" বরাহনগর " বা যাকে আমরা চলতি কথায় " বরানগর" বলে থাকি, সেটি হলো উত্তর কলকাতার এক প্রাচীন জনপদ। বিভিন্ন কারনে এই অঞ্চল বাংলার ইতিহাসের এক বিরাট জায়গা দখল করে রেখেছে। তবে প্রাচীন এই শহরের এরকম নামকরণ হবার কারন কি ছিল ?? সঠিক কারণ জানা না থাকলেও মনে করা হয়.......(১) গঙ্গার ধারে এই গ্রামে সেইসময় প্রচুর শুয়োরের উৎপাত ছিল বলে এর নাম হয়েছিল "বরাহনগর "। আবার কেউ কেউ বলেন.....(২) "বরাহ" নামে এক সিদ্ধ মুনি এই অঞ্চলে বাস করতেন বলে এর নাম এইরকম হয়েছিল। কারও মতে আবার....(৩) "বরহা" শব্দের মানে হ'ল ময়ূরের লেজ। তিন চারশ বছর আগে এখানে ময়ূর আর ময়ূরপুচ্ছের বাজার ছিল। হয়তো এইজন্য এই অঞ্চলের নাম ছিল বরাহনগর। আবার অনেকে বলে থাকেন..... (৪) বিক্রমাদিত্যের রাজসভার নবরত্নের অন্যতম রত্ন বরামিহিরের নাম থেকেই নাকি এসেছে " বরাহনগর " বা " বরানগর "। তবে এ কথার সত্যতা কতখনি সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। আর এই অঞ্চলের সাথে মিল রেখে পাশের গ্রামটিকে চিড়িয়ামোড় বলে ডাকা হ'ত। তবে যাই হোক এই জনপদ পশ্চিমবাংলার মানচিত্রে চব্বিশ পরগনার (উত্তর) জেলার এক প্রাচীন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান হিসাবে পরিচিত।
এই বরানগরের ইতিহাস মোটামুটি পাঁচশ বছরের পুরানো। বরানগর ছিল ওলন্দাজ বা ডাচেদের ঘাটি। তারা এখানে প্রথম কুঠি স্থাপন করেন। এরপর পর্তুগীজরাও এখানে কুঠি স্থাপন করে । এই সব কারনে এখানে তৈরি হয়েছিল কুঠিঘাট। এরপর রাজত্ব করেছিল ব্রিটিশরা। সেইসময় এই কুঠিঘাট রোডের দুধারে তুলোর গুদাম ছিল। আর সমস্ত অঞ্চল ছিল গভীর জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। এই জঙ্গলের ভিতর থেকেই মাঝে মধ্যেই শোনা যেত মর্মভেদি / গগনভেদি কোনো নারীর কন্ঠস্বর, চিৎকার। আর তার সাথে শোনা যেত কাঁসর, ঘন্টা, ঢাক, ঢোলের এক প্রবল আওয়াজ। আশেপাশের লোকেরা বুঝতে পারতেন গঙ্গার পারের থেকেই এই আওয়াজ আসছে। এবং এটা কিসের আওয়াজ তা তারা সহজেই বুঝতে পারতেন। এ ছিল মৃত স্বামীর সাথে সহমরনের পৌশাচিক কালো সতীদাহ প্রথার বয়স্কা বা কিশোরী বধূর আর্তনাদ। এই হ'ল সেই " সতীদাহ ঘাট " যেখানে সেই সময়ের সামাজিক কুপ্রথার ক্রিয়াকর্ম চলতো। বর্তমান ঠিকানা ১১৮ নং মথুরানাথ চৌধুরী ষ্ট্রীট, কুঠিঘাট বাজার, বরানগর, কলিকাতা - ৩৬।
কথিত আছে বরানগরের প্রসিদ্ধ তুলো ব্যবসায়ী দত্তরাম চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ীতে এক রাতে ডাকাত পরে। নগদ টাকা ছাড়া দামি দামি জিনিস ডাকাতি করে ডাকাতরা পালানোর সময় দত্তরাম বাধা দিলে ডাকাতরা তাকে একাধিক বার রামদা দিয়ে আঘাত করে এবং তাতে তিনি মারা যান। এবং সেই সময়ের প্রথা অনুযায়ী তার স্ত্রী তাঁর সাথে সহমরনে গিয়ে সতী হন। এই ঘাটই ছিল সতীদাহ ঘাট এবং এটাই ছিল ঐ ঘাটে শেষ সতীদাহ।
তখনকার সমাজে এই অন্ধকারময় অধ্যায়ে সহমরন ছিল স্বামীর প্রতি স্ত্রীর আনুগত্য ও ভক্তির প্রতীক। সহমরনে গেলে বিধবা স্বর্গে আরোহন করবে---- এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত ছিল। রাজা রামমোহন রায় ভারতের এই অন্ধকার অধ্যায়ের সমাপ্তির জন্য তীব্র আলোরণ সৃষ্টি করেন এবং সহমরন রদের জন্য চারিদিকে আন্দোলন জোরদার করেন। এই প্রথাকে আইনের সাহায্যে নিষিদ্ধ করবার জন্য তৎকালীন ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিকের কাছে আবেদন করেন। লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথা নিষিদ্ধ করে আইন পাস করেন। রাজা রামমোহন রায়ের সেই প্রতিবাদ ভারতবর্ষের মানুষের কাছে এক বিরাট অবদান । খুব সহজ কথায় বলা যেতে পারে তাঁর এই অবদানই ভারতবর্ষের নারীমুক্তি বা নারীশিক্ষার পথ মসৃণ করেছে।
এটি এখন একটি পর্যটন কেন্দ্র বলা যেতে পারে। চারিদিকে ঘর বাড়ী হয়ে যাওয়ার ফলে গঙ্গার পাড়ের এই জায়গার এক সামান্য অংশ বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা তেমন কেউ আসে না। আর এর ফলে এই স্থানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব/ সম্বন্ধে কেই-ই বিশেষভাবে ওয়াকিবহাল নয়। পর্যটকদের জন্য সুন্দর বসার ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে বসে আপনি গঙ্গার সুন্দর দৃশ্য উপভোগ করতে পারবেন আর তার সাথে অতীতের ঘটনাগুলি আপনাকে মনে করিয়ে দেবে সেই বর্বরতাময় অন্ধকার যুগের কথা। এখানে রয়েছে রাজা রামমোহন রায়ের আবক্ষ মূর্তি যা কিনা এক সংস্কারের প্রতীক বা পরিবর্তনের প্রতীক। আপনিও একদিন চলে আসুন। বি টি রোডের সিঁথির মোড় স্টপেজে নেমে কুঠিঘাটের অটো ধরুন। আপনাকে নামিয়ে দেবে গঙ্গার ঘাটে। একটু হেটে এসে এই নিরালায় বসে থাকতে থাকতে হয়তো আপনিও শুনতে পেতে পারেন বাতাসে ভেসে আসা রাজা রামমোহন রায়ের সেই প্রতিবাদের আওয়াজ।
( সংগৃহীত )




