Thursday, 13 March 2025

বঙ্গে সূর্য মন্দির

 

সোনাতপলের সূর্য মন্দির -- আলোকমন্দির  

বিশ্বে ভারতবর্ষ হ'ল এক রহস্যের দেশ হিসেবে পরিচিত। সেই রহস্যময় দেশ হিসেবে এক বিশেষ গৌরবও আছে। আর এই গৌরব আরও বাড়িয়ে তুলেছে তার প্রাচীন সূর্য মন্দিরগুলি। সবগুলি মন্দিরই সূর্যদেব সূর্যকে উৎসর্গীকৃত।ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে প্রায় প্রত্যেকটি মন্দিরই  প্রাচীন ভারতীয় শাসকদের দ্বারা বহু বছর আগে নির্মিত হয়েছিল।  এই মন্দিরগুলি ভারতীয় হিন্দুদের ধর্মীয় জীবনে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে।




সূর্য মন্দির কি ?? সূর্য মন্দির বা সৌর মন্দির হ'ল এমন একটি ভবন যা ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক কার্যকলাপের জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন প্রার্থনা বা বলিদান...... যা সূর্য বা সৌর দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হয়। এই ধরণর মন্দিরগুলো বিভিন্ন সংস্কৃতি দ্বারা নির্মিত হয়েছিল এবং ভারত, চীন,  জাপান , মিশর ও পেরু সহ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।  এর মধ্যে কিছু মন্দির ধ্বংসস্তূপে রয়েছে, খনন, সংরক্ষণ  বা পুনরুদ্ধার কাজ চলছে এবং কয়েকটি বৃহত্তর স্থানের অংশ হিসেবে বিশ্ব-ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত। 



ভারতে বেশ কয়েকটি ( প্রায় ১৪টি ) উল্লেখযোগ্য সূর্য মন্দির রয়েছে। এর মধ্যে মেধরার সূর্য মন্দিরটি, যা কিনা গুজরাতে অবস্থিত। ১০২৬-২৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এটি নির্মিত হয়েছিল।  চালুক্য রাজবংশের প্রথম ভীমসেনের শাসনকালে এর নির্মাণ হয়। এই মন্দিরের স্থাপত্য শৈলী মারু-গুর্জরা শৈলীর।  এটি পশুপতি নদীর তীরে অবস্থিত।




সূর্য মন্দির মাতন্ড..... যা জম্ম্-কাশ্মীরে অবস্থিত।  এটি একটি অসাধারণ মন্দির। কারকোটা রাজবংশ এটি নির্মাণ করেছিলেন ৮ম শতাব্দীতে। মন্দিরটির আশ্চর্যজনক খোদাই আজ ধ্বংসস্তূপে পরিনত হয়েছে। মন্দিরটি মালভূমির উপর অবস্থিত হওয়ায়, এখান থেকে সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকার দৃশ্য দেখা যায়।




দক্ষিণার্ক মন্দির যা গয়ায় অবস্থিত।  হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বায়ু পুরাণে এর উল্লেখ পাওয়া যায়। গয়ায় পিন্ডদান স্থানের কাছেই রয়েছে এই মন্দির।  আবার বিষ্ণুপদ মন্দিরটি এর কাছেই।  গয়ায় আরও দুটি সূর্য মন্দির রয়েছে..... সেগুলি হ'ল উত্তরকা মন্দির আর গয়াদিত্য মন্দির।  




তবে ভারতে সূর্য মন্দিরের কথা বললেই...... যে মন্দিরের কথা মাথায় আসে তা হল কোনারকের সূর্য মন্দির। এটি সাতটি বিস্মেয়ের একটি। ইউনেস্কো ঐতিহ্যবাহী স্থানগুলির মধ্যে কোণার্ক সূর্য মন্দির হ'ল একটি প্রাচীন  সূর্য মন্দির।  এটি পুরী থেকে ৩৫ কি মি দূরে অবস্থিত।  ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্দিরে আপনি দেখতে পাবেন ছয়টি ঘোড়া দ্বারা পরিচালিত ২৪ চাকার সূর্যদেবের রথ। কিন্ত  আজ মন্দিরের বেশিরভাগ অংশই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে।





তবে আজ আর পুরীর সূর্য মন্দিরের কথা নয়, এমন একটি সূর্য মন্দিরের কথা লিখছি যেটা কিনা রয়েছে পশ্চিমবঙ্গেই। শোনা যায় এই মন্দির কোনারকের সূর্য মন্দিরের থেকেও প্রাচীন।  তাই আজ সে ন্যাশনাল হেরিটেজের  তকমায় পুরস্কৃত। কিন্ত কোথায় রয়েছে সেই মন্দির  ??  সেই মন্দির রয়েছে আমাদের পশ্চিমবঙ্গেরই লাল মাটির দেশে, বাঁকুড়া জেলার ওন্দা থানার অন্তর্গত সোনাতপল গ্রামে সোনাতপল সূর্য মন্দির।   সূর্য মন্দির বলা হয় কারন মন্দিরটি পূর্বমুখী হওয়ায় দিনের প্রথম সূর্যকিরণ এসে পড়ে মন্দিরের গর্ভগৃহে। আলোকিত করে এই মন্দিরের গর্ভগৃহকে। তাই এটি সূর্য মন্দির নামে পরিচিত।  এই দেউলে আগে কোন দেবদেবী ছিল না। কিন্ত বর্তমানে একটি ত্রিশূল ও  শিবলিঙ্গ স্থাপন করা হয়েছে।  দারকেশ্বর নদীর দক্ষিণ-পশ্চিমে, বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় ১০ কি মি দূরে এই প্রাচীন গ্রাম সোনাতপল। সোনাতপলের সূর্য মন্দিরটি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক ও কিছুটা রহস্যময়। মন্দিরে লাগানো সরকারী বোর্ড থেকে জানা যায় আনুমানিক খ্রীস্টীয় একাদশ শতাব্দীতে মন্দিরটি তৈরী হয়েছিল।  ঔপনিবেশিক সময়ে তৈরী এটি ইটের রেখা দেউল। উচু ইটের ভিতের উপর তৈরী এই সূর্য মন্দিরটির উচ্চতা প্রায় ১২০ ফুট। এত উচু মন্দির এই অঞ্চলে আর নেই।  এটি জেলার অন্যতম পুরাকীর্তি।




তবে কবে এই মন্দির তৈরি হয়েছিল তা নিয়ে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, এই মন্দির বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের তত্ত্বাবধনে গড়ে উঠেছিল। আবার একসময় বাঁকুড়া ছিল বৌদ্ধ ও জৈনদের বাস।  তাই এই অঞ্চলে রয়েছে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের নানা পুরাকীর্তির। এই মন্দিরের গায়ে অনেক উপরে দেখা যায় এক ছোট্ট বৌদ্ধ মূর্তি। তাই কেউ মত প্রকাশ করেন যে এই মন্দির বৌদ্ধ বা জৈনদের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল।  ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পায় যে সোনাতপল গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল হামিরডাঙা। মন্দিরটির নির্মানকাল এগারো শতকে। শোনা যায় যে শালবাহন নামের কোনও এক রাজা এই মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন।  তৎকালীন হামিরডাঙায় শাকদ্বীপি ব্রাহ্মণদের  বাস ছিল। তাঁরা সূর্যের উপাসনা করতেন।  তবে অন্য এক ঐতিহাসিকের মত যে জনশ্রুতির মাধ্যমেই ঐ রাজার নাম জানতে পারা যায়। ওন্দার কোথাও সেই রাজার কোনও চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়নি। তবে সূর্য মন্দির যে জৈন বা বৌদ্ধ স্থাপত্য---- এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 




ট্রেনে যেতে হলে নিকটতম রেল ষ্টেশন বাঁকুড়া জংশন।  এখান থেকে দশ কি মি গাড়ী বা অটোতে যেতে পারেন। আর গাড়ি নিয়ে গেলে আরামবাগ- জয়পুর-বিষ্নুপুর-ওন্দা হয়ে কিছুটা গিয়ে ডান দিকের রাস্তা ধরে সোনাতপল গ্রামে পৌঁচ্ছাতে পারেন। এছাড়া বাঁকুড়া-বিষ্নুপুর রাস্তা ধরে ধলডাঙ্গার মোর থেকে বেকে এই মন্দিরে যেতে পারেন। 




হাজারো বছরের প্রাচীন এই মন্দিরের সংস্কার এখনই প্রয়োজন।  স্থানীয়দের দাবী...... এত পুরানো মন্দির আজ ভেঙে পরেছে সংস্কারের অভাবে। এখানে যাতায়াতের রাস্তা পর্যন্ত নেই।  আলপথ পেরিয়ে এই মন্দির দেখতে যেতে হয়। একখানা সরু রাস্তা থাকলেও বর্ষাকালে তা বেহাল হয়ে পরে। আগাছায় পরিপূর্ণ মন্দির।  এলাকাবাসী বারবার বিভিন্ন মহলে মন্দির সংস্কারের আবেদন  জানালেও কোনো কাজ হয়নি।   ভারতীয় পুরাতত্ত্ব বিভাগ এই মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক হলেও সরকার শুধুমাত্র এলাকাটির চারপাশে প্রাচীর দিয়েছে। মন্দিরের অবস্থা বেশ জরাজীর্ন ও ভগ্নপ্রায়।  মন্দির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বর্তমানে শ্রী ষষ্ঠী মল্ল নামে একজন গ্রামবাসী নিযুক্ত আছেন। এর আগে তাঁর মা শ্রীমতী সবিতা মল্ল দেখাশোনা করতেন। তবে একার পক্ষে এই স্থাপত্য রক্ষণাবেক্ষণ সম্ভব নয়। কথায় কথায় ষষ্ঠী মল্ল ক্ষোভের সাথে জানালেন ......" অনেকেই মন্দির দেখতে  আসেন।  গ্রামে আসার রাস্তাটি লাল মাটির।  কিন্ত মন্দির দেখতে হলে জমির আলপথ মাড়িয়ে আসতে হয়। সেই কারণে অনেকে দূর থেকে মন্দির দেখে ফিরে যান। সরকার সচেষ্ট হলে এই মন্দিরটিকে ঘিরে  গ্রামটিকে একটি পর্যটন স্থল হিসেবেও গড়া যেতে পারে। আর তখনই স্বাভাবিকভাবেই গ্রামের মানুষের রুজি রোজগারের একটা ক্ষেত্রও তৈরি হতে পারে।"





এখন প্রশ্ন হ'ল ........ ইতিহাসের হাত ধরে এই এলাকা কি ভবিষ্যতের পর্যটন স্থান হিসেবে উঠে আসবে ?? এর জবাব পেতে হলে আগামী দিনগুলির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কিছুই করার নেই। 







Saturday, 19 October 2024

মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ির দূর্গাপূজো

 

ঐতিহ্য রক্ষায় তরবারি পুজো......

মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি দূর্গাপূজোয় 

পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা শহর থেকে আট কি. মি. পূর্বে শিলাবতী অববাহিকায় সবুজ গাছপালায় ভরা মঙ্গলাপোতা গ্রাম। এখানেই রয়েছে মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ি। ইতিহাস ঘাটলে জানা যায় যে এই রাজবাড়ি একদা ছিল রাজাদের আমোদ প্রোমদের  বাগানবাড়ি। এটি নির্মাণ করেছিলেন বগড়ীর রাজা ছত্র সিংহ এবং শোনা যায় যে তিনিই  র্প্রচলন করেছিলেন দূর্গাপূজোর। তৎকালীন বগড়ী পরগনার শেষ স্বাধীন রাজা তিনি ছিলেন। প্রায় ৪০০ বছর আগে সেই দূর্গাপূজো আজও চলে আসছে মঙ্গলপোতা রাজবাড়ির  দূর্গাপূজো নামে।  আবার এও শোনা যায় যে এই রাজবংশের প্রথম রাজা ছিলেন গজপতি সিংহ৷ তবে এই বংশের নবম রাজার  নামও ছিল গজপতি সিংহ। ইনিও মঙ্গলপোতাতে দেবী দুর্গার আরোধনা আরম্ভ করতে পারেন। ইতিহাস বলে বা আঞ্চলিক অধিবাসীদের  বিশ্বাস এখানে যে ঘটটি আছে,  সেই ঘটটি  বাস্তবে গড়বেতার মা সর্বমঙ্গলার ঘট। ছত্র সিংহ ঘটটি জোর করে নিয়ে এসেছিলেন এবং সেটা আর ফেরত দিয়েছিলেন না। আর সেই দেবী সর্বমঙ্গল ঘট এখানে পুঁতে তিনি দূর্গাপূজোর প্রচলন করেছিলেন। ঘট পোতা হয়েছিল বলে এই জায়গার নাম মঙ্গলপোতা। এও জানা যায় যে বিষ্ণুপুরের রাজা মল্লরাজ খয়েরমল্ল  দেবী সর্বমঙ্গলার এই ঘট একবার নিয়ে যান। সামসের জং বাহাদুর, রাজা ছত্র সিংহের পাশে দাড়িয়ে যুদ্ধে খয়েরমল্লকে পরাজিত করে এই ঘট আবার উদ্ধার করে আনেন। 






পূজোর ১৫ দিন আগে দেবীর ঘট স্থাপন করা হয়। আগে পূজার মন্ডপ  ছিল মাটির। ছাউনি ছিল টালির ও টিনের। কাঠের ছিল দরজা। এখন স্থায়ী মন্ডপ হয়েছে। রয়েছে পূর্বকার পঞ্চমুন্ডির আসন। বারান্দায় রয়েছে ৬টি প্রকান্ড থাম। আর ভিতরে একই রকম চারটি থাম। মণ্ডপে ভিতরে বাঁদিকে রয়েছে এক উই এর ঢিপি। শোনা যায় যে ষষ্ঠী থেকে নবমীর ভিতর যে কোনো দিন এক সাপ সেই ঢিপি থেকে বেড়িয়ে দেবীর কাছে এসে ঘোরা ফেরা করে। পরে আবার নিজে থেকে সেই ঢিপির ভিতর ঢুকে যায়। এই পূজোর বৈশিষ্ট্য হল প্রচীন রীতি মেনে  দূর্গাপূজোর ঐতিহ্য বজায়  রাখা। এই পুজোতে ৪টি তরবারি পুজো করা হয়। রাজাদের বীরত্বের প্রতীক হিসেবে তরবারীগুলোকে পুজো করা হয় দেবীর সামনে রেখে।  জিতাষ্টমীর দিন প্রথম তরবারী, দ্বিতীয় তলবারি পূজো হয় মহালোয়ার দিন, তৃতীয় তরবারি পুজো ষষ্ঠীর দিন, আর সপ্তমীর দিন পূজো করা হয় সবচেয়ে বড় চতুর্থ তলবারিটি। তৎকালীন উড়িষ্যার বীরযোদ্ধা সামসের জং বহাদুর ছিলেন মা কালীর এক পরম সাধক এবং সাধনাবলে তিনি এই তরবারি পেয়েছিলেন। বিশ্বাস  তরবারি মন্ত্রপূত ছিল। এই তরবারি দিয়ে তিনি বিষ্ণুপুরের রাজা খয়েরমল্লকে যুদ্ধে পরাজিত করে মা সর্বমঙ্গলার আসল  ঘট উদ্ধার করেন। অন্য তিনটি  তরবারি কুলদেবতা রাধাকৃষ্ণ জিউ-এর মন্দিরে রাখা আছে। রাধাকৃষ্ণ, নারায়ন, সর্বমঙ্গলা ও দূর্গা ছাড়াও  এই তরবারিগুলি রোজদিন পুজো করা হয়। দূর্গাপূজোর সময় এই সব তরবাড়ি মূল মন্ডপে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের ও অন্য ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস যে বড়ো তরবারিটি কালী মা। প্রতি দূর্গার সপ্তমীর দিন ও কালীপুজোর দিন দুমিটার করে চার মিটার লাল শালু কাপড় দিয়ে তরবারিটি জড়ানো হয়। পুরোনো লাল শালু কাপড়টি ফেলে দেওয়া হয় না। তার উপর এই লাল শালু কাপড় জড়ানো হয়। কিন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল যে এটি মোটা হয়ে যাওয়ার কথা কিন্ত মোটা হয় না, একই রকম আছে।





ষষ্ঠীর দিন হোম থেকে, যাগযঞ্জ এবং চন্ডীপাঠ শুরু হয়। যঞ্জকুন্ডে অবিরাম ২৪ ঘন্টা এই কয়দিনে কাঠ জ্বলতে থাকে। কিন্ত অবাক লাগে যে প্রাচীন কালের সেই দূর্গাপূজোর শুরু থেকে সেখান থেকে যঞ্জের কাঠ পুড়ে ছাই হলেও কোনদিন ছাই পরিস্কার করা হয়নি অথচ গর্তটি ছাই-এ ভর্তিও  হয়নি। প্রতি বছর নতুন করে দেবী বিগ্রহ তৈরি করা হয়। এখানে এক চালায় দেবীর পূজো হয়। প্রাচীন কালে এখানে নরবলি হত। যাকে বলি দেওয়া হতো সে কোথা থেকে আসতো বা কিভাবে দেবীর পিছনে এসে বসে থাকতো তা কেউ জানতে পারতো না।  এখন আর সে সব নেই। এখনও সপ্তমী ও সন্ধি পুজোতে ছাগ বলি হয়। কিছু বছর আগে পর্যন্ত মোষ বলি হত। এখন আর মোষ বলি দেওয়া হয় না। কেননা মোষ বলির পর, তার মাংস আদিবাসীরা এসে প্রসাদ হিসেবে নিয়ে যেত। এখন তারা আর আসে না, আর তার জন্য মোষ বলিও বন্ধ গেছে। 




এই পূজোয় নিয়মবিধি মেনে সবকিছু অনুষ্ঠান করাটা মুখ্য।  সুপ্রাচীন কালে যে নিয়ম ছিল তা আজও মেনে চলা হচ্ছে। দূর্গাপূজোয় এখানকার ঘট স্থাপনের সময় যে তোপধ্বনি হয়, সেই ধ্বনি শুনে গড়বেতাতে দেবী সর্বমঙ্গলার পূজো আরম্ভ হয়।  আবার গড়বেতার মা সর্বমঙ্গলার  পূজোর তোপধ্বনি শুনে গোয়ালতোড়ে দেবী সনকা মায়ের পূজো আরম্ভ হয়ে থাকে।  প্রায় ৪০০ বছর ধরে ঐতিহ্যের এই পরম্পরা রক্ষা হয়ে চলেছে।  একটি বারের জন্য তা লঙ্ঘন হয়নি।





১৯৮০ সালে এই রাজবাড়ির অদূরেই জঙ্গল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছিল যশোবন্ত সিংহের নাম খোদাই করা তিনটি কমান । দুইটি ব্রোঞ্জের ও একটি লোহার।  এগুলিকে কলকাতার প্রত্নতত্ত্ব সংগ্রহশালায় সংরক্ষণের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলাপোতা রাজবাড়ির সেই বনেদিয়ানা আজ আর নেই। নেই সেই আভিজাত্য।  সেইসঙ্গে হারিয়েছে দূর্গাপূজোর জৌলুস।  ভগ্নপ্রায় অবস্থা রাজবাড়ির।  পলেস্তরা খসে পড়েছে।  রয়েছে চূনসুড়কির গাঁথা মোটা মোটা দওয়াল ওয়ালা দালান কোঠা।  বহু দূর দূর থেকে একসময় মানুষ আসত এই পূজো দেখতে ও আনন্দ করতে।  পূজা মন্ডপ বা ঐ রাজবাড়ি এলাকা গম্ গম্  করতো।  চলত যাত্রা , থিয়েটার, নাটক।  বসতো বাউল গান বা কীর্তনের আসর। এখন ঐ রাজবাড়ি এলাকায় এক ছোট্ট মেলা বসে। এখন রাজবাড়ির বংশধর হিসেবে রয়েছেন শ্রী অরবিন্দ সিংহ এবং তার ভাইয়েরা।  তারাই পূজো করেন।  আর্থিক সংকটের জন্যই পূজো নিষ্প্রভ হয়ে পরেছে। তবে গ্রামের বা আশেপাশের মানুষ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।  এই ভাবেই মঙ্গলাপোতার এই সুপ্রাচীন গৌরবময় দূর্গাপূজো নিজের ঐতিহ্য বজায় রেখে আজও টিকে রয়েছে। 



খুব সহজেই এখানে আসা যায়।  ট্রেনে বা বাসে বা গাড়ীতে এখানে আসতে পারেন।  ট্রেনে আসতে হলে পুরুলিয়া এক্সপ্রেস, রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস বা অরন্যক এক্সপ্রেসে এসে নামতে হবে গড়বেতা স্টেশনে। আর আছে প্রচুর বাস কলকাতা বা হাওড়া থেকে গড়বেতা আসার জন্য।  গড়বেতা থেকে অটো বা যে কোনো গাড়ী ভারা নিয়ে আসা যেতে পারে মঙ্গলাপোতা গ্রামে। গাড়ী নিয়ে এলে আরামবাগ--গড়বেতা--ধাদিকা মোড় হয়ে সহজেই পৌঁছানো যায় মঙ্গলাপোতায়।  যদি কেউ রাত্রে থাকতে চান তবে গড়বেতায় ছোটোখাটো লজ আছে। এছাড়া চন্দ্রকোনা রোডে ভালো থাকার জায়গা আছে।


Tuesday, 15 October 2024

দূর্গোতিনাশিনীর আরোধনায় কুমারীপূজা

 

শুদ্ধাত্মা কুমারী ...........বিশ্বজননী ভগবতীর আর এক রূপ  


সাধারণত   পূজা হয় কোনো না কোনো দেব দেবীর। আর সব পূজাই উপাসনা পদ্ধতিতে থাকে। সেখানে ঘট বা প্রতিমা দেব-দেবীর প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়। অনেকক্ষেত্রে চিত্রপট ব্যবহার করা হয়। কিন্ত দুর্গাপুজোর সময় কুমারী পুজো নিয়ে একটা প্রশ্ন জাগে......কুমারী বালিকা আবার পুজনীয় হয় কি? কুমারীতো পার্থিব একজন। তার আবার পুজো কেন?এ কি দুর্গা নাকি ছোটো  দুর্গা হিসেবে  পুজো করা হয়?

কুমারী পূজার দার্শনিক তথ্যে সেখানে বলা হয়েছে...... পরমার্থ ও দর্শন নারী পরমার্থ অর্জন। এই বিশ্বে প্রতিনিয়ত সৃস্টি, স্থিতি ও লয় সাধিত হচ্ছে, সেই ত্রিশক্তি বীজকারে কুমারীতে নিহিত। কুমারী প্রকৃতি বা নারী প্রতিক ও বীজ। এই ভাবনায় ভাবিত হতে দেখা যায় শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব স্ত্রীকে ষোড়শী ঞ্জানে পুজো করতেন। 

 কুমারী পূজার শুরু ঠিক কবে তা নির্দিষ্ট করে বলা যায় না। যোগীনিতন্ত্র নারী কুমারী দেবী দুর্গার উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে দেবীর উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে....... হে দুর্গা, তুমি নারী ও কুমারী। আমরা কাত্যায়নকে জানার জন্য তোমার ধ্যান করছি। আপনি আমাদের প্রেরণা প্রদান করেন।  যোগীনিতন্ত্রে কুমারী পূজা সম্পর্কে উল্লেখ আছে...... ব্রহ্মাশাপবশে মহাতেজা বিষ্ণুর দেহে পাপ সঞ্চার হলে হিমাচলে মহাকালীর তপস্যা শুরু করেন। বিষ্ঞুর তপস্য মহাকালী সন্তুষ্ট হন৷ দেবী সন্তোষষ্টি মাত্র বিষ্ণুর পদ্ম হতে "কোলা" নামক মহাসুরের আবির্ভাব হয়। সেই কোলাসুর ইন্দ্রাদি দেব গণকে পরা করে অখিল ভূমণ্ডল, বিষ্ণুর বৈকুণ্ঠ এবং ব্রহ্মার কমলাসন প্রভৃতি দখল করে। তখন পরাজিত বিষ্ণু ও আদিদেব দেবীর স্তব শুরু করেন। দেবগণের স্তবে দেবী সন্তুষ্ট হয়ে বলেন, “হে বিষ্ণু! আমি কুমারীরূপ ধারণ করে কোলানগরী গমন করে কোলাসুরকে সবন্ধবে বধ করিব ৷ অতঃপর তিনি কোলাসুরকে বদ করেন এবং------সেই থেকে দেব-গন্ধর্ব, কিন্নর-কিন্নরী, দেবীগন সমবেত হয়ে কুসুম-চন্দন-ভারে কুমারী অর্চনা করেন। কথিত  আছে, বাসুদেব শ্রীকৃষ্ণের নির্দেশে তৃতীয় পান্ডব অর্জুন কুমারী পুজো করেন।

শিশুকন্যাকে কুমারী রূপে পূজা করার এক সুক্ষ্ম নিদর্শন রয়েছে 'বৃহদ্ধর্ম পুরাণ'-এ। সেখানে আছে, রাম কর্তৃক রাবন বধের জন্য   দেবতারা  ব্রহ্মার  কাছে যজ্ঞ করার জন্য অনুমতি চাইলে ব্রহ্মা দেবীকে জাগরিত করার কথা উল্লেখ করেন। দেবতারা তখন আদ্যাশক্তির স্তব করেন। সেই স্তবে সন্তুষ্ট হয়ে এক কুমারী দেবী আবিভূত হয়ে দেবীর বোধন করে পূজা করার নির্দেশ দেন।

সেই নির্দেশমতো ব্রহ্মা দেবতাদের  সঙ্গে পৃথিবীতে এসে  ঘুরতে ঘুরতে এক নির্জন স্থানে বেলগাছের একটি পাতায়  সোনার বরণ এক শিশুকন্যাকে নিদ্রিত দেখে 'সোনাবিশ্বপ্রসবিনী জগজ্জননী মহামায়া'  বলে স্তব করেছিলেন । ব্রহ্মার সেই স্তবেই শিশুকন্যা জাগরিত হয়ে দেবীরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন এবং দেবতাদের অভীষ্ট পূরণ করবেন বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

 শ্বেতাশ্বতর উপনিষদেও কুমারী পুজোর কথা উল্লেখ আছে। এছাড়াও প্রাচীন শাস্ত্র ও বই থেকে নেপাল, ভুটান ও সিকিমের কুমারী পুজোর উল্লেখ করা যায়। সুদূর অতীতের কুমারী পূজার প্রচলন ছিল এবং তার ব্যবহার পাওয়া যায় "কুমারী পূজাদি আবেদন" বইয়ের পুথি থেকে। আর লেখা থেকে অনুমান করা কঠিন নয় দেবীর কুমারীর নাম অনেক পুরানো। দেবীর কুমারী নাম যেমন পুরানো, তার আরাধনা ও পূজার ঘটনা আচরনও প্রাচীন।

স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর প্রথম কুমারী পুজো করেন ১৮৯৮ সালে, তাঁর কাশ্মীর ভ্রমণের সময়। এক  মুসলমান মাঝির শিশুকন্যাকে কুমারী হিসেবে পুজো করেন স্বামীজি। যা দেখে তার মানসকন্যা নিবেদিতা সহ তার অন্যান্য পশ্চাত্য শিষ্যও  বিস্মিত হন। প্রব্রাজক হিসেবে উত্তরপ্রদেশের রায়বাহাদুর গগনচন্দ্রের শিশুকন্যা মণিকা রায়কে কুমারী রুপে পুজো করেন। ১৮৯৮ সালের অক্টোবরে কাশ্মীরের ক্ষীরভবানীতে কুমারীপূজো করেন।  ক্ষীরভবানী কাশ্মীরের এক অতি প্রাচীন দেবীপীঠ। স্বামীজি এই সময় প্রায় একাকীই থাকতেন এবং ক্ষীরভবানীর প্রথা অনুযায়ী পূজা করে "পায়েস"  নিবেদন করতেন।   ১৯০১ সালে যখন তাঁর হাতে বেলুড় মঠে দুর্গা পুজো শুরু হয়, তখন নয়জন কুমারী এক সঙ্গে পুজিত হন। তবে এখন শাস্ত্রীয় রীতি মেনে একটি কুমারীকে পুজো করা হয়।

বিশেষত দুর্গাপুজোর অংশ হিসাবে কুমারী পূজা করা হয়।এছাড়াও কালীপুজো, জগদ্ধাত্রীপূজা, অন্নপূর্ণা পূজা এবং কামাখ্যাই কুমারী পূজার প্রচলন রয়েছে। মাদুরাইয়ের মীনাক্ষী দেবী মন্দিরে ও কুমারীতে মহা ধুমধামে কুমারী পূজা করা হয়। বিশ্বাস করা হয় যে কুমারীপুজো ছাড়া হোম- যঞ্জ করে দুর্গাপুজোর সম্পূর্ন ফল পাওয়া যায় না। সাধারণত দুর্গাপুজোর অষ্টমী তিথিতে কুমারী পুজো করা হয়। তবে সপ্তমী, অষ্টমী ও নমবী ---- এই তিনদিনই বা নিয়মনীতি অনুসারে কুমারী পূজো করা যেতে পারে।

পুরোহিতদর্পন গ্রন্থে কুমারী পুজোর পদ্ধতি ও মাহাত্ম্য সবিস্তারে লেখা রয়েছে। বলা হয়েছে কুমারী পূজায় কোনো জাতি, ধর্ম বা বর্নভেদ নেই। দেবী , এক থেকে ষোলো বছর পর্যন্ত সুলক্ষণ যে কোনো কুমারী পূজনীয়। তবে সাধারন ব্রাহ্মণ কুমারী নারী পুজাই সর্বাত্মক। তবে এ কথা বলা যাবে না যে ব্রাহ্মণ্যই কেবলমাত্র পূজ্য।


পুরাতন ক্রমানুসারে পূজা কাল এই সকল কুমারীদর বিভিন্ন প্রকারের নামে  অভিহিত করা হয়। অনেকে বিশ্বাস করেন যে বিভিন্ন  পুজোয় বিভিন্ন ফল লাভ করা যায়। তবে দুই থেকে দশ বছর কুমারী হওয়া ভালো।

[১] এক বছরের   নারী কুমারীকে সন্ধ্যা  বলা হয়েছে। [২] দুই বছর বয়সী কুমারীকে সরস্বতী বলে ডাকা হয়। পূজার ফল :-: দুঃখ ও দারিদ্র কাটানোর জন্য, ভাগ বৃদ্ধির জন্য, ছাত্র ওনা ও আয়ু বৃদ্ধির জন্য। [৩] তিন বছর বয়স্ক কুমারীকে ত্রিমূর্ত্তি বলা হয়েছে। পূজার ফল :÷: পুত্র সন্তান, বিদ্যা ও বুদ্ধির জন্য এবং সব ধরনের মনস্কামনা পূরণের জন্য। [৪] চার নারী কুমারীকে কালিকাগ্রাম   নির্দেশ করা হয়। কথিত আছে রাজসুখ প্রাপ্তি, অত্যন্ত জটিল সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায় এই পুজো থেকে। [৫] পাঁচ বছর পুরানো কুমারীকে সুতাপা বলে   নামকরণ করা হয়। বলা হয়, সমস্ত রোগমুক্তির জন্য এবং সব ক্ষেত্রে জয় লাভের জন্য এঁর পুজো ফলপ্রদ৷  [৬]  ছয়  বছর বয়সী কুমারীকে  উমা ডাকা হয়। জয়ের জন্য এবং সবার প্রিয় পূজার জন্য এঁর জো করা হয়। [৭] সাত বছর পুরানো কুমারী মালিনীগ্রাম  পরিচিত। প্রকৃত ধনসম্পদ ও মান সন্মান লাভের জন্য এঁর পুজো হয়ে থাকে । [৮] আট বছর  কুমারীকে কুঞ্জিকা আখ্যা দেওয়া হয়েছে।  ঝগড়ার অবসান ও সিদ্ধিলাভের আশায় এঁর পূজো করা হয়।  [৯] নয় বছর নারী কুমারীকে কলিসংমা  বলা হয়েছে।  কঠিন থেকে  কঠিনতর মমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এঁর পূজো হয়ে থাকে। [১০] দশ বছরের কুমারীকে অপরাজিত ডাকা হতে পারে।   অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এঁর পূজার আয়োজন।      [১১] এগারো বছরের কুমারীর নাম রুদ্রাণী । [১২] বরো রছর কুমারী হলে  ভৈরবী    ডাকা হয়। [১৩] তেড় বছরের পুরনো কুমারীর নাম হবে মহালক্ষী । [১৪] চোদ্দ বছরের কুমারীর  নাম পাঠক । [১৫] পনেরো বছরের কুমারীকে এলাকাঞ্জা মনে হবে। [১৬] ষোল বছরের পুরনো কুমারীর  নাম অন্নদা বা অন্য রাষ্ট্রে অম্বিকা নাম হবে।

পুজোর আগে কুমারী কে স্নান করিয়ে নতুন শাড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়। ফুলের গয়না দিয়ে অঙ্গ সাজানো হয়। পা ধোয়ানো হয়।  পায়ে আলতা ও কপালে সিঁদুরের টিপ দেওয়া হয়। কুমারীকে দেবী জ্ঞানে উপচারে পুজো করা হয়। পূজারী ও ভক্তগণ কুমারীর মধ্যে দেবীকে অভিবাদন করে। কুমারীর মধ্যে মাতৃ ধর্মকে পুজো করা হয়। সাধারণ মনের পশুত্ব নাশ করতেই এই পুজো। ১৬ টি উপকরণ ব্যবহার করা হয়। পাঁচ উপকরণ দিয়ে কুমারীকে পুজো করা হয়। 


কুমারী,  মহিলা দেবী... কালীতন্ত্রে। কুমারীর চরণ ধুয়ে দিয়ে কেশর ও তিল দিয়ে ভক্তিপূর্বক পুজোতে অসুর, বিরুদ্ধ গ্রহ, ভূত, পিচাশ, গন্ধর্ব, যক্ষ, রাক্ষস, দেবীগন, ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর, সকলে  প্রীত ও প্রসন্ন হন।

নিয়ম পূর্বক কুমারীপূজা নাশ করে বিঘ্ন, ভয় ও শত্রু। রোগ আরগ্য হয়। শান্ত ও প্রসন্ন এই পুজো, বিরুদ্ধ ও রুষ্ট গ্রহদি শুভ ফলদান করে। মানুষ সম্মান, ভূমি, লক্ষ্মী, বিদ্যালাভ করেন। মহাতেজ প্রাপ্তি হয়। অপ্রত্যাশিত দৈবপাত, দুঃস্বপ্ন, অমৃত্যু ব্যক্তি মানুষের সমস্ত দুঃখদায়ক দূর হয় কুমারী পূজার সময়।

শক্তিপীঠে কুমারী পূজার ফল অশেষ। যেকোনও জাতির কুমারী পুজো করা বাধা নেই। তন্ত্রের কথায়, কুমারী পূজায় জাতিভেদ বিচার করতে নেই। জাতিভেদে মানুষ নরকগামী হয়।

জাগতিক সমস্ত দুঃখ দারিদ্র ও শত্রু এবং শক্তি প্রাপ্তির জন্য কুমারী পুজো সর্বোত্তম। কুমারী পূজার ফলে অপ্রাপ্তি পূরণ করেন দেবতারা। তবে এক নারীপূজোর ফল, শত কুমারী পুজো ফল একই, তারতম্য নেই। 

ব্যবস্থায় বলা হয়েছে, কুমারী পুজো স্বয়ং ভগবতী প্রসন্ন হন। যেখানে কুমারী পুজো হয়, সেখানেই ভগবতীর নিবাস। সেইজন্য কুমারীকে মান্য করা হয় ভগবতীতে। যে রাজরূপ রূপক পুজোর দেবীকে নৈবেদ্য ও ভোজনে তৃপ্ত করে, সে ত্রিলোক তৃপ্ত করে

Tuesday, 6 August 2024

গেরুয়া বসনের অন্তরালে

 

মানুষকে এই বস্তুবাদী দুনিয়া থেকে ত্যাগের পথে নিয়ে যায় এই গেরুয়া রং। তাই সেই বেদের সময় থেকেই গেরুয়া হয়ে গিয়েছিল বস্তুবাদী দুনিয়া ত্যাগ করে বৃহত্তম আধ্যাত্ম্য দুনিয়ায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার রং। তাই গেরুয়া হয়ে গেল সাধু মহাত্মাদের পরিধেয় বসনের রং।



স্বামীজি থেকে শুরু করে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে যে সাধু মহাত্মাদের দেখা যায়, তাঁরা গেরুয়া বসন পরে থাকেন। যুগ যুগ ধরেই কিন্তু এ দৃশ্য মানুষ দেখে এসেছেন। কিন্তু কেনই কেবল গেরুয়া বসন? কেন অন্য কোনও রং নয়? এর কারণ খুঁজতে কিন্তু পিছিয়ে যেতে হয় বেদের সময়ে।

গেরুয়া রং হল আগুনের রং। গেরুয়া হল সূর্যের রং। ঋগ্বেদে অগ্নিকে আগুনের দেবতা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। বৈদিক যে কোনও ক্রিয়ায় আগুনের ব্যবহার আবশ্যিক। সে হোম হোক বা আরতি। বলা হয় আগুন সবকিছুকে পবিত্র করে তোলে। আগুনের রং হল ত্যাগের রং। আর সেই রং হল গেরুয়া। মানুষকে এই বস্তুবাদী দুনিয়া থেকে ত্যাগের পথে নিয়ে যায় এই গেরুয়া রং। তাই সেই বেদের সময় থেকেই গেরুয়া হয়ে গিয়েছিল বস্তুবাদী দুনিয়া ত্যাগ করে বৃহত্তম আধ্যাত্ম্য দুনিয়ায় নিজেকে সঁপে দেওয়ার রং।

আমাদের অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে, পৃথিবীতে এত রঙ থাকা সত্ত্বেও কেন সাধু সন্ন্যাসীরা গেরুয়া রঙকে এত পছন্দ করেন? এই রং অনেকটা কমলা রঙের মতো। আসলে গেরুয়া রঙের যোগ রয়েছে পুরাণের সঙ্গে। আধ্যাত্বিক বিশ্বাস সহকারে সাধুরা এই রঙের পোশাক পরিধান করেন। বলা হয় অগ্নিদেবের রঙ্গ গেরুয়া। হিন্দু ধর্মের পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও গেরুয়া রঙের পোশাক পরতে দেখা গিয়েছে। লাল হলুদের মিশেলে পাওয়া এই রঙকে বলা হয় সুখের প্রতীক। কথিত আছে, গেরুয়া রঙের সঙ্গে মানব শরীরের অঙ্গের বিশেষ যোগ রয়েছে। সেই তালিকায় রয়েছে কিডনি, প্রজননতন্ত্র, মলাশয় এবং মূত্রথলি। এই রং নাকি শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি মানসিক ভারসাম্য বজায় রাখে তাই এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে সুস্থ অসুস্থতার বিষয়।

গেরুয়া রং বলতে দেশের জাতীয় পতাকার সর্বোচ্চ রং।  এর পাশাপাশি আরও একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট লক্ষ্যনীয় যা কিনা প্রধানত ধর্মীয় এবং পৌরাণিক তাৎপর্য পূর্ন।   


ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে এক সময় এদেশে প্রচলিত ছিল বর্ণাশ্রম প্রথা। কালের গহ্বরে সেই প্রথা এখন প্রায় অস্তমিত। এই প্রথারই শেষ পর্যায় ছিল সন্ন্যাস। অর্থাৎ বৃদ্ধ বয়সের অন্তিম আস্তানা। সন্যাস এখন আর বাধ্যতামূলক নয় ঠিকই, তবে ভারতীয়দের স্মৃতিতে এ প্রথা আজও স্পষ্ট। এখনও বহুজন সন্যাসী রয়েছেন......., একান্তই ব্যক্তিগত ইচ্ছেয় যাঁরা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু সন্ন্যাস এই প্রথার সঙ্গে যে অচিরেই মিলেমিশে গিয়েছে একটি রং, গেরুয়া। এটির আসল কারণ কী? কি কি যুক্তি রয়েছে এর পিছনে।

সাধারণত গেরুয়া রংটি আমরা আধ্যাত্মিক চোখেই দেখে থাকি। রংটি হিন্দু পুরাণের দুটি শুভ জিনিসের সাথে অনুরণিত হয়। তা হল সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের রঙ এবং আগুনের রং। পুরাণ মতে, সূর্য এবং আগুন এই দুটিই গুরুত্বপূর্ণ উপাদান যা উল্লেখযোগ্য শক্তি। কিন্তু আধুনিক সময় দাঁড়িয়ে কেবল পুরাণের উপর ভিত্তি করে জীবন চলে না তার সঙ্গে অনিবার্য হয়ে দাঁড়ায় বিজ্ঞানও। আপনি কি জানেন শুধু ধর্ম নয়,  সাধুদের গেরুয়া পোশাক পরার পিছনে বৈজ্ঞানিক কারণও আছে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেছেন, সাইকো নিউরোবিক্স বিশেষজ্ঞ ডক্টর বি কে চন্দ্রশেখর। তাঁর মতে, সাতটি প্রাথমিক রং আমাদের শরীরের সাতটি চক্রের সাথে যুক্ত। এগুলি হল- লাল, গেরুয়া বা কমলা, হলুদ, সবুজ, নীল এবং বেগুনি। প্রতিটি রঙেরই রয়েছে ভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য। যখন আমরা কোনও রঙের দিকে তাকাই, তখন সেই রংগুলি প্রত্যেকেই নিজের নিজের বৈশিষ্ট্য মেনে আমাদের মনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এটিকেই বলে কালার ভাইব্রেশন থেরাপি।

কিন্তু কী এই কালার ভাইব্রেশন থেরাপি?

যখন আমরা একটি রং দেখি, তখন এটি আমাদের রেটিনায় একটি চিত্র তৈরি করে যা বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তরিত হয় এবং তৎক্ষণাৎ মস্তিষ্কে নির্দেশ পাঠায়। চোখের অপটিক নার্ভ এটিকে ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স এবং মস্তিষ্কের অন্যান্য অংশের সাথে সংযুক্ত করে। প্রতিটি রংই আমাদের মস্তিষ্কে আলাদা আলাদা কম্পন তৈরি করে। এবং এই কম্পন থেকেই মানসিক প্রভাব বিস্তার হতে পারে মনে করেন তিনি।

গেরুয়া রংকে এমনিতেই আমরা ত্যাগ ও সহনশীলতার প্রতীক হিসেবে জেনে থাকি। পাশাপাশি ডাঃ চন্দ্রশেখর ব্যাখ্যা থেকে জানা যায়, এই রঙের উপর দৃষ্টি নিক্ষেপ করার ফলে মানুষের মস্তিষ্কে যে কম্পন তৈরি হয় তা একজনের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। মানুষের কোলন, মূত্রাশয়, কিডনি, প্রজনন ব্যবস্থা এবং মূত্রথলি জনিত বিভিন্ন ক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এই রং।


যদিও বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন কমলা আনন্দের রঙ কারণ এটি লাল এবং হলুদের সংমিশ্রণ। কিন্তু বিশ্বাস যাই হোক এই রঙের যে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও যথেষ্ট রয়েছে তা জানা যায় চিকিৎসকের ব্যাখ্যা থেকেই। গেরুয়া রঙের উপর মনোনিবেশ করা একজনের জীবনে মানসিক এবং শারীরিক উভয় ক্ষেত্রেই একাধিক উপকার করতে পারে এটি। এমনকী ক্লান্তি দুর করতেও সহায়তা করে।


সুতরাং সাধুদের পোশাকের এহেন রং কেবল একটা মিথ নয়, অভ্যাসও নয়। এটির নেপথ্যে রয়েছে বিজ্ঞান। আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ব্যাখ্যার পাশাপাশি একজন সাধুর প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস এবং আকর্ষণ জোরালো করতেও সাহায্য করে পরনের ওই গেরুয়া বসনটিই।

তবে পুরানো নথিপত্র ঘাটলে এই গেরুয়া রং-এর পোশাক কেন সন্ন্যাসীদের পোশাকের রং হল, তা সম্বন্ধে কিছুটা আলোকপাত করা যেতে পারে। জানা যায় এইরকম..........

শ্মশানে মৃতদেহ নামিয়ে রাখার পর পুরোনো কাপড় ফেলে দিয়ে দেহটি গঙ্গায় স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে শুরু করা হয় মৃতের অন্তিম যাত্রা। ওই ফেলে দেওয়া কাপড় সংগ্রহ করে আনতেন বৌদ্ধ শ্রমণেরা। লাল মাটির উপর অনেক দিন ফেলে রাখলে সেই কাপড়ে মাটির রঙ ধরত। তখন মাটি থেকে কাপড় তুলে নিয়ে সামান্য ধুয়ে তাঁরা গায়ে পরতেন। এইভাবে তৈরি হত সন্ন্যাসীর পরিধেয় আড়াই হাজার বছর আগে।

বৈদিক যুগের সন্ন্যাসী প্রায়শই নগ্ন, লজ্জা তাঁকে ছেড়ে গেছে। তবু দিন পাল্টায়। অরণ্য কেটে যতই বসতি স্থাপন করা হল, ততই সন্ন্যাসীরও প্রয়োজন হল বসনের। সামাজিকতার কারণে তো বটেই, শীত এবং রৌদ্রের তাপ হতে বাঁচার তাগিদেও। 

কাপড়ে মাটির রঙ ধরানো হত একথা মনে রাখার জন্যেই যে, এ দেহ একদিন মাটি হয়ে যাবে। তাই, জড়িয়ে পোড়ো না এ দেহের মায়ায়।  মাটির রঙে রাঙানো কাপড় সদাই সেকথা মনে করাতো। 

কিন্তু কাপড়ের রাঙানোর এই প্রক্রিয়া দীর্ঘ বলে মনে হল একদিন। কনখলে আর রাজমহেন্দ্রীর মত জায়গায় এমন সব পাহাড় পাওয়া গেল যাদের রঙ লালচে গেরুয়া। তখন সেখান থেকে পাথর নিয়ে আসা হল। দুই খণ্ড বাদামী পাথর দুহাতে ধরে জলের মধ্যে ডুবিয়ে ক্রমাগত ঘষে ঘষে রঙ তৈরি হত। জলের সঙ্গে গুলে সেই আশ্চর্য রঙ তৈরি হলে, কাপড় বারবার ডুবিয়ে ডুবিয়ে নিংড়ে নিংড়ে থুপে থুপে রঙ করার প্রক্রিয়া চলতে লাগল। হাত ব্যথা, কোমর ব্যথা, শিরদাঁড়া ব্যথা হয়ে গেলেও গৈরিক কাপড় শুকিয়ে গেলে গায়ে পরবার সময় সন্ন্যাসীরা অনির্বচনীয় শান্তি ও স্থির ধ্রুব আনন্দের অধিকারী হতেন।

অনেকের মনে প্রশ্ন হতে পারে,  কেন বাজার থেকে গেরুয়া থান কাপড় কিনে আনলেই তো হতো। তার থেকে জামা, কাপড় বানিয়ে নিলেই হল। এত কাণ্ডের দরকার কী? কিন্তু অমন রেডিমেড কাপড়ে এত বছরের ইতিহাস মাখা থাকত কি? মাটির সুঘ্রাণ, মাটি হয়ে যাবে সব একদিন, মনে পড়ত কি? দশনামী সাধুদের কাপড় অন্তত মাটিতে ছুপিয়েই পরার রীতি। 

কালক্রমে কনখল কিংবা রাজমহেন্দ্রীর সেই  গিরিশ্রেণী ধ্বংস হয়ে গেল। মাটির নীচে পাওয়া গেল কপারের মাইন। লাল পাথর চলে গেল, এল এক কেমিকাল। খুব সহজে জলে গুলে যায়। রঙ উজ্জ্বল, পাক্কা। এখন এই কেমিকালেই সাধুরা কাপড় রাঙান। একটা ইতিহাস হারিয়ে গেল।

এই রঙের মূল বৈশিষ্ট্য হল এই রঙ মনের ওপর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিগত প্রভাব সৃষ্টি করে। ক্রমাগত গৈরিক রঙ ব্যবহার করলে আর কোনও রঙের পোশাক পড়তেই ইচ্ছা করবেনা। এই রঙ পরিধান করলে মনে শান্তি আসে, কালিমা দূর করে, ধীরে ধীরে আত্মচেতনা বৃদ্ধি পায়। মানব জীবনে গৈরিক রঙের প্রভাব সূদূর প্রসারী। গৈরিক রঙ অত্যন্ত শুভ রঙ। এই রঙ মনের কুসংস্কারকে দূর করে সংস্কারি করে তোলে চিত্তকে। ত্যাগের অন্যতম প্রতীক এই গেরুয়া রঙ। এই জন্য সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর সঙ্গে গৈরিক রঙটি ওতোপ্রতো ভাবে জড়িয়ে আছে। সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে বা উপনয়নের মতো অনুষ্ঠানে এই বসন আবশ্যিক।

 গেরুয়া রঙ 'ত্যাগ, সাহস, শক্তি এবং বীরত্বের ' প্রতীক।

 একজন সন্ন্যাসী তার সমস্ত কামনা ত্যাগ করেছেন, তার লাভের কিছুই নেই। যেহেতু তার কিছু পাওয়ার আশা নেই, তাই কিছু হারানোর ভয়ও তার নেই। যেহেতু তার কোনো ভয় নেই, তাই তার সাহস ও মানসিক শক্তির কোনো অভাব নেই। এই কারণে সন্ন্যাসীরা গেরুয়া পরেন।


<< সংগৃহীত >>