯৮, মঠ, বেলুড়, হাওড়া
মহারাজা,
আপনার তারবার্তা আমায় যে আনন্দ দিয়াছে তাহা বর্ণনাতীত| এমন বার্তা আপনার মত মহান ব্যক্তিরই যোগ্য |আমি কি চাই তাহা বিশদভাবে লিখিলাম |
কলকাতায় একটি ছোটখাটো বাড়ী নির্মাণের নুন্যতম খরচ আনুমানিক দশ হাজার টাকা |সংসার খরচের জন্য মাসিক একশত টাকা আপনি যে আমার মাকে পাঠাইয়া থাকেন তাহা তাঁহার পক্ষে যথেষ্ট | যদি আমার জীবদ্দশা পর্যন্ত আমার ব্যায় নির্বাহের জন্য আরও একশত টাকা পাঠাইতে পারেন তবে আমি বড়ই খুশী হইব ;কিন্তু এই বাড়তি একশত টাকা আপনাকে খুব বেশী দিন বহন করিতে হইবে না কেননা আমি বড়জোর আর দু-এক বৎসর বাঁচিব |আমি আর একটি ভিক্ষা এখানে চাহিব |মায়ের জন্য একশত টাকার সাহায্যটি সম্ভব হইলে আপনি স্হায়ী রাখিবেন | মহারাজা যেন সাধুর দুঃখী বৃদ্ধা মাতার প্রতি এই করুণা বর্ষণ করেন|••••••••••••••
যে -জগন্মাতার লীলা-খেলা এই বিশ্বচরাচর,যাঁহার হাতে আমরা যন্ত্রমাত্র----তিনি যেন আপনাকে সকল অমঙ্গল হইতে রক্ষা করেন |
ভগবানের নামে চিরদিন আপনার ----
বিবেকানন্দ





স্বামীজীর ধীরা মাতা ---Mrs.Ole Bull


          বর্তমান বেলুড়মঠ নির্মাণের জন্য একটা বিশাল অঙ্কের টাকা দিয়েছিলেন, এই মহিলা। বিবাহের দশ বছর পরেই তার স্বামীর মৃত্যু হয় ।

এর ১৪ বছর পর স্বামীজীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় |স্বামীজী বলেছেন Most Spiritual Women.
জন্মসূত্রে অগাধ ঐশ্বর্যের অধিকারিণী হয়েও জাগতিক সুখ বিমুখ ছিলেন ।এঁর একমাত্র কন্যার নাম ওলিয়া |  ইনি মৃত্যুর আগে উইল করে যান যার একটা বড় অংশই শ্রীরামকৃষ্ণ ভাবাদর্শের উদ্দেশ্যে দান করেছিলেন ।

মামলা করেছিলেন,মেয়ে ওলিয়া মৃতা মায়ের উইলের যথার্থতা নিয়ে।

কিন্তু মামলায় তার পরাজয় হয় আর ওলিয়ার মৃত্যুও হয় মামলার রায় যেদিন প্রকাশিত হয়, সেদিনই আকস্মিকভাবে ।

শ্রীরামক়ষ্ণ মিশনে তিনি Saint Sara নামে পরিচিত | 

বাইরের ঘটনা সবসময় কোন মানুষের সঠিক পরিচয় দেয় না।জীবনের উচ্চতম আদর্শকে সামনে রেখে তিলে তিলে নিজেকে উৎসর্গ করেছেন যে রমণী, তিনিই স্বামীজীর ধীরামাতা --- শ্রীমতী সারা চ্যাপম্যান বুল |




🔴🔴🔴🔴🔴   মহাপ্রাণ   স্বামীজী   🔴🔴🔴🔴🔴  

                 বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে বেদ বেদান্তের গভীর আলোচনায় মেতে রয়েছেন স্বামীজী তাঁর শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে নিয়ে ।  এমন সময় সেখানে হাজির হলেন ভক্তভৈরব গিরিশচন্দ্র ঘোষ ।  গিরিশবাবুর দিকে তাকিয়ে স্বামীজী বললেন, " কি জি. সি., এ-সব তো কিছু পড়লে না, কেবল কেষ্টু-বিষ্টু নিয়েই দিন কাটালে । "  গিরিশবাবু বললেন, " কি আর পড়ব ভাই ?  অত অবসরও নেই, বুদ্ধিও নেই যে, ওতে সেঁধুব ।  তবে ঠাকুরের কৃপায় ও-সব বেদবেদান্ত মাথায় রেখে এবার পাড়ি মারব ।  তোমাদের দিয়ে তাঁর ঢের কাজ করাবেন বলে ও-সব পড়িয়ে নিয়েছেন, আমার ও-সব দরকার নেই । "  এ কথা বলে গিরিশবাবু প্রকাণ্ড ঋগ্বেদ গ্রন্থখানিকে বারবার প্রণাম করে বলতে লাগলেন ------ " জয় বেদরূপী শ্রীরামকৃষ্ণের জয় । "
                  এবার স্বামীজীর দিকে তাকিয়ে গিরিশবাবু বলে উঠলেন, " হাঁ, হে নরেন, একটা কথা বলি ।  বেদবেদান্ত তো ঢের পড়লে, কিন্তু এই যে দেশে ঘোর হাহাকার, অন্নাভাব, ব্যভিচার, ভ্রূণহত্যা, মহাপাতকাদি চোখের সামনে দিনরাত ঘুরছে, এর উপায় তোমার বেদে কিছু বলেছে ?  ঐ অমুকের বাড়ির গিন্নি, এককালে যার বাড়িতে রোজ পঞ্চাশখানি পাতা পড়ত, সে আজ তিন দিন হাঁড়ি চাপায়নি ;  ঐ অমুকের বাড়ির কুলস্ত্রীকে গুণ্ডাগুলো অত্যাচার করে মেরে ফেলেছে ;  ঐ অমুকের বাড়িতে ভ্রূণহত্যা হয়েছে, অমুক জোচ্চুরি করে বিধবার সর্বস্ব হরণ করেছে ------- এ-সকল রহিত করবার কোন উপায় তোমার বেদে আছে কি ? "   গিরিশবাবু এভাবে সমাজের বিভীষিকাময় ছবিগুলো চোখের সামনে তুলে ধরাতে স্বামীজী নির্বাক হয়ে রইলেন ।  জগতের দুঃখকষ্টের কথা ভাবতে ভাবতে স্বামীজীর চোখে জল এল ।  মনের ভাব কাউকে জানতে দেবেন না বলে তাড়াতাড়ি উঠে বাইরে চলে গেলেন ।
                     গিরিশবাবু শিষ্যকে লক্ষ্য করে বললেন, " দেখলি বাঙাল, কত বড় প্রাণ !  তোর স্বামীজীকে কেবল বেদজ্ঞ পণ্ডিত বলে মানি না ;  কিন্তু ঐ যে জীবের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গেল, এই মহাপ্রাণতার জন্য মানি ।  চোখের সামনে দেখলি তো মানুষের দুঃখকষ্টের কথাগুলো শুনে করুণায় হৃদয় পূর্ণ হয়ে স্বামীজীর বেদবেদান্ত সব কোথায় উড়ে গেল ! "


🔴🔴🔴🔴জয়  স্বামীজী  🔴🔴🔴🔴






১৮৬৩ সালের পৌষ সংক্রান্তি কৃষ্ণা সপ্তমী তিথিতে কলকাতায় সিমুলিয়ায় দত্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম বিশ্বনাথ দত্ত, জননীর নাম ভুবনেশ্বরী দেবী।

১৮৬৩ সালের ১২ই জানুয়ারী পৌষ সংক্রান্তির পুণ্যপ্রভাতে সূর্যোদয়ের ৬ মিনিট  পূর্বে, ৬ টা ৩৩ মিনিট ৩৩ সেকেন্ডে দেবী ভুবনেশ্বরী বিশ্ববিজয়ী পুত্রের  জন্ম দিয়েছিলেন।

বিশ্বনাথ দত্ত ও ভুবনেশ্বরী দেবীর মোট দশটি সন্তান-- 
 ১) পুত্র শৈশবে মৃত। 
 ২) কন্যা শৈশবে মৃত। 
 ৩) হারামণি ২২ বৎসর জীবিত ছিলেন। 
 ৪) স্বর্ণময়ী ৭২ বৎসর জীবিত ছিলেন। 
 ৫) কন্যা শৈশবে মৃত। 
 ৬) নরেন্দ্রনাথ ৩৯ বৎসর ৫ মাস ২৪ দিন জীবিত ছিলেন। 
 ৭) কিরণবালা ১৬ বৎসর জীবিত ছিলেন। 
 ৮) যোগীন্দ্রবালা ২২ বৎসর জীবিতছিলেন। 
 ৯) মহেন্দ্রনাথ ৮৭ বৎসর জীবিত ছিলেন। 
 ১০) ভূপেন্দ্রনাথ ৮১ বৎসর জীবিত ছিলেন।

বিরজাহোম করে সন্ন্যাসগ্রহণ কালে নরেন্দ্রনাথের নতুন নাম হয় বিবিদিষানন্দ।  পরিব্রাজক জীবনে তিনি সচ্চিদানন্দ ও বিবেকানন্দ নামও ব্যবহার করেছেন।  শেষোক্ত নামেই তিনি বিশ্ববিখ্যাত হন।

ॐ নমঃ শ্রীযতিরাজায় বিবেকানন্দসূরয়ে ।
 সচ্চিৎ সুখস্বরূপায় স্বামিনে তাপহারিণে ।।


শ্রীমান্, সন্ন্যাসিরাজ, সচ্চিদানন্দস্বরূপ, ত্রিতাপহারী, সর্বজ্ঞ স্বামী বিবেকানন্দকে প্রণাম করি।




#আমি_কচুরি_সম্প্রদায়ভুক্ত_সন্ন্যাসী !
স্বামী বিবেকানন্দ।


বাঙালি মানেই ভোজনরসিক। সেই তালিকায় মধ্যে রয়েছেন বহু মনিষীও। নেতাজীর যেমন লক্ষ্মীনারায়ণের চপ না হলে রাজনৈতিক মিটিং জমত না। রবীন্দ্রনাথ আবার তিনি খান আর নাই খান তাঁর পাতে বিভিন্ন ধরনের খাবার সাজানো রয়েছে এটা দেখতে পছন্দ করতেন। রামকৃষ্ণদেব আবার সারদামণির হাতের ভাত আর ঝোলেই তৃপ্তি পেতেন। তাঁরই শিষ্য বিবেকানন্দ, তিনি আবার কচুরি খেতে খুব পছন্দ করতেন।

কলকাতার বিভিন্ন দোকান থেকে তিনি কচুরি আনিয়ে তো খেতেন। লন্ডনে তাঁকে কে বানিয়ে দেবে কচুরি তরকারি ? তোয়াক্কা করতেন না। বিদেশে বাড়ির বেসমেন্টে বসেই বানিয়ে ফেলতেন। তারপর তৃপ্তি করে তা উদরস্থ করতেন। ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছেন স্বামীজি। পথে এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞাসা করে বসে, “আচ্ছা, আপনি কোন সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসী? পুরী না গিরি?” বিবেকানন্দ বরাবরই কথার প্যাঁচে পটু ছিলেন। তাঁর অসাধারন উত্তরে কাবু প্রশ্নকর্তা। তিনি বলেন, ” পুরী গিরি দুটোর কোনোটাই না, আমি কচুরি সম্প্রদায়ভুক্ত।” এমনই ছিল তাঁর কচুরি প্রেম।

মৃত্যুর দিনেও স্বামী বিবেকানন্দ দুপুরে ভাত আর ইলিশ মাছের ঝোল খেয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন যে “একাদশীতে না খেয়ে পেটটা কেমন হয়ে গিয়েছিল। স্বস্তি পেলাম।” কিন্তু সব কিছু ছাড়িয়ে তাঁর খাদ্য তালিকায় সবার উপরে থাকত কচুরি আর তরকারি। এটা না খেলে তাঁর দিন যেত না। সমস্ত মায়া ত্যাগ করা মানুষটির কচুরি দেখলে লোভ সংবরন করতে মুশকিলে পড়তেন। কচুরি-আলু ছেঁচকি বানানোর কেউ না থাকলে নিজেই বানিয়ে খেয়ে নিতেন। এর প্রতি স্বামীজির দুর্বলতা মারাত্মক ছিল।

শুধু খাওয়া নয় রান্না করতেও ভালোবাসতেন। মাংসের নানা পদ তাঁর প্রিয় ছিল। ফাউল ছিল তার মধ্যে অন্যতম। শিকাগো যাত্রার আগে তৎকালীন বোম্বাইতে স্বামীজি ১৪ টাকা খরচ করে এক হাঁড়ি পোলাও রান্না করে শিষ্যদের খাইয়েছিলেন। কই মাছের তরকারি তাঁর প্রিয় খাবারের আরও একটি।

তখন তিনি শুধুই নরেন্দ্রনাথ দত্ত। পড়াশোনা করছেন। পেটুক এবং খাদ্যরসিক বন্ধুদের নিয়ে তৈরি করেছিলেন ‘পেটুক সংঘ’। তাদের কাছে ঘোষণা করেন, “দেখবি কলকাতা শহরে গলির মোড়ে মোড়ে পানের দোকানের মতো চপ-কাটলেটের দোকান হবে।” এখন সত্যি শহরের প্রত্যেক মোড়ে একটি অন্তত চপ বা তেলেভাজার দোকান থাকেই। কিছু না হোক মিষ্টির দোকানের শিঙারা তো পাওয়াই যায়। খেতে পছন্দ করতেন রসগোল্লা এবং আইসক্রিমও।


স্বামীজির আমেরিকায় থাকাকালীন প্রাতঃরাশের তালিকাও ছিল বেশ লম্বা। প্রথমেই খেতেন কমলালেবু এবং আঙুর। এরপরেই খেয়ে নিতেন ডবল ডিমের পোচ। এরপরে দুই পিস টোস্ট এবং ক্রিম ও চিনি সহকারে দুই কাপ কফি। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার মধ্যে স্যুপ এবং মাংস বা মাছের সঙ্গে রাতের আহার সেরে নিতেন। এরপর কোনও একটি মিষ্টির পদ থাকতই। আর প্রত্যেকবার খাবার শেষে ধূমপান ছিল অতি আবশ্যক।






স্বামী বিবেকানন্দের বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্ববঙ্গ) ভ্রমনের একাংশ:


১৯০১ সালের ১৮ মার্চ জলপথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হন সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ। ভ্রমণসঙ্গী ছিলেন তাঁর মা ও কয়েকজন বন্ধু। পরবর্তীতে কিছু আত্মীয় স্বজনও এসে যুক্ত হন তাদের সাথে । পূর্ববঙ্গে তিনি ১৫ দিনের বেশি অবস্থান করেছিলেন এবং ঢাকায় দুটি ভাষনও প্রদান করেন৷ 

জগন্নাথ কলেজে প্রদত্ত প্রথম ভাষণের শুরুতে বলেন, "আমি নানা দেশ ভ্রমণ করেছি-কিন্তু আমি কখনো নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশ বিশেষভাবে দর্শন করিনি। জানতাম না, এ দেশের জলে স্থলে সর্বত্র এত সৌন্দর্য ;কিন্তু নানা দেশ ভ্রমণ করে আমার এই লাভ হয়েছে যে, আমি বাংলার সৌন্দর্য বিশেষভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।"

ঢাকায় অবস্থানকালে তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা জানিয়ে লন্তনে অবস্থানরত মিসেস ওলি বুলকে স্বামীজি দুটি চিঠি পাঠান (২০ মার্চ ও ২৯ মার্চ)। আমার প্রিয় মা সম্বোধন করে তিনি লেখেন,

" শেষ পর্যন্ত আমি পূর্ব বাংলায় এসেছি। এখানে আমি এবারই প্রথম এবং কখনো জানতাম না বাংলা এত সুন্দর। এখানকার নদীগুলো আপনার দেখা উচিৎ - নিয়মিত পরিষ্কার জলের প্রবাহ এবং সবকিছু এত সবুজ। গ্রামগুলো সমগ্র ভারতের মধ্যে সবচেয়ে পরিষ্কার ও সুন্দর।"

ঢাকার জীবন সম্পর্কে লিখেছেন, " I am peaceful and calm. I'm finding every day the old begging and trudging life is the best for me after all."

দ্বিতীয় চিঠিতে লেখেন," এখানে ব্রহ্মপুত্র নদে বিরাট একটি পবিত্র স্নান আছে। যখনই গ্রহ-নক্ষত্রের সংযোগ হয়, যা খুবই কদাচিৎ  হয়ে থাকে,তখনই নদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে বিশাল লোকের সমারোহ হয়ে থাকে। এবছর এখানে হাজার হাজার লোকের সমারোহ হয়েছিল; মাইলব্যাপী নদটি নৌকাদ্বারা পরিপূর্ণ হয়েছিল।.... নদটি যদিও স্নানের স্থানে প্রায় একমাইল প্রশস্ত, তবে স্থানটি কর্দমাক্ত। "

৫ জুলাই, মেরি হলকে চিঠিতে স্বামীজি লেখেন," তুমি জানো, আমার এই দেশকে বলা হয় জলের দেশ। কিন্তু এর তাৎপর্য পূর্বে কখনো উপলব্ধি করিনি৷ পূর্ববঙ্গের নদীগুলো যেন তরঙ্গসঙ্কুল স্বচ্ছ জলের সমুদ্র, নদী মোটেই নয় - সেগুলি এত দীর্ঘ যে, স্টীমার সপ্তাহের পর সপ্তাহ এদের মধ্যে দিয়ে চলতে থাকে। "


  *অচেনা অজানা  বিবেকানন্দ*

স্বামীজির মহাপ্রয়াণ হয় ৩৯ বছর বয়েসে ১৯০২ সালে । বেলুড় মঠে তখন রাত ৯ টা ১০ মিনিট। তখন বেলুড় মঠে বা তার পার্শ্ববর্তী গ্রামে বিদ‍্যূৎ ছিল না । কিন্তু টেলিফোন ছিল তবুও কোন সংবাদমাধ্যম আসেনি এবং পরের দিন বাঙ্গলাদেশের কোন কাগজেই বিবেকানন্দের মৃত্যূ সংবাদ প্রকাশিত হয়নি,এমন কি  কোন রাষ্ট্রনেতা বা কোন বিখ্যাত বাঙ্গালী কোন শোকজ্ঞাপনও করেননি । 
ভাবতে পারেন ???

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর স্বল্প জীবনে অপমান, অবহেলা বহু পেয়েছেন,উপেক্ষিত হয়েছেন বার বার। পিতার মৃত্যূর পর স্বজ্ঞাতির সঙ্গে কোর্ট কাছারী করতে হয়েছে তাঁকে ।বহু বার হাজিরা দিয়েছেন কাঠগড়ায় l

 নিদারুণ দরিদ্রের সংসারে সকালে উঠে অফিস পাড়া ঘুরে ঘুরে চাকরির খোঁজে বেরুতেন । দিনের পর দিন মা কে বলতেন মা আজ রাতে বন্ধুর বাড়িতে খেতে যাবো। প্রায় দিন দেখতেন সংসারে চাল,ডাল,নুন ,তেল কিছুই নেই কিন্তু ভাই ও বোন নিয়ে 5 টা পেটের খাবার কি ভাবে জুটবে ? মুদির দোকানে ধার করে মাকে এক- দুই দিনের চাল ডাল দিয়ে ... মা কে বলতেন আমার রান্না কোরো না... মা ! দিন দুই বন্ধুর বাড়িতে নিমন্ত্রণ আছে কিন্তু..কোথায় নিমন্ত্রণ ? .. আনাহার আর অর্ধপেটে থাকতেন তৎ কালীন নরেন্দ্র .........

 ভাবা যায় !!!!!!!

চরম দারিদ্রের মধ্যে সারা জীবনটাই টেনে নিয়ে গেছেন । ২৩ বছর বয়েসে শিক্ষকের চাকরি পেলেন মেট্রোপলিটন স্কূলে । যাঁর প্রতিষ্ঠাতা বিদ্যাসাগর মশাই আর হেডমাস্টার বিদ্যাসাগরের জামাতা । জামাতা পছন্দ করতেন না নরেন্দ্রনাথ দত্তকে .. শ্বশুরকে বলে..." *খারাপ পড়ানোর অপরাধে"* বিদ‍্যালয় থেকে তাড়িয়ে দিলেন বিবেকানন্দকে । অথছ, যাঁর জ্ঞান,বুদ্ধি,ব্যুৎপত্তি তর্কাতীত, অন্তত সেই সময়েও।
 আবার বেকার বিবেকানন্দ। বিদেশেও তাঁর নামে এক বাঙ্গালি গুরু প্রচার করেন .. বিবেকানন্দ বেশ কয়েকটি বৌ ও দশ -বারো ছেলে পুলের পিতা ও এক আস্ত ভন্ড ও জুয়াখোর। ......

দেশে ও বিদেশে অর্ধপেটে বা অভুক্ত থেকেছেন দিন থেকে দিনান্তে.... 

চিঠিতে লিখেছিলেন :- 

"-কতবার দিনের পর দিন অনাহারে কাটিয়েছি । মনে হয়েছে আজই হয়ত মরে যাবো ... জয় ব্রহ্ম বলে উঠে দাঁড়িয়েছি .... বলেছি . ..আমার ভয় নেই,নেই মৃত্যূ, নেই ক্ষুধা, আমি পিপাসা বিহীন । জগতের কি ক্ষমতা আমাকে ধ্বংস করে ?" ...

অসুস্থ বিবেকানন্দ বিশ্ব জয় করে কলকাতায় এলে তাঁর সংবর্ধনা দিতে বা সংবর্ধনা সভা তে আসতে রাজি হয় নি অনেক বিখ্যাত বাঙ্গালী ( নাম গুলি অব্যক্ত রইল) শেষে প্যারিচাঁদ মিত্র রাজি হলেও ... তিনি বলেছিলেন .. ব্রাহ্মণ নয় বিবেকানন্দ । ও কায়েত... তাই সন্ন্যাসী হতে পারে না , আমি ওকে brother বিবেকানন্দ বলে মঞ্চে সম্বোধন করবো । 
১৮৯৮, বিদেশের কাগজে তাঁর বাণী ও ভাষণ পড়ে আমেরিকানরা অভিভূত আর বাঙ্গালীরা !
সেই  বছরই অক্টোবরে অসুস্থ স্বামীজি কলকাতার বিখ্যাত ডক্টর রসিকলাল দত্তকে দেখাতে যান,(চেম্বার- 2 সদর স্ট্রিট। কলকাতা যাদুঘরে পাশের রাস্তা )। রুগী বিবেকানন্দ কে দেখে সেই সময় 40 টাকা ও ঔষুধের জন্যে 10 টাকা মানে আজ ২০২০র হিসাবে প্রায় ১৬০০০ টাকা নিলেন বিবিধ রোগে আক্রান্ত বিশ্বজয়ী দরিদ্র সন্ন্যাসীর কাছ থেকে . বেলুড় মঠের জন্যে তোলা অর্থ থেকে স্বামী ব্রহ্মনন্দ এই টাকা বিখ্যাত বাঙ্গালী(?) ডক্টর রসিকলাল কে দিয়েছিলেন। ..

আরও আছে .........!!!

 বিবেকানন্দের মৃত্যূর কোন ফটো নেই । এমনকি বীরপুরুষের কোন ডেথ সার্টিফিকেটও নেই কিন্তু সে সময় বালি - বেলুড় মিউনিসিপালিটি ছিলো। 

 আর এই municipality বেলুড় মঠে প্রমোদ কর বা amusement tax ধার্য করেছিলো ।
বলা হয়েছিল ওটা ছেলে ছোকরাদের আড্ডার ঠেক আর সাধারণ মানুষ বিবেকানন্দকে ব্যঙ্গ করে মঠকে বলতো .. "বিচিত্র আনন্দ" বা "বিবি- কা আনন্দ" । ( মহিলা /বধূ / ... নিয়ে আনন্দ ধাম)। এই ছিলো তৎকালীন মুষ্টিমেয় বাঙ্গালীদের মনোবৃত্তি l 

সাধে কি শেষ সময় বলে গিয়েছিলেন- " *একমাত্র আর একজন বিবেকানন্দই বুঝেতে পারবে যে এই বিবেকানন্দ কি করে গেল।"*